আচার ০২৪: পরবাসীর রোজনামচা

১.
গত মাসের শেষে মাস্টার্স থিসিস জমা দিয়ে দিয়েছি। থিসিসের ডিফেন্সও শেষ। হাতে কাজ নাই বললে ভুল বলা হবে। থিসিসের কাজ-কর্ম রিপোর্ট করে একটা জার্নাল পেপার লেখার তাগাদা সুপার দিয়ে যাচ্ছেন থিসিস শেষ করার আগে থেকেই। সেই কাজে হাত দিয়ে বুঝলাম ব্যাটারির চার্জ ফুরায়ে গেছে, মায়ের হাতের রান্না আর বউয়ের বানানো পুডিং না খেলে ব্যাটারি রিচার্জ হবে না। অগাস্ট মাসটা চুপচাপ থাকি বরং, ছুটিতে গিয়ে পেপার লেখার ব্যাপারে চিন্তা করা যাবে। থিসিস জমা দিয়েই দেশে চলে যাওয়া যেত, কিন্তু ভিসা সংক্রান্ত নানাবিধ সমস্যায় সেপ্টেম্বরেই যেতে হবে। অগাস্ট মাসটা ভাবলাম নিজের মত করে কাটাব, কম্পুতে গেইম খেলব, ব্লগিং করব আর সেইন্ট জনসের রাস্তায় পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াব। কম্পুতে গেইম খেলাটা এতোদিন ভালোই হল, ডেসপারাডোজ রিভিশান দিলাম, এখন খেলতেছি ব্ল্যাক হক ডাউন। ল্যাপিতে চলে না বলে ডেসপারাডোজের সিকুয়েল হেলডোরাডো চালাইতেছি ইউনিভার্সিটির কম্পিউটারে। আইনত ঘোরতর গর্হিত কাজ, আমি পাত্তা দেই না। কিন্তু বাকি দুইটা কাজ হয় নাই বিশেষ একটা। রাস্তায় হাঁটার জন্য সংগী দরকার, সেইটা নাই। বউ দেশে মাস্টার্স করে, এইখানের পোলাপাইনও ব্যস্ত। রাস্তায় হাঁটা সংগীর অভাবে বেশি হয় নাই তাই। আর ব্লগিং-এর কথা কি বলব, মাথাভর্তি ব্লগ লেখার আইডিয়া। কিন্তু কিছুই নামে না। আমার মাই ডকুমেন্টস ভর্তি শেষ না করা ব্লগের টেক্সট ফাইলে, একটাও মনমতো হয় না বলে পোস্টানোও হয় না। বড় লেখকদের হয় মাঝেমধ্যে এমন, এইটারে বলে রাইটার্স ব্লক। আমি মনে হয় লেখক হিসাবে বড়ই, না হইলে রাইটার্স ব্লকে পড়ার তো আর কোন কারণ নাই।

গত কয়েকমাস যাবৎ এই এক ব্যাপার হইছে আমার, ব্লগ নামলে নামে জোড়ায় জোড়ায়, না হইলে তিনটা একসাথে। এডু স্যারের ব্ল্যাকলিস্টে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক এই জন্য। কিন্তু মনের আবেগ যে রুধিয়া রাখিতে নারি। এখন পর্যন্ত এডু স্যার ধমক দেন নাই, না দেওয়া পর্যন্ত এই কাজ চালায়ে যাব। সুতরাং কাছে থাকুন। (কপিরাইটঃ গ্রামীন ফোন। রবিন ভাই দৌড়ানি দিবেন গ্রামীন ফোনরে ক্রেডিট না দিলে, তাই দিয়া দিলাম। আগে ভুলটা দেওয়ার রবিন ভাই ঠিকই ধইরা ফেলছেন।)

২.
থিসিস জমা দেওয়ার সময় জমা দিতে হয় তিন কপি। দুইটা দুইজন এক্সটার্নাল এক্সামিনারের জন্য, একটা স্কুল অব গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের রেকর্ডের জন্য। এই তিন কপি প্রিন্ট করার টাকা আবার স্কুল থেকে দেয় না। থিসিসখানাও মাশাল্লাহ গায়ে গতরে বেশ বড়, থিসিস লেখকের মতো পাটকাঠি না। প্রায় দুইশ পেইজ। সেইগুলার মধ্যে আবার কালার গ্রাফিক, ইলাস্ট্রেশান আর রেন্ডারিং আছে বেশ কিছু। খুব কষ্ট করে করছি, সাদা-কালোতে ছাপাইতে মন চাইল না। কালার ছাপাইতে গেলে আবার হ্যাপাও অনেক। ফ্যাকাল্টির একটা বেশ ভালো কালার প্রিন্টার আছে, সেইটাতে প্রতি পেইজে টাকা রাখে ৫০ সেন্ট। দুইশ পেইজের থিসিস তিন কপি ছাপাইতে গেলে তিনশ ডলারের মামলা। এতো টাকা আমারে বেচলেও হবে না। এই টাকা দিতে হবে আবার অনলাইনে, সেইটাও মহা ঝামেলার ব্যাপার। উপায়ন্ত না পেয়ে গেলাম সুপারের কাছে, মনে আশা তার রিসার্চ ফান্ডের টাকা থেকে যেন প্রিন্টের টাকাটা দিয়ে দেয়। সুপার অবশ্য কিপটা না এইসব ব্যাপারে, সুতরাং সুরাহা একটা হবেই এই বিশ্বাস ছিল। সুপারকে বলার পর সে আকাশ থেকে পড়ল ফ্যাকাল্টির প্রিন্টিং চার্জ শুনে। বলল, এইটার ব্যাপারে কিছু একটা করতেই হবে। আমি ভাবলাম ফ্যাকাল্টি মিটিং-এ কথাটা তুলবেন। কিন্তু তিনি যা করলেন তা আমার কল্পনাতেও আসে নাই।

কিভাবে যেন প্রিন্টারের আইপি নিয়ে সুপার অনলাইন স্পুলারকে বাইপাস করলেন। সোজা বাংলায় অর্থ হলো, প্রিন্টারে এখন টাকা না দিয়েও প্রিন্ট করা যাবে, পুরো সিস্টেমটাকেই হ্যাক করছেন তিনি। যে ঘরে প্রিন্টারটা আছে, সেইটাতে বসেন সেন্টার ফর কম্পিউটার এইডেড এঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারী ভ্যালোরী মার্সার। সুপার তথ্য দিলেন, ভ্যাল নাকি ছুটিতে আছে। সুতরাং চুরি করে প্রিন্টিং করাতে কোনই অসুবিধা হবে না। করিডরের এক প্রান্তে সুপারের অফিস, অন্য প্রান্তে প্রিন্টার। প্রিন্ট দেওয়ার আগে আমি আর সুপার চুপি চুপি গেলাম ক্রাইম সিন রেকি করতে। গিয়ে দেখি কেউ নাই। সুপার বললেন তুমি এইখানে পাহারা দাও, আমি অফিসে গিয়ে প্রিন্ট কমান্ডটা দিয়ে আসি। আমিও সুপারের কথামত দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দেওয়া শুরু করলাম, সুপারকে দেখলাম অফিসে ঢুকতে। একটু পরেই ঘড়ঘড় শব্দে প্রিন্ট হওয়া শুরু হল। সুপার আবার ফিরে আসলেন প্রিন্টারের রুমে। হাজার হইলেও ইউনিভার্সিটি প্রফেসর, তাই ভদ্রতা রক্ষার জন্য বললাম, তোমার এইখানে থাকতে হবে না, আমি আছি। প্রিন্ট শেষ হলে নিয়ে আসব। সুপার উত্তর দিলেন, এভিডেন্স ধ্বংস করতে হবে একজনেকে এবং একজনকে পাহারা দিতে হবে। সুতরাং তারও থাকতে হবে। অগত্যা আমি পাহারা দেয়া শুরু করলাম আর সুপার প্রিন্ট হওয়া মাত্র কাগজ প্রিন্টারের ট্রে থেকে সরিয়ে রাখতে শুরু করলেন। কেউ দেখলেও যাতে ব্যাপার কি হচ্ছে না বোঝে। প্রায় পনের মিনিট চলল এই কাহিনী। এরপর আমি আর সুপার দুইজনেই দন্তবিকশিত কোলগেট হাসি দিতে দিতে ফ্যাকাল্টি ডিনের অফিসের দিকে রওয়ানা দিলাম, তিন কপি থিসিস জমা দিতে হবে অফিস আওয়ার শেষ হওয়ার আগেই।

৩.
থিসিস জমা দেওয়ার আগেই থিসিস ডিফেন্স করতে হয়েছিল। মাস্টার্সের ডিফেন্স অত কড়াকড়ি হয় না, কারণ থিসিসখানা তিনধাপে খুব ভালোভাবে পরীক্ষার পরই একসেপ্ট করা হয়। ডিফেন্স নিয়ে তাই খুব রিলাক্সড ছিলাম। নিজের কাজ, কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারব না- এই আশংকা ছিল না। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়, দেশ থেকে স্যুট আনি নাই। ডিফেন্সে পরার মতো কিছু নাই, জিন্স আর টি-শার্ট পরে ডিফেন্স দিতে গেলে উপস্থিত প্রফরা অপমানিত বোধ করতে পারেন। গেলাম মলে স্যুট কিনে আনতে, সবচেয়ে পঁচা স্যুটটা কিনলেও এক্সেসসরিজসহ পোয়া হাজার ডলার বেরিয়ে যাবে। আমিও শেখ সাদীর গল্পের কথা মনে করে গরীবতর না হয়ে ফেরত আসলাম বাসায়। অন্য একটা বুদ্ধি আঁটলাম, বিজনেস ক্যাজুয়াল পরব বলে ঠিক করলাম। বংগ থেকে পোয়া হাজার টাকায় কিনে আনা গ্যাবার্ডিনের খাকি প্যান্ট আর শার্টটাকে বেশ ভালো করে ইস্ত্রি দিলাম। স্নিকার পরে যাওয়া যাবে না, তাই একজোড়া জুতাও পোলাপাইনের কাছ থেকে ম্যানেজ করলাম।

ঘটনার দিন সকাল সকাল উঠে শেভ করে ফুলবাবু সেজে গেলাম ইউনিভার্সিটিতে। প্রায় পঞ্চাশ মিনিট চাপা পিটাইতে হবে, সুতরাং একটা প্রস্তুতি থাকা দরকার। ভেন্ডিং মেশিন থেকে একটা পানির বোতল কিনলাম। তারপর ওশেন এঞ্জিনিয়ারিং বোর্ড রুমে গিয়ে ল্যাপি সেটআপ করলাম। যথাসময়ে আমার বকবকানি শুরু হলো। পাবলিকরে প্রবলভাবে বোঝানোর চেষ্টা করতেছি আমি কি হাতি-ঘোড়া করছি। এই করতে করতে ত্রিশ মিনিট চলে গেল, মাথা ঝিমঝিম করতেছে আমার। গলায় প্রচন্ড পিপাসা, চোখে ঝাপসা দেখতেছি। হাত বাড়িয়ে ডায়াসের উপর রাখা পানির বোতলটা নিলাম, এক চুমুক পানি খাব। মাথার ভেতর তখন কে জানি চিৎকার করতেছে, ইউ ব্লাডি ফাকার ক্যারি অন। (গালিটা আরো খারাপ ছিল, ভদ্রলোকের ব্লগ বলে সেন্সর করলাম।) আমার তখন চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পাইছে, মাথার ভেতরের লোকটার কথা শুনলাম। বোতল থেকে পানি খেলাম না। কিন্তু বোতলটা হাত থেকেও নামাই নাই, বাকি বিশ মিনিট পানির বোতলটাকেই পয়েন্টার বানিয়ে বকবকায়ে গেলাম। “ইন দিস ফিগার ইউ ক্যান সি……” ফিগারটার দিকে আমার বোতল তাক করা। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করার পর দেখি আমার হাতে পানির বোতল। থিসিসের ডিফেন্স মনে হয় না কেউ এরকম বোতল হাতে দিয়েছে। যাই হোক, আমি সবসময়ই একটু অন্যরকম থাকতে পছন্দ করি। বোতল হাতে ডিফেন্স দেওয়া যাবে না, এইটা তো আর কোথাও লেখা নাই।

২,৪৪৫ বার দেখা হয়েছে

৬২ টি মন্তব্য : “আচার ০২৪: পরবাসীর রোজনামচা”

  1. রবিন (৯৪-০০/ককক)
    সুতরাং সাথেই থাকুন। (কপিরাইটঃ গ্রামীন ফোন। রবিন ভাই দৌড়ানি দিবেন গ্রামীন ফোনরে ক্রেডিট না দিলে, তাই দিয়া দিলাম।)

    ব্যাটা, সাথে না, কাছে থাকুন

    জবাব দিন
  2. আব্দুল্লাহ্‌ আল ইমরান (৯৩-৯৯)
    বড় লেখকদের হয় মাঝেমধ্যে এমন, এইটারে বলে রাইটার্স ব্লক। আমি মনে হয় লেখক হিসাবে বড়ই, না হইলে রাইটার্স ব্লকে পড়ার তো আর কোন কারণ নাই।

    হুম, আমার মনে হয় তোমার রাইটার্স ব্লকে পড়ার কারণ আছে। :boss:

    জবাব দিন
  3. রকিব (০১-০৭)

    ভাইয়া, দেখি আজকে একের পর এক :gulli2:
    তবে প্রথমটায় চোর ঠেকালেন, আর এইটায় নিজেই চুরিটা সেরে নিলেন 😛
    আপনার সুপারম্যানটারে আমার বড়ই পছন্দ হইছে। ব্যাটা দেখি বেশি বস।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
    • তৌফিক (৯৬-০২)

      তোর জন্য একটা সাবধানবাণী। তাঁরে আন্ডারগ্র্যাডের ছেলেপেলে খুব ভালো পায় না, কঠিন প্রশ্ন করে এবং হাই স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করে দেখে। ওদের সাথে কখনোই খারাপ ব্যবহার করতে দেখি নাই অবশ্য। এক আন্ডারগ্র্যাডের ছাত্র আমাকে বলছে উনি হাসলে নাকি ও ভয় পায়, কারণ ভুল হইলেই নাকি তিনি তাঁর শয়তানী হাসিটা দেন। 😀

      জবাব দিন
    • তৌফিক (৯৬-০২)

      এইখানেই শেষ না, সে আরো কান্ড-কীর্তি করে। লিখতে গেলে আরো দুই তিনটা ব্লগ হয়ে যাবে। সব লিখাও যাবে না। তবে লোক হিসাবে এবং প্রফ হিসাবে সে বেশ ভালো। বলার দরকার নাই মনে হয় এখন আর, পোস্ট পড়লেই বুঝা যায়- আমি তাঁর বিশাল ভক্ত। 🙂

      কলেজের খাকি প্যান্ট এখন আর গায়ে হবে না। শুকায়ে গেছি গত মাস ছয়েকের চাপে। স্যুট পরলে নির্ঘাত কার্টলি এমব্রোসের মত দেখা যাইত। 🙁

      জবাব দিন
  4. এহসান (৮৯-৯৫)

    অভিনন্দন। লেখা মজা করে পড়লাম। ভালো লেগেছে।

    অঃটঃ
    কবে যাবা দেশে। তুমি কি ঢাকার ছেলে নাকি আমার মত মফস্বলের পোলা। সময়মত ঢাকায় থাকা হবে তো? এবারের গেট টুগেদারটা মিস কইরো না। আমাদের সময় ঠিক করা দরকার, আয়োজকরা তো কিছু কইতেসে না 😉

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।