আচার-০০১

ক্যাডেট জীবনের প্রথম স্টেজ কম্পিটিশানে গিয়া বিরাট পঁচাইলাম, এইরকম পঁচানি যে আকাশ বাতাস গন্ধে ত্রাহি ত্রাহি করতে লাগল। সেইটা ছিল ইংরেজি এল্যুকিউশান। আমি নেহেরুর বক্তৃতা মুখস্থ কইরা না গিয়া, দেইখা দেইখা পুরাটা বইলা আসলাম। ফলাফল, যা হওয়ার তাই হইল। আমি হইলাম লাড্ডুগুড্ডু। আমাদের হাউস কালচারাল প্রিফেক্ট সেইদিন কোন কারণে যায় নাই অডিটরিয়ামে, তাই ভাবছিলাম বাইঁচা যামু এইবার। কিন্তু, মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। আমাদের তৎকালীন হাউস মাস্টার রফিক নওশাদ স্যারের জিগরে বড়ই চোট লাগল তার হাউসের এক ক্যাডেটের এই রকম ন্যাক্কারজনক পারফর্মেন্সে। স্টেজ কম্পিটিশানগুলা হইত বৃহস্পতিবার, লম্বা কোয়াইট আওয়ারসহ। সেই লম্বা কোয়াইট আওয়ারটা যে আমার জীবনের দীর্ঘতম কোয়াইট আওয়ার হবে আগে জানলে তো নেহেরুর বক্তৃতা ঠোঁটস্থ, কন্ঠস্থ কইরা যাই। যাই হোক, সেইটা যখন আগে জানতাম না, আর চোর পালানোর আগে যেহেতু মানুষের বুদ্ধি বাড়ার কোন চান্স নাই, আমার নিয়তিও পরিবর্তন হয় নাই। বৃহস্পতিবারের বদখত এবং বদস্য বদ স্বাদের লাঞ্চ সাইরা হাউসে ফিরতেই হাউস মাস্টার অফিসে আমার ডাক পড়ল। গিয়া দেখি, রফিক স্যার বিরাট বেত নিয়া দাড়াঁয়া আছেন। আমি যাইতেই গরু পিটনা শুরু করলেন। তখন মোটে ক্লাস এইটে পড়ি। বয়েস ডোন্ট ক্রাই- এই আপ্তবাক্য মাথায় তখন ঢুইকা গেছে, কিন্তু মাইরের চোটে ফোঁপায়া কান্দন শুরু করলাম। স্যার এতে ক্ষান্ত দিলেন না। তখনো জুনিয়ার আসে নাই, তাই বেশরম আমার অপমান চুড়ান্ত করতে ক্লাসমেটদের ডাইকা নিয়া আসলেন হাউস বেয়ারা দিয়া। তাদের সামনে নেহেরুর এল্যুকিউশন করতে বললেন, কান্নার চোটে আমার মুখ দিয়া নেহেরু কাইন্দা কাইন্দা ভিক্ষা চাওয়া ফকিরদের সুরে বক্তৃতা করা শুরু করলেন। স্যার তো গেলেন আরো খেইপা, ক্লাসমেটদের ভাগায়া দিয়া বললেন, অফিসের সামনে দাড়াঁয়া দাড়াঁয়া পুরা বক্তৃতা মুখস্থ করতে, যতোক্ষণ মুখস্থ না হয় অফিসের সামনে দাড়াঁয়া থাকতে হবে। আমি আর কি করুম, স্যারের আদেশ মাথায় নিয়া দাড়াঁয়া থাকলাম হাউস অফিসের সামনে। স্যার চইলা গেলেন বাসায়, আমার শাস্তির ব্যবস্থা কইরা। লোকজন বলে আমার ঘাড়ের রগ নাকি ত্যাড়া। মাইর খাইয়া সেই ত্যাড়া রগ ত্যাড়াতর হয়া গেল। আমি কি আর ওইটা মুখস্থ করি, স্যারের এই রকম আচরণের প্রতিবাদ করতে আমি ঘাড় গোঁজ কইরা দাড়াঁয়া থাকলাম পুরা কোয়াইট আওয়ার। স্যার মাগরিবের নামাযের সময় আসলেন, আমার যথেষ্ট শিক্ষা হইছে ভাইবা আর নেহেরুর বক্তৃতা করতে বললেন না। কইলেন গোসল সাইরা নামাযে যাইতে। স্যারকে ধন্যবাদ এইজন্য যে, তার এই মাইরে নিজের মধ্যে একটা রোখ চাইপা গেল। আমার স্টেজ কম্পিটিশানে ভাল করতেই হবে, নিজের জন্য লক্ষ্য ঠিক কইরা নিলাম। মজাটা হইল যে, স্যার নিজেই আমারে এই লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করছেন, তার কাছ থাইকাই আমি আবৃত্তি বা ড্রামাটিক ডায়লগ থ্রোয়িং-এর প্রথম পাঠ নিলাম। স্যার আমারে খারাপ শিখান নাই, পরের বছর বাংলা কবিতা আবৃত্তি আর ইংলিশ এল্যুকিউশন – দুইটাতেই দ্বিতীয় হয়া গেলাম (আমাদের তারকা আবৃত্তিকার আল-মাহমুদ না থাকলে হয়ত আরো একটু ভাল করতে পারতাম, কিন্তু শালা বাড়াবাড়ি রকমের ভাল)। স্টেজে উইঠা লোক হাসানো একটা ছেলের জন্য এক বছরে উন্নতি হিসাবে খারাপ না, কি বলেন? কবিতা আবৃত্তি এরপর আমার প্যাশন হয়া গেল, এখনো রাত্রে যখন ল্যাব থাইকা বাসায় ফিরি রাস্তায় লোকজন না থাকলে গলা ফাটায়া আবৃত্তি করি। স্যারকে এই ব্লগের মাধ্যমে আমার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলাম।

যা নিয়া লেখমু ভাবছিলাম তার থাইকা অনেক দূরে আইসা পড়ছি। আবার প্রসংগে ফেরৎ যাই। আগের পোস্টে গ্র্যাড ফেস্টের কথা বলছিলাম। গ্র্যাড ফেস্টের অনেক ইভেন্টের একটা ছিল ব্রিউয়ারি টুর, যেখানে বিয়ার বানায় আরকি, সেই ফ্যাক্টরি পরিদর্শন। আমরা প্রায় পঞ্চাশজন গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট বাসে চইড়া গেলাম সেইখানে। বাস ভর্তি লোকজনের সাথে গেল নানা রকম বাদ্য যন্ত্র, সেইখানে গিয়া গান বাজনা হবে। তো গেলাম সেইখানে, গিয়া একটা জিনিসে অবাক হইলাম, বিয়ারের গন্ধ হইল গিয়া খেজুরের রসের মতো (শীতে আই ইউ টি তে সকাল বেলা রস খাইতে যাওয়া একটা অবশ্য কর্তব্য ছিল আমাদের। আহা! কতদিন খেজুরের রস খাই না।)। কানাডার লোকজন বিয়ার খায় প্রচুর, বিয়ার খাওয়াটা তাদের কালচারের একটা বড় অংশ। সুতরাং তারা ফ্রি বিয়ার পায়া শুরু কইরা দিল বিয়ার পান। দুই একজন তো পারলে বিয়ার রাখার বড় ট্যাংকিতে ঝাঁপ দেয়। এত বড় একটা দলের মাঝখানে আমিই একমাত্র বিয়ার না খায়া আড্ডা দেওয়া শুরু করলাম পোলাপাইনের সাথে। দুই একজন সাধাসাধি করল বটে, যখন বললাম আমি খাই না, আমারে আর ঘাটাইল না। আমারে ভুল বুইঝেন না, নিজেরে সাধু হিসাবে জাহির করতাছি না, ইচ্ছা যে একেবারে করে নাই তা না। আমি জীবনে এলকোহল খাই নাই, এখন হঠাৎ কইরা খায়া টাল হইয়া যাই যদি! টাল হওয়া ছাড়াই আমি যেসব টালামি করি ওইগুলার কথা চিন্তা কইরা আর সাহস পাইলাম না, কে জানে কি করা শুরু করি! যাহোক দলনেতা সেবাস্টিয়ান একটু পর শুরু করল লোকজন ডাইকা ডাইকা গান গাওয়ানো। এইখানের মিউজিক স্কুলের লোকজন ফাটায়া ফেলতে লাগল। ঘন্টা দুয়েক পর মোটামুটি সবাই যখন গান বাজনা বা অন্যকিছু একটা কইরা ফালাইছে, সেবাস্টিয়ান মাইক নিয়া বলল, আমার এখন কিছু একটা করতে হবে। আমি পড়লাম আকাশ থাইকা। গান যদি শুরু করি, আশেপাশের সব কুত্তা চইলা আসব আমারে তাড়াইতে। সুতরাং এই রিস্ক নেয়া যায় না। মোটামুটি বেগুন ধরনের আমার কোন গুনই নাই, কিছুই পারি না। এই সব কিছুই না পারার মধ্যে যেটা একটু কম না পারি ওইটা হইল আবৃত্তি, তাই ঠিক করলাম বিদ্রোহী আবৃত্তি করুম। স্টেজে মাইক নিয়া দাড়াঁইলাম, একটু বলার চেষ্টা করলাম বিদ্রোহীর বেন্তাত্ত। তারপর শুরু করলাম আবৃত্তি। ফিসফাস, গ্লাসের টুংটাং সব থাইমা গেল তামশা দেখতে। সবাই চোখ বড় কইরা কইরা দেখা শুরু করল, চিকনা ঢ্যাঙ্যা এক লোক তারস্বরে চেচাঁয়া যাইতাছে। আমি কেয়ার করলাম না, আমার চোখ মুখ দিয়া আগুন বাইর হইতাছে আমি বুঝতাছি, শুরু যখন করছি শেষ করুম। পুরাটা মনে ছিল না, তাই “পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি ফিং দিয়া দেই তিন দোল” পর্যন্ত আবৃত্তি কইরা থামলাম। লোকজন হাততালি দিল, আমি বাউ কইরা নাইমা আসলাম। ভেতরে থাকতে লজ্জা লাগতাছিল, তাই নিচে গিয়া পার্কিং লটে দাড়াঁইলাম। আমাদের সাথে আসা একজন তখন নিচে আসছে, বিড়ি খাইব বইলা। আমারে দেইখা বিদ্রোহী সম্পর্কে, কাজী নজরুল ইসলাম-এঁর সম্পর্কে জিগাইল। যতোটুকু পারি বললাম। তার ততোক্ষণে বিড়ি শেষ, শেষের লম্বা টানটা দিয়া ফিল্টারটা মাটিতে ফালায়া পা দিয়া পিইষা ফেলল, আমার দিকে তাকাইল, তারপর বলল, “I liked it. That was fucking intense, man!” আমি কি আর করুম, কাজী নজরুল মনে হয় জীবনে বহু কমপ্লিমেন্ট পাইছে, কিন্তু “FUCKING INTENSE!” আমি হতবুদ্ধি হইয়া তার অপসৃয়মান পিঠের দিকে তাকায়া থাকলাম।

৪,০০৭ বার দেখা হয়েছে

৫২ টি মন্তব্য : “আচার-০০১”

  1. তৌফিক (৯৬-০২)

    মেহেদি ভাই, ভাল খারাপের কিছু তো নাই, ব্যাপারটা চয়েসের। যা করতে মন চায় করবেন, আরেক জনরে ডিস্টার্ব না করলেই হইল। আপনি কি অস্ট্রেলিয়ার নাকি? অসি এক মাইয়ার সাথে অইদিন ওই জায়গাতেই আলাপ হইছিল, কয় বিয়ার নাকি এইখানে দামি, দেশে নাকি সস্তা।

    জবাব দিন
  2. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    তৌফিক ভাইয়ের "তোমাকে পাবার জন্যে হে স্বাধীনতা" কেন জানি এই সাত বছর পরেও আমার মনে পড়ে।আইসিসিএলএমএম ২০০১-পাবনায় মেডেলের তালিকায় হয়ত তাঁর নাম উঠে নাই, কিন্তু সেদিনের সেই তাঁর মতই ঢ্যাঙ্গা,জীবনের প্রথম আইসিসি করতে আসা ক্লাস ইলেভেনের ছেলেটার মনের খাতায় পাকাপোক্তভাবে সেই আবৃত্তি গেঁথে গিয়েছে।

    আইসিসিএলেমেম-২০০১ আমার ক্যাডেট জীবনের সবচেয়ে আনন্দের কয়েকটা দিন।তৌফিক ভাই, মনে করায় দিলেন।ইট ওয়াজ *কিং ইনটেন্স! 🙂

    জবাব দিন
  3. আহ্সান (৮৮-৯৪)

    তৌফিক,

    চুপা রুস্তম...। আসলে তোমাদের অনেকের ই দেখতাছি এক ই অঙ্গে বহুত রুপ...। সাবাস বেটা...।
    লেখাটা সুন্দর হইছে। খুবই ভালো। লেখা gradually develop করাটা সবাই পারেনা। তুমি পারো।

    রফিক নওশাদ স্যার আমার হাউস মাস্টার ছিলেন...। আমি ছিলাম হাউস কালচারাল। সুতরাং, ওনার সাথে ওঠা বসা টা আমার একটু বেশী ই ছিল। স্যারের কাছ থেকে সাংস্কৃতিক অনেক কিছুই শেখার আছে। কিন্তু স্যারের মাইরের ইতিহাস তো আমার জানা ছিলনা । নতুন তথ্য পাইলাম ।

    যাইহোক, পরবর্তী পর্বের আশায় রইলাম।

    জবাব দিন
  4. রায়হান আবীর (৯৯-০৫)

    ''শীতে আই ইউ টি তে সকাল বেলা রস খাইতে যাওয়া একটা অবশ্য কর্তব্য ছিল আমাদের। আহা! কতদিন খেজুরের রস খাই না।''

    তিন বছর হয়ে গেলো আমি এখনও খাইনাই। 🙁

    লেখা দারুন লাগছে। চালিয়ে যান। আপনার লেখা পড়ে পড়ে আমরাও আপনার অভিজ্ঞতার স্বাদ নেই।

    জবাব দিন
  5. জিহাদ (৯৯-০৫)

    তৌফিক ভাই, আপনের কথা ভাবতে গেলে চোখের সামনে যে মানুষটা ভাইসা ওঠে সে খালি আকাশ বাতাস কাঁপায় তোমাকে পাবার জন্য হে স্বাধীনতা আবৃত্তি করে। 😀 আপনের এরম শরীর থেকে এরম ভরাট গলার আবৃত্তি ক্যামনে বাইর হয় এইটা আসলেই একটা চিন্তার বিষয়। :boss:

    আপনের নাম শুনলে আরেকটা কথা মনে হয়। ডাইনিং হলে খাওয়া শেষের বেল দিয়া দিসে।পোলাপাইন সব বাইর হয়া গেসে। ডিউটি মাস্টার প্রিফেক্টগোরে নিয়া দরজার দিকে পা বাড়াইসে। কিন্তু আমগো তৌফিক ভাই তখনো খালি খাইতেই আসে, খাইতেই আসে 😛

    এই সিরিজ চালায় যান ভাই। যেইটা দিয়াও আবার নিয়া নিসেন সেইটাও সাহস করে দিয়া দেন। আমরাও পড়ার জন্য সাহস অর্জন করতে থাকি । আমিন, ছুম্মা আমিন।


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
  6. মান্নান (১৯৯৩-১৯৯৯)

    বেগুন তৌফিকেরই যত গুনের খবর পাচ্ছি, তাতে আমাদের তো মুখ লুকাতে হবে মনে হচ্ছে । আমিও প্রথম বার টেলেন্ট শোতে স্টেজে উঠে নাটকের ডায়লগ ভুলে গিয়েছিলাম । সে কথা এখনো মনে পড়ে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।