বাংলা খাবার লন্ডনে

লন্ডনে প্রায় সাড়ে চার বছর এর উপর হয়ে গেল, সেই প্রথম বছরের পর থেকেই কেন যেন দেশে ফেরার চিন্তা শুরু করেছিলাম, কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে সেই সুযোগ এনে দেয়নাই। যাই হোক, লন্ডনে আমি যেখানেই যাই আজীবন শুধু অভিযোগ করে গিয়েছি। এর কারণ কি আমি, নাকি যা নিয়ে অভিযোগ করছি তা।

আজকে প্রথমেই খাবারের কথা বলবো, লন্ডনে বাংলাদেশের সব কিছু পাওয়া যায় বলে একটা সুনাম আছে। এবং কথা সত্য। গরুর বট, শুটকি মাছ/ভর্তা, কচুর মুখি, বম্বে মরিচ, পান, সুপারি, বাংলাদেশি বেনসন, গোল্ডলীফ, প্রাণের চানাচুর, বম্বে চানাচুর সবই পাওয়া যায় এবং বেশ সহজলভ্য। দাম কিছু ক্ষেত্রে ঢাকার থেকে কম, বিশেষ করে ইলিশ মাছ আর গরু-ছাগলের কলিজা।

ইবকো এবং আরও কিছু কোম্পানির কারণেই আজ আমরা বিলেতে থেকেও বাংলাদেশের মজা নিচ্ছি, আমেরিকা কিংবা অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত বাংলাদেশি প্রবাসিরাতো এখানে এসে বাংলা লেখা দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে যায়। কিন্তু, ”পার্কিং নিষেধ” কিংবা ”এখানে বল খেলা নিষেধ” এমনকি ” এখানে পানের পিক ফেলবেননা” এসব লেখা দেখে আমরা বেশ অভ্যস্ত।

এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে আমি লন্ডনের এসব ব্যাপারে খুব খুশি, কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। যেহেতু আমি রান্না করতে পারিনা কিংবা রান্নার প্রতি আগ্রহ কম, সুতরাং কাচা খাবারের প্রতি আমার আগ্রহ খুব কম। আমি ‘ভোজন রসিক’ না হলেও খেতে খুব পছন্দ করি। বিশেষ করে বাসার বাইরে। সব ধরণের খাবার আমার পছন্দ, হোক সেটা চাইনিজ কিংবা ইতালিয়ান। কিন্তু সবচেয়ে প্রিয় বাংলা খাবার, এবং একমাত্র এইখানেই আমার যতসব অভিযোগ।
আমি এখানে কোনও রেস্টুরেন্ট এর নাম উল্লেখ করবোনা, এধরণের সস্তা ব্যাপারে যাবনা। শুধু খাবার দোকানের নাম না, মালিকের নাম জানলে তার নাম ও এখানে উল্লেখ করতাম।
ব্রিক লেনকে বলা হয় ”কারি সিটি” এর কারণ এখানে প্রচুর ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট। এবং শুনলে খুশি হবেন যে এর ৯৯% বাংলাদেশি মালিকের এবং ৯৯% স্টাফও বাংলাদেশি। তবে এখানে খেতে গেলে আপনি আসলে বাংলা খাবারের স্বাদ পাবেননা, যেমনটা আমি মনে করি, চাইনিজরা আমাদের দেশের চাইনিজ রেস্টুরেন্ট এ গেলে তেমন একটা মজা পাবেনা। কারণ, ওই চাইনিজ খাবার গুলো কিন্তু আমাদের স্বাদে বানানো। তাই চায়নায় গিয়ে মোটামুটি সমস্যায় পড়তে হয় আমাদের মত মানুষের।

সোনারগাঁও রেস্টুরেন্ট বাংলাদেশি বাফে করে মাত্র ৬,৯৫ পাউন্ডে। যে এখানে খেতে আসে সেই অভিযোগ করে তাদের খাবারের মান নিয়ে। কিন্তু আমি মনে করি ৬,৯৫ পাউন্ড এ এর থেকে বেশি আশা করা উচিৎ নয়।

এরপর আমরা যেতে পারি গ্রাম বাংলায়, এখানকার খাবারের মান অনেকটা ফেরী কিংবা লঞ্চের মত। অবশ্যই স্বাদ ওইরকম না তবে খারাপ বলা যাবেনা। কোয়েল পাখি পাবেন, পাবেন ইলিশ মাছের ডিম শিমের বিচি দিয়ে, সাথে আছে মগজ ভুনা এবং দেশি ভাবে রান্না করা গরুর গোস্ত। ঝাল, তেল এবং মশলা পরিমাণের চাইতে অনেক বেশি হইলেও অত খারাপ বলবোনা।

তারপর আসি ঢাকা বিরিয়ানিতে, ওখানকার মালিক কিংবা ম্যানেজার একজন দুষ্ট জারজ সন্তান(মানে জামাত)। যেটা আগে জানতাম না, গিয়ে অর্ডার দিলাম কাচ্চি বিরিয়ানি। অনেকগুলো গরুর টুকরো সহ প্লেটে কাচ্চি বিরিয়ানি দিয়ে গেল। সার্ভিস যত খারাপ, খাবারের মান তার চাইতেও অনেক খারাপ। জীবনে কাচ্চি বিরিয়ানি দেখেছে কিনা জানিনা।

কলাপাতা!!!!! আমার অন্যতম পছন্দের খাবারের দোকান। বাংলাদেশি খাবারের দোকান, অনেকেই বলেন কলাপাতার মান আগের মত নেই, তবে আমি বলবো, বাকি সবগুলার চাইতে অনেক অনেক ভাল। সবচাইতে ভালো জিনিস এখানে বাকি গুলার মত হিন্দি গান বাজায় না। সুন্দর সুন্দর বাংলা গান বাজায়। চটপটি, ফুচকা, হালিম, খিচুড়ি, গরুর বট এমনকি ইলিশ পোলাও পাওয়া যায়।
কাদের মোল্লার ফাঁসী হওয়ার পর ওখানে খেতে যাওয়ার পর আমাদের বিনামূল্যে একজন ওয়েটার ভাইয়া পায়েস খাইয়েছিলেন।
তবে ওখানে কিছু পরিচিত কাস্টমারদের আলাদা সার্ভিস দেয়া হয় যা বাকিদের চোখে লাগার মত। আমি মনে করি, কাস্টমার ধরে রাখতে চাইলে এই ব্যাপারে একটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন,

হাজী নান্না বিরিয়ানি, হাজী সাহেব যদি বেঁচে থাকতেন এবং লন্ডনে এসে এই রেস্টুরেন্ট এ খেতেন তাহলে পাশের আলতাব আলী পার্কে গলায় দড়ি দিতেন। তবে হ্যাঁ, তারা ঢাকা বিরিয়ানির মত গাধা না, তারা জানে কোনটা কোন বিরিয়ানি। আমরা ৫ জন ছিলাম, ফুচকা এবং মাছের কোপ্তা খাওয়ার পর ৫টা কাচ্চি বিরিয়ানি অর্ডার করেছিলাম। পুরো বিরিয়ানিটা ওভেনে গরম করা, এবং চালের থেকে বাজে গন্ধ, সেই সাথে প্রথম থেকেই মেজাজ বিগড়ে ছিল টিভিতে হিন্দি গান চলার কারণে। আমি এখনো বুঝিনা কেন কেন কেন!!! বাংলা সুন্দর গান কি নাই, নাকি জীবনে শুনেনাই ???? যাই হোক আমার আবার মুখ খারাপ, আমি বাজে কথা বলা শুরু করছিলাম। প্রধান কারণ হিন্দি গান আর তারপরে এই বাজে বস্তা পচা বিরিয়ানির জন্য। সবাইকে অনুরোধ করবো দয়া করে নান্নাতে গিয়ে টাকা এবং পেট সেই সাথে নিজে একটা ভালো মুডে থাকলে সেটা নষ্ট করবেননা।

ক্যাফে ইস্ট লন্ডন– খাবারের দাম শুনবেন?? মাত্র ৩,৫০ পাউন্ড এ আপনি পাচ্ছেন ডাল, ভাত, আলুর ভর্তা, সালাদ এবং পছন্দের তরকারি। গরু, মুরগী, তেলাপিয়া, রুই, বিভিন্ন ধরণের ভর্তা পাওয়া যায় খুব সুলভ মূল্যে। সার্ভিস এবং খাবারের মান আমার কাছে খুব ভালো মনে হয়েছে, এবং একেবারে দেশীয় খাবার, সেরকম রান্না এবং চা টাও অসাধারণ, সবচেয়ে বড় ব্যাপার হিন্দি গান চলেনা।
বাঙ্গালীর কানও নষ্ট হয়ে গেছে হিন্দি গানে, অধিকাংশ বাসাতেই দেখতে পাবেন হিন্দি গান বাজে। আর রেস্টুরেন্ট এতো অবধারিত।

সামনের পর্বে অন্য কোন গল্প নিয়ে, সেই সময় পর্যন্ত সাথেই থাকুন 😀

৮০৫ বার দেখা হয়েছে

১৩ টি মন্তব্য : “বাংলা খাবার লন্ডনে”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    ঐদিন আমি একটা দোকানের ছবি তুইলা আনছি।
    হারামীরা আমারে ওভেনে উইংস গরম কইরা দিছে।
    পঞ্চনামা মে বি।
    তবে অনেকদিন পর সোনারগাও এ দুইদিন খাইছিলাম, তার একদিন তোর সাথে।
    আমার কাছে ওদের উইংস আর ভেড়ার মাংশ বেশ ভালো লাগছে।
    গ্রাম বাংলায় একবার খাইছিলাম অনেক আগে, আর খাবার ইচ্ছা নাই।
    মসজিদের সাথে বারাকা ভালো।
    যাযা গ্রীল খারাপ না।

    কলাপাতা নিয়া আমার ২ টা খারাপ অভিজ্ঞতা।
    একবার তোদের সাথে ; ফ্রাইডে নাইটে গিয়া যদি মেনুর সব খাবার না পাস তবে কবে পাবি???
    আরেকবার তোর ভাবী হসপিটালে।
    খাবার নিছি কলাপাতা থেকে।
    হাসপাতাল তো সাথেই।
    গিয়া দেখি তেমন গরম না।
    যেইখানে সিলভার কন্টেইনারে ঘন্টার পর ঘন্টা আগুন গরম থাকে, সেখানে ১০-১৫ মিনিটে খাবার প্রায় ঠান্ডা।

    পরে একবার কইলাম ওগোরে।
    কয় কি, টেক এওয়ে খাবার ওতো গরম করে না ওরা।
    চিন্তা কর, কত্ত বড় হারামী।

    বাট ক্লিফটনের পর টাপাক গ্রীল না কি একটা বুফে করছে, ভালোই। ২ দিন খাইছি।
    রেড ড্রাগন হালাল চাইনিজ নিয়া পুলাপানের একটা উচ্ছাস ছিলো। কিন্তু আমার কাছে ইলফোর্ডের চাইনীজ বুফেই ভালো লাগতো।
    অনেকদিন যাওয়া হয় না।
    আর এইদিকে সাপ্পু ভাই যেইটায় খাওয়াইছিলো সেটার খাবার ভালো।
    এখন আবার হালাল করছে।
    আমি ঐটায় যাওয়া বন্ধ করছি, শালারা বান্দর কিসিমের।
    তখন শুয়োর ছিলো।
    এক ফ্যামিলি ফ্রেন্ডরে নিয়া গেছি তার ফ্যামিলি সহ। ব্যাঙ্ক হলিডে ছিলো, তাই এমনিতেই বেশি বিল।
    ঐ ফ্রেন্ডের পোলা আবার মহা বান্দর।
    সে লবণ ছিটাইতেছিলো টেবিলের উপর। হালকা বকা দেয়া হচ্ছিলো।
    ওয়েটার হারামী আইসা কয়, তোমরা খাবার নষ্ট করতেছো।
    চিন্তা কর ২-৩ পয়সার লবণ থাকে ঐ জারে।
    আর সেইটার কিছুটা মানে হার্ডলি ১ পয়সা। সেটা ফেলার জন্য বলে খাবার নষ্ট।
    পরে ভাবলাম ম্যানেজাররে বলি, এই বেকুবরে রাখছো ক্যান?
    সেই গাধায় বলে, লবণ ও তো খাবার।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    হোয়াইট চ্যাপেল থেকে কমার্শিয়াল রোডে যাবার যে গলি তাতে বেশ কিছু ভালো দোকান আছে।
    আমি নিজে স্টেপনি গ্রীনের দোকানগুলা প্রেফার করি।
    নট ঢাকা বিরিয়ানি।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  3. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    ব্রিক লেনে মধু বনের মালিকদের একটআ রেষ্টুরেন্ট আছে। নানান জাতের মাছ আছে, ভর্তা আছে।
    খারাপ না।

    তবে বাঙলা খাবার খাইতে হইলে আমি বাসাই প্রেফার করি।
    আর এজন্য নিজের বাসাই বেশি উত্তম।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
    • মোকাব্বির (৯৮-০৪)
      তবে বাঙলা খাবার খাইতে হইলে আমি বাসাই প্রেফার করি।
      আর এজন্য নিজের বাসাই বেশি উত্তম।

      তথাস্তু :thumbup: যদিও লন্ডন শহরটায় বাঙালীর আধিক্য তারপরেও বিদেশের মাটিতে নিজের দেশের খাবার খাইতে হইলে নিজে রান্ধো। না হয় আরেক দেশী লোকের বাসায় দাওয়াত খাইতে যাও। বিদেশের মাটিতে রেস্তোরায় খাইতে হইলে সেটা হবে বিদেশী খাবার।


      \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
      অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

      জবাব দিন
  4. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    ভাল লিখেছো নাজমুল। দেশে আসো, ঘরের রেস্টুরেন্টের দেশি খাবার খাওয়াবো।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  5. দিবস (২০০২-২০০৮)

    নাজমুল ভাল লিখেছ, পরের পর্বে পিচ্চির ইতিহাস( 😉 শোনার অপেক্ষায় রইলাম। তাড়াতাড়ি রগরগে করে লিখে ফেল। গুপ্ত (!) রেখে কি লাভ?


    হেরে যাব বলে তো স্বপ্ন দেখি নি

    জবাব দিন
    • মোকাব্বির (৯৮-০৪)

      অনেক ধরনের লেখাই দেয়া যায় কেউ চেষ্টা করে না। ফুড রিভিউ একটা চমৎকার টপিক হইতে পারে। বিশেষ কইরা দেশ থেকে কেউ যদি লেখে তাইলে আমার মত স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকারী যুবকের প্রেম করার জায়গা পাওয়া যায়। :shy:

      যদিও সেক্ষেত্রে ফুলার রোড আর কার্জনই ভালো লাগে বেশী! 😛


      \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
      অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

      জবাব দিন
      • আহসান আকাশ (৯৬-০২)

        ফুলার রোড আর কার্জনেই থাকোম মানিব্যাগের স্বাস্থ্যের জন্য ভাল, তবে ব্যাগের রঙ সবুজ হলে সমস্যা নাই 😛


        আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
        আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

        জবাব দিন
        • মোকাব্বির (৯৮-০৪)

          ব্যাগের রঙ সবুজ হইলে তো ভালই ছিল। :dreamy: :dreamy: কপালগুণে উনিও ফুলার রোডেই বসতে ভালবাসেন! সমস্যা করবে উনার সখী-সাথীরা! :bash:

          মানিব্যাগের কথা আসতে একটা জোক মনে পড়লো। ফুয়াদ ভাই (ফকক ৯৯) গতকালের স্ট্যাটাস ছিল।

          মানিব্যাগ হইলো পেঁয়াজের খোসার মত। খুললেই চোখে পানি আইসা পড়ে! :khekz: :khekz: :khekz: :khekz:


          \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
          অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

          জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।