হোওয়াইট চ্যাপেল এবং ব্রীক লেন আরেক বাংলাদেশ

[৭৫,জেটল্যান্ড স্ট্রীট]

[সেন্ট পিটারস কলেজ,লন্ডন]

এই পর্বে আমাদের বাঙ্গালীদের নিয়ে কিছু কথা বলবো,

আমার জানামতে TIER-4(ইউ কের ইমিগ্রেশন এর নতুন নিয়ম) এ ৭০০০০ হাজার বাঙ্গালী ছাত্র আসে। শুধু বাংলাদেশ থেকেই নয়, দক্ষিণ এশিয়া, চীন, আফ্রীকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের অনেক স্টুডেন্ট এখানে আসে। এত লোক কিন্তু জব এর অর্ধেক ও নাই। বলতে খারাপ শোনায়, কিন্তু এটা সত্য যারা প্ল্যান করেছিল লেবার ভিসা নিয়ে মধ্য প্রদেশে যাবে তারাও স্টুডেন্ট ভিসায় ইউ কে চলে আসে। কিন্তু এখানে আসার পর তাদের মাথায় আসে, তারা এমন একটা দেশে চলে আসছে যেখানে ভাষা ইংরেজি। এখানে কোনো দোকানের ক্লিনার হতে হলেও ইংরেজিতে ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি পেতে হয়।
তারা আশ্রয় নেয় বাঙ্গালী জব সেন্টার গুলোতে।
কিন্তু খুবই লজ্জার ব্যাপার আমাদের ভাইরা তাদের নিয়ে নতুন ব্যাবসা চালু করে।
একটা উদাহরণ দেইঃ
মনে করা যেতে পারে, আমার একটা রেস্ট্রুরেন্ট আছে। এবং আমার বন্ধু কিংবা আমার কোন পরিচিত লোকের জব সেন্টার আছে। আমি আমার পরিচিত ভাইকে বললাম,
“ভাই আমার হোটেলে তো লোক লাগবে, কিন্তু এমন একটা সিস্টেম করেন যাতে বেতন দিতে না হয়”
জব সেন্টার এর ভাই বললো,
“যে কাজ করবে তাকে না হয় না দিলেন আমারেও কি কিছু দিবেন না??”
“আপনাকে আমি খুশি করে দিব”
তো জব সেন্টার এর ভাই আমাদের এক স্টুডেন্ট ভাইকে ফোন দিবেঃ
“শোনো এখানে একটা হোটেলে জব আসে করবা??”
সে ছুটে যায় জব করার জন্য, এক সপ্তাহ পরে তাকে বলা হয় তোমার কাজ ভালো না রাখা যাবেনা।
যেখানে সপ্তাহে (১০০-১৫০ পাউন্ড+থাকা খাওয়া) এর উপরে আগে দেয়া হতো, সেখানে সেই ছাত্র তাকে অনুরোধ করতো আমাকে কোনো বেতন দেয়ার দরকার নাই খালি থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থা করেন। কেউ কেউ রেখে দেয় কেউ রাখেনা সে অন্য জনকে আরো এক সপ্তাহের জন্য আনে।
এখানে আমাদের দেশের এক অঞ্চলের প্রচুর মানুষ থাকে আমি নাম বললাম না কারণ আমরা সবাই জানি,
তারা সত্য কথা বলতে বাঙ্গালীদের কাছে একরকম ভীতির ব্যাপার। তারা এই দেশে অনেক বছর ধরে আছে। তাদের প্রাপ্তি, ২টা হোটেল বা ১ টা চিকেন চিপস এর দোকান।
যেখানে শোনা যায় ইন্ডিয়ার একজন মাষ্টার কার্ডের সি ই ও সেখানে আমরা শুনি হোয়াইট চ্যাপেল এ নতুন চিকেন চিপস এর দোকান খুলেছে। যেটার লিফলেট ১০০০ বাসায় দেয়ার জন্য কেউ ২০ পাউন্ড পাচ্ছে, যা কিনা কোনো দোকান বা মার্কেটের কোনো সাধারণ কর্মচারির ৩ ঘন্টার বেতন।
কিন্তু এদের কাছে আমরা অনেক কৃতজ্ঞ, আমাদের এই বাঙ্গালি কমিউনিটির কারণে আমরা লন্ডনে বসে বাংলাদেশের এমন কোনো খাবার নাই যা পাইনা। তাদের কারণেই কাউন্সিল থেকে আমাদের কোনো চিঠি আসলে ইংলিশের সাথে বাংলায় অনুবাদ করা থাকে।
লাইব্রেরীতে থাকে বাংলা বই। দেশে থাকতেও আমি কোনো ফ্রী লাইব্রেরীর সুবিধা পাইনাই যা কিনা এখানে আসার পর আমি পেলাম।
বিশাল বিশাল লাইব্রেরীতে ঢুকে যখন আমি দেখি নতুন বাংলা বই এর বিজ্ঞাপণ(বই কিন্তু ফ্রী লাইব্রেরীর মেম্বারশীপ সহ) আসলেই তখন ভালো লাগে।
এখানে আসার পর যত বড় ইলিশ মাছ আমি এখানকার দোকানে দেখেছি নিউমার্কেট কেন অন্য কোথাও আমি দেখিনাই। বুঝলাম দেশের বড় মাছ কই যায় ??

এবার একটু হালাল হারাম খাবারের দিকে যাইঃ
ইসলামিক কারণে হোক কিংবা ব্যাবসায়িক কারণে হোক, এখানে হারাম হালাল এখন অনেক বড় ব্যাপার হয়ে গেছে।
এমনকি এখন ম্যাকডোনাল্ডস/কে এফ সি এমনকি নান্দুস ও বাইরে হালাল খাবারের সার্টিফিকেট লাগিয়ে রাখে।
হালাল কে এফ সি
হালাল মাংস
হালাল কে এফ সি
কিছুদিন আগে আমাদের কলেজের ভাইয়ারা এবং কিছু ক্যাডেট ভাইয়ারা একটা হোটেলে খেতে ঢুকলাম। অবশ্যই হালাল, কারণ ব্রীক লেন এ এর অবস্থান।
সব কিছু ঠিক আছে, কিন্তু সেই হালাল হোটেলে মদ এবং বিয়ার ও বিক্রী হচ্ছে। ওগুলোর গ্লাস তো আলাদা সেগুলোতে তো আমরা পানি খাচ্ছিনা, কিন্তু যখন কোক দিয়ে গেল সেটা কিন্তু বিয়ার এর হাফ পাইন্ট গ্লাস। আমার কথা হলো যে হালাল খাবারের দোকান দিল ইসলামিক নিয়ম মেনে, সে মদ বিক্রী করতেসে কিসের কারণে।
একটা কাহিনী শুনলাম সেটা শেয়ার করি,
ইহুদীরাও কিন্তু হালাল মাংস খায়। সেই কারণে রোমফোর্ড এর একটা ইহুদি দোকান খুব বিখ্যাত মাংসের জন্য।
তো এক বাঙ্গালী ভদ্রলোক ও মাংসের দোকান দিলেন অন্য এলাকায়, তার এখনো হালাল ব্যাবসায়ী হিসেবে সুনাম হয়নাই। তো সে রোমফোর্ড এর সেই ইহুদি দোকানের সাথে চুক্তি করলো, প্রত্যেকদিন সকালে কিছু টাকার বিনিময়ে তারা(রোমফোর্ড হালাল মাংস) তাদের গাড়ি নতুন দোকানটির সামনে রেখে যাবে। কিন্তু কোনো মাংস তারা নিবেনা। কারণ,
আমরা যারা হালাল মাংস খাই তারা তো বিশ্বাস করবো এরা হালাল মাংস বিক্রী করে, ওইযে ওদের প্রত্যেকদিন রোমফোর্ড হালাল মাংস থেকে হালাল মাংস সাপ্লাই দিয়ে যায়।
তো এই হলো অবস্থা।
এবার বাংলা ভাষা নিয়ে আরো কিছু কথা বলি,
আমাদের এখানে শহীদ মিনার আছে আলতাব আলী পার্কে,
আলতাব আলী পার্ক
যদিও সেখানে বসে মদ খাওয়া হয়। শহীদ মিনার দিয়ে আমাদের ভাষার অবস্থান বোঝানোর জন্যই বোধহয় বানানো হয়েছে।
কিন্তু আমরা তার মর্যাদা একটুও করিনা, কিভাবে করিনা তা একটু বলি,
আমাদের এখানে প্রচুর ইন্ডিয়ান এবং পাকিস্তানী আছে।
আমি খেয়াল করে দেখলাম ৮০% এর উপর মানুষ এদের সাথে হিন্দী কিংবা উর্দুতে দারুণ আড্ডা দিচ্ছে।
আমি কাজে ঢোকার পর প্রথমে বুঝতে পারতাম না এই লোকটা কি বাঙ্গালী নাকি ইন্ডিয়ান নাকি পাকিস্তানী??
কারণ বাংলায় তাদের কথা বলতে খুব কম দেখা যায়। আমাদের সাথে তারা ইংরেজিতে কথা বলে আর তার প্রতিবেশি দেশের লোকের সাথে তাদের ভাষায় কথা বলে।
এই কারণে, আমাদের কলেজের ভাইরা যারা এখানে আছেন তারা আমাকে বলেছিল কাজ যেন কোনো ইন্ডিয়ান দোকান বা পাকিস্তানিদের মালিকানাধীন কোথাও কাজ না করি।
কারণ তারা ধরেই রাখে বাংলাদেশের ২য় ভাষা হিন্দী অথবা আরবী। এমনকি অনেকে জানেওনা আমাদের আলাদা ভাষা আছে(বিশ্বাস করার মত কথা না)। আমি যখন কাজ করি তখন কোনো ইন্ডিয়ান কাষ্টমার আশেপাশের লোকজনকে দেখে যখন বুঝবে আমি এশিয়ান, সে আমার কাছেই কিছু জানতে চাবে, এবং অবাক করা ব্যাপার আমি হিন্দী বুঝি কি বুঝিনা সেটা না জেনেই সে আমার সাথে হিন্দীতে কথা বলা শুরু করে দিবে। আমাদের ভাইয়াদের(ক্যাডেট) দেখলাম তারা এ ব্যাপারে খুব সচেতন তারা সরাসরি বলে দিবে আমি আপনার ভাষা বুঝতেসিনা। আমিও সেই কাজ করি, এমন ভান করি এটা কোন দেশি ভাষা আমি জানি না।
এই হলো বাংলাদেশের মানুষ এর অবস্থা(যদিও প্রচুর ব্যাতিক্রম আছে)।
পরের পর্বে ক্যাডেট এর প্রবাস জীবন নিয়ে লিখবো…
চলবে…।।

৪,৩০৪ বার দেখা হয়েছে

৪৫ টি মন্তব্য : “হোওয়াইট চ্যাপেল এবং ব্রীক লেন আরেক বাংলাদেশ”

  1. মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)
    যখন বুঝবে আমি এশিয়ান, সে আমার কাছেই কিছু জানতে চাবে, এবং অবাক করা ব্যাপার আমি হিন্দী বুঝি কি বুঝিনা সেটা না জেনেই সে আমার সাথে হিন্দীতে কথা বলা শুরু করে দিবে। আমাদের ভাইয়াদের(ক্যাডেট) দেখলাম তারা এ ব্যাপারে খুব সচেতন তারা সরাসরি বলে দিবে আমি আপনার ভাষা বুঝতেসিনা। আমিও সেই কাজ করি, এমন ভান করি এটা কোন দেশি ভাষা আমি জানি না।

    দুবাইতে গিয়ে গোটা দুই সপ্তাহ অফিসের বাইরে যতক্ষন ছিলাম আমাকে এই কাজ করা লাগসে। সবাই হিন্দিতে কথা বলতে চায়।

    জবাব দিন
  2. মশিউর (২০০২-২০০৮)

    ব্রিক লেন নামে একটা বই পড়া শুরু করছিলাম কলেজে । কিন্তু লেখিকার পন্ডিতগিরির কারণে অল্প কিছু পড়ার পড়ে হাল ছেড়ে দিসিলাম । (শাফি মনে হয় পুরাটা পড়ছে ।) এখন তোর লেখা থেকে ব্রিটেনে বাঙ্গালীদের কাহিনী জানা যাবে মনে হয় । সাবাস । অতি সুখাদ্য লেখা । এটাকে একটু ভাব নিয়া লেখ । তাহলে সুন্দর একটা কিছু দাঁড়িয়ে যাবে ।

    জবাব দিন
  3. সাব্বির (৯৫-০১)
    অবাক করা ব্যাপার আমি হিন্দী বুঝি কি বুঝিনা সেটা না জেনেই সে আমার সাথে হিন্দীতে কথা বলা শুরু করে দিবে

    তবুও ভাল ইন্ডিয়ার স্ট্যন্ডার্ড ভাষায় জিগেস করে,
    এদের কমনসেন্স এতই কম আমার এখানে আমাদের দেখলে পাঞ্জাবী, গুজরাটি, এমন কি তামিল ভাষাতেও কথা বলা শুরু করে দেয়।
    মন ডায় কয় থাব্রা দেই x-( x-(

    জবাব দিন
  4. মান্নান (১৯৯৩-১৯৯৯)
    কিন্তু এটা সত্য যারা প্ল্যান করেছিল লেবার ভিসা নিয়ে মধ্য প্রদেশে যাবে তারাও স্টুডেন্ট ভিসায় ইউ কে চলে আসে।

    "মধ্য প্রদেশ" মনে হয় "মধ্য প্রাচ্য" হবে। মধ্য প্রদেশ ইন্ডিয়ার একটা প্রদেশ ।

    জবাব দিন
  5. রাশেদ (৯৯-০৫)

    তোমার সিরিজটা দারুণ হচ্ছে নাজমুল, চালায়ে যাও। আর প্রবাসী অনেকের কাছেই আমাদের জাত ভাইদের এই উর্দু হিন্দীর কুকীর্তির কথা শুনি। প্রতিবার শুনি আর মেজাজটা খারাপ হয়, আর ভাবি- এই ব্যাটাদের সমস্যা কই?


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
  6. মামুন (২০০২-২০০৮)

    আমার এইখানেও কয়েকটা পাকিস্তানী আছে, দেখা হইলেই বইলা উঠে, 'ক্যায়সা হ্যায়?' মেজাজটা এতো খারাপ হয়। ১৯৫২ সালের শিক্ষাটা ওদের পুরোপুরি মানুষ করতে পারে নাই। অবশ্য বাঙালিদের ও দোষ আছে। কয়েকজনকে দেখি, ঊদু কিংবা হিন্দিতে কথা বলা কে ক্রেডিট মনে করে।
    যাই হোক লেখাটা সত্যি চমতকার হচ্ছে....আমার মনের অনেক কথা লিখে ফেলছিস।

    জবাব দিন
  7. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    নাজমুল : তোমার পুরো ধারাবাহিকটা পড়লাম। মনে পড়লো, লন্ডন যাওয়ার আগে দেখা করতে এসেছিলে। কিন্তু তুমি যে এতোটা কষ্ট করে ওখানে গেলে সেটাতো জানতাম না। ভালো লাগলো তোমার সত্যভাষণ। আশা করি তোমার পরের সবাই এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেবে। তোমাকে যে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তা যেন আর কারো না হয়।

    তবে তোমার লড়াই করার সাহসের প্রশংসা করি। হাল ছোড়ো না, কষ্ট হলেও লেগে থেকো। যে সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছো, তুমি নিশ্চয়ই নিজের ভালোটা বুঝবে। নিজেকে যোগ্য করে তোলো। নিশ্চয়ই একদিন সুন্দর ভোর আসবে। ভালো থেকো।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  8. আহমদ (৮৮-৯৪)

    ক্যাডেট কলেজে ক্লাশ সেভেনের লাইফটা এর চেয়ে হাজারগুন ভাল ছিল বলেই মনে হচ্ছে। 'ভিন্ন জানালা দিয়ে দেখা'-এর পরে এই সিরিজটাই সিসিবিতে আমাকে সবচেয়ে টানছে। অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকি পরের পর্বটার জন্য। নিয়মিত লিখে যাও। তোমার জন্য শুভকামনা সবসময়।


    চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

    জবাব দিন
  9. ৫ তারা না দাগায় উপায় নাই।হিন্দি বা উর্দু ভাষায় কথা বলাকে ক্রেডিট মনে করা ভাইজানদের নিয়া কই যাই??দোষ আসলে আমাগো কিছু বাঙ্গালীদেরই রে।বৈদেশীদেরকে দোষ দিয়া কি লাভ ?? 🙁

    জবাব দিন
  10. আব্দুল্লাহ্‌ আল ইমরান (৯৩-৯৯)
    হিন্দি বা উর্দু ভাষায় কথা বলাকে ক্রেডিট মনে করা ভাইজানদের নিয়া কই যাই??দোষ আসলে আমাগো কিছু বাঙ্গালীদেরই রে।বৈদেশীদেরকে দোষ দিয়া কি লাভ ?

    আর উর্দু হিন্দি ওয়ালারা মনে করে সারা বিশ্ব তাদের বাপের তাল্লুক।সবাই তাদের মত কথা বলবে। :chup: :duel:

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।