ওবলাকা

ছোট কাঁচের বোতলের ভেতর থেকে গাছের গুঁড়ি আর পাথর কুচো ফ্লোরে ফেলল মারিনা, সেই গুড়োতে জুতো ঘষে নিলো। ঘর্ষনের শব্দটা খুবই বিরক্তিকর, গায়ে কাটা দেয়, প্রতিবার পাথর কুচোতে পা ঘষার সময় মারিনার মনে হয় দেয়ালে নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে, আর নখগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেয়ালের সাথে লেপ্টে যাচ্ছে। তবু জুতো ঘষতে হয়, মারিনা ড্যান্সার, রেস্টুরেন্টে সন্ধ্যায় লাইভ মিউজিকের সাথে নেচে তার জীবন চলে। রেস্টুরেন্টের ফ্লোর টাইলস লাগানো, খুব পিচ্ছিল, তাই জুতোর তলার গাছের গুঁড়ি আর বরফ কুচো ঘষতে হয়, নয়ত নাচের সময় চিত পটাং হয়ে গেলে, মালিক ঠিক ঠিক কাজ থেকে বের করে দেবে। আজ সন্ধ্যায় ভায়োলিনের সাথে দুটো নাচ আর এরপর ল্যাটিন নাচ আরো তিনটে, প্রতিটা নাচের পর আবার কাপড় বদলানোর হ্যাপা, প্রতিটি নাচের আলাদা আলাদা কাপড়।
মানুষ একসময় শুধু খাবার কিছু পেলেই সন্তুষ্ট থাকতো, এর পর আগুন এলো, মানুষ খাবার পুড়িয়ে খাবার মজা পেলো, মশলা এলো, থালাবাটি এলো, খাবারকে মানুষ বিনোদনের পর্যায়ে নিয়ে গেলো, এখন প্রায় প্রতি রেস্তোরাঁয় নাচ-গানের আয়োজন থাকে, সন্ধ্যায় বিশেষ করে, মানুষ খেটে খেতে গান শোনে, নাচ দেখে। প্রস্তর যুগে খাবারের জন্য মানুষ বেঁচে থাকতো এবং সংগ্রাম করতো, আর এখন বিনোদনের জন্য খায়।

মারিনা আজ চার বছর ধরে নাচে, কোথায় শুধু নাচেনি, রেস্তোরাঁয়, বিয়ের অনুষ্ঠানে, ক্লাবে। একটা সময় ছিল যখন দিনের বেলায় রেস্তোরাঁয় ইন্টারভিউ দিচ্ছে, আর সন্ধ্যায় বাঁধা রেস্তোরাঁয় নাচছে। এভাবেই জীবন গড়িয়েছি, এখন কিছুটা হলেও স্বস্তি, মোট চারটা রেস্তোরাঁয় পাকা কাজ আছে, হপ্তায় দু’দিন করে।
রেস্তোরাঁয় নর্তকীর নাচ অবশ্য কোন অফিশিয়াল কাজের মধ্যে পরে না, যেখানের মালিক যেমন টাকা দিতে আগ্রহী, সেখানে সেই টাকাতেই রাজি হতে হয়। টার্কিশ মালিকেরা কৃপণের কৃপণ, রাশানরা অনিয়মিত টাকার ব্যাপারে, আজারবাইজান-তাজিকেরা টাকা দিলেও খাটায়ে নেয় প্রচুর।
আজ কিছুতেই মারিনার মন বসছে না নাচে, আজ মেয়েটার জন্মদিন, মায়ের সাথে মিলিয়ে নাম রেখেছে মারিয়া। বয়স মাত্র বছর চারেক। স্বামী- সংসারের সুখ মারিনার হয়নি। মেয়ের বাবাকে ভালো করে মারিনা চেনেই না, সেই এক রাতের পর আর দেখাই হয়নি। জার্মান এক ব্যবসায়ী, এক রেস্তোরাঁয় পরিচয় তার সাথে, নাচের পরে তিনি মারিনাকে তাদের টেবিলে আমন্ত্রন করলেন, হাজার হাজার মেয়ের ভাগ্য ফিরে গেছে বড়লোকের ঘাড়ে উঠে, আগে পিছে না ভেবেই মারিনা আমন্ত্রনে সাড়া দিলো, চমৎকার ভদ্রলোক, মিশুক, বাকপটু, মারকুটে পুরুষালী চেহারা। অনেক শ্যাম্পেন আর ওয়াইনের পরে মারিনা তার সাথে হোটেলে চলে গেলো। পরদিন ঘুম ভেঙ্গেছে রুম সার্ভিসের ডাকে, ভদ্রলোককে কোথাও দেখা গেলো না। ডেস্কে জিজ্ঞেস করে জানা গেলো আজ সকালে তার ফ্লাইট ছিল প্যারিস, সেখান থেকে আগামীকাল বার্লিন। হতাশার সীমা থাকে না মারিনার, হয়ত তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না আর কোনদিন।

দুঃখের উপখ্যান এখানেই শেষ নয়, তিনমাস পরে বোঝা গেলো মারিনা গর্ভবতী। একটা জীবন ধ্বংস করার মতো সাহস করতে না পারায় বাচ্চাটা রেখে দিলো মারিনা, বিশাল পেট নিয়ে নাচা চলে না, কাজ ছেড়ে দিলো সব, নয় মাসের সময়ে সরকারী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গেলো, নয়মাস তিন সপ্তাহের দিকে মারিয়া পৃথিবীতে এলো।
সামান্য জামা-জুতো- টেলিফোন- চকলেটের জন্য আজকাল মানুষজন হাহাকার করতো, অথচ মারিনার তখন এক পয়সার উপার্জন নেই, বাসা থেকে উঠিয়ে দিলো বাড়িওলা, হাত-পা ধরে দুঃসম্পর্কের এক বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিলো মারিনা, বাচ্চা ঘুমালে বোন আর স্বামীর জন্য রান্না করতো, বাসা পরিস্কার করতো। মাস খানেক পরে শুরু হলো বোনের স্বামীর কাছে ধর্ষিত হওয়া, পাশে মেয়েটা ঘুমাচ্ছে আর শুয়োরটা মারিনার উপরে চড়ে বসছে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে মারিনার কান্না করা বোনের স্বামীর অত্যাচার থামাতে পারেনি। মাস দুয়েক এমন চলার পরে আর সহ্য করতে না পেরে মারিনা একদিন বোনের কাছে বিচার দিলো। বোন বিরক্ত মুখে বলল- তুই কি চাস এখন? তোর জন্য আমি স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে দেই? সেপারেশনে চলে যাই? তোর মতো কষ্ট করি রাস্তায় রাস্তায়? আমার বয়স ৩৪ বছর, আমার দিকে কোন ব্যাটাছেলে ফিরে তাকাবে এখন? আমি আগেই বলেছিলাম আমার এখানে উঠিস না, অনেক সমস্যা আছে, শুনলি না আমার কথা।
মেয়েটার আজ জন্মদিন, চার বছর হয়ে গেলো। সেদিনের সেই বাচ্চাটা কত বড় হয়ে গেলো, সামনের বছর স্কুলে দেয়া যাবে। আর এখন পাশের বাসার মহিলার কাছে রেখে কাজে আসে, ভদ্রমহিলার বন্ধ্যা, অনেক ভালোবাসেন মারিনার মেয়েটাকে, মারিনার মাঝে মাঝে অনেক ক্ষোভ হয়, মনে হয়, খুব অভিমান হয়, মনে হয় ভদ্রমহিলা ওর
মেয়ের উপর ভাগ বসাচ্ছে, তবু কিছু করার নেই, মুখ বুজে সহ্য করতে হয়।

মেয়েটা বার বার বাবার কথা জিজ্ঞাসা করে, ইদানিং কি যে হল। প্রতিবেশী বাচ্চারা বাবাদের সাথে পার্কে ঘোরে, বাবারা এটা সেটা কিনে দেয়। মারিনা মেয়েকে বলে- তার বাবা বিদেশে আছে, ছুটি পেলেই আসবে, এই রকম মিথ্যা কথা আর কতদিন বলা যাবে মেয়েটাকে ভাবতেই কান্না আসে, মাঝে মাঝে দোকান থেকে মেয়েকে এটা সেটা কিনে এনে দেয়, বলে- বাবা বিদেশ থেকে পাঠিয়েছে, বাচ্চা মেয়েটা খুশি হয়ে যায়। মারিনার কণ্ঠচাপা কান্না মেয়েটার কাছে পৌঁছায় নাহ। আজকের সন্ধ্যার নাচ ভালোয় ভালোয় শেষ হয়ে গেলো। রাত একটার দিকে ট্যাক্সি করে বাসায় আসলো মারিনা, পথে ২৪ ঘন্টার দোকানে একটা ঢুঁ মেরেছিল, এক প্যাকেট ডিম, কয়েকটা পেঁয়াজের ডাঁটি, এক টুকরো চিজ আর কালো অলিভ কিনে নিলো। পাশের বাসার ভদ্রমহিলা জানালো মেয়েটা অঘোরে ঘুমাচ্ছে, ছোট্ট মেয়েটার ঘুম ভাঙ্গাতে ইচ্ছে করলো না মারিনা, ও নিজের ফ্ল্যাটে চলে আসলো। থাকুক না আজকের রাতটা শুধু নিজের জন্য। আধা কাপ দুধের মধ্যে চারটে ডিম ফেটে নিল ও, একটু লবন ছড়িয়ে দিল। ফ্রাইং প্যানে এক ফালি মাখন কেটে ছেড়ে দিলো, অল্প তাপে মাখন গলার দৃশ্য অল্প কয়েকটা সুন্দর ঘরোয়া দৃশ্যের মধ্যে অন্যতম। মাখনে গলে গেলে ডিম ছেড়ে দিয়ে ঢেকে দিলো ফ্রাইং প্যান ও, চুলোটা কমিয়ে দিল। দ্রুত হাতে দুটো পেঁয়াজের ডাটি কুচি করে কেটে ফেলল, মিনিট তিনেক পরে ডিম শক্ত হয়ে আসা শুরু করলে ও সামান্য গোল মরিচের গুড়ো উপরে ছড়িয়ে দিল। আর একদম শেষে পেঁয়াজের ডাঁটি কুচো ছড়িয়ে দিয়েই আবার ঢেকে দিলো প্যানটা। পেঁয়াজের কুচির মূল স্বাদ ঘ্রানে, ঘ্রান বেড়িয়ে গেলে এই কুচির আর কোন মূল্য নেই। মিনিট দিয়েক পরে পুরো ডিমে ছড়িয়ে গেল একটা পেঁয়াজ পেঁয়াজ ঘ্রান। প্লেটে ডিম নিয়ে দেখা গেল একজনের জন্য পরিমানে বেশ বেশি, থাক, কাল সকালে অভেনে গরম করে আবার খাওয়া যাবে। টমেটো কেচাপে লেপ্টায়ে অমলেটের টুকরো মুখে দিতেই ডিম গলে গলে গেল। মনটাই ভালো হয়ে গেল ওর, আজকাল ফাস্টফুড কম দামি পিজা খেয়ে দিন চলে, রান্নার সময় হয়না। রান্নায় যে ওর নিজের হাত ভালো রীতিমত ভুলে যেতে বসেছিল মারিনা। আজকাল নিজের জন্য এক টুকরো সময় বের করা যায় না, যখন হাত্রী ছিল কলেজে ঘন্টার পর ঘন্টা বাথটবে শুয়ে গোসল করেছে- ওয়াইন খেয়েছে, কত ছেলে গোলাপের তোড়া নিয়ে দেখা করতে আসতো, প্রায় সবাইকেই ফিরিয়ে দিয়েছে মারিনা, খুঁজেছে সত্যকারের ভালোবাসা। হাজারটা সাধারণ মেয়ের মতো ওরও স্বপ্ন ছিল- সাদা ঘোড়া চড়িয়ে ওর প্রিন্স আসবে। অন্য সব মেয়েরা প্রিন্সকে দেখে হিংসায় ভুগবে। নিজের অজান্তেই ফিক করে হেসে ফেলে ও, মেয়েরা ভুলেই যায় প্রিন্স’রাও দামী প্রিন্সেস খোঁজে, সাধারণ মেয়েদের পিছে পরে থাকলে প্রিন্স আর প্রিন্স কই থাকলো। সে তো সাধারণের কাতারেই চলে আসলো। সিন্ডারেলা গল্প সিনেমায় অপেরায়ই দেখা সাজে, জীবনে সিন্ডারেলারা সারাজীবন চুলাই ঠেলে।

একবার এক শপিং মলের সিকিরিউটি গার্ড’র সাথে পরিচয় হয়েছিল ওর, মনে থেকেই ওকে পছন্দ করে ফেলেছিল লোকটা, মুখের ডানদিকে বড় একটা দাগ, আর বেঁটে চুলহীন লোকটা ওকে -ফুল,চকলেট কিনে দিয়েছিল, ভালোবাসার কথা বলেছিল নদীর পারে পার্কে বসে। সেদিন মারিনা লোকটাকে একগাদা কথা শুনিয়ে দিয়েছিল। ঘুরতে এসেছি-বিয়ে বসতে আসিনি, আমাদের বয়সের অনেক তফাৎ, আমাদের উচ্চতার অনেক তফাৎ ইত্যাদি। ভদ্রলোক মনে অনেক কষ্ট পেয়েছিল সম্ভবত, আর কোনদিন ফোন করেননি। প্রিন্স’রা আর আসবে, কাল আরেক প্রিন্সেস এর পেছনে ভেগে যাবে, অথচ এই সত্যকারের পুরুষকে ফিরিয়ে দিয়ে অনেকটাই পতিতার মতো আচরণ করে ফেলেছে মারিনা। পতিতা বড়লোক খদ্দের খোঁজে আর মারিনা খুঁজেছে- সুদর্শন, ধনী, ভালো ফ্যামিলির ছেলে।

একা একাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে মারিনা, অনেক হতাশা, অনেক সংগ্রাম। যদি কোনদিন ভদ্রলোকের দেখা পাওয়া যায় তাহলে এক কাপ চায়ের দাওয়াত দিতে হবে, মনে মনে ভাবে ও। এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে গেছে টের পায়নি ও, সকালে ঘুম ভাঙে মেয়েটার দাপাদাপিতে। মেয়েটা একটা ছবি এঁকেছে- গোলাপি রঙের একটা হাতি, হাতির রঙ গোলাপি হয় এই ধরনের ধারনা মেয়েটার মধ্যে কে ঢুকিয়েছে এইটা ভাবনার বিষয়। শহরে একটা সেক্স শপ আছে, সেইখানের লোগো একটা গোলাপি খরগোশ, কে জানে, সেখানকার বিজ্ঞাপন দেখে গোলাপি রঙ মাথায় ঢুকেছে কিনা।

মেয়েকে সে জিজ্ঞাসা করল – কিরে, খিদা লেগেছে, সাবু খাবি?
মেয়ে- না না না, খাবো না।
– সকালে সাবু খেতে হবে, এটা কবার বলতে হবে?
– খাবো না, খাবো না
– তোর না চাওয়াতে হবে নাকি, চল এখনি খেটে চল
– কুত্তী যদি না চায়, কুত্তা পারে না হান্দাইতে
– তোকে এ কথা কে শিখিয়েছে?
– ভ্লাদিমির চাচা।

ভ্লাদিমির এই পাড়ারই লোক, আগে আর্মি ট্যাংকে গোলা ভরার চাকরী করতো। চেচনিয়া যুদ্ধে এক পা হারানোর পর সরকার থেকে বাড়ি পেয়েছে আর পেনশন। এখন সারাদিন বাড়ির সামনে বসে বসে বিয়ার খায় আর এসব আজে বাজে বকে, ১০০ কথা বললে তার মধ্যে ৯০ কথাই অশ্লীল। মারিনার মেয়েটার সাথে খুব ভাব, খুব আদর করে মেয়েটাকে, মেয়েটাও খুব নেওটা ভ্লাদিমিরের। অথচ কি সব বাজে কথা শিখছে মেয়েটা ভ্লাদিমিরের কাছ থেকে, কান গরম হয়ে গেল মারিনার। মেয়েটাকে ঈদানীং একদম সময় দেয়া যাচ্ছে না, কিসব শিখছে যা তা। বই খাতা রঙ পেন্সিল কিনে দিলেই আসলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, এগুলোর ব্যবহার শেখানোই আসল, পেটে ধরলেই মা হওয়া যায় না, মাছও পেটে ডিম ধরে, পোনা খালাস করে নিজেও খালাস হয়ে যায়, এইরকম মা হয়ে লাভ নেই, মা হলে দায়িত্ববান মা’ই হওয়া উচিত। নাইলে রাজনিতিবিদদের মঞ্চের ভাষন আর মাছের মা’য়ের মধ্যে পার্থক্য নেই কোনই।

আজ দিনটা বেশ অলস যাচ্ছে, মেয়েটার সাথে খুনসুটি ছাড়া আর তেমন কোন কাজ নেই, বাসার জিনিসপত্র, কাপড় চোপড় গুছালো, নখের পুরানো নেইল-পলিশ তুলে নতুন নেইল পলিশ লাগালো। পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটার বাইরের দিকের হাড় বেকে যাচ্ছে, উঁচু জুতো পরতে পরতে, একটু কালচেও লাগছে। যত্ন করে পায়ের নখেও পলিশ লাগালো ও, এক দুই ঘন্টা নিজের পেছনে ব্যয় করলেই কতটা চকচকে লাগে নিজেকে, একবারই তো বাঁচছি, একটু ভালো কাপড় একটু চকচকে থাকতে দোষ কি, দোষ নেই কোনই, আসলে নাচের সময়টুকু বাদে কারো মনোযোগ পাবার আগ্রহটাই হারিয়ে ফেলেছে মারিনা।

মেয়েটার হাঁপানি শুনে দৌড়ে রান্নাঘরে গেলো মারিনা, চিত হয়ে পরে আছে, হাতের মধ্যে চকলেট, সারামুখ লালচে হয়ে গেছে, সাথে হাঁপানি, বার বার কাঁপছে, দ্রুত এম্বুলেন্স ফোন করলো মারিনা, প্রথমে মারিনা ভেবেছিল মুখের মধ্যে চকলেট আটকেছে, মুখ খুলে আঙ্গুল দিয়ে দেখলো মুখের ভেতরে পরিস্কার, কিছুই বুঝতে পারছে না ও, হৃদপিণ্ড এসে গলার গাছে আটকে আছে, মেয়েটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে রাখলো, মিনিট বিশেক পরে এম্বুলেন্স আসলো, এমার্জেন্সি ডাক্তার জানালেন- এলার্জি, বাদামে এলার্জি মেয়ের, চকলেটের মধ্যে সামান্য বাদামের টুকরো ছিল, সেই থেকেই এই অবস্থা, অক্সিজেন দিয়ে আর একটা ইনজেকশন দেয়াতে মেয়েটা স্বাভাবিক হয়ে আসলো, ডাক্তার কয়েকটা ওষুধ লিখে দিলেন, দোকানে আনতে গিয়ে দেখা গেলো, দুটো ওষুধই জার্মান, প্রচন্ড দাম, একটা স্প্রে’ও আছে অনেক দামী। সেটা কেনা গেলো না টাকার জন্য। মনটাই ছোট হয়ে গেলো মারিনার, প্রায় সবগুলো টাকা বের হয়ে গেলো ওষুধের পিছে, ব্যাগ প্রায় খালি, মেয়েটার খাবারের টাকা কোথা থেকে আসবে, আগামীকাল যদি আবার অসুস্থ হয়ে পরে, তাহলে সেই চিকিৎসা খরচও বা কোথা থেকে দেবে ও?
রাস্তায় নামার সাথে সাথে মোবাইল ফোন বেজে উঠলো, রেস্তোরাঁর ম্যানেজারের নাম্বার
– মারিনা, আজ সন্ধ্যায় তোমাকে আসতে হবে, রেস্তোরাঁয়।
– আমার তো আজকে ছুটির দিন ম্যানেজার সাহেব
– আজ সন্ধ্যায় একটা বিজনেস গ্রুপের বুকিং, ১৮ জনের, প্রায় লাখ টাকার খাবারের অর্ডার, তোমাকে আসতেই হবে।
– আমার মেয়েটা অসুস্থ, ম্যানেজার সাহেব
– আচ্ছা ঠিক আছে, অন্য কাউকে ফোন করে আসতে বলি।
– না না ম্যানেজার সাহেব, ঠিক আছে, আমি আসবো।

পেট খালি থাকলে, মনে দেশপ্রেম থাকে না, বেকারের মন প্রেমশূন্য। টাকার প্রয়োজন অস্বীকার করতে পারলো না মারিনা, মেয়েটার জন্যই টাকার দরকার, খালি হাতে মেয়ের পাশে বসে থাকলে মেয়ের উপকার হবে না।
রেস্তোরাঁর চেহারাই পালটে গেছে, বাতি ঝকমক করছে, ওয়েটার, বারম্যানের গায়ে পরিস্কার কাপড়, বোঝায় যাচ্ছে আজকের অতিথিদের পয়সা আছে, ভিতরে গিয়ে কাপড় পালটে নিলো মারিনা। প্রায় বারোটা পর্যন্ত অতিথিরা থাকবেন, কমপক্ষে ৬ টা নাচ নাচতে হবে।
মনের মধ্যে মেয়ের চিন্তা নিয়েও হাসি মুখে নাচ শুরু করলো মারিনা, সাধারনত অতিথিদের সাথে আই কনট্যাক্ট ওর নাচের সময় হয়েই যায়, আজো হলো, বুকটা খচ করে উঠলো, কেউ যেন হৃদপিণ্ডটা ধরে নীচ দিকে টান দিলো, কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে মারিনা একে একে ছয়টা নাচ শেষ করলো। ধন্যবাদ দিয়ে চলে যাবার সময়ে কাঁচাপাকা দাড়ি, ছোটচুলো- নেভী ব্লু স্যুট পরা এক ভদ্রলোক এসে মারিনাকে চমৎকার নাচের জন্য ধন্যবাদ জানালেন, একটা মিহি মিন্টের ঘ্রান আসছে ভদ্রলোকের গা থেকে ঠিক আগের মতো, সম্ভবত আফটার শেভ লোশন। মোটা নটের টাই, চওড়া কাঁধ, চকচকে ক্রিম কালারের জুতো, সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে ভদ্রলোকের।
– আপনি অসম্ভব সুন্দর নাচেন।
– ধন্যবাদ আপনাকে।
– আমরা আরো একঘন্টা এখানে বসছি আরো, আপনি আমাদের সাথে আমাদের টেবিলে বসলে খুব আনন্দিত হতাম।
– অনেক ধন্যবাদ, কিন্তু আমাকে বাসায় যেতে হবে, আমার মেয়েটা অসুস্থ, আসলে আপনার মেয়েটা অসুস্থ।

ভদ্রলোক কিছুই বুঝতে না পেরে মারিনার চলে যাওয়া দেখলেন, মারিনা হুট করে কাপড় বদলে বেড়িয়ে পরলো রাস্তায়, মারিয়ার বাবার সাথে এভাবে দেখা হবে ভাবেনি, একটু বুড়িয়েছে মাত্র, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, কারো জন্য ঢিল ছোঁড়া, কারো জীবন নিয়ে টানাটানি। চার বছর পর এক রাত্রের সঙ্গিনী মারিনাকে তিনি চিনতেই পারলেন না, অথচ না চিনতে পারা লোকটাই মারিনার সন্তানের বাবা। বড় একটা ঢোঁকের সাথে কান্নাও গিলে ফেলল মারিনা, দ্রুত বাসায় যেতে হবে, সাড়ে ১২ টার সময় বাস চলা বন্ধ হয়ে যায়, মারিনা দ্রুত পা ফেলল বাস স্টপেজের দিকে, পেছনে রেস্তোরাঁর হৈ হুল্লোড় আনন্দ, মদের গ্লাসের টোকাটুকি, আকাশে মেঘ করেছে, হালকা পাতলা স্তরের কালো মেঘ। এই মেঘকে রাশান ভাষায় বলে “ওবলাকা”

১,৫১৯ বার দেখা হয়েছে

৯ টি মন্তব্য : “ওবলাকা”

  1. সাইদুল (৭৬-৮২)

    শুধু বর্ণণা আর আবেগ টাবেগের ব্যপার নয়। অনেকদিন পর একটি লেখা পড়লাম যার মধ্যে গল্পটা দানা বেঁধেছে। লিখো, আরও অনেক লিখতে হবে।


    যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

    জবাব দিন
  2. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    গল্পটা খুব ভালো লাগলো। আচ্ছা বাস্তবের মেরিনারা কি এতো সহযে তাদের সন্তানদের বাবাদের ছেড়ে দেয়? কে জানে।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
  3. সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

    হামীম লিখতে চাইলাম, সবজান্তা আইপ্যাড বারবার শুধরে দিচ্ছে হামানদিস্তা বলে!

    সো, হ্যালো হামানদিস্তা ভাইয়া, লেখা বরাবরের মতই ভাল লাগলো। আরো অনেক পড়বার অপেক্ষায় রইলাম। :clap: :clap: :clap: :clap:

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।