গোধূলি কথন -১

ভার্সিটি থেকে ফিরছি, বেশ ফুরফুরে মেজাজে। যাক আজকের পরীক্ষাটাও ভালো ভাবেই শেষ হয়েছে, এবার কয়েকদিনের জন্য ঘুম আর বাউন্ডুলেপনা। তওসিফ বলছিল জাফলং যাবার কথা, মন্দ হয় না। তিথিটা গেলে বোধহয় খুব জমতো, তবে মনে হয় না বাসা থেকে পারমিশন পাবে। এসব অগোছালো কথাবার্তা ভাবতে ভাবতেই বাসার গেটের সামনে কেবলি পৌঁছেছি, আরেব্বাপ এই ভেজাল আবার শুরু করলো কে !!! ছোট ভাইটা খুশি মনে পুরনো কাগজ, সংবাদপত্র, আর কি সব যেন জড় করছে। গেটের বাইরেই মাঝারি আকারের একটা ঝাঁকা নিয়ে বসে আছে এক মাঝবয়সী লোক। পান খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে অর্কিডের টবটার পাশে পিচিক করে পিক ফেলছে আর হাতে ধরে থাকা রংচটা গামছাটায় মুখ মুছেই চলেছে, এ ব্যাটার কি আনলিমিটেড ঘাম নাকি, কে জানে বাপু !!!! পুরনো কাগজপত্রের এক পাশ দিয়ে কোন রকমে ঢুকতে গিয়েই চোখ আটকে গেল ঝাকার এক কোনায়। বাদামী মলাটের একটা মলিন খাতা অনাদৃতের মতো পড়ে আছে। একটু ভালো করে তাকালাম, দু’পাশে সোনালী কারুকাজ, মনে হচ্ছে ডাইরী।

-“চাচা মিয়া, খাতাটা একটু দ্যান দেখি, কি জিনিস ঐটা?”

-“দেখেন, অসুবিধা নাই, কাইলকের মালগুলান সরানোর সময় মুনে হয় রয়া গেছিল”, এক গাল হাসি দিয়ে লোকটা সায় দিল।

হাতে তুলে নিয়ে কাভারের উপরের ধুলো ঝাঁড়লাম। প্রথম পাতা খুলতেই বেশ চমৎকার হাতের লেখা নজরে এলো। বেশ পরিচ্ছন্ন, কাল বলপয়েন্ট কলম দিয়ে কেমন পেঁচিয়ে লেখা। মাত্র দুটো লাইন, “ In the end, it’s not going to matter how many breaths you took, but how many moments took your breath away.”

নিচে বোধহয় ওটা নাম লিখে রেখেছে, কথন; নামটা ভালোই, কাব্যিক গন্ধ আছে।
কয়েকটা খালি পাতা উল্টাতেই সহসা লেখা চোখে পড়লো।

১২/৩/২০০৪,
বিকেলবেলাটা আমার সবসময়ই প্রিয়। জানালার ফাক দিয়ে যখন সূর্যের শেষ সম্ভাষণটুকু আমার হাতের উপরে পড়ে, খুব ভালো লাগা একটা অনুভূতি হয় তখন। একটা অজানা মিষ্টি আবেশে ছেয়ে যায় চারপাশে। অবশ্য আজকাল জানালার পাশে বসা হয়ে উঠেনা। ব্যস্ততা নয়, কায়িক অবসাদ আজকাল সে সু্যোগ দেয় না। বিছানা থেকে একা একা বেশ কষ্ট হয়। তাই বিকেলটা এখন বালিশে মাথা ঠেকিয়েই কাটে।

এবার বোঝা যাচ্ছে, এটা কারো, সম্ভবত কথনের দিনলিপি ছিল। পড়তে খুব ইচ্ছে করছে। চাচা মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম, “এই খাতাটা আমি রেখে দিচ্ছি, কত দিতে হবে?”
পিচিক করে পানের পিক ফেলে হেসে বললেন, “আপনি ঐটা রাইখা দ্যান, কিছুই দেয়া লাগবো না, এমনেই রাইখা দেন।”
ধন্যবাদ দিয়ে রুমের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। যেই না দরজা ঠেলে ঢুকছি, ওমনি পেছন থেকে মায়ের গলা ভেসে এলো, “কীরে, পরীক্ষা কেমন হলো?”
-“হয়েছে মোটামুটি, ভালোও না, খারাপও না।”
-“আচ্ছা যা, তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে নে।”

তাড়াহুড়া করে হাতে-মুখে পানির ঝাপটা দিয়েই খেতে বসলাম। মাথার মধ্যে ডাইরীর পোকাটা খুব বেশি ঝামেলা শুরু করেছে। কোন রকমে নাকমুখে ভাত ঠেলে রুমে ফিরে এলাম। লক্কর ঝক্কর মার্কা মান্ধাতার আমলের পিসিটা আজকাল আমার সাথে বড় রকমের প্রতারণা শুরু করেছে, কোন কথাবার্তা ছাড়াই ফট করে রিষ্টার্ট হয়ে যায়। কালে কালে এর বয়স তো আর কম হয়নি। খুব মৃদু ভলিউমে শ্রীকান্তের প্লে-লিষ্টটা ছেড়ে দিয়ে ডাইরীটা নিয়ে বসলাম। সময়টা ভালোই কাটবে মনে হচ্ছে।
পাতা উল্টে সেই পুরানো লেখাগুলোয় ফিরে গেলাম।

১২/৩/২০০৪,
বিকেলবেলাটা আমার ………

(ডিস্ক্লেইমারঃ এটা ছিল ভূমিকা। গল্পটা মূলতঃ ডাইরীর লেখাগুলোকে ঘিরেই আবর্তিত হবে। তবে বুঝতে পারছি না লেখাটা আগাবে কি না 🙁 )

গোধূলি কথন- ২

২,৩১৮ বার দেখা হয়েছে

৪০ টি মন্তব্য : “গোধূলি কথন -১”

  1. তানভীর (৯৪-০০)

    রকিব, চমৎকার লিখছ। :thumbup: :thumbup: তোমার লেখার ভক্ত হয়ে যাচ্ছি দিনে দিনে।
    পর্বগুলো অল্প সময়ের বিরতিতে দেয়ার চেষ্টা কইর, জানি লিখাটা খুব কষ্টকর।
    পরের পর্বের জন্য এক কঠিন অপেক্ষায় ফেলে দিলা রে ভাই। :dreamy:

    জবাব দিন
    • রকিব (০১-০৭)

      😀 😀 😀 :hatsoff: :hatsoff:
      ক্রিকেট ব্যাট দিয়া যেই সিক্সার মেরে শুরু করছিলা, এক ঠেলায় ভক্ত হয়ে গেছিলাম, এরপর তো বহুদিন লেখা দেও নাই 😡 😡
      তাড়াতাড়ি লেখা ফেলাও একখান


      আমি তবু বলি:
      এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

      জবাব দিন
  2. রেজওয়ান (৯৯-০৫)
    In the end, it’s not going to matter how many breaths you took, but how many moments took your breath away.

    সেদিন হিচ দেইখা আমি এই ডায়লগ টার বিশাল ভক্ত হইয়া গেছি :boss:
    ঐ দেরি করিস না, আমি না হয় সময় পাই না O:-)
    তুই তো এখন ফ্রি :grr:

    জবাব দিন
  3. কামরুলতপু (৯৬-০২)

    রকিব আইডিয়া খুবই পছন্দ হইছে। কেমন যেন মনে হচ্ছে লেখাটা বিষাদময় হবে। না হোক এই আশায় রইলাম। তাড়াতাড়ি লেইখো। ফ্রি যখন হইছ তাইলে তো কথাই নাই।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।