নাদেশদা

এক

আজ আমার দুই বছরের জেল হয়ে গেল। বিচারক সাহেব মোটা গ্লাসের চশমা মুছতে মুছতে রায় পড়ে শুনালেন, আমার উকিল ম্যাচের কাঠি দিয়ে কান খুচতে খুচতে রায় মেনে নিলেন। শ্রোতা বেঞ্চিতে আমার মা আর মেজো চাচা বসে আছেন, রায় শুনে মায়ের তেমন কোন ভাবান্তর হল না, মেজো চাচা এই সুযোগে মায়ের উরুতে সহানুভূতির হাত বুলিয়ে দিলেন। মেজো চাচার কিলবিল করা আঙ্গুলগুলো নিয়েও মা’কে উদাসীন মনে হল।
অথচ মায়ের দোষ না, আজকাল সবাই বাস্তববাদী হয়ে গেছে। আমার থেকে জিগাতলার দুই রুমের বাসার মূল্য অনেক বেশি, আমার পিছনে মাসে মাসে কতগুলো টাকা খরচ হয়, আর জিগাতলার বাসা থেকে মাসে মাসে ভাড়ার টাকা আসে।

মাদক দ্রব্য আইনে আমার দুই বছরের জেল হয়ে গেলো। অথচ আমার মাথায় ব্যপারটা যাচ্ছে না, আমার মাথা জুড়ে আছে আলতাফের চিন্তা, বন্ধু আলতাফের আজ আমার সাথে দেখা করার কথা, এক বোতল ফেনসিডিল নিয়ে আসার কথা। আদালত থেকে যাবার পথে আলতাফের সাথে দেখা হবে, তাই দুই বছর অথবা দুইশ বছরের জেলের রায়ে আমার কিছু আসে যায় না।
আদালত থেকে ফেরার পথে আমার মা আমার হাতে পাঁচশ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিলেন, মেজো চাচা মায়ের শরীরের সাথে শরীর লাগিয়ে আছেন, ভাবটা এমন যেন মানুষের ভীড়ে দাঁড়ানোর জায়গা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
টয়লেটে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল আলতাফ, আমি ঢুকতেই আমার হাতে ফেন্সির বোতল ধরিয়ে দিল আলতাফ, আমি ঢকঢক করে চুমুক দিয়ে আধা বোতল ফেন্সি নিঃশেষ করে ফেললাম, বাকিটুকু চুমুক দেবার সময় দেখি আলতাফ ঠোঁট চাটছে, আমি শেষ চুমুক ওর জন্য রেখে দিলাম। ওর চোখ চকচক করে উঠলো।

আমার শরীরে এখন নানা রঙ খেলা করছে, নানা শব্দ, নানা অনুভূতি। আমি চোখ মুখ ভরা তৃপ্তির ছাপ নিয়ে পুলিশ ভ্যানে উঠে বসলাম। ভ্যানের ছোট ফুটো দিয়ে ঢাকা শহর দেখতেও ভালো লাগছে, একটা বায়োস্কোপের মতন স্বাদ আসছে, বাতাসটা ভেতরে যদিও একটু কম তবুও বেশ ভালো লাগছে দেখতে। বেশির ভাগই রিকশা, এক ভদ্রলোক বসে বিড় টানছে, আরেক ভদ্রলোক ফোনে কথা বলছে, একটা স্কুল ড্রেস পরা ছেলে আরেকটা স্কুল ড্রেস পরা মেয়ের শেমিজের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে, মেয়েটা শুড়শুড়ি লাগায় মুচড়ে উঠছে।
এসব দেখতে দেখতেই আমাদের প্রিজন ভ্যান কারাগারে চলে আসলো।

দুই

জেলে আসার পরে আমি সবার প্রথম উপলব্ধি করলাম আমার একটি নাক এবং একটি পাকস্থলী আছে। নানান রকম গন্ধ অনুভব করার সাথে আমি প্রবল ভাবে খাবার খেতে চাইছি, প্রায় সারাদিনই আমার খাবার খেতে ইচ্ছে করে, এরমধ্যে প্রথম এক সপ্তাহেই আমার দু”বার খিঁচ উঠলো, সারা শরীর বিদ্রোহ করে বসল, শরীর ফেনসিডিল চায়, অথচ ফেনসিডিল দেবার মতো কেউ নেই। জেলের ডাক্তার সাহেব আমার সমস্যাটা বুঝে ফেললেন, তিনি প্রথমে আমাকে সিডাটিভ মেরে ঘুম পারিয়ে রাখলেন, আর এরপর কিছু বিদঘুটে অসুধ খাইয়ে আমার চিকিৎসা করতে লাগলেন। প্রথম ধাক্কা আমি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই কাটিয়ে উঠলাম, এখন আর খিঁচ ওঠে না, বড়জোর ঘাম ছাড়ে।

আমার সাথে প্রথম এক মাসে কেউ দেখা করতে এলো না, দ্বিতীয় মাসে আমার মা মেজো চাচাকে নিয়ে দেখা করতে এলেন, আমি জানালা দিয়ে তাদেরকে দেখে আর দেখা করতে গেলাম না। মা আর মেজো চাচার এই সামজিক ঢলাঢলি দেখলে আমার আগে বমি পেত, এখন বিরক্তি লাগে।
খুনের আসামী চাটগায়ের সিদ্দিক আমাকে প্রথম খাবার খাওয়া শেখালো, সাদা ভাত, লেবু, কাঁচামরিচ, বেগুনভাজি, মুরগির মাংস নিয়ে এসেছিল ওর বউ একদিন, সেখান থেকে আমাকে খাওয়ালো সিদ্দিক। সত্যি কথা বলতে এত ভালো খাবার আমি কখনো খাইনি। পরের সপ্তাহে সিদ্দিক আমাকে ইলিশ মাছ ভাজি আর আলু পটলের নিরামিষ দিয়ে ভাত খাওয়ালো। পটলের আঁটি গিলে খাবার মধ্যে এত আনন্দ আছে জেলে না আসলে জানতে পারতাম না। সেদিন রাতে সিদ্দিক আমার ট্রাউজারের মধ্যে হাত দেয়, ওর লোমশ হাত লকলক করতে থাকে আমার উরু আর পেটে, আমি বুঝতে পেরে সিদ্দিককে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেই। এরপর থেকে আমি সিদ্দিককে এড়িয়ে চলি, সিদ্দিকও সম্ভবত লজ্জা পেয়ে আমাকে এড়িয়ে চলে।

খাবার আর যৌনতা দুই বিষয়েই আমি ফেনসিডিলের কারণে ডাব্বা মেরে গিয়েছি, আমার লক্ষ্য, দৃষ্টি ইত্যাদি সবসময়ে ছোট ছোট বোতল কেন্দ্রিক থাকতো। আমাদের ইউনিভার্সিটি’র ক্লাসের এক মেয়ে ওর জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমাদের সবাইকে ওর বাসায় দাওয়াত করলো, খাবার টেবিলে আমি একটু ডিমের কোরমা খুঁটে খাওয়া শেষ করলাম, আমার মাথায় তখন ফেন্সি’র তাং। আমি বান্ধবীর বাসার টেবিল থেকে ওর বাবার সুন্দর হাতঘড়িটা চুরি করে নীচে নেমে আসি। ৩০০০ টাকায় সেই ঘড়ি বিক্রি করে রাজার মতো বোতল টানি সেই সপ্তাহে, আমার জীবনের সুন্দর সময়ের মধ্যে সেই সময়টাকে রাখা যায়।
এরপর আমাকে ক্লাসের সবাই মোটামুটি বয়কট করে ফেলে, আমি থোড়াই কেয়ার করি, আমি তখন কমলাপুর, কাওরানবাজারের নিয়মিত বাসিন্দা।

যৌনতাও আমাকে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দিয়ে যায়, শরীরের প্রয়োজনে পরে আমি মহাখালীর আবাসিক হোটেলের শরনাপন্ন হই। বিলকিস জুলেখাদের খদ্দের হই পয়সা দিয়ে, বিলকিস, জুলেখারা আমাকে লুফে নেয়, বিলকিস-জুলেখাদের আমি জয় করতে পারি না, তাদের পেটে, উরুতে নিঃশেষ হয়ে যাই, অনভিজ্ঞ আমার যৌনতার হাতে খড়ি হবার আগেই কপালে জোটে হাসি-তামশা, বিলকিস-জুলেখারা আমার ফেনসিডিলের পয়সা কেড়ে নিয়ে আমাকে হাতে নিঃশেষ করে। যৌনতা এবং ফেনসিডিলের মধ্যে আমি ফেন্সি বেছে নেই।

জেলে কাশেম চাচার সাথে আমার পরিচয় হয় অনেক দিন পর, কাশেম চাচা পড়ালেখা জানেন না, শুধু আরবী পড়তে পারেন। উনি গ্রামে জমি জমার মালিক ছিলেন, মুসুল্লী ছিলেন। কিন্তু যখন বুঝতে পারেন একাধিকবার ধানের গোলায় কাজের মেয়ে জরিনাকে ভোগ করার ফলে জরিনা গর্ভবতী হয়ে গেছেন, তখন তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, কারন জরিনার মা’কেও তিনি দীর্ঘদিন ধানের গোলায় আটকে ভোগ করে গর্ববতী বানিয়ে ফেলেছিলেন, জরিনার জন্ম হবার পর জরিনার মা আত্মহত্যা করেন।

জরিনাকে বালিশ চাপা দিয়ে খুন করতে গিয়ে গভীর রাতে কাশেম চাচা রসুইঘরে যান, বুড়ো শরীরটা পেরে ওঠে না, জরিনা ছিটকে কাশেম মিয়াকে ফেলে দেয়। গভীর রাতে চিৎকারে লোক জড় হয়, থানা পুলিশ হয়, কাশেম মিয়ার বউ আর জরিনা শলা-পরামর্শ করে এটেম টু মার্ডার আর ধর্ষনের মামলা দেয়। কাশেম মিয়ার ১২ বছরের জেল হয়ে যায়।
কাশেম মিয়ার জমির কিছু কাগজপত্র আসে জেলে, আমি পড়ে কাশেম চাচাকে বুঝিয়ে দেই, কাশেম চাচা খুশি হয়ে আমাকে কমলা খেতে দেন, কমলার খোসার এত সুন্দর গন্ধ হয় আমি এই প্রথম জানতে পারি। কাশেম চাচা আমাকে চিড়া, গুড়, শুকানো নারিকেল খেতে দেন, আমি কাশেম চাচার মামলা এবং জমির কাগজপত্র পড়ে তাকে বুঝিয়ে বলি।

অল্প কয়েকদিনের মধ্যে আমার জ্ঞানের সুনাম জেল জুড়ে ছড়িয়ে পরে, মানুষ আমার কাছে বাড়ির দলিল, মামলার কাগজ, প্রবাসী মেয়ে চিঠি ইত্যাদি নিয়ে আসে। আমি সবাইকে সাহায্য করার চেষ্টা করি। সবাই আমাকে খেতে দেয়, গরুর ভুঁড়ি ভাজা, পাঁচফোড়ন দিয়ে কষানো ফুলকপি আর শিমের ঝোল, ধনে পাতা দিয়ে ছোট মাছের চচ্চড়ি, মাংসের কিমা, কপাল ভালো থাকলে আমার কপালে বিরিয়ানীও জোটে। যার বাসা থেকে যাই নিয়ে আসে, সেখান থেকে আমাকে খেতে দেয়া হয়। শুধু আমার বাসা থেকে কেউ আসে না, আমি নাক ভরে খাবারের ঘ্রান নেই, ফেন্সি অথবা বাসার কথা আমি বেমালুম ভুলে যাই, এমনকি সিগারেটও আমাকে টানে না এখন।

আমি জেলের বাগানে ঘুরি, লেবু গাছের কাছে যাই, লেবু পাতা, পেয়ারা পাতার গন্ধ আমাকে বিমোহিত করে, পেয়ারা পাতা দিয়ে দাঁত মাজার এক অনবদ্য কৌশল শেখায় আমকে এক কয়েদি। আমি নিয়মিত মুগ্ধ হই, সারাজীবন আমাকে সব যায়গায় অবাঞ্চিত করা হয়েছে, আমাকে দেখলেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, আমাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে, অথচ জেলে আমাকে সবাই লেখাপড়া করা ভালো ছেলে বলে, আমার কাছে জরুরী কাগজপত্র নিয়ে আসে, আমার প্রচন্ড সুখ হয়। এক ধরনের ভালোলাগা ছড়িয়ে থাকে আমার ভেতরে। কারো কাগজপত্রের কাজ করে দিতে আমার কোন বিরক্তি লাগে না, আমি সময় নিয়ে সবার কাজ করে দেই।

দেখতে দেখতে আমার বছর গড়িয়ে যায় জেলখানায়, বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান উপস্থাপনার দায়িত্ব পাই আমি। আমি রবি ঠাকুরের কবিতার কোটেশন দিয়ে স্ক্রিপ্ট সাজাই, অনুষ্ঠানের দিন আমার মনে হয় আমি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন কাজটি করছি। ঠিকঠাক মতনই অনুষ্ঠান হয়, জেলার সাহেব আমাকে ডেকে নিয়ে বেশ প্রসংশা করেন, শিফন শাড়িতে জেলার সাহেবের বউয়ের থলথলে নিতম্ব দেখে অনেকদিন পর আমার ভেতরে যৌনতা জেগে ওঠে, একগাদা লিপস্টিক দেয়া ঠোঁটদুটো দেখে আমার বিলকিস জরিনার কথা মনে হয়।

প্রেমের অনুভূতি কেমন হয় ভুলেই গেছি, আউল ফাউল নাম্বারে ফোন দিয়ে অপরিচিত মেয়েদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা আর আমাদের ভাড়াটিয়ার হাবা-গোবা মেয়েটার স্তন মর্দন করা ছাড়া তেমন কোন আবেগপ্রবণ বন্ধন আমার কোন মেয়ের সাথে হয়নি। শুস্ক যৌনতা এবং প্রেমের মধ্যে পার্থক্য আমার বুঝে ওঠা হয়নি। রিক্সায় ঘোরা, গল্প করা, মাত্র মাত্র শ্যাম্পু করা চুলের ঘ্রান নেয়া হয়নি, অথবা উপহার কিনে দেয়ার মতো সুন্দর জিনিসগুলো আমার পরখ করে দেখার সুযোগ আসেনি।

দেখতে দেখতে আরেকটা বছর গড়িয়ে যায়, আমার রিজিলের সময় হয়ে আসে। আমি উদাস মুখে কাগজপত্র সাইন করি, আমার কেন যেন মনে হতে থাকে আমার জেলখানা ছাড়া যাবার কোন যায়গা নেই। একদিন সকালে আমাকে ডেকে কাগজ পত্র আর কাপড় চোপড় ধরিয়ে দেয়া হয়, জেলার সাহেব আমাকে নতুন জীবন শুরু করতে বলেন। জেল খানার ছবিআলা ক্যালেন্ডার উপহার দেন। দুই বছর আগের কাপড় চোপড় আমার গায়ে ছোট হয়, আমার কোমড়ের বেড় বেড়ে গেছে, কাঁধ চড়া হয়েছে। মানুষের নাকি জেলে অবনতি হয় আমার উন্নতি চোখে পরবার মতো।

বিদায়ের দিন সবাই খুশি, অথচ আমি খুশি নই। সবাইকে চিঠি লেখার প্রতিশ্রুতি জানিয়ে আমি জেল থেকে বিদায় নেই।

তিন

আমার বাসায় ফিরে আসাটা খুব আটপৌরে একটা ঘটনার মতো ঘটে গেল। আমি আমার রুমে বসে পুরানো বই, পত্রিকা পড়ি, খাবার সময় হলে খাবার খাই। আমার সাথে আমার মায়ের তেমন কোন কথা হয়না। বাবা-মা’র ঘরে এখন মা- মেজো চাচার বসবাস। আড়াল আবডালের কোন বাড়াবাড়ি নেই। মা-বাবা-আমার ফ্যামিলি ছবিটা দেয়াল থেকে নেমে গেছে, সেখানে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে মেজো চাচার কাঁধে মাথা রাখা মায়ের ছবি।

আমার সাথে একমাত্র বাসার কাজের বুয়া আসমা খালা গল্প করেন, তার বাচ্চাদের ছবি আঁকার গল্প, মেয়ের পরীক্ষায় পাশ করার গল্প। আসমা খালা আমাকে পান খেতে দেন, আমি মুখ ভরা পান নিয়ে গভীর আগ্রহে আসমা খালার গল্প শুনি।

একদিন আমি খোঁজ-খবর নিয়ে আমার ইউনিভার্সিটির বন্ধু হাসিবের অফিসে যাই, হাসিবের বাবা মারা যাবার পর হাসিব সাগরে পরে, হাসিবের দুই তিন মাসের মেস ভাড়া-খাওয়া খরচ আমি দিয়েছিলাম। হাসিবের অফিসের দারোয়ান আমাকে গেটে আটকে দিলো। গেট থেকে ফোন করে হাসিবকে পাওয়া গেল। হাসিব আমাকে নিয়ে এয়ার কন্ডিশনড রেস্তোরাঁয় খেতে গেলো, আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, অন্তত সবাই আমাকে ছেড়ে গেলেও হাসিব আমাকে ছেড়ে যায়নি, আমাকে সে এখনও বন্ধুর মতো দেখে। আমরা পুরানো দিনের অনেক গল্প করলাম। হাসিব আমার পকেটে জোর করে ২০০০ টাকা দিয়ে দিলো, ওর নতুন বউয়ের ছবি দেখালো। বাসায় আসতে বলল। হাতি কাঁদায় পরলে পিঁপড়া যে সবসময় লাথি মারে এই কথাটা ভুল। হাসিব আমাকে ভোলেনি।

অসম্ভব সুন্দর একটা সময় কাটিয়ে আমি বাসায় আসলাম। আমার মা তখন আমার হাতে কিছু কাগজ ধরিয়ে দিলেন। আমি পড়ে জানতে পারলাম আগামী ছয় মাসের জন্য আমাকে রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছে। আমি মা’কে বললাম আমি কোন মাদকের সাথে আর জড়িত নই। আমার মা কান্নাকাটি করে ঘর ওলট পালট করলেন। মা বললেন ভালো না লাগলে ফোন করতে- আমাকে নিয়ে আসবেন আবার।

উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা জায়গাটা আমার প্রথমেই খুব অপছন্দ হলো। আরো অপছন্দ হলো মানুষের ব্যবহার। একদল মাদকসেবীর মধ্যে আমার নিজেকে খুব বেমানান লাগতে থাকে। আমি সকাল বিকাল জোর করে ওষুধ খাই, কিসের ওষুধ খাই জানি না, ধীরে ধীরে আমার চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে যেতে থাকে, অবশ হয়ে যেতে থাকে ঘ্রান, শ্রবন অথবা ব্যথার অনুভূতিগুলো।

প্রচন্ড অতিষ্ঠ হয়ে আমি বাসার ফোন করি, বাসার ফোন ধরেন এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক, তিনি জানান দুই সপ্তাহ আগেই আমার মা তার হাজব্যান্ডকে নিয়ে কানাডা চলে গেছেন। আমাদের বাসার নতুন ভাড়াটিয়া তিনি। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে, আমি এই অসহ্য রিহ্যাব সেন্টারে সত্যি থাকতে চাই না।

সেই রাতে আমি রিহ্যাব সেন্টার থেকে পালিয়ে যাই। হাসিবের দেয়া টাকাটা সাথেই ছিল, আমি আমার প্রিয় জেলখানার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। কাক ডাকা ভোরে আমি জেলখানায় পৌঁছাই, গার্ডের কাছ থেকে জেলার সাহেবের বাসার ঠিকানা জোগাড় করি, সাত সকালে আমাকে ড্রয়িং রুমে বসে থাকতে দেখে জেলার সাহেব রীতিমত ভিড়মি খান, সম্ভবত সকল কয়েদী এবং সাবেক কয়েদী জেলার সাহেবের কাছ থেকে হাজার মাইল দূরে থাকতে চান। আমি জেলার সাহেবকে সব খুলে বলি, এবং আমাকে আবার জেলে জায়গা দেবার জন্য বলি, জেলার সাহেবের চোয়াল ঝুলে পরে, উনি লুঙ্গির গিট বাঁধতে বাঁধতে আমাকে বসতে বলেন, বলেন- দেখি কি করা যায়।

আমার সামনে ফ্লোরে বসে জেলার সাহেবের ছোট মেয়েটা ইংরেজি অক্ষর দিয়ে শব্দ লিখছে, এইচ দিয়ে লিখেছে হ্যাট, আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম, হ্যাট এর পাশে গোটা গোটা অক্ষরে লিখলাম HOME।

আমি এখন জেলার সাহেবের ছোট মেয়ের সাথে ফ্লোরে বসে জেলার সাহেবের অপেক্ষা করছি।

পরিশিষ্ট- গল্পের নাম “নাদেশদা”, শব্দটি রাশান, এর অর্থ সুন্দর কিছুর জন্য প্রতীক্ষা।

২,৪০২ বার দেখা হয়েছে

২৪ টি মন্তব্য : “নাদেশদা”

  1. জুনাইদ ( ৮৩-৮৯)

    পেশাগত কারণেই ইদানিং মাদকাসক্ত আর মাদক ব্যবসায়ীদের ধাওয়া করে বেড়াতে হয়। মাদক সংক্রান্ত অপরাধে হামেসাই মানুষের জেল জরিমানা হতে দেখছি। তোমার গল্পে একটা ধাক্কা খেলাম। এভাবে তো ভেবে দেখিনি! এদের সবার নিশ্চয় এরকম একটা গল্প আছে। ধন্যবাদ তোমাকে...।


    লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়!

    জবাব দিন
    • তাওসীফ হামীম (০২-০৬)

      গল্পের দুই অংশ থাকে, এপিঠ অইপিঠ, মুদ্রার মতো। ঠিক এই কারনেই আমি মানুষকে বিচার করি না, সবার হয়ত কোন কারন ছিল, কোন বাধ্যবাধকতা ছিল, কোন গল্প ছিল।
      পড়বার জন্য অনেক ধন্যবাদ। 🙂


      চাঁদ ও আকাশের মতো আমরাও মিশে গিয়েছিলাম সবুজ গহীন অরণ্যে।

      জবাব দিন
  2. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    স্টকহোম সিন্ড্রম নিয়ে ইদানিং খুব নাড়াচাড়া করা হচ্ছে। আমার কেন জানি খুব ঠুনকো মনে হয় ঐই থিওরীটি। ভাললাগা তৈরী হতে ভাল কিছু ঘটতেও হয়। সেটা জেলও হতে পারে। অসাধারণ হামীম। তোমরা কিছু বান্দা আছো যাদের জন্য হা করে বসে থাকতে হয় কবে লিখবে একটি লিখা। সিদ্দিক সাহেব লিখলেন অনেকদিন পরে। আমরা পড়লাম। এবার তুমি লিখলে। ধন্যবাদ দিয়ে খাট‌ো করতে চাই না। আপাতত আবারো হা করে অপেক্ষায় বসলাম পরবর্তি কিছু একটার জন্য! 🙂


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন
    • তাওসীফ হামীম (০২-০৬)

      মোকা ভাই আমেরিকা সিরিজ মিসাই, সবসময় কমেন্ট না করলেও পড়তাম নিয়মিত, আশা করি এইবার নস্টালজিয়া সিরিজ লিখবেন দেশে বসে বসে।
      একটা লেখা নামানোতে কত কষ্ট অবশ্যই জানেন, মানুষ পড়লে খুব খুব শান্তি লাগে। অনেকদিন পর দেশ কেমন লাগছে, এতদিনে কি পরিবর্তন হয়েছে এই নিয়ে একটা লেখা দিয়েন সম্ভব হইলে।

      পড়বার জন্য অনেক ধন্যবাদ। 🙂


      চাঁদ ও আকাশের মতো আমরাও মিশে গিয়েছিলাম সবুজ গহীন অরণ্যে।

      জবাব দিন
  3. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    অরেঞ্জ ইজ দ্যা নিউ ব্ল্যাক! 😀

    গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র 'আমি'কে তাও অন্য অনেকের চেয়ে ভাগ্যবানই বলব। কেননা জেলখাটা আসামীর জন্য আমাদের (আসলে কমবেশি সব দেশেরই) সমাজ অনেক বেশিই নির্মম।

    ভাল লাগল! :clap:


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
    • তাওসীফ হামীম (০২-০৬)

      নূপুরদা, প্রথম দুই পর্বে চেয়েছি মাদকাসক্ত চরিত্রটিকে পাঠকের কাছে যথা সম্ভব বিরক্তিকর এবং বিদ্ঘুটে এবং লুজার টাইপ হিসাবে উপস্থাপন করবার জন্য, এইজন্যই কিছুটা যৌন আনুসাঙ্গিক করেছি। কি জানি বেশি হয়ে গেলো কিনা। 🙁


      চাঁদ ও আকাশের মতো আমরাও মিশে গিয়েছিলাম সবুজ গহীন অরণ্যে।

      জবাব দিন
  4. কুইক পড়লাম।
    দূর্দান্ত। আগে আমি এই লেখকের কোন লেখা পড়িনি। প্রথম অনুভূতি তীব্র ভালো লাগা।
    সিসিব্লগেও আগে সময় দেয়া হয়নি। এটা ভুল করেছি, এই লেখা পড়ে বুঝলাম।

    ধন্যবাদ তাওসীফ হামিম।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।