সবাই যায় পশ্চিমে,আমি গেলাম পুবে ও পশ্চিমে (২)

সবাই যায় পশ্চিমে,আমি গেলাম পুবে ও পশ্চিমে (১)

ঘুম থেকে উঠলাম ঘণ্টা তিনেক পর,ততক্ষণে আমার সাথে থাকা ছেলেটি জুতা মুজা খুলে বসেছে আর টিভিতে দেখছে স্থানীয় সংবাদ। সংবাদের কি বুঝছে সে,সেই জানে। নক পেয়ে দরজা খুললাম,আরো একজন আমাদের সাথে এসে যোগ দিল। তার নাম আসিফ,আমাদের মধ্যে এক জুটি ছিল,তখন টের পেলাম। ছেলেটি মেয়েটিকে একান্তে পাবার লক্ষে তার রুম থেকে আসিফকে বের করে দিয়েছে। আসিফ মন খারাপ করে বসে আছে। আমারও মনে খারাপ কারন দুই মেয়ে,একজন জুটিতে,রইল বাকি মাত্র এক।

ছেলেরা একসাথ হলে সেখানে নারী শরীরের বর্ননাই সবচে গুরুত্বপূর্ণ এবং নিখুঁত। আসিফ বলল মেয়েটি ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে রুমে ঢুকেছে,আমি আমার ঠোঁট দিয়ে লিপস্টিক চেটে খাবার ভঙ্গি করে দেখালাম,বাকি দুজন খুবই মজা পেল এবং বাহবা দিল।
দুই বিছানার মাঝখানে ইন্টারকম টেলিফোন। আংরেজি ছবিতে দেখেছি ফোন তুলে খাবার অর্ডার করলেই খাবার চলে আসে। আমিও ফোন তুলে নিলাম কানে, ডিরেকশন শুনে রুম সার্ভিস এর জন্য জন্য ১০৩ বা ১০৪ এই জাতীয় একটা ডিজিট প্রেস করলাম,মিনারেল পানি আর কফির অর্ডার করলাম,কারন আমাদের খাবারের ব্যবস্থা হোটেলের বুফেতে,অর্ডার দিয়ে খেলে পয়সা লাগবে। অতএব কফিই সই। নিজেকে আংরেজি ছবির নায়ক নায়ক মনে করতে লাগলাম।

হাতমুখ ধুতে ধুতে কফি চলে আসলো। আসিফ এবং রাফি বিভিন্ন গঠনমূলক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে লাগলো। আমি কফি খেয়ে নেমে গেলাম নীচে,মেইল করতে।
মোস্তফা গেমস খেলার মতো বক্স কম্পুটার। ৩০ মিনিট পর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেট বিচ্ছন্ন হয়ে যায়। মেইল বক্সে আমাদের সাথের আরেক ছাত্র প্রত্যয় এর প্রেমিকার একটি মেইল পেলাম,রমণী প্রেমিকের জন্য খুব টেনশন করছে।

পিতা মহাদয়কে মেইল দিলাম,যে হোটেলে আছি,কোন সমস্যা নাই। ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেট দিলাম

– হ্যাভিং ফান উইথ ফ্রেন্ডযযয( এস নয় বরং ইংরেজি জেড দিয়ে লিখতে হবে) ইন আবুধাবী এয়ারপোর্ট হোটেল….. .
এই ধরনের স্ট্যাটাসকে বলা হয় চিল বা কুল আপডেট। এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষনীয়। “ফ্রেন্ডয” লেখার মানে হোল আমার অনেক বন্ধু এবং সেখানে মেয়ে বন্ধুও আছে। দ্বিতীয় বিষয় লাইনের শেষে ডট ডট ডট…… অর্থাৎ ফান চলছে,এবং ফান যেকোন দিকে টার্ন করতে পারে।

নিজেকে কুল ডুড প্রমান করে আমি এয়ারপোর্ট এর মধ্যের দোকান পাট ঘুরে দেখতে লাগলাম,ক্যামেরার দাম খুব কম,গয়না গাটিরও,চকলেটের। অনেক শেখ দেখলাম,ঢোলা আলখাল্লা পরে মাথায় পাগড়ী বেঁধে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। এছাড়াও নেপালের দুজন ছাত্রের সাথে পরিচয় হোল, তারা হোটেল বুক করেনি,তাই সারা রাত লবিতে বসে কাটাতে হবে,আমার সাথে খাতির জমাতে এলে আমি পাত্তাই দিলাম না,কারন তারা লবিতে রাত কাটাবে আর আমি হোটেলে। কিছু উপদেশ দিয়ে আমি সটকে পড়লাম। কারন নাপিত যখন মন্ত্রী হয়,তখন সে আর, নাপিত কি জিনিস চেনে না এবং চেনার চেষ্টাও করে না। এটাই স্বাভাবিক।

রাত আটটার দিকে ফিরে এলাম রুমে। গঠনমূলক আলোচনা তখনও চলছে,আমি তাদেরকে বললাম যে প্রত্যয় এর প্রেমিকা আমাকে মেইল করেছে,সবার চোখে সন্দিহান জিজ্ঞাসু। প্রত্যয়কে না করে আমাকে কেন? আমিও এক দাগ বেশি রহস্য চোখে নিয়ে বুঝিয়ে দিলাম আমাকে নয় তো কি তোমাদের মতো ফাতরাদের মেইল করবে? আমি সবাইকে বললাম যে এখন বুফেতে না গেলে মানুষের খেয়ে ফেলা উচ্ছিষ্ট খেতে হবে শেষে। সবাই তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে গেল।

আমি নক করলাম মেয়েদের রুমে। বেড়িয়ে এল যে মেয়েটি সে বড়ই রূপবতী হয়েছে,ভেজা চুল,ঠোঁটে লিপগ্লস, কুসুম কুসুম রোমান্সের ইচ্ছা বাড়ি দিল মনে ভীষণভাবে। রাতে খেতে যাবার কথা বললাম,এবং কেয়ারিং হবার চেষ্টা করলাম। এটা সেটা জিজ্ঞাসা করলাম,কোন সমস্যা হয়েছে কিনা, শরীর কেমন,এসিতে তাপমাত্রা ঠিক মতো সেট করতে পেরেছে কিনা ইত্যাদি। আমি তাকে বুঝিয়ে দিলাম- ইফ সি নিডস এনিথিং,আই এম অলঅয়েজ দেয়ার,বাই হার সাইড।
জুটিকেও জানতে সাহায্য করলাম কোথায় বুফে,এবং কিভাবে যেতে হবে।

দলবল নিয়ে আমরা বুফেতে পৌঁছে গেলাম এবং বাঙ্গালীয়ানা বজায় রেখে টেবিলে এক্সট্রা চেয়ার যোগ করে সবাই একসাথে বসলাম। নাম বুফে হলেও ওয়েটার আছে এবং তার চেহারায় উপমহাদেশীয় ছাপ। ওয়েটার কাছে আসতেই মেয়েটি বলে উঠল “ টাকলা ওয়েটার” আমরা সবাই একচোট হেসে নিলাম। মেইন কোর্স অর্ডার করল যে যার পছন্দ মতো। তবে সবাই খুটিয়ে দেখে নিল পর্ক আছে কিনা,আমি সবাইকে নিশ্চিত করলাম যে আরব দেশের এয়ারপোর্ট হোটেলে পর্ক এবং এলকোহল থাকবে না এবং তার মধ্যে এখন রোজা চলছে।

শুয়োরের বিষয়টি দেশের বাইরে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। না খেয়ে মরে গেলেও শুয়োর ছোয়া চলবে না। শুয়োরকে যত গাল পাড়বেন আপনার উপর প্রবাসীরা তত খুশী হবে। এছাড়াও রাশিয়াতে আরব ছাত্রদের দেখেছি মদের সাথে খাবার জন্য গ্রাম থেকে হালাল ভেড়া অথবা গরুর মাংস কিনে আনতে,শুয়ার কখনই নয়। শুয়োর খাওয়া ইসলামে সরাসরি হারাম। আমরা অপেক্ষা করছি খাওয়া আসার,এর মধ্যেই আমাদের জুটি পৌঁছে গেল,আমাদের কোন রকম পাত্তা না দিয়ে তারা আলাদা টেবিলে বসে গেল এবং খুনসুটি করতে লাগলো।

খাবার আসার পর দেখ গেল কেউই খেতে পারছে না,কেউ কাটা চামচ চাকুর জন্য,কেউ লজ্জায়,কেউ ভাত- মাছ না পেয়ে। সবাই তখনও চামচে টুং টাং করছে আমি ওয়েটারকে ডেকে ডেসার্ট অর্ডার করলাম, ফ্রুট কেক চাইলাম।

কেক চলে আসার পর দেখা গেল উপরে অজানা এক ফলের টুকরো। আমি সম্ভ্রান্ত মুসলমানের ঘরের সন্তান,না জেনে কিভাবে খাই? যদি হারাম ফল হয়? আমি আমার ওয়েটারকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম এই ফল কি ফল? সে জবাব দিল “কিভি” কিভি হোল বাংলাদেশে আমড়া সাইয ফল,ছিলে খেতে হয়,টক মিষ্টি স্বাদ। ভেতরের শাঁসের রং কাচা কলার মতো। আগ্রহীদের জন্য কিভি ফলের একটা ছবি দিয়েছি।

পিচ ফল আর কিভি ফল এখনও আমার সবচে প্রিয় ফল।
কেক শেষ হবার পর আমি আইসক্রিম নিতে চাইলাম,ওয়েটার বলল
– স্যার ইউ হ্যাভ অলরেডী অর্ডারড ইয়োর ডেসার্ট,ইউ ক্যান নট অর্ডার এগেন।

ইজ্জতের পায়জামা খুলে গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে গেল ব্যাটা। জুমার নামাজের দুই রাকাত ফরজ নামাযের জামাতের পর আপনি মসজিদে প্রবেশ করলে আপনার দিকে মানুষ যেভাবে তাকিয়ে থাকে,সবাই আমার দিকে সেইভাবে তাকিয়ে রইল।
আমি হেসে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলাম কিন্তু বিষয়টা ঠিক উড়ল না।

পেটপূজা সেরে আমরা রুমে ফিরে আসলাম। সবাই আমার রুমে বসল,বিভিন্ন গল্প গুজব করছি,কে কিভাবে এপ্লাই করেছে,কার বাড়ি কই,ভাই বোন কতজন,কে কয়টা প্রেম করেছে ইত্যাদি। আমি হাই তুলে বললাম- এক প্যাকেট তাস নিয়ে আসা উচিত ছিল,২৯ খেলা যেত,সবাই আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন আমি সবাইকে হেমলক বিষ খেতে বলেছি।

মেয়েটি বিদায় নিল,তার নাকি ঘুম আসছে। এরপর আমি প্রস্তাব দিলাম সবাইকে,নীচে যাওয়া যাক,অনেক নারী যাত্রী আছে,পরিচিত হওয়া যাক,কথা বলা যাক আফটার অল দেয়ার ইজ আ থিং কল্ড “ ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড” কিন্তু সবার অনাগ্রহ দেখে মনে হোল আমি একদল সমকামীর মাঝে এসে পড়েছি।

একজন প্রস্তাব দিল গানের কলি খেলা যায়। আমি একটা সিধান্তে পৌঁছে গেলাম,হয় আমি ভিন গ্রহের বাসিন্দা,নয়ত এরা ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা।
সহসা রুমের ফোন বেজে উঠল,সবাই একযোগে আমার দিকে তাকালো। আমি উঠে গিয়ে ফোন ধরলাম। আমাকে জিজ্ঞাসা করা হোল কেউ রোজা রাখবে কিনা? তাহলে ভোররাতে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়া হবে ফোন করে,এবং খাবারের ব্যবস্থা আছে। আমি বললাম অবশ্যই,আমরা সবাই রোজদার।

ফোন রাখার পর সবাই জিজ্ঞাসা করল আমি কেন হ্যাঁ বললাম,আমি তো গতকালও রোজা ছিলাম না,তাছাড়া,আমরা কোথায় ইফতারী করব? মস্কো পৌঁছে আমাদের ইফতারের ব্যবস্থা কে করবে?
আমি সোজা সাপটা বলে দিলাম যে আমাদের প্রিয় নবীজী( দঃ) সবসময় সেহরী খেয়েছেন,এবং সাহাবীদের সেহরী খাবার জন্য উৎসাহিত করেছেন,আমি সেহরী এবং ইফতার ছেড়ে দিয়ে পাপের ভাগীদার হতে চাইনা।

এরপর যে যার রুমে চলে গেল,সিধান্ত হোল,যার ইচ্ছা সে খাবে,যার ইচ্ছা না সে সেহরী খেতে যাবে না।

১,৮৩৫ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “সবাই যায় পশ্চিমে,আমি গেলাম পুবে ও পশ্চিমে (২)”

  1. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    তিন নম্বর পর্ব কই???
    কুইক দে 😡
    চমৎকার লেখনী ::salute::


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    আমি এখানে এসে প্রথম কিউয়ি খাই। ভাবী দেয় খেতে।বলে, বিশাল গুণ ওয়ালা ফল। আমার ঐ ভাই-ভাবী আবার গুণাগুণ বিচার করে খাবার খায়।
    যেমন মোটা চালের ভাত খায়
    বাদামী, বিস্বাদ রুটি খায়।
    সকালে হেইঞ্জের বেকড বীন খায়।
    আমার অবস্থা ডাইল কইরা দিছিলো কয়েক দিনে।

    কিউয়ি ছিল্কা ছাড়িয়ে কুচি কুচি (পেয়াজ কুচির চাইতে একটু বড় হবে) করে কেটে লবণ মরিচ দিয়ে খেতে অসাধারণ।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  3. ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

    হামীম তোমার গত পর্বে বাক্স প্যাটরার কথা পড়ে, আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার না করে পারছি না।
    ঢাকা এয়ারপোর্টে আমরা একসাথে অনেক ছেলেমেয়েই উঠেছিলাম। এদের মধ্যে একটি মেয়ের নাম ছিল শিল্পি। তার বাবা আমাকে শিল্পির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, "আমার মেয়ে, তোমাদের সাথে মস্কো যাবে।" ভালো কথা আমি স্মরণ রাখলাম। এয়ারপোর্টে লাউন্জে অপেক্ষা শেষ করে যখন প্লেনের দিকে যাচ্ছি (তখন কোন নোজ ছিলনা, লাউন্জ থেকে নেমে বাসে করে অথবা হেটে প্লেনে যেতে হতো), আমার সামনেই পড়ল শিল্পি। পিছন থেকে এক মুরুব্বী বললেন (তিনি সম্ভবতঃ এয়ারপোর্টের কর্মকর্তা ছিলেন, এবং শিল্পিদের পরিচিত) বান্ধবীকে একটু হেল্প করো, ওর ব্যাগটা ক্যারি করে দাও। মুরুব্বীর কথা ফেলি কি করে? ওর সাথে দুটো হ্যান্ডব্যাগ ছিল। আমি অপেক্ষাকৃত ছোট হ্যান্ডব্যাগটি নিলাম। নিয়ে কাধে রাখতেই, আমার কাধ প্রচন্ড ভারে বাঁকা হয়ে গেল। তখন টগবগে বয়স ভার-টার আর গ্রাহ্য করিনি। প্লেন পর্যন্ত বয়ে দিলাম। পরদিন মস্কো এয়ারপোর্টে নেমে, যে দৃশ্য দেখলাম তা ভোলার নয়। অনেক সিনিয়র বাঙালী ভাই-বোনেরা এসেছেন আমাদের রিসিভ করতে। উনারাই আমাদের ব্যাগ টেনে দিতে শুরু করলেন। আমার নিজের ব্যাগই আর ক্যরি করতে হলোনা, শিল্পি তো পরের কথা। শহরে যাওয়ার সময় বাসে উঠতে আবারও শিল্পি লাইনে আমার সামনে। শিল্পির ব্যাগ যেই সিনিয়র ভাই ক্যারি করছিলেন, তিনি হঠাৎ বললেন, "এট ছোট ব্যাগ এত ভারী কেন? কি আছে এটায়?" শিল্পি লাজুক ভঙ্গিতে বলল, "জ্বী, শিল-পাটা।" "কি, শিল-পাটা? এখানে মশলা পিশতে হয় না কি, তোমাকে এই বুদ্ধি কে দিল, এখানে শিল-পাটা লাগে?" ক্ষুদ্ধ ও বিস্মিত হয়ে বললেন ঐ সিনিয়র ভাই। এবার আমি কঠিন দৃষ্টিতে তাকালাম শিল্পির দিকে, মনে মনে বলছি, 'ঢাকায়, এই জিনিস টানতে হয়েছে আমাকে!!'

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।