আমার প্রথম ভালোবাসা

(শুরুর কথাঃ ক্যাডেট কলেজের প্রাতঃরাশে মাথাপিছু পরোটা বরাদ্দ থাকত তিনটা। ক্লাস সেভেনে লিকেলিকে শরীরের পেটরোগা আমি সবগুলো খেতে পারতাম না। ২৯ তম ব্যাচের শ্রদ্ধেয় বড়ভাই ও তৎকালীন টেবিল লিডার আবুল হোসেন ভাই ব্যাপারটি খেয়াল করলেন। ফরমান জারি করলেন, এখন থেকে আমার চারটা খেতে হবে, তার একটা সহ। আমার ভালোবাসার শুরু এখানেই।)

সকালবেলা পিটির পর গোসল সেরে যখন খাকি ড্রেসটা পরতাম মনে হত, দুনিয়া খেয়ে ফেলি। বাড়ন্ত শরীরের চাহিদাটা বোধকরি একটু বেশিই ছিল। ডাইনিং হলে ঢোকার সাথে সাথে ভাজা পরোটার গন্ধ নাকে এসে এমন সুড়সুড়ি দেয়া শুরু করত যে মনে হত একটা পরোটার জন্য হাতের মুঠোয় প্রাণ নেয়া যায়, দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বাঁধা যায় লাল কাপড়, বিশ্ব সংসার তন্নতন্ন করে খুঁজে আনা যায় ১০৮ টা নীল পদ্ম, অবলীলায় অমরত্ব তাচ্ছিল্য করা যায়। ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে শুরু হত খাওয়া দাওয়া। সিনিয়ার মোস্ট ক্যাডেট, তাই নিজের জিহ্বাকে সংবরণ করে অপেক্ষা করতে হতো, জুনিয়ারগুলো বাটি থেকে পরোটা তুলে নেবে বলে। যথাসময়ে পরোটার বাটি আসত আমার সামনে। পরম মমতায় তিনটে পরোটা তুলে নিতাম পাতে, ৩০ সেকেন্ড লাগত ওগুলোকে ছুরি দিয়ে দুইভাগ করতে। সাথে থাকত চানার ডালে গরুর মাংস, ছোট ছোট বাটিতে। অর্ধেক পরোটার মাঝখানে একটু ডাল আর মাংস নিয়ে মুড়ে ফেলতাম। চকেচকে চোখ দিয়ে চাটতে চাটতে দাঁত দিয়ে কেটে নিতাম মুড়ানো পরোটার অর্ধেক। মুখে দিতেই আবেশে বন্ধ হয়ে আসত চোখ দুটো, তেলে ভাজা পরোটাগুলো গলে যেত মুখে। কিন্তু তাড়িয়ে তাড়িয়ে, প্রলম্বিত আনন্দের মতো স্বাদটাকে উপভোগ করব, সেই সময় কোথায়? মোটে পনের মিনিটে খেয়ে নিতে হবে যতোটুকু পারা যায়। তিনটে পরোটা আর ছোট এক বাটি ডাল শেষ হয়ে যেত নিমিষেই। আমার রাক্ষুসে খিদে আর পরোটা প্রীতির কথা মেস ওয়েটাররা ভালোই জানতেন। তাদের বলতে হত না, বাড়তি পরোটা আমার সামনে এসে যেত চোখের পলকে। কিন্তু ডাল যে শেষ, এই পরোটাগুলো খাব কিভাবে? আমাদের সিনিয়ারদের কাছ থেকে দেখে শিখেছি, চা আছে না? কাপে চা ঢেলে পরোটা চুবিয়ে দিতাম। পরোটাগুলো চা শুষে নিয়ে টুইটুম্বুর হয়ে ফুলে উঠতে সময় নিত না বেশি। আহা! চায়ে ডুবানো পরোটা!!! একটার পর একটা পরোটা আমার পেটে যেতে থাকত, কেটলিতে চা তো আছেই। মেস ওয়েটাররা হাঁপিয়ে যেতেন আমাকে পরোটা সাপ্লাই দিতে দিতে। শেষের ঘন্টা যখন দিয়ে দিয়েছে, আমার সামনে তখনো তিন চারটা পরোটা পড়ে আছে। পরোটা গুলো টানা টানা ডাগর চোখে প্রহর শেষের আলোয় রাঙা হয়ে তাকিয়ে থাকত, গহন গাঙে বান ভাসিয়ে আলতো হেসে আমায় বলতো, যেয়ো না সোনা, আমারা এখনো আছি তো। পাঠক হয়তো আমাকে উন্মাদ ভাবছেন। কিন্তু দেখার চোখ না থাকলে, শোনার কান না থাকলে মহান শিল্পকর্ম অথবা সংগীত- কোনকিছুতেই সৌন্দর্য্য খুঁজে পাওয়া যায় না। লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে আমি পরোটাগুলোর আহ্বানে সাড়া দিতাম, ভুলে যেতাম সবকিছু। বাকাঁ চোখে তাকাতে তাকাতে ডিউটি মাস্টার ডাইনিং হল ছাড়তেন, আমি তখনো মগ্ন আমার বেঁচে থাকায়, আমার সর্বনাশে, আমার স্বর্গে। গোটা চার গ্লাস পানি খেয়ে নেমে আসতাম ধুলোমাটির পৃথিবীতে, যেখানে একটু পরেই ক্লাস শুরু হয়, আর অপেক্ষা শুরু হয় পরদিনের প্রাতঃরাশের।

৬,৩৩৭ বার দেখা হয়েছে

৬৮ টি মন্তব্য : “আমার প্রথম ভালোবাসা”

  1. তৌফিক (৯৬-০২)

    ঘুমানোর চেষ্টা করতেছি। পারতেছি না, চোখের সামনে খালি পরোটা ভাসতাছে। মনে হইতাছে আটলান্টিক এক সাঁতারে পাড়ি দিয়া দেশে চইলা যাই, গিয়া খালি পরোটাই খাই, পরোটাই খাই।

    জবাব দিন
  2. আহ্সান (৮৮-৯৪)

    অসাধারন...।অসাধারন...।। :clap:
    ইসসস...তৌফিক তুমি আমাকে যেন ঠিক কলেজে ডাইনিং টেবিলে নিয়ে গেছ। আমাদের সময়ে বুধবার দিত পরোটা আর আলু দিয়ে গরুর মাংসের(ছোট ছোট টুকরো করা)ঝোল। কিযে অমৃতের মত লাগতো সেই মাংস...আর ঝোলের কথা না হয় নাইবা বললাম...। শুধু ঝোল দিয়েই মনে হয় আমি হাফ ডজন পরোটা খেয়ে ফেলতে পারতাম। আর অদ্ভুতভাবে প্রতিটি বুধবারেই ঝোল আর মাংসের স্বাদ হতো একইরকম...। সব ব্রেকফাস্টগুলোর মধ্যে এটাই ছিলো আমার সবচেয়ে ফেভারেট। পরোটা দিত মাত্র দুইটা...। কিন্তু আমার চোখ দুটো আরো পরোটা খুজতো। আর পুরো কলেজের সব ক্যাডেটরাই যেন বুধবার সকালে রাক্ষস হয়ে যেত। কোথাও কোন এক্সট্রা পরোটা থাকতোনা। আর এই ব্রেকফাস্টের প্রতি আমার বুক ফাটা নীরব ভালোবাসার কথাও কেউ জানতোনা। তাই ভালোবাসার কষ্ট বুকে নিয়েই ডাইনিং হল ত্যাগ করতাম। এতদিন পরে আবার মনে হলো..."আহা রে এমন কি কেউ আছে যে আমাকে সেই একই স্বাদের একটুখানি ঝোল আর গরুর মাংস রান্না করে দেবে...।
    তৌফিক, অতিমাত্রায় সুখপাঠ্য হয়েছে লেখাটি... অন্ততঃ আমার কাছে। লেখাটি পড়ে আমার মুখ পানিতে ভরে গেছে...। রোজা হাল্কা হয়েছে কিনা জানিনা...। বাট, আফসোস নাই...।
    অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমার এই সুন্দর লেখাটির জন্য।

    জবাব দিন
  3. জিহাদ (৯৯-০৫)

    =)) =)) আমি হাসতে হাসতে শ্যাষ ।

    সাধেই কি আর কইসিলাম সবাই চলে গেলেও তৌফিক ভাই ডাইনিং হলে বসে বসে কি খাওয়াটাই না দিত। 😀

    কবি তৌফিকানন্দ দাশ বোধহয় ডিউটি মাস্টারকে উদ্যেশ্য করে এজন্যই বলে গেছেন - তোমার যেখানে সাধ চলে যাও, আমি এই ডাইনিং টেবিলেই রয়ে যাবো। :boss:

    জীবনে বহুত পরোটা খাইসি। আল্লায় দিলে ভবিষ্যতেও খাবো। কিন্তু ইমানে কই, কলেজের পরোটার তুলনা আমি আজ পর্যন্ত কোথাও খুঁজে পাইনাই। আপনার এই রসালো বর্ণনা দেইখা বুকের মধ্যে আবার হাহাকার উঠলো। মনে হইতেসে এখনই যদি মাঠের চারপাশে দুইটা চক্কর দিয়া, গোসল করে ফ্রেশ ট্রেশ হয়ে আবার আগের দিনের মত ডাইনিং হলের দিকে যাইতে পারতাম। :((


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
    • তৌফিক (৯৬-০২)

      সাধেই কি আর কইসিলাম সবাই চলে গেলেও তৌফিক ভাই ডাইনিং হলে বসে বসে কি খাওয়াটাই না দিত।

      তোমার আগের কমেন্ট পইড়াই এই লেখার আইডিয়া মাথায় আসছে। সেইজন্য ধন্যবাদ।

      বুকের মধ্যে আবার হাহাকার উঠলো।

      হাহাকার কি তোমার একার লাগছে? হাহাকার আমাদের সবারই লাগছে।

      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

      জবাব দিন
  4. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)

    Pudding!!!! ভাইরে দিলা তো আরেকটা দূর্দান্ত জিনিস মনে করাইয়া। এই পুডিং টার্গেট কইরা ডিউটি ক্যাডেট হওয়ার পাল্লাপাল্লি লাগত। জিনিসটার উপর আমার এতই মহব্বত জানতে পেরে আমার কলিগরা কেকের পরিবর্তে পুডিং কাটাইয়া আমার লাস্ট বার্থডে সেলিব্রেশন করছে 😀 😀 ।


    Life is Mad.

    জবাব দিন
  5. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    মুর্তজা ভাইএর 'প্রাপ্তবয়স্ক' ১ ও ২ পর্যন্ত আমার রোযারে নাড়াইতে পারে নাই- এই বার এমনই কঠিন সংযম করতেছিলাম... B-)
    কিন্তু, তৌফিক তোমার এই পোস্ট রোযারে শুধু নাড়াইলোই না- আর একটু হলে পাইড়া ফালাই দিতেছিল... 🙁
    এই রকম উস্কানিমুলক পোস্টের তীব্র প্রতিবাদ জানাই... x-(

    অফ দ্যা টপিক- কলেজের খাসির মাংস আমার কাছে অমৃতের কাছাকাছি লাগত...আহারে!!!


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  6. রোযার দিনে সবাই এইগুলি কি শুরু করলো? পরটা,পুডিং,কেক,গরুর মাংস,খাশির মাংস।
    মুমিন বান্দাদের এই রকম কঠিন পরীক্ষায় ফেলানো আল্লায় সহ্য করবো না। ~x(

    যাবতীয় বে-রোজদার নিপাত যাক। 😉

    জবাব দিন
  7. সাব্বির (৯৫-০১)

    ভাগ্য ভাল ইফতার কইরা সিসিবি তে আইসা কাহিনীডা পড়লাম। ঢোক গিলতে গিলতে আমি শেষ।
    বর্ননা এতটা বাস্তব যে পড়া শেষ কইরা টের পাইলাম আমি আসলে পরাটা খাইতেছি না। :(( :((

    জবাব দিন
  8. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    পরোটার কথা মনে হইতে আমার সুখী দিনগুলা আরেকবার হোচট খাইল। আইইউটি'র খাবারের কথা ভুইলা থাকতে চাই। কলেজের পরোটার কথা বইলা সেই কথাই মনে করায়া দিলেন। একটু পরেই ডিনার। খামু ক্যাম্নে? 🙁

    জবাব দিন
  9. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    আরে তৌফিক জটিল লেখা ব্রাদার, আর পোলাপাইনের কমেন্টগুলাও সেইরকম...... সারাদিন সিয়াম সাধনা শেষে কই একটু সেইরকম 'রুহ আফজা' নিয়া বইছিলাম, দিলাতো সবকিছুর বারটা বাজায়া....খালি পরটা মাংস না চোখের আর জিব্বার সামনে কলেজের সবকয়টা মেন্যুই ভাসতাছে...... :boss: :boss:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
    • তৌফিক (৯৬-০২)

      ১...
      নরমাল জিনিস? x-(

      আপু, পুরা একবছর পরোটা না খায়া থাকলে বুঝতা। 🙂

      দাঁত থাকিতে দাঁতের মর্ম কেউ বুঝে না। 🙁

      ২...

      এত সুন্দর আর উৎসাহদায়ী মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

      ৩...

      কষ্ট করে আমার লেখা পড়ার জন্য তোমাকেও :salute:

      জবাব দিন
  10. মুহিব (৯৬-০২)

    কি রে রাসেল!!!!!!!!! জব্বর লিখা লিখছছ। তয় দোস্ত পরটার লগে লগে আমি কলেজের বৃহস্পতি বারের স্পেশাল ডিনারটাও খুব miss করি। লিখাটা দারুন হইছে। you just took me to my CCR dinning hall.

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : তৌফিক (১৯৯৬-২০০২)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।