ডাক্তারের কাছে গেলেই টেস্ট দেয়

প্রাক কথন-

দক্ষিন বাড্ডার বাসিন্দা আলতাফ হোসেন ( বিএসসি) সাহেবের মেয়ে ” তৃপ্তি” এ বছর সরকারী মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করেছে। বড্ড খেয়ালী মেয়ে, আলতাফ সাহেবের ছোট ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে ইন্টার মিডিয়েট পড়বার সময়, তৃপ্তির বান্ধবী রুমী সেদিন তার বর নিয়ে চা খেয়ে গেল বাসায়, অথচ তৃপ্তির সেই দিকে কোন নজর নেই, পড়াশুনা শেষ করতে হবে বলে বলে আজ এই ছয় বছর বিয়ে করেনি। এখন একটা বেসরকারী ক্লিনিকে ভালো বেতনের চাকরী করছে, এবারে বিয়ের কথা তুলতে তৃপ্তি বলল আচ্ছা ঠিক আছে।

গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই আলতাফ সাহেব ঝাঁপিয়ে পরলেন ছেলে খুঁজতে। একমাস পর আলতাফ সাহেবের হাতে তিন পাত্র। প্রথম পাত্রের সন্ধার দিয়েছে আলতাফ সাহেবের কলিগের মেয়ের নানশের খালাতো বোনের ভাসুর। এছাড়া আরো দুজন পাত্রের সিভি হাতে পরেছে। আলতাফ হোসেন( বিএসসি) এবার একটি টালী করলেন।

null
চিত্র-আলতাফ হোসেন(বিএসসি) সাহেবের তৈরি টালী

কোনভাবেই এবারে আলতাফ সাহেব কাউকে স্ক্রিন আউট করতে পারলেন না। সবারই কিছু প্লাস আছে, মাইনাস আছে, এভাবে হচ্ছেই না। কারো বাড়ি আছে তো গাড়ি নেই, কারো চেহারা দেখলেই বলে দেয়া যাচ্ছে নারী লোলুপ। এ যুগের ছেলে মেয়েদের এই এক সমস্যা। রাজপুত্তর মতো দেখতে এক ছেলের সাথে তৃপ্তি আগে সারারাত কথা বলত ফোনে, সে ছেলে বাসায় এসে তৃপ্তির রুমে বসে ঘুটুর ঘুটুর করত। এক রাতে তৃপ্তিকে ওর মা ঝাড়ু ( হলা পিছা) দিয়ে মারার ঘটনাও মনে পরে আলবৎ। সেই ছেলে পরে এক আমেরিকা প্রবাসী মেয়ে বিয়ে করে আমেরিকা চলে গেছে।

যাই হোক এরপর বুড়িগঙ্গার জলে অনেক জঞ্জাল ভেসেছে, তৃপ্তিও দাগা খেয়ে পড়ালেখায় মন দিয়েছিল। কোন ভাবেই সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে আলতাফ সাহেব মেয়ের হাতে পাত্র-টালী ধরিয়ে দিলেন। মেয়ে বুঝদার, সেই সিদ্ধান্ত নেউক।

তৃপ্তি কথন-

পাত্র-টালী হাতে পেয়ে তৃপ্তির বার বার বিষম খায় ( মতান্তরে তব্দা খায়) তার বাবার সব কিছুই বড় গুছানো। যাতে পাত্রদের সম্পর্কে একটা সাধারন ধারনা পাওয়া যায় সেই জন্য টালী করে রেখেছে। সব কজন পাত্রই রিজনাবল। তবুও এখানে শুধু একটা ধারনা পাওয়া যাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে না কিছুই, মানুষের জুতোর দিকে তাকালে মানুষ সম্পর্কে একটা ধারনা পাওয়া যায়, কিন্তু সিভিতে কারো জুতোর ছবি নেই, সবার একটা গম্ভীর মুখের পাসপোর্ট সাইজ ফটো। তৃপ্তি সিদ্ধান্ত নিল এভাবে অন্ধকারে ঢিল মারা কোন ভাবেই উচিত হবে না, পেশা, চরিত্র, আয় দেখে জীবনের এত বড় সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না আবার অইদিকে ” ফর্শা মানেই সুন্দরী নয়, লম্বা মানেই হ্যান্ডসাম নয়” চেহারা দেখেও কোন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। অবশেষে তৃপ্তি সবার সাথে দেখা করে কিছু সময় কাটানোর দফারফায় আসে, এতে প্রত্যেকের ভালো ও মন্দ গুন বোঝা যাবে এবং একটি উপসংহারে আসা যাবে।

একজনের সাথে কড়াই গোশত, একজনের সাথে যমুনা ফিউচার পার্ক আর আরেকজনের সাথে কেএফসিতে দেখা করে তৃপ্তি পরবর্তী তিন সপ্তাহে। বাবা যেমন টালী করেছেন, খাতা কলম নিয়ে নিজেও টালী করতে বসে তৃপ্তি
null
চিত্র- পাত্রদের সাথে দেখা করার পর তৃপ্তির টালী

বাবার হাতে টালী ধরিয়ে দেয়ার পর আলতাফ সাহেবের মুখের অবস্থা দেখার মত হয়, তিনি বলেন- তুই এত কিছু কিভাবে জানলি? তৃপ্তি বলল দেখা করে জেনেছি। আলতাফ সাহেব বললেন- ছেলে সমকামী কিভাবে বুঝলি? তৃপ্তি বলল- “ছেলের হাতের উপরের দিকে সিগারেট দিয়ে পুরে এক ছেলের নামের প্রথম অক্ষর লেখা, আমি জিগাসা করায় বলল তার খুব প্রিয় ক্যাডেট কলেজের এক জুনিয়রের নামের প্রথম অক্ষর” আলতাফ সাহেব বললেন- আচ্ছা বুঝলাম, নিকোটিনে আসক্ত কিভাবে বুঝলি? তৃপ্তি বলল- আঙ্গুলের ফাকায় আর নখের মাথায় হলুদ দাগ, বেশিক্ষন বসতে চাইছিল না আমার সাথে, কারন যেখানে বসেছিলাম সেখানে ধূমপান নিষিদ্ধ।

মেয়ের পর্যবেক্ষন ক্ষমতায় আলতাফ সাহেবের পাত্র-টালী হুমকির সম্মুখীন হল। আলতাফ সাহেব বললেন- ভালো করেছিল সবার সাথে দেখা করে পর্যবেক্ষন করে। নাহলে কত কিছু জানতেই পারতাম না, তা এখন কি করবি? তৃপ্তি লাজুক হেসে বলল- প্রথম ছেলেটার সাথে আমি আরেকটু কথা বলে দেখি।

মূল কথন-

পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়, রোগীর রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে গন্ধ শুকেই বলে দিতে পারতেন কি রোগ হয়েছে। এখনকার ডাক্তারেরা কেন সবাই বিধানচন্দ্র নয় সেটা নিয়ে অবশ্যই কথা কাটাকাটি হতে পারে। তবে সত্যি কথা হল, আপনার চেহারা দেখে অথবা তাপমাত্রা, ব্যথা দেখে বোঝা সম্ভব নয় আপনার রক্তে কোন ব্যাকটেরিয়া আছর করেছে, ভাইরাস তো আরো এককাঠি সরেস, এরা মাঝে মাঝে ব্যাকটেরিয়ার দেহ ব্যবহার করে আপনার শরীরে রোগের সৃষ্টি করে ফেলে। অনেক রোগের একই রকম লক্ষন, লক্ষন দেখেই ওষুধ দেয়া যায় না, তাহলে হোমিওপ্যাথি আর এলোপ্যাথির মধ্যে কোন পার্থক্য রইল না। ইদানিং শুনেছি হোমিওপ্যাথি ডাক্তারেরাও রক্ত পরীক্ষা করতে দেন। শরীরের ভিতরের অংগগুলোর সঠিক অবস্থা জানার জন্য ডাক্তারদের বিভিন্ন টেস্ট করতে দিতে হয়, হেপাটাইটিস বি না সি সেটা জানার জন্যও ব্লাড টেস্ট করতে দিতে হয়। আপনি যদি আপেল পচা কিনা দেখে কিনতে পারেন, আপনার হিমোগ্লোবিন কমে গেছে কিনা সেটা দেখে চিকিৎসা করা একজন ডাক্তারের অধিকার।

কসাই কসাই বলে ফেনা তুলে ফেলার আগে বুঝুন, এরপর কসাই কসাই বলে চিৎকার করুন। পয়সালোভী ডায়াগোস্টিক সেন্টার আপনার কাছ থেকে বেশি টাকা নিচ্ছে এটা একজন ডাক্তারের অপরাধ নয়। অনেক সাধারন টেস্ট খুব কম খরচে করা সম্ভব, কেন তারা বেশি টাকায় এই টেস্ট করে এটার উত্তর আপনি যেমন জানেন আমিও জানি। তাই ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার টেস্ট দিলেই বিরক্ত হবেন না, মনে রাখবেন আপনি এক পিস ডিম কিনতে গেলেও চারবার ডিম উলটে পালটে দেখেন, ডিমটা ফাটা কিনা।

ডিসক্লেইমার- সকল চরিত্র কাল্পনিক, জীবিত অথবা মৃত অথবা তালাকপ্রাপ্ত কারো সাথে মিলে গেলে লেখক দায়ী থাকবেন না।

৬৯২ বার দেখা হয়েছে

৭ টি মন্তব্য : “ডাক্তারের কাছে গেলেই টেস্ট দেয়”

  1. মোকাব্বির (৯৮-০৪)
    ডিসক্লেইমার- সকল চরিত্র কাল্পনিক, জীবিত অথবা মৃত অথবা তালাকপ্রাপ্ত কারো সাথে মিলে গেলে লেখক দায়ী থাকবেন না।

    The usual suspect: মিলে যাবার সম্ভাবনা থাকলেই মানুষজন লেখায়, বিজ্ঞাপনে, নাটক ইত্যাদির শেষে "দাবী পরিত্যাগ দফা" যোগ করে থাকে! 🙂


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন
  2. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    কথা হচ্ছে অনেক রকমের কম্বিনেশন বিরাজ করে। ডায়াগ্নস্টিক সেন্টারের কাছ থেকে কমিশন নেন কিন্তু টেস্টগুলো দেয়া জাস্টিফাইড; কমিশন খান না কিন্তু বিদ্যার দৌড় নাই - না বুঝে টেস্ট দেন; প্রচুর প্র্যাক্টিশনার শুধু কমিশনের জন্যে ফালতু টেস্ট দেন; অনেকে গাড়ি ফ্রিজ বাড়ি যাবার বিমান ট্রেন বাসের টিকেট ইত্যাদি দাবী করেন ফার্মা কোম্পানির কাছ থেকে --- এর মাঝেও সৎ সংবেদনশীল চিকিৎসক আছেন তো বটেই। কিন্তু মানুষ কি করে তাদের চিনবে? যেখানে প্রতিপদে সন্দেহ আর অবিশ্বাস, যার শুরু হয়েছে মূলত চিকিৎসকদের দ্বারাই। এখন কোন ডাক্তারো নিজের বা আপনজনের চিকিৎসার জন্যে দেশের বাইরে দৌড়ান -- ভেতরের খবর ভালোভাবে জানেন বলেই।

    এর থেকে মুক্তির উপায় কি। সাধারণ মানুষ কি করে বুঝবে কোন্ টেস্ট আসলেই প্রয়োজন, কোনটা স্রেফ ধান্দাবাজি -- ফলে সে সবাইকে গালি দেয়, ঢালাওভাবে রাগ ঝেড়ে কিছুটা সান্ত্বনা পেতে চায়। আর কোন ধরণের ভুল, ম্যালপ্র্যাক্টিসের প্রতিকার হয়না, বিচার হয়না। ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে এসবের। এসব কারণে ডাক্তাররাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বৈ কি -- যে কোন ইন্টারভেনশনে ব্যর্থতা হতেই পারে, অনেক ফ্যাক্টর থাকে -- কিন্তু সাধারণ মানুষ এসব শুনতে রাজি থাকেনা - ডাক্তার পিটিয়ে বা মেরে ফেলে বা চেম্বার হাসপাতাল ভেঙ্গে 'বিচার' সমাধা করে ফেলে।

    এসব নিয়ে খোলামেলা কথা বলা উচিত। আমি নিজে ডাক্তার হিসেবে বলবো -- আমরা দেশে রোগীকে মানুষ হিসেবে যথেষ্ঠ সম্মান দেইনা , রোগী বা তার আপঞ্জন কোন কিছু নিয়ে চ্যালেঞ্জ করলে অপমানিত বোধ করি, যেকোন পরিস্থিতি বেশির ভাগ সময় ব্যাখ্যা করিনা (যেমন 'এই ওষুধগুলা চালিয়ে যান' টাইপের দায়সারা কথা বলি।

    অন্যদিকে রোগীপক্ষের লোকজন প্রথমেই ধরে নেন দেশের ডাক্তাররা কিসসু জানেনা। এবং মেডিকেল সায়েন্স সম্পর্কে কোন ধারনা না থাকা লোকজন বিদ্যা জাহির করতে উদ্ভট বানোয়াট কথা বলে সবাইকে বিভ্রান্ত করেন যা আসলে চিকিৎসার চরম ক্ষতি করে।

    'কসাই' বলে গাল পাড়াটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। যেমন মানুষ গাল পাড়ে পুলিশকে, কথায় কথায়। একজন মাস্ফু হয়ত পুরো সিস্টেমটাকে বদলাতে পারবেনা -- কিন্তু সেসব না ভেবে যে বৈপ্লবিক পন্থায় মানুষের কাছে পৌঁছাবার চেষ্টা করছে সে, সেটা মানুষের প্রতি ভালোবাসা না থাক্লে সম্ভব না।
    আজকের ডাক্তারদেরকে মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে - যেভাবেই হোক প্রমাণ করতে হবে আমরা জনগণের বন্ধু। ভুল ভাঙানোর শুরুটা আমাদেরি করতে হবে - কোন সন্দেহ নেই। একজন ডাক্তার বা একটা প্যাথলজিকাল সেন্টার আসলেই ঠিকঠাক পরীক্ষা করতে বলছে কি না - সেটার বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টির উপায় খুঁজতে হবে।

    কিন্তু পুরো দেশ ইতোমধ্যেই যে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে -- কোটিকোটি টাকার বাণিজ্যে মেতে আছে যে মহাজনেরা তাদের ছোঁবার স্পর্ধা কি কারো আছে?

    জবাব দিন
    • মোকাব্বির (৯৮-০৪)

      মেডিকেল নেগলিজেন্স নিয়ে বাংলাদেশের আইনী দৌড় কদ্দূর সেটা একটু ঘেঁটে দেখছিলাম। ভালো কিছু পেলাম না। ঘাঁটছিলাম বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশানের কোড অফ এথিকস। দায়সাড়া গোছের, ঝাঁপসা নির্দেশনা দেয়া। ভাবলাম একটু খোঁজ নিয়ে দেখি কে কি লিখছে এই ব্যাপারে। ব্র্যাকে থাকতে বেশ কয়েকজন শিক্ষক মেডিকেল নেগলিজেন্স নিয়ে কাজ করতো। ডঃ তুরিন আফরোজ ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন করছেন (হয়তো) প্যাথলজি ও বেসরকারী পর্যায়ে হাসপাতাল সেবা কিন্তু ভোক্তা অধিকারের মাঝে পড়ে। ডঃ শাহদীন মালিকও কিছু লিখালিখি করেছেন মনে পড়ে। বেশীর ভাগ লেখাই, গতানুগতিক রিভিউ অর্থাৎ কি কি আইন আছে, তাদের মাঝে কি কি প্রতিকার আছে ইত্যাদি নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ ও কিছু নতুন ধারণা।

      কিন্তু পুরো দেশ ইতোমধ্যেই যে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে -- কোটিকোটি টাকার বাণিজ্যে মেতে আছে যে মহাজনেরা তাদের ছোঁবার স্পর্ধা কি কারো আছে?

      আসলে যারা লিখছে বা কাজ করছে বা কাজ করতে চাইছে এই ব্যাপারে তাদের হাতও বাধা। কে যাবে এই বড় মহাজনের সাথে টক্কর দিতে? লতায় পাতায় আত্মীয়তায় সব তো এক বড় রসুনের অনেকগুলো কোয়া!


      \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
      অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

      জবাব দিন
  3. তাহমিনা শবনম (৮৪-৯০)

    "প্রথম পাত্রের সন্ধার দিয়েছে আলতাফ সাহেবের কলিগের মেয়ের নানশের খালাতো বোনের ভাসুর"-নানশ কি?

    লেখার দ্বিতীয় অংশের লেখার সাথে সহমত (একমত নই,আরো কথা আছে।)


    আমি চোখ মেললুম আকাশে
    জ্বলে উঠলো আলো পূবে পশ্চিমে

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।