আধাসামরিক প্রেমের গল্প

আধাসামরিক ক্যাডেট কলেজে বেসামরিক প্রেমিকা থাকা শুধু কষ্টের নয়, ভয়াবহ কষ্টের।প্রতিবার ছুটির শেষে প্রিয়
মানুষটিকে ফেলে কলেজে যেতে অনেক কষ্ট হয়।ক্যাডেট কলেজ, সে এমন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, যেখান থেকে মুক্ত পৃথিবীর খোঁজ নেয়া অসম্ভব প্রায় । আর্মি হেড কোয়ার্টারের স্বেচ্ছাচারিতায় মুঠোফোনের বেতার তরঙ্গ তখনো জায়গা করে নিতে পারেনি ক্যাডেট কলেজের সেই চৌহদ্দিতে। তবুও সমস্ত কলেজ প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে কখনো আন্ডারগার্মেন্টস এর নিচে,কখনো মোজার ভেতর,মোটা বইয়ের পৃষ্ঠা কেটে,ব্যাগের কোনায়,এংলেটের মধ্যে, আর না হলে নিছক শেষ হয়ে যাওয়া বডি স্প্রের কৌটা কেটে নিতান্তই সাধারণ একটি সেট সাথে রাখা। কখনো মটোরোলা অথবা চিরপরিচিত নোকিয়া ১১০০। শুধু প্রিয় মানুষটির সাথে একটু যোগাযোগ রাখার চেষ্টায় এত এত
আয়োজন। অনেক অবেলায় যখন ঝুম বৃষ্টি নেমে আসতো আমাদের আধাসামরিক সেই কলেজে,মনে পড়তো ভীষণ সেই বেসামরিক প্রেমিকাকে। তখন হয়তো সান্ধ্যকালিন ক্লাসের ঘন্টা মাত্র দিয়েছে। হাজারি ও নাগের রসায়ন প্রথম পত্র খুলে হাবিজাবি কিসব বিক্রিয়ায় মাথা নষ্ট হবার উপক্রম। ঠিক তখন হয়তো মুঠোফোনে ভাইব্রেশন। সব কিছু
পেছনে ফেলে ওয়াশ রুমের দিকে দৌঁড়। ততক্ষণে হয়তো রিং হয়ে গেছে কয়েকবার। চার নম্বর টয়লেটে ঢুকে যখন গভীর আবেগে প্রিয় নম্বরে ডায়াল দেয়া হল তখন হয়তো মুঠোফোনে যথেষ্ট টাকা নেই। অথবা মায়ের চোখ
এড়িয়ে কথা বলতে যাওয়া সেই বালিকাও মুঠোফোনের কাছে আর নেই। সমস্ত রাত হয়তো ঘুমই এলোনা। বিষণ্ণতায় হয়তো ডিনারে না খেয়ে থাকা কিংবা উদাসীন চামুচ গুটিয়ে ডিনার শেষ হবার জন্যে অপেক্ষা। এরপর হাউসে এসে একা একা ডায়রি লেখা। একসময় সারাদিনের ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দেয়া।

কখনো কখনো চিত্রপট পরিবর্তন হয়।সতেরো কিংবা আঠারো বছরের সেই ছেলেটিকে দেখা যায় খাটের নিচে,কখনো লকারের আড়ালে,কখনো বেড কভার মুড়ি দিয়ে কথা বলতে। হয়তো সমস্ত রাতের আকাশে আকাশে ভেসে যায় ভালোবাসার সেই ফিসফাস গল্প। কি থাকে সেই গল্পে?

ঠিক গত সপ্তাহে বিনা কারণে রফিক স্টাফ যে ইডি টা দিয়েছিল তার কোন কারনই ছিলনা,কিংবা এই টার্মটা বেশ ঝামেলায়
যাচ্ছে। নতুন এডজুটেন্ট ভালো না। সকালে তিন চক্কর দৌঁড়ানোর মাঝে একটুও হাঁটা যায় না।
কিংবা রননের জন্মদিনটা পালন
করতে গিয়ে গভীর রাতে দত্ত স্যারের কাছে ধরা খেলাম। জানো, ইদানিং তোমাকে খুব
বেশি মনে পড়ে। সেদিন রাতের জোছনা খুব বেশি মায়াময় ছিল। তোমাকে ফোন দিয়ে পেলাম না। আমরা কয়েক জন সেই
জোছনায় বেরিয়ে ছিলাম। গার্ডের কাছে ধরাও খেলাম। তুমিতো জানোইনা এবার আমরা বোধ হয়
হাউস চ্যাম্পিয়নশীপটা পেয়েই যাবো। সেদিন
ডাব চুরী করতে গিয়েছিলাম আমরা কজন।
সে কি এডভেঞ্চার। তুমি হয়তো বিশ্বাসই করবেনা। এবার ছুটিতে এলে বেশ মজা হবে। আর
তো মাত্র কয়েকটা দিন. . .”

হয়তো রাত ফুরোয়,মুঠোফোনের চার্জ ফুরোয়,টাকা ফুরোয় কথা ফুরোয় না। থেকে যায়
অনেক কথা। কখনো কখনো অনেক দিন কথা হয় না। আচমকা হাউস চেক হতে পারে ভেবে মুঠোফোন পাঠিয়ে দেয়া হয় স্টোর রুমে। দুজন দুজনের জন্য অপেক্ষা করে। এদিকে অধ্যক্ষের হাউস পরিদর্শন শেষ হয়। একদিন বৃহঃস্পতিবার সন্ধ্যায় ফোন খোলা হয়। অনেক অনেক না পড়া ক্ষুদেবার্তা। বালিকার ছোট ছোট আবেগ অনেক বড় বড়
অনুপ্রেরণা হয়ে ঘিরে থাকে ছেলেটিকে। এরপর হয়তো মুঠোফোনে ফোন যায়। ওপাশ থেকে উচ্ছাস ভাঙা কন্ঠে অজস্র অভিমানী ষোড়শী তার মায়াভরা কন্ঠে বলে,এতদিন
ক্যামোন ছিলে?

কখনো কখনো চিঠি আদান প্রদান হয়। মেয়েটি হয়তো চিঠি পাঠায়। প্রেরকের নামের জায়গায় কোন ছেলের নাম ব্যবহার করে। কখনো কখনো সেই চিঠি সেন্সর বোর্ডের কাছে ধরা খায়। কলেজ অথরিটির কেউ কেউ
বুঝতে পারে এ চিঠি প্রেমিকার পাঠানো। অতি আনরোমান্টিক কোন শিক্ষক হয়তো সে চিঠি ছিঁড়ে ফেলে। সে হয়তো জানেও না এ চিঠির প্রতিটি শব্দ বহন কত সহস্র আবেগ। ছেলেটিও চিঠি পাঠায়। সেই চিঠি হয়তো পৌঁছে যায় ষোড়শীর কাছে। হয়তো পৌঁছায় না। সেই চিঠি পড়ে ষোড়শী কাঁদে কি না আমরা জানি না। শুধু জানি সেই
একটি চিঠি পাঠাতে ছেলেটিকে নিতে হয় অনেক মিথ্যের আশ্রয়। হয়তো সে চিঠির পেছনে ছেলেটি তার আসল নাম লিখতে পারে না। লিখতে হয় কোন মেয়ের নাম,নয়তো ছদ্ম নাম। কলেজের চতুর্থ শ্রেণীর কোন কর্মচারিকে দিয়ে হয়তো সে চিঠি পাঠানো হয়। মাঝেমাঝে টাকা ও দিতে হয়। শুধু যে চিঠি যায় তা নয়,সে চিঠির ভাঁজে ভাঁজে থাকে গোলাপের পাপড়ি,কখনো কখনো কলেজের বাগান থেকে আধ ফোটা একটি গোলাপ কলি অথবা কাগজে হয়তো একটুও সুগন্ধীও মেখে দেয়া হয়। এরপর শুধুই অপেক্ষা। পরবর্তী চিঠি না আসার। এর অনেক দিন পর হয়তো একটা চিঠি আসে। কোন এক বিষণ্ণ বিকেলে প্রিয় মানুষটিকে কাছে না পাওয়ার শুণ্যতায় ভোগা মন খারাপের মেয়েটির মনের কথাই হয়তো চিঠি হয়ে যায়। হয় চিঠির ভাষা। সে চিঠিতে হয়তো অজস্র বানান ভুল থাকে,হয়তো কাব্যিক উপমা প্রয়োগে বাক্য তার যোগ্যতাও হারায়,সে চিঠিতে হয়তো ভালো ভাষা থাকে না। ভালোবাসা থাকে। রাতের ক্লাসে যাওয়ার ঠিক একটু আগে ছেলেটি হয়তো সে চিঠি পায়। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলে বানান ভুলের সে চিঠি। বেসামরিক প্রেমিকা লিখেছে,

প্রথমেই বলে নিচ্ছি কাঁদবে না। হাতের লেখা যেন সুন্দর হয় এ জন্য কাগজে দাগ টেনে টেনে জেল পেন দিয়ে লিখেছি। তোমার চোখের পানিতে যেন মুছে না যায়। তাহলে ছোট এ পৃথিবীর বুকে বাঁচার যে শেষ ইচ্ছেটুকু আছে তাও বিলীন হয়ে যাবে জানো,এই বৈশাখে আমরা বান্ধবীরা শাড়ি পরেছিলাম। জীবনের প্রথম শাড়ি পরা। কত ইচ্ছে ছিল তোমাকে দেখানো। জিনাত সারাদিন ওর তৌফিকের সাথে ঘুরলো। ওদের প্রেমটাও জমে উঠেছে। তুমি তো ছুটিই পেলে না। মন খারাপ করো না লক্ষী সোনা,আর তো মাত্র কয়েক টা দিন। এবার তুমি ছুটি তে এলে আমরা সারাদিন ঘুরবো। কলেজের নিয়ম মেনে চলো কিন্তু. .

কখনো কখনো এই নিরবচ্ছিন্ন প্রেমের মাঝেও বিচ্ছিন্নতা আসে। কেউ কেউ হয়তো মুঠোফোন নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে ধরা খায়। হয়তো জরিমানা হয়। তবুও সবকিছুকে ছাপিয়ে এগিয়ে যায় আধাসামরিক সেই প্রেমের কাহিনী। এভাবে সেনাবাহিনীর সমস্ত নিয়ম কানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এগিয়ে যায় আধাসামরিক ছেলের সাথে বেসামরিক মেয়ের প্রেমের গল্প। সে গল্প হয়তো ইতিহাস হয়না। সে গল্পের নায়িকারা সময়ের সাথে হয়তো হারিয়েও যায়। তবুও ক্যাডেট কলেজ নামক অদ্ভুত বৈচিত্রে ভরপুর সেই আধাসামরিক পরিবেশের প্রকৃতি,জোছনা,বৃষ্টি,পিচ
ঢালা পথ,লকার,খাটের নিচ,সেই এংলেট,বডি স্প্রে এর কাটা কৌটা, ইলেক্টট্রিক তাঁর,বাল্ব সকেট, চার্জার,ডায়রির পাতা,আর সেই নোকিয়া এগারোশো মডেলের সেই ভাঙা সেটটি সাক্ষী হয়ে থাকে সেই
ভালোবাসার। বছরের পর বছরের এভাবেই চলতে থাকে। গল্পের কাহিনী একই থেকে যায় শুধু বদলায় অভিনয় শিল্পীরা।

উত্‍সর্গ: সেইসব বেসামরিক মেয়েদের। যাঁদের অজস্র ভালোবাসায় উচ্ছৃঙ্গল আধাসামরিক ক্যাডেটরা সিক্ত হয়েছিল,হয়েছিল যোগ্য প্রেমিক। এবং সেইসব প্রেমিকদের,যাঁরা এত প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে প্রেম করার দুসাঃহস দেখিয়েছিল।

৫,১০০ বার দেখা হয়েছে

৩২ টি মন্তব্য : “আধাসামরিক প্রেমের গল্প”

  1. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    লাইনের মধ্যে কয়েক জায়গায় অনাকাংক্ষিত গ্যাপ আছে...
    এডিট করলে দেখতে সুন্দর লাগবে, পড়তেও আরাম লাগবে...


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)
    আর্মি হেড কোয়ার্টারের স্বেচ্ছাচারিতায় মুঠোফোনের বেতার তরঙ্গ তখনো জায়গা করে নিতে পারেনি ক্যাডেট কলেজের সেই চৌহদ্দিতে।

    তবে কি ক্যাডেট কলেজে মোবাইল ফোন লিগাল করে দেয়া উচিত???

    যাঁদের অজস্র ভালোবাসায় উচ্ছৃঙ্গল আধাসামরিক ক্যাডেটরা সিক্ত হয়েছিল,হয়েছিল যোগ্য প্রেমিক।

    খেলো লাগলো।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  3. খুব সুন্দর অভিজ্ঞতা। দুঃসহ যন্ত্রণা কিন্তু মধুর... আপনার এই অভিজ্ঞতাটাকে যদ্দূর সম্ভব ধৈর্য্য ধরে বিস্তারিত করুন। আপনি বিস্তারিত তুলে ধরলে আমি এটাকে মনতাজের অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে আনতে পারবো।

    আম জনতা ক্যাডেট জীবনের একটা ব্যাপক ফিল্মি অভিজ্ঞতা পাবে... আশা রাখছি।

    জবাব দিন
  4. ‍লেখাটি প‍ড়ে যখন মন্তব্য করব ‍‍‍ভাবছি তখন, অাবেগহীন মানুষগুলোকে অাবেগময় মানু‍ষরা ভালোবাসে মন্তব্যটা অামাকে ‍কেমন ‍ঘোরে ‍ফেলে দিল! বুকজুরে জায়গা করে নিচ্ছে গাঢ় দীঘর্শ্বাস! স্তব্ধ অামার চারাপাশ ! অামি ‍প্রেম করিনি, ‍ অামার তৃতীয় উপন্যাস লিখছি কিন্তু ‍সেটা ‍রোমান্টিক। ভালোই লিখেছেন ভাইয়া।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।