বুক রিভিউঃ দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ফ্ল্যাট / ইনসাইড দ্য থার্ড রেইখ

আমি রিভিউ ধরনের পোস্ট লিখতে খানিকটা ভয় পাই, কি লিখতে কি লিখে ফেলি। মিস্তিরিগিরি করি, ওইটা নিয়াই থাকা উচিৎ। আজকে ঘুম থেকে উঠে ভাবলাম লিখেই ফেলি, মাখায়া ফেললে আর কি, আমরা আমরাই তো!

১।
বইয়ের নামঃ দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ফ্ল্যাট। বাংলা করলে পৃথিবী সমতল। এক বিংশ শতাব্দীতে এসে পৃথিবী যে কমলালেবুর মতো, দুইপাশে একটু চাপা, এই কথা নার্সারী ক্লাসের বাচ্চাও জানে। কিন্তু লেখক টম ফ্রিডম্যানের দাবী পৃথিবী আর গোলাকার নেই, সমতল হয়ে গেছে। কি কারণে সমতল হলো, পুরো বইয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। বইয়ের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে ইন্টারনেট। এর প্রভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কথা খুব সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন। ব্যাখ্যার পেছনে আছে যুক্তি আর তথ্যের মিশেলে মজবুত গাঁথুনি। সুখপাঠ্য একটি বই।

ভারত ও চীন কিভাবে লাভবান হয়েছে ইন্টারনেট বুমিং-এ এ ব্যাপারে বলা যাক প্রথমে। প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে যেটা নূন্যতম আয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সেটাই সম্মানজনক আয়। যেমন কল সেন্টারের কাজ হলো প্রথম বিশ্বে একটা অড জব। স্টুডেন্টরা করে বেশিরভাগ, হাতখরচ চালানোর জন্য। কল সেন্টারের কাজ করে এখানে কারো সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে না। কিন্তু ভারত এই কল সেন্টারের কাজগুলো করে দেবে কম খরচে, এবং ভারতে কল সেন্টারের কাজ মোটামুটি আরাধ্য বস্তু, ভালো বেতন এবং সেই সাথে উচ্চতর সামাজিক মর্যাদার জন্য। কোম্পানিগুলো তাই কল সেন্টারগুলো প্রথম বিশ্ব থেকে সরিয়ে তৃতীয় বিশ্বে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কম খরচের জন্য। এটা তো একটা উদাহরণ গেল, এরকম আরো অনেক উদাহরণ আছে বইটাতে। লোকজনের সাক্ষাৎকারসহ।

বইটায় ইন্টারনেটের প্রভাবে শিক্ষা ও গবেষণায় কি পরিবর্তন এসেছে লেখক তাও আলোচনা করেছেন। চীনের যেকোন ইউনিভার্সিটি একজন ছাত্র এবং পৃথিবীর সেরা প্রযুক্তির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এম আই টি-র একজন ছাত্রের মধ্যে পার্থক্য মোটে দুই সপ্তাহ এই দাবি করেছেন তিনি। বিস্তারিতের জন্য বইটা পড়তে হবে, আমি মজা নষ্ট করবো না।

আমেরিকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেছেন বইটাতে। ঠিক কি কারণে আমেরিকা পিছিয়ে পড়েছে তাও ব্যাখ্যা করেছেন উনি। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের একজন মানুষ যদি বইটা পড়েন তবে প্রত্যেক পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে মনে হবে আমরা যদি এটা করতাম বা ওটা করতাম তবে আমাদের ভাগ্য ফিরে যেত। যাইহোক আমাদের প্রাজ্ঞ রাজনীতিকরা তো ইন্টারনেট নিতেই চাইলেন না প্রথমে। নীতি নির্ধারণে দূরদর্শীতার অভাবে আমরা পিছিয়ে পড়ছি।

বইটা এখন আমার সাথে নেই, থাকলে উলটে পালটে রিভিউটা লেখা যেত। রিভিউয়ের চেয়ে এই পোস্টটা বিজ্ঞাপন বেশি হয়ে গেছে মনে হয়। তবে আমার রিভিউকে পাত্তা না দিয়ে যদি বইটা পড়েন তাহলে দারুণ একটা অভিজ্ঞতা হবে – এইটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি।

২।
হিটলারের আর্মামেন্ট মিনিস্টার ছিলেন আলবার্ট স্পিয়ার। পেশায় ছিলেন একজন আর্কিটেক্ট। হিটলারের চোখে পড়ে যাওয়ায়, তার পৃষ্ঠপোষকতায় জার্মানীর ইন্সপেক্টর জেনারেল অব বিল্ডিংস হয়েছিলেন। এরপর হন তার আর্মামেন্ট মিনিস্টার, তার কাজ ছিল জার্মান ওয়ার মেশিনের জন্য আর্মস এন্ড মিউনিশান তৈরী করা। হিটলারের গেস্টাপো বাহিনী তাকে পছন্দ করতো না বন্দী ইহুদি শ্রমিকদের সাথে ভালো ব্যবহার করতেন বলে। ইন্টারনেট একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই দেখবেন চার্চিল হিটলারের পরেই স্পিয়ারকে বিপদজনক ভাবতেন। মার খাওয়া জার্মান বাহিনী তার সুনিপুণ সাপ্লাই নেটওয়ার্কের উপর ভর করে বেঁচেছিল অনেকদিন।

নুরেমবার্গ ট্রায়ালে মনে হয় ২০ বছর জেল হয়েছিল উনার (গুগল করলেই হয়, ইচ্ছা করছে না), জেল থেকে আত্নজীবনী লেখা শেষ করেছেন। তার আত্নজীবনীর নাম- ইনসাইড দ্য থার্ড রেইখ। আন্তরিক একটা সৃষ্টি এটা।নুরেমবার্গ ট্রায়ালে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিজের মৃত্যুদন্ড দাবি করেছিলেন। জেলে লুকিয়ে লুকিয়ে বইটার কাজ শেষ করেছিলেন। বইটাকে মোট তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে, প্রথম ভাগে আছে তার নিজের উত্থানের কথা। মধ্যভাগে আছে যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থার বর্ণনা, শেষভাগে আছে থার্ড রেইখের পরাজয় এবং তার নিজের জবানবন্দি।

হিটলার এন্ড গংদের কাছ থেকে বুঝতে চাইলে এই বইটা পড়া যেতে পারে। গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক আলোচনায় না গিয়ে নির্মোহ বর্ণনায় তিনি এঁকেছেন হিটলার, এভা ব্রাউন, গোয়েবলস এবং থার্ড রেইখেরঅন্য মাথাগুলোকে। হালের সিনেমা ভ্যালকারি-র ঘটনাও ওখানে আছে। জার্মানির আর্মস ডেভলপমেন্ট এবং যুদ্ধে তাদের ইম্প্যাক্টের উপর নাতিদীর্ঘ বর্ণনা আছে মাঝেমধ্যে। যুদ্ধের শেষদিকে হিটলারের হটকারী সিদ্ধান্তগুলোর কথা এই বই থেকে জানা যায়। অনেক উদাহরণ না দিয়ে একটার কথা বলি বরং। দ্বিতীয় যুদ্ধের ইতিহাসে ট্যাকটিক্যালি জার্মানির সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল যখন ইউ এস এয়ার ফোর্স জার্মানির মেইনল্যান্ডে ওদের ফ্যাক্টরিগুলোতে বম্বিং শুরু করল। এই হামলা ঠেকানোর প্রযুক্তি অবশ্য জার্মানির ছিল, হিটলারের হটকারী সিদ্ধান্তে তা ব্যবহার হয়নি। জার্মানিই প্রথম জেটপ্লেন তৈরী করে। স্পিয়ার লিখেছেন তার সুপারিশ ছিল জেটপ্লেনগুলোকে ইন্টারসেপ্টর বা ফাইটার হিসাবে ব্যবহার করা হোক, মাথামোটা হিটলার সেগুলোকে বম্বার হিসাবে ব্যবহার করেছিল। ইউ এস এয়ারফোর্সের হামলাগুলোকে অনায়াসে থামানো যেত জেটগুলো দিয়ে, কারণ ইউ এস এয়ারফোর্সের প্লেনগুলো তখনো মান্ধাতা আমলের পিস্টন সিলিন্ডার ইঞ্জিনে চলে, গতি বলতে গেলে জেটগুলোর তুলনায় পিপঁড়ার গতি। এরকম আরো অনেক চমকপ্রদ তথ্য পাবেন বইটাতে।

বইটা পড়ার পর আমার মনে হয়েছে হিটলারের জায়গায় যদি ঝানু কোন সমরবিদ থাকতেন তবে যুদ্ধের ফলাফল কি হত অথবা যুদ্ধটা অতটা ছড়িয়ে পড়তো কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে।

ডিসক্লেইমারঃ বিছানায় শুয়ে শুয়ে স্মৃতি থেকে লিখেছি। ভুলভাল থাকতে পারে, নিশ্চিত তথ্য জানতে অন্য রেফারেন্সের সাহায্য নিন।

৩৭ টি মন্তব্য : “বুক রিভিউঃ দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ফ্ল্যাট / ইনসাইড দ্য থার্ড রেইখ”

  1. চায়না'র পড়াশুনা পুরাই অন্য ধাঁচের..........ওখানে অনেক ইউনিতে অ্যালগরিদম না পড়েই কম্পু গ্রাজুয়েট হয় তারা.....কিন্তু এরপরেও এবার প্রোগ্রামিং কন্টেস্টে ইউএসএ'র টিমগুলো (এমআইটি সহ) চায়না'র টিমের কাছে সে অর্থে তেমন কোন পাত্তাই পায়নাই.......

    সুতরাং লেখক কিসের ভিত্তিতে তুলনা করেছেন তা ভাল করে জানা দরকার....

    জবাব দিন
  2. ত্রিমিতা (৯৬-০০)
    দিয়ে যদি বইটা পড়েন তাহলে দারুণ একটা অভিজ্ঞতা হবে - এইটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি।

    ধন্যবাদ তৌফিক! পুরোপুরি একমত!

    যারা আলসেমিতে বা সময়ের অভাবে মোটা বই ধরতে সাহস করেননা তাদের জন্য নিচের ভিডিওটা দিলাম। এটা মনযোগ দিয়ে শুনলে মোটামুটি বইটার
    সানে-নজুল বুঝতে পারবেন।
    Thomas Friedman Speech

    জবাব দিন
  3. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)
    ব্যাখ্যার পেছনে আছে যুক্তি আর তথ্যের মিশেলে মজবুত গাঁথুনি।

    উঁহু, যুক্তি আর তথ্যই নাই, তাছাড়া পাঠককে মুগ্ধ করার জন্য আর যা যা লাগে তা'র সবই 😛 । আর এক কারণে ফ্রিডম্যান যা বলেছে, সেটা বিজ্ঞাপণ, জ্ঞান নয়।

    কপালে আমেরিকার পাসপোর্ট আর পকেটে নিউইয়র্ক টাইমসের এসাইনমেন্ট থাকলে পৃথিবী সমতলই দেখার কথা, কোন শালার সাহস আছে ঐ মামুরে আটকায়! তিনি যেই দেশগুলোর উন্নয়ন-জোয়ার রিপোর্ট কইরা বেরান, পাসপোর্টটা সেইসব কোন দেশের হলেই বুঝতেন পৃথিবী কতটা বন্ধুর।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
    • তৌফিক (৯৬-০২)

      মাহমুদ ভাই,

      আগেই বলছি মিস্তিরি, তাই যখন পড়ার সময় মুগ্ধতা নিয়েই পড়ছি। আপনি কোন লাইনে কথা বলতেছেন তা বুঝতে পারছি। আমি এভাবে চিন্তা করি নাই। আমি এর ভুক্তভোগী।

      জবাব দিন
    • ‍কি অদ্ভুত... তৌফিকের ‍রিভিউটা পড়তে পড়তে ঠিক মাহমুদ ভাইয়ের কথাগুলা মনে হচ্ছিল!! এসব "সমতল" লেবেল হল এক ধরনের বাহাস... সম্পর্কটা সবসময় ক্ষমতার এবং অসম।

      জবাব দিন
      • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

        এই বইয়ে ফ্রিডম্যান মামু ভারত বা চীনে উন্নয়নের অনেক গল্প কয়েছেন। সেগুলোর একটা হল, ব্যাঙ্গালোরে তিনি দেখেছেন শ্রমিকরা ইটের পরে ইট গেঁথে অত্যাধূনিক ইমারত বানাচ্ছে আর তিনি সেই উন্নয়নের জোয়ার দেখে 'বিমুগ্ধ' হয়ে যাচ্ছেন!- মামু একটু কষ্ট করে মাইলখানেক দূরে গেলেই দেখতে পেতেন যে, এই শ্রমিকেরা বস্তিতে কিভাবে থাকে। এরা কিন্তু শত বছর ধরে বস্তিবাসী না, এরা সদ্য গ্রামীন অর্থনীতি থেকে রাষ্ট্রীয় তদারকিতে উতখাত হওয়া সাবেক-স্বনির্ভর 'গেঁয়ো'।

        কর্পোরেট অফিসে এসির মধ্যে বসে 'ইরাম' উন্নয়নকে দেখতে চাইলে এই বইয়ের সাথে মামুর আরেকটা বই আছে, ঐটাও পড়ে দেখা যেতে পারে (Lexux and the Olive Tree)।


        There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

        জবাব দিন
  4. জিহাদ (৯৯-০৫)

    বইটা পড়া হয়নাই। কোনদিন পড়া হবে কীনা সেইটাও বুঝতেসিনা 😕

    তবে রিভিউ ভাল্লাগসে।

    তো হ্যাট্রিক আজকে করেই ফালাইলেন দেখি। বলেন কি খাওয়াবেন? 😀


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
  5. মাসুদুর রহমান (৯৬-০২)

    তৌফিক আমি তোর সব কথা/লেখা বুঝি নাই। কারন আমি একজন আপাদমস্তক মানবিক ছাত্র। কিন্তু এই

    বইটা পড়ার পর আমার মনে হয়েছে হিটলারের জায়গায় যদি ঝানু কোন সমরবিদ থাকতেন তবে যুদ্ধের ফলাফল কি হত অথবা যুদ্ধটা অতটা ছড়িয়ে পড়তো কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে।

    এই কথাতা মানতে পারলাম না। হিটলার না যুদ্ধ পরিছালনা করতেন রোমেল। হিতলের তার পরামর্শ খুব মানতেন। আর আইজেন হাওয়ার রোমেল সম্পর্কে বলেছেন, "may be i m talented but Romel is genius."
    জবাব দিন
  6. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    অনেকদিন পর আবার পড়লাম।
    আলবার্ট স্পিয়ার সাহেবের বইটা পড়ার জন্য ব্যাপক লোভ হচ্ছে। ব্যাটার সাইকোলজি জানতে মঞ্চাইতাছে।
    এইটা আগেও দেখছি, আর্কিটেক্টরা সবধরণের প্ল্যানিং এ দুর্দান্ত হয় নিজের লাইফ প্ল্যানিং টা ছাড়া 😀


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।