হলদে পক্ষীর ‘৭১

১৪ মে, ১৯৭১।
পিরোজপুর জেলার কৃষ্ণনগর গ্রাম।
ঊর্মিলা সকালে উঠেই বুঝতে পারল, আর একটি অবশ দিন অপেক্ষা করছে তার জন্য। সারাদেশে কি যে শুরু হল, যুদ্ধ,গুলি আর বিপ্লব। ঊর্মিলা অনেক কিছুই বুঝতে পারে না,গতবার যখন তার ভাই ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছিল, তখন বাবা আর ভাই কে অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে শুনেছে,আইয়ুব খান, মনায়েম খান, রাও ফরমান আলি এই সব নাম গুলো বার বার ওর কানে আছড়ে পরছিল। ঊর্মিলা গায়ে লাগায়নি। বাবা এখন আর ব্যাংকে যান না,অনেক দিন হল সদরের ব্যাংক বন্ধ। বাবা বলেছিলেন জীবনের ঝুকি নিয়ে চাকরি করা সম্ভব নয়। মা নেই ঊর্মিলার। বাবাই তাদের জগত। সদর থেকে ওরা এই কৃষ্ণনগর গ্রামে চলে আসে, এখানে এই বাড়ি ওর মাসীর। মাসিরা ঢাকা তে থাকেন।
গ্রামে আসায় ঊর্মিলার ভাল হয়েছে, অনেক ভাল লাগছে ওর। উত্তর দিকে সদর রাস্তা,আর দক্ষিন দিকে একদম ফাকা, অনেক দূর সোজা গিয়ে ছোট একটি খাল। খাল এর আগ পর্যন্তই ঊর্মিলার ভাল লাগে, দুপাশে গাছ, জাম্বুরা,মেহগনি, আর রেইনট্রি। আর আছে করমচা,কয়েকটা কাঁঠাল গাছ, সব থেকে আনন্দের বিষয় হল পাখি। গতদিন ঊর্মিলা করমচা গাছে হলুদ পাখি দেখেছে। ছোট্ট ডানা মেলা হলদে পাখি।

শহরে থাকতে ঊর্মিলা কলেজে পরত, মেধা অত একটা ভাল নয় ওর। ও গায়ে লাগায় না,সবাইকে মেধাবি হতে হবে এমন কোন কথা নেই। ওর ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, হলে থাকে,হলের নাম মহসিন হল।সেই হলে আড্ডা দিতে আসে নাকি এক লম্বা চুল অলা কবি,নাম তার নিরমেলেন্দু গুন। ওই কবি কে খুব ভাল লাগে ওর। কবিতা গুলোতে প্রান আছে ভাবে ঊর্মিলা।

হাতে চায়ের মগ নিয়ে ও খালের দিকে যেতে থাকে। আর গুনের একটা কবিতা ভাজে মনে মনে, ভাইর কাছ থেকে কবিতার বইটা রেখে দিয়েছিল ও। ওনার নাকি অনেক লম্বা লম্বা চুল,বেটাকে পেলে চুল গুলো একবার আঁচড়ে দেয়া যেত,ভাবতে থাকে ও। খাল পারে নৌকা ভিড়ানো,আক্কাস চাচার। এই লোকটাকে খুব ভাল লাগে ওর, গতকাল একটা কাছিম এনে দিয়েছিল ওকে। আক্কাস চাচা মাছ ধরেন, বেশির ভাগ সময় নৌকাতেই রেধে খান, মরিচ আর ধনে পাতা দিয়ে রান্না করেন, খুব সুন্দর একটা গন্ধ বের হয়। একবার খেয়েছিল হলুদ দিয়ে ভাজা মাছ,আর সাদা চালের ভাত। আক্কাস চাচা বলেন,
-কি গোঁ মা মনি,কেমন আছো গোঁ,
-ভাল আছি চাচা।
-নউকাত ঘুরবা নি??
-না চাচা,আজকে না।
-খাইসন নি হকালে(সকালে)
-জি চাচা খেয়েছি
– বুঝলা নি মাজান, আমার পোলারে আর রাখতে পারলাম না, ওর মায়ের লগে ঝগড়া কইরা, ইন্ডিয়া গেছে গা,কি বলে তেরনিং লইব, দেশ স্বাধীন করব বলে,তুমি কিছু জান নি মাজান,উত্তম দাদায় ত হুনছি বেবাক খবর রাহে।
-চাচা বাদ দেন না,ভাল লাগে না আমার,খালি গুলি, যুদ্ধ এই সব,শুনেন, আমার একটা হলদে পাখি লাগব।
-হা হা হা হইলদা পাখি??আছে নি দেশে, গুলি আর বোমার গন্ধে সব ভাগছে মা জান।
-কবিতা শুনবেন চাচা???
-আইচ্ছা সুনাও,দেহি।
-খাবা নাকি এক টুকরা মাছ,ভাইজা দেই??
-দেন চাচা।
কবিতা পড়তে থাকে ও,আর চাচা মাছ ভাজে, মুড়ি আর মাছ ভাজা খাবার পর ঊর্মিলার মনে পরে,সকালে উঠে এখনও মুখ ধোয়া হয়নি। বিদায় নিয়ে চলে আসে ঊর্মিলা।

হাঁটতে থাকে ও, কয়েকটা ছাগল কাঁঠাল পাতা খাচ্ছে, কি যে মজা আছে কাঁঠাল পাতায় কে জানে।আর সামনে আসে ও, করমচা তলায় কিছু ছেলে মার্বেল খেলছে,খুব সুন্দর করে ওরা পরিষ্কার করেছে জায়গাটা, গর্ত করেছে কয়েকটা, ওরা খেলছে,দূরে দাড়িয়ে একজন তামাকের বিড়ি ধরাল। গন্ধটা ভাল লাগলো না ঊর্মিলার, ও দ্রুত হাঁটতে লাগলো, একটা ছেলের অস্পষ্ট গলা শুনল ও,তারপর আর একজনের
-অই হালা দেখ না বুনিডি কত্ত বড় বড়
-অই মাদানি চুপ কর,তর থে কত্ত বড়, অই মাইয়া,এক্কালে চুপ কইরা থাক।
এই ভাষা গুলো বুঝে না ঊর্মিলা, গায়ে লাগায় না। হাঁটতে থাকে, এবারে মেহগানি গাছ, এই মেহগনি ফলগুলো দেখতে সুন্দর, কিন্তু কাজের না, বিচি খুব তিতা,আর ফলের বাইরের অংশ টা খুব শক্ত, একটা ফল হাতে নেয় ঊর্মিলা, চিন্তা করে, এই ফল দিয়া নিরমেলেন্দু গুন এর মাথায় একটা বাড়ি দিলে কেমন হবে,বড় একটা ফোঁড়া উঠবে,সেই ফোঁড়া বাচাতে গিয়ে গুন বেটা সব চুল ফেলে দিবে, মনে মনে হাসতে থাকে ও।

বাড়ি ফিরেই গোসল সেরে নেয়। বাবা ভাত বসিয়েছেন। বাবার হাতের রান্না ভাল না। খেতে স্বাদ নাই, আক্কাস চাচার সাথে নিয়মিত খাওয়া দাওয়া করার একটা খসড়া প্লান করে ঊর্মিলা। দুপুরে ভাত খেয়ে একটা ভাত ঘুম দেয় ঊর্মিলা। চেচামেচিতে ঘুম ভেঙে যায় ওর
-অই মালাউন ,তোর নাম কি??উত্তম নাকি??
-জি আমি উত্তম,কিছু বলবেন??
-বলুম মানে,হালায় কয় কি??তর পোলায় নাকি যুদ্ধে গেছে??ঢাকা হল থেকে খবর পাইছি আমরা
-জি,আমার ছেলে পড়াশুনা করে,বাকি টুকু আমি জানি না।
-জানি না মানে?? ঘরে জাগল মাইয়া আছে এই টা জানস নি??নাকি এই তাও জানস না??হা হা হা
-অন্য কিছু বলবেন??আমার কাজ আছে।
-অই হালা পাকিস্তান এ আবার মালাউন গোঁ কাম কি?? চুপ কইরা শোন, পাকিস্তান আর্মি আইছে, সদর এ, গ্রাম এ গ্রাম এ পেট্রোল দিব,হেগর আচার আপ্পায়ান এর লাইগা পইসা লাগব,তর মাথায় ৩০০ ধরছি, সইন্ধায় আইসা লইয়া জামু।
-আমার চাকরি নেই,আমি কোথা থেকে পইসা দেব??
-তাইলে মাইয়া দিস, পাঞ্জাবি অপিসার রা কচি মাইয়া খায় ভাল।হা হা হা
গা গুলিয়ে আসে, ঊর্মিলার, এই কথার মানে বোঝে সে, সদরে শুনেছে,অনেক মেয়ে কে নিয়ে হায় আর্মি, পরে অত্যাচার করে,মেরে ফেলে ।আর রাজাকাররা এদের সাহায্য করে,তাহলে এরাই রাজাকার, বমি পেতে থাকে ওর। অসুস্থ লাগে।বার বার ভাবতে থাকে, হিন্দু কিম্বা সংখ্যা লঘু এই জন্য কি ওর দিকে সবার নজর, নাকি মুসলমানদেরও একই অবস্থা, এরা কি চায়, কারা এই মুক্তিবাহিনী? ভাইয়া কি তাহলে যুদ্ধে নেমেছে?? বাবা কি জানে সেই কথা??? উতাল পাথাল ভাবতে থাকে ঊর্মিলা।

হারিকেন জালিয়ে পড়তে বসে ঊর্মিলা, কলেজ খুলেই পরীক্ষা হবে, হরফগুলো হিজি বিজি লাগে। রাতে খায় না ও। কালো একটা বিড়াল দেখে,ঘরের পাশে ,জানলা দিয়ে। নীল চোখ জল জল করে বিড়ালের। বাবা রাস্তার উপর এর দোকান এ গিয়েছেন, ওখানে চা খান, রেডিও শুনেন ,৯ তার দিকে বাসায় আসেন, ঊর্মিলা এক মুঠো ভাত নিয়ে বিড়ালটাকে খেতে দেয়, বিড়াল দাড়িয়ে থাকে,মুখ পর্যন্ত দেয় না, একটু দূরে ঝোপ এর পাশে দাড়িয়ে প্রবল ভাবে চিৎকার করতে থাকে। ঊর্মিলা সামনে আগায়, দেখে ২ টা বিড়াল ছানা,ঝোপের পাশে।ঊর্মিলা দ্রুত বাসায় ফেরে,ভাত আনে বাটিতে,ওদের খেতে দেয়। একটু দূরে দিয়ে দাড়িয়ে থাকে।

এমন সময় ও চিৎকার চেচামেচি শুনতে পায়, মশাল এর আলো দেখে,নিমিশেই সেই আলো বাড়ির উঠান এ পড়ে, বাবাকে দেখতে পায়,পাশে অনেক লোক, বাবাকে ধরে আছে লোকগুলো, কথোপকথন শুনতে পায় ও রাজাকারদের
-কিরে তোরে কইলাম পইসা দিতে,তুই চা খান আর মুজিব কুত্তার ভাষণ হুনন মারাস
– আমি আপনাদের বলেছি,আমার কাছে টাকা নেই।
-মুজিব এর ভাষণ হুনিস কেলা??
-মুজিব তোরে ভাত দিসে না তোর মাইয়ার ভাতার??তোর ঘর এ এখন আগুন দিমু,মালাউন এর পু
-ঘর টা আমার না,দয়া করে এমন করবেন না।
– চুপ,মালাউন,তর মাইয়া কই,আইজকার তোরে তোরে খাইছি,তর মাইয়া রেও খাইছি।
-মেয়েকে আমি দুপুরেই পিরোজপুর সদর এ পাঠিয়ে দিয়েছে, বেড়াতে।
ঊর্মিলা বুঝতে পারে না, বাবা মিথ্যা কেন বলছেন, কিন্তু আচমকা ওর মনে হয়,বাবা কি তাহলে ওকে সংকেত দিচ্ছেন, দূরে সরে যেতে বলছেন ওকে??

ঊর্মিলা, দ্রুত উল্টো ঘোরে,অন্ধকারে গা মেশায়, তারপর ঝোপ পার হয়ে খালের দিকে মোড় নেয়, পায়ে কাটা বেধে ওর,উলটে পরে,আবার নিঃশব্দে সামনে যেতে থাকে ও,অল্প একটু জায়গাকে ওর মনে হয় মাইলখানেক। খাল পাড়ে পৌঁছে যায় ও। পিছনে পায়ের শব্দ টের পায়,নিশ্চয় ওরা আসছে,শব্দ শুনতে পেরেছে। কলিজা শুকিয়ে যায় ঊর্মিলার, নৌকা বাধা আছে ঘাটে,আক্কাস চাচার।আক্কাস চাচা মনে হয় বাসায় গিয়েছেন।খাল পাড় হবার সুযোগ নেই,পায়ের শুব্দ এগিয়ে আসছে, ঊর্মিলা পানিতে নেমে পড়ে, সাতরে নৌকা এর পিছনের অংশে যায়, শুধু কান আর মাথা তুলে, ও জানে পাড় থেকে ওকে দেখা যাবে না, কিন্তু কেউ নৌকাতে উঠলে ওকে দেখে ফেলবে, দম বন্ধ হয়ে আসে ওর। ঠিক এই সময় রাইফেল আর আলো দেখে ঊর্মিলা পারে,শুনতে পায় কথা
-কইরে রে মালাউন এর ঝি??
– দেখি না তহ ওস্তাদ
– ভাল কইরা দেখ,নউকাতে উঠ। লাইট মার।
-ওস্তাদ, এই খানে দেখেন,
-কি রে
-বিলাই অস্তাদ,বিলাই,এই হালাই
-তো,কি হইছে
– ঝোপ এর মদ্ধে শব্দ এই হালায় করছিল,ইন্দুর দেখসিল মনে হয়,আর আপ্নে মনে করছেন মালাউনের ঝি।
-দে হালারে গুল্লি। একদম পেটটা গাইলা দে।
লোকটি কালো বিড়ালটাকে লাফি মারে, বেড়ালটা শব্দ করতে করতে চলে যায়, ঊর্মিলা ওদের চলে যাবার শব্দ শোনে, ও মাথা তুলে আকাশে তাকিয়ে থাকে,সেখানে অনেক তারা,আর চাদের রুপালি আলো ,সেই আলোতে কিছুক্ষন পর ওদের ঘর পোড়াবার শব্দ আর ধোয়া মেশে। আর স্তব্ধতা ভঙ্গ হয় ওর বাবার আর্তচিৎকারে।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে।

১,২৮৬ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “হলদে পক্ষীর ‘৭১”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।