আচার ০২৩: হ্যাকিং

দেখতে দেখতে আমার সিরিজটার ২৩ নম্বর কিস্তি চলে আসল। ২৩ নাম্বারটা একটা স্পেশাল নাম্বার, মাইকেল জর্ডান এইটা পরতেন জার্সি নাম্বার হিসাবে। শিকাগোর ইউনাইটেড গার্ডেন এরিনাতে এই জার্সিটা রিটায়ার করে রাখা হয়েছে তাঁর সম্মানার্থে। জর্ডানের সাথে ব্র্যাডম্যানের একটা এনালজি দেয়া যায়। ব্র্যাডম্যানের সাথে তুলনা অনেকেরই হবে, কিন্তু তর্কের শেষে ব্র্যাডম্যানকে হিমালয়সমান উচ্চতায় রাখতেই হবে। জর্ডানও এমন একজন খেলোয়াড় ছিলেন, বলা হয় বাস্কেটবলের ইতিহাসে সেরা খেলোয়াড়। কোর্টে তার ইম্প্রোভাইজেশান খেলাটাকেই পরিবর্তন করে দিয়েছে। প্রি-জর্ডান আর পোস্ট-জর্ডান বাস্কেটবলের ভিডিও দেখলে ব্যাপারটা সবার কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

যাহোক, আজকে ব্লগানো শুরু করেছিলাম অন্য একটা বিষয় নিয়ে কথা বলব ভেবে। শিরোনাম লিখতে গিয়ে যখন দেখলাম এটা ২৩ নম্বর পর্ব তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। জর্ডান বিষয়ক একটা ব্লগ ভবিষ্যতে আসতেও পারে, তবে কাহিনী হইল গিয়া পাবলিকে বাস্কেটবল খায় না। আবার বেলাইনে চলে যাচ্ছি, লাইনে ফেরত আসি। হ্যাকিং নিয়ে কথা বলব ভাবছিলাম, ওইটাতেই থাকি। আজকে ফেইসবুকে এক দোস্তাইন মেসেজ পাঠাইল যে একজনের ফেইসবুক একাউন্ট হ্যাক হয়েছে, দোস্তাইন মহা বিরক্ত এইটা নিয়া। আমারও মনে পড়ে গেল নিজস্ব একটা হ্যাকিং-এর কাহিনী। না ভাই ও বোনেরা, আমি হ্যাকিং করি নাই। হ্যাকিং কি জিনিস এইটা জানি, কেমবায় করে জানি না। একটু একটু জানি, ওইটা রকেট ইঞ্জিন কিভাবে চলে এইটা উচ্চমাধ্যমিকের পদার্থবিজ্ঞান বই পড়ে জানার মতই। আমার নিজের একাউন্ট হ্যাক হয়েছিল। হ্যাকিং-এর শিকার হইছিলাম আই ইউ টি-র থার্ড ইয়ারে। আই ইউ টি-তে পোলাপানরে মাসে দুই ঘন্টা ফ্রি ব্রাউজিং দিত, বাকিটার জন্য পকেট এলাউন্স থেকে টাকা কেটে রাখত। আমি তখন নেটে খালি মেইল চেক করি, মাসে দুই ঘন্টার বেশি লাগে না। পকেট এলাউন্সটা তাই পুরোটাই পাই। একদিন এলাউন্স তুলতে গিয়ে দেখি আমারে ১৩০০ টাকা কম দিছে। কি কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখি, এই টাকা দিয়ে নাকি আমি নেট ব্যবহার করছি।

একাউন্ট সেকশনে এইটা নিয়া ফালাফালি করে কোন লাভ হইত না, ওইটা কম্পু সেকশনের কাজ। গেলাম কম্পু সেকশনে, গিয়ে মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। বলে কিনা, আমি নাকি লগ আউট করি নাই, তাই টাকা গেছে। আমি যতই বলি ঘটনা এইটা না, তারা বিশ্বাস করে না। ভাগ্যদোষ মনে করে লগ ইন পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করলাম। কিন্তু লাভ হইল না, দুইদিন পড়ে গিয়ে নেট ব্যবহারের লগ চেক করে দেখি চোর বাবাজি এর মধ্যে পাঁচ ঘন্টা ব্যবহার করে রাখছেন। আই ইউ টি-র এক বিশেষজ্ঞ বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলে বুঝলাম হ্যাকিং-এর মাধ্যমে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করাটা অপেক্ষাকৃত সোজা, পাসওয়ার্ড জানাটা অনেক কঠিন। চোর বাবাজি দুই দুই বার আমার পাসওয়ার্ড জেনেছেন, তাও একদিনের ব্যবধানে- ব্যাপারটা কেমন যেন মনে হইল। ব্রুট ফোর্স দিয়া ৬ ঘন্টায় সে পাসওয়ার্ড গেস করে ফেলছে- বিশ্বাস হইতে চাইল না। গুগল বাবাজির সাহায্য নিলাম এই ব্যাপারে। চুরি করার অনেক পদ্ধতির মধ্যে একটাতে পেয়ে গেলাম উত্তর। চুরির পদ্ধতিটা মাত্রারিক্ত সরল। চোর বাবাজি “কি-লগার” নামে একটা স্পাইওয়্যার দিয়ে চুরির কাজটা করেছেন। এই স্পাইওয়্যার ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে, যখন কিবোর্ডের কোন কি চাপা হয় তখন সে একটা টেক্সট ফাইলে সেইগুলা সেইভ করে রাখে। চোরের উপর বাটপাড়ি করার একটা উপায়ও পাইলাম, ভার্চুয়াল কি-বোর্ড (ক্লিক করে লিখা) ব্যবহার করা। সেইটা ব্যবহার করে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করলাম। যে কম্পিউটারটা ব্যবহার করেছিলাম চুরির পর পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের জন্য সেটার টাস্ক ম্যানেজার খুলে দেখি একটা “কি-লগার” প্রসেস ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতেছে। প্রমাণ বের করে খুশিতে বাকবাকুম হইলাম, এইবার নিশ্চয়ই কম্পু পাবলিক আমার কথা শুনবে এবং টাকা ফেরত দিবে। কিন্তু কিসের কি, ঘটনার বৃত্তান্ত বলার পর তারা আমলেই নিল না। উলটা ইশারা ইংগিতে বুঝায়ে দিল কাজটা আমারই যে না, এইটা তারা নিশ্চিত হবে কিভাবে। রাগে টগবগ করতে করতে রুমে আসলাম। ব্যাটাদের মত বড় উজবুক আর নাই, কিন্তু কূটনীতি ঠিকই বুঝে এরা। কি-লগারের দিয়ে পাসওয়ার্ড চুরিকে যদি তারা আমলে নেয়, তাহলে দায়টা তাদের উপরই বর্তায়। কারণ, কম্পিউটারগুলিকে পরিষ্কার রাখা আর এডমিনিস্ট্রেটিভ একাউন্ট ম্যানেজ করার দায়িত্ব তাদেরই। তারা দায়িত্ব পালন করে নাই দেখেই এই ঘটনা ঘটেছে। এবং দোষ ঢাকতে আমার কথাকে তারা পাত্তাই দেয় নাই।

রুমে এসে রাগে মুখ খারাপ করে গালি গালাজ শুরু করলাম। নিজের সওয়াব সব হাই রেটে চোর বাবাজি আর কম্পু পাবলিকদের একাউন্টে ট্রান্সফার করে দিতেছি, মুনকার-নাকীরদের নেটওয়ার্কে ঝড় উঠাইতেছি- এমন সময় আরেক ভুক্তভোগী এসে হাজির। দুইজনে মিলে ভাবলাম এই ব্যাপারটার ব্যাপারে আমাদেরই কিছু একটা করতে হবে। মাথা থেকে বের হইল “অপারেশন রিটালিয়েশান”-এর আইডিয়া (তখন অবশ্য কোন নাম দেই নাই, এখন দিলাম। নামটা বেশ কুল কুল লাগতেছে।)

পরের দিন পাঁচখানা কম্পিউটারে কি-লগার স্পাইওয়্যার ইন্সটল করে আসলাম। প্রায় জনাবিশেকের লগ-ইন ইনফরমেশন সন্ধ্যার দিকে নিয়া আসলাম পেন ড্রাইভে ভরে। প্রত্যেকের লগ-ইন নেইম আর পাসওয়ার্ড একটা সিংগেল শব্দ হিসাবে ছাপাইলাম কাগজে, যাতে আমার মত ভুক্তভোগীদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাটা কমে। সেইসাথে একটা মেসেজ দিলাম। মেসেজটার সারমর্ম ছিল, কারো পাসওয়ার্ডই নিরাপদ না। পাসওয়ার্ড চুরি যাচ্ছে, কারণ কম্পুগুলি স্পাইওয়্যারে ভরা। এরকম আরো কিছু হাবিজাবি সংক্ষেপে লিখে পোস্টার ছাপাইলাম বেশ কিছু। রাত বারোটার পর গার্ডদের চোখ ফাঁকি দিয়ে গেলাম একাডেমিক বিল্ডিং-এ। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সাঁটায়ে দিলাম সেই পোস্টার। তারপর লক্ষ্মী ছেলের মত এসে ঘুম দিলাম।

পরের দিন সকালে ক্লাস ছিল, যথারীতি দেরিতে গেলাম ক্লাসে। রোল-কলের পর কমান্ডো স্টাইলে ক্লাস বাং মেরে পালায়ে আসলাম কম্পিউটার ল্যাবে। এসে যা দেখলাম, তাতে হাসিতে পেট ফেটে যাওয়ার মত অবস্থা হইল। কম্পু সেকশনের পাবলিকেরা মারমুখী কতগুলা আফ্রিকান ছাত্রের কাছে ক্ষমা চাইতে চাইতে নাই হয়ে যাইতেছে। আর সেই ছাত্ররা পারলে কম্পিউটার ল্যাব ভাঙা শুরু করে আরকি। একজনের হাতে আবার আমাদের ছাপানো পোস্টার। এইখানে একটু কথা না বললেই না, বাঙালি ছাত্রদের চেয়ে বিদেশি ছাত্রদের দাপট স্টাফদের কাছে একটু বেশি ছিল। আমি যেটা করতে পারতাম না, এরা তাই করতেছে। যাই হোক, এদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একটু ঠান্ডা করল কম্পু পাবলিকেরা। আধাঘন্টার ভেতর দুইজন কাজে নাইমা গেলেন, সবগুলা কম্পিউটারকে পরিষ্কার করলেন। আর আমি মিশন সফল হওয়ার আনন্দ নিয়ে কম্পিউটার ল্যাবে শুধুই শুধুই বসে থাকলাম অনেকক্ষণ, কম্পু পাবলিকদের নাকাল হওয়া দেখার জন্য।

এইটাই আমার জীবনের একমাত্র হ্যাকড হওয়ার কাহিনী। এরপর থেকে জিন্দেগিতে নেট ব্রাউজ করার সময় কি-বোর্ড চাপি নাই, সবসময় ভার্চুয়াল কি-বোর্ড দিয়ে পাসওয়ার্ড টাইপ করতাম।

২,২৩৩ বার দেখা হয়েছে

৫০ টি মন্তব্য : “আচার ০২৩: হ্যাকিং”

  1. তানভীর (৯৪-০০)

    হা হা হা হা...দারুণ মজা পাইলাম তৌফিক। =)) =))

    জর্ডানরে নিয়া একটা পোস্ট দিয়া দাও। আমি ওর খেলাগুলা লাইভ দেখার জন্য সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে যেতাম। এখন অল্প-সল্প বাস্কেটবল দেখি, খবর রাখি নিয়মিত। 🙂

    জবাব দিন
  2. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)
    তখন অবশ্য কোন নাম দেই নাই, এখন দিলাম। নামটা বেশ কুল কুল লাগতেছে

    কিরে দেশে আসার আগে লাস্ট?
    জমায়া লিখছিস, এজ ইউজ্যুয়াল :clap:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  3. রকিব (০১-০৭)

    প্রায় এক মাস দশ দিন পর পোষ্টাইলেন। বরাবরের মতই দারুন। :boss: :boss: কাজের মতো একখান কাজ করছিলেন দেখি।
    ভাইয়া, বাংলাদেশ যাচ্ছেন কবে? এবারে কি ভাবীকে নিয়ে আসবেন?


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  4. রবিন (৯৪-০০/ককক)

    কী লগার নিয়া কাহিনি মনে পইড়া গেলো। আমার অফিসের এক বস ছিলেন যিনি অফিসের চিপার ডেস্কে বসে ভালো ভালো ওয়েবসাইট ( :)) ) দেখতেন। আরেক বস আমাকে রিকোয়েস্ট করছিলেন উনি কি করেন বের করে দিতে পারলে উনি একশন নিতে পারবেন। তাই ঐ পিসিতে কী লগার সেট করে এক সপ্তাহের ডাটা বিগ বস কে পাঠিয়ে ছিলাম।

    জবাব দিন
  5. জিহাদ (৯৯-০৫)

    আমি একবার ভুলে লগআউট না করেই চলে আসছিলাম। ভাগ্য ভালো ততদনে ১০ ঘন্টা হয়ে গেসিল ফ্রি হাওয়ার। নইলে খবরাসিল 😛

    লাস্ট কবে ল্যাবে গেসি মনে করতে পারতেসিনা :shy:

    লেখা বরাবরের মতই। 🙂


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
  6. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    বেশ মজা পাইলাম পড়ে... অনেকদিন পর লেখা দিলি...আছিস ক্যামন?


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  7. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    ভাইরে এইডা কি কইলা? আমি তো কি বোর্ডেই পাসওয়ার্ড লিখি! ~x( তাইলে আমারটাও কেউ হ্যাক করতে পারে? বাসায় আবার আমি আর আমার পোলা একই ল্যাপটপ ব্যবহার করি! ~x( ~x( মাথাটা আসলেও খাওজাইতাছে............. ভারচ্যুয়াল কি বোর্ড দিয়া কেম্নে পাসওয়ার্ড লিখমু??

    তয় মাথা চুলকানির মতোই একটা জোস পোস্ট হইছে। টেকি জিনিষ আমি ডরাই...... তুমি তো রীতিমতো ডর লাগাইয়া দিলা!! 😕 😕 😕


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
    • @ সানাউল্লাহ ভাইয়া:

      সেরকম ভাল প্রোগ্রামার হলে কিবোর্ড চাপার উপর বিশ্বাস করবে না, সরাসরি আপনি আপনার ব্রাউজারে পাসওয়ার্ড বক্সে যা লিখেন সেটাই লগ করবে 😉 ক্রেডিট কার্ড হ্যাকিং সফটগুলো এভাবেই কাজ করে.....

      তবে পাবলিক প্লেসে থাকা কম্পিউটারগুলোই ভয়ের...... বাসা-বাড়িতে কিংবা নিজের পার্সোনাল পিসিতে ( যদিনা কেউ ভাইরাস চাষী হয়) নরমাল অ্যান্টিভাইরাস থাকলেই আর কোন সমস্যা নাই.....

      @ তৌফিক ভাইয়া :

      জটিল অভিজ্ঞতা....... :))

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।