ধূলোমাখা শহর, ধূলোমাখা স্মৃতি – ০৭

এবার লিখবো এক নীলনয়নাকে নিয়ে। নাম তার র‌্যাভিন, নীলনয়না র‌্যাভিন, উপরের ঠোঁটের বামপাশে একটা ছোট্ট তিল, আর তাই জায়গাটা একটু উঁচু, দেখে মনে হবেই হবে, আদর পাবার জন্যই ফুলে আছে সেটা।

সেবার ওয়েস্টার্ন তখন তুমুল জনপ্রিয়। গোগ্রাসে পড়ি, তবুও একটা অতৃপ্তি থাকে সেখানে, “সেইরকম” কোন কিছুর বর্ননা নেই-যে। আর আমাদের চাহিদা বুঝেই কিনা, সেবার মত করে আরও কিছু প্রকাশনী পেপারব্যাক বের করা শুরু করল অতঃপর, সেখানে ওয়েস্টার্নও আছে, সেইসাথে আছে “সেইরকম” কিছুর বর্ননা।

আমাদের কিশোর মন আকুপাকু করে কিছু একটার জন্য।

র‌্যাভিন ঋজু হয়ে বসে স্ট্যালিয়ন এর পিঠে, স্যাডেল ছাড়াই, মাথায় কাউবয় হ্যাট, পিছনে সোনালী চুল উড়ছে, উরুর উপরে আড়াআড়ি রাখা রাইফেল, হোলস্টার বাঁধা একটু নীচু করে, গ্যানম্যানরা যেভাবে পরে আরকি, শার্টের দুটো বোতাম খোলা, সেখানে গোলাপী রং এর ঢিবির আভাস পাওয়া যায়। র‌্যাভিন কাউকে পাত্তা দেয় না, কারন তাঁর কাউকে পাত্তা দেয়ার দরকার নেই, মানে ছিলনা আরকি, উপন্যাসের প্রথম বিশ পৃস্টা পর্যন্ত। এর পরেই তো আসল কাহিনীর শুরু।

আমাদের পুলিশ লাইন স্কুলের সামনেই গার্লস স্কুল, গার্লস স্কুলের সামনেই গোখরা সাপের খেলা দেখায় একজন, উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা আপুদের স্কুল, হলুদ রং এর বিল্ডিং, আপুদের ড্রেস সবুজ, সাদা ওড়না, চুলে দুটো করে বেনী।

পুরো প্রাইমারী কাটালাম মাথা নীচু করে, সাপের খেলা আমাকে টানে না, আপুদের দেখে আমি মাথা নীচু করে ফেলি লজ্জায়। মাঝে মাঝে টিনের গেট আর দারোয়ানকে ফাকি দিয়ে ভিতরে তাকাই, কি সুন্দর মাঠ, কি সুন্দর স্কুলের ভিতরে, কত সুন্দর গাছ। এক অজানা আকর্ষন।

নাইন-টেনের দিকে আমিও ঘোড়া নিয়ে বের হলাম, একটা পেল্লাই সাইজের র‌্যালে (!) সাইকেল। চক্কর মারা শুরু করলাম সমস্ত ছোট ছোট কাউ-টাউনে, নীলনয়না র‌্যাভিনের খোঁজে, যার ঠোটের উপরে ছোট্ট কালো তিল, তিলের জায়গাটা একটু উঁচূ, আদর পাবার জন্য।

কাউ-টাউন মানে আপুদের স্কুল আরকি, আপুদের ছোটমনিদের খোঁজে।

খোজাখুজি বৃথা যেতে পারতো, কিন্তু গেল না। একদিন পেয়ে গেলাম একজনকে, সব কিছুই ঠিক আছে, ঘোড়ার জায়গায় সে বসে আছে রিক্সায়, উরুর উপরে আড়াআড়ি হাত, রাইফেলের মত করে ধরে রেখেছে স্কুলের ব্যাগ, সবুজ ড্রেসের উপরে টাইট করে চাপানো সাদা ওড়না, ঠোটের উপরে ছোট্ট কালো তিল। একটু উচু জায়গাটা।

পার্থক্য বলতে শুধু চুলগুলো, কালো, চোখটাও। এটা এত বড় সমস্যা নয়। তিল তো আছে, বাকী কিছু সোনালী না নীল নাকি কালো, তাতে কিবা আসে যায়।

ব্যস, আমি শুরু করলাম আমার ঘোড়া নিয়ে তার ঘোড়াকে অনুসরন।

দস্যি মেয়ে, সহজে কি আর তাঁর ডেরা খুজে পাওয়া যায়। এ গলি সে গলি। তার ঘোড়ার নাগাল পিছলে যায় বারবার। ট্রেইল খুজে পাই না। কোন ছাপও থাকে না কোথাও।

“আরে এত সহজে পেলে কি আর মজা থাকে নাকি, থাকে না।” মনকে বুঝাই।

খোজাখুজি চলতে থাকে, একদিন পাই তো চারদিন পাইনা, যেদিন পাই, সেদিন আবার ট্র্যাকিং ভুল হয়। মনের আকুপাকু বাড়তেই থাকে। এদিকে ছুটিও শেষ হয়ে আসে, কলেজে চলে যেতে হবে আবার। কি করি কি করি? শেষমেষ লজ্জার মাথা খেয়ে আমার বড় ভাইয়ের যে কবিতা সংগঠন আছে, শব্দকন্ঠ, তাদেরকে খুলে বলি মনের লজ্জার কথা। “আপুরা, ভাইয়ারা আমাকে বাঁচান। আমি তো নাই হই গেলাম।” কথোপকথন আউড়াই, “তুমিও কি আমার সর্বনাশ করোনি নন্দিনী, আগে গোলমরিচের মত এতটুকু ছিলাম আমি…………….. আগাছার জমিতে বুনে দিয়েছো জলন্ত উদ্ভিদের দিক চিহ্নহীন বিছানা…………… এখন ঘরে টাঙ্গানোর জন্য গোটা আকাশ না পেলে আমার ভালো লাগে না…………… ”

আমার বেদনার ভারে তারা ব্যাথিত হন, এগিয়ে আসেন, কথা দেন আমাকে, খুজে বের করবেন, আমার নীলনয়না র‌্যাভিন কে। পৌছে দেয়া হবে আমার আকুলতার কথা।

আমি কলেজ চলে যাই।

এর পরের কাহিনী খুব মজার, র‌্যাভিন কে খুজে পাওয়া, প্রস্তাব পাঠানো হিসাব-কিতাব, এক ভাইয়ার দায়িত্ব নেয়া, আর হাউস মাস্টার স্যারের কাছে অসাধারন একটি চিঠি ধরা পড়ার কাহিনী, আরেকদিন বলবো। সেই সাথে বোনাস হিসেবে আমার খারাপ হাতের লেখার ট্র্যাজেডি।

সে এক অসাধারন টুইস্ট। প্রেম করতে চাইলে, হাতের লেখাটাও সুন্দর করতে হয়।

২,৫৫৩ বার দেখা হয়েছে

৭৬ টি মন্তব্য : “ধূলোমাখা শহর, ধূলোমাখা স্মৃতি – ০৭”

  1. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)
    উপরের ঠোঁটের বামপাশে একটা ছোট্ট তিল, আর তাই জায়গাটা একটু উঁচু, দেখে মনে হবেই হবে, আদর পাবার জন্যই ফুলে আছে সেটা।

    :dreamy: :dreamy:

    হেভি ফর্মে আছেন দেখি ফয়েজ ভাই ;))

    কামরুল কইসিলো টার্ণ আউট, আর আপনে কইলেন হাতের লেখা... একটার পর একটা প্রোপার্টিজ মিলতাসে :thumbdown:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  2. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    আহ ফয়েজ ভাই, কতদিন পরে আপনার এই সিরিজ, গত কয়েকদিনে আগের গুলো রিভিশন দিছি... তাই আরো ভাল লাগল। এখন তাড়াতাড়ি বাকি কাহিনি বলেন।

    ফয়েজ ভাই পাথরায় :hatsoff: :hatsoff: :hatsoff:


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  3. রেশাদ (১৯৯৩ -৯৯)
    র‌্যাভিন ঋজু হয়ে বসে স্ট্যালিয়ন এর পিঠে, স্যাডেল ছাড়াই, মাথায় কাউবয় হ্যাট, পিছনে সোনালী চুল উড়ছে, উরুর উপরে আড়াআড়ি রাখা রাইফেল, হোলস্টার বাঁধা একটু নীচু করে, গ্যানম্যানরা যেভাবে পরে আরকি, শার্টের দুটো বোতাম খোলা, সেখানে গোলাপী রং এর ঢিবির আভাস পাওয়া যায়।

    আহারে মনডা উদাস হই গেলো।

    জবাব দিন
  4. কানিজ ফাতিমা সুমাইয়া (অতিথি)
    আর হাউস মাস্টার স্যারের কাছে অসাধারন একটি চিঠি ধরা পড়ার কাহিনী

    ভাইয়া,আপনার লেখার অনেক আগের থেকেই আমি একজন নিরব ভক্ত।খুব ভাল লাগল।অসাধারন সেই চিঠি ধরা পড়ার কাহিনীর অপেক্ষায় রইলাম 🙂 (সম্পাদিত)

    জবাব দিন
  5. রায়েদ (২০০২-২০০৮)

    কাহিনী পইড়া আর কমেন্ট পইড়া খালি ইমো দেওয়ার ইচ্ছা করে।
    সিসিবিরে চালু করার মহান ব্রতের জন্য,
    :boss: :boss: :boss: :boss: :boss: :boss: :boss: :boss:

    অ.ট.: ফয়েজ ভাই আর আমার দুইজনেরই ক্যাডেট নাম্বারের শেষের অংশ ৪৮। 😀

    জবাব দিন
  6. রাশেদ (৯৯-০৫)

    অনেকদিন পর ফয়েজ ভাই 🙂
    আহারে হাতের লেখা প্র্যাক্টিস করার জন্য কাউরে পাইলাম না জীবনে 🙁
    এইসব গল্প শুনলে পুরাটাই একবারে শুনতে মনচায় তাই ফয়েজ ভাইয়ের ... চাই 😀


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
  7. কিবরিয়া (২০০৩-২০০৯)

    ফয়েজ ভাই, আপ্নেরে রংপুরের স্টারের খাওয়ামুই।। আসাধারন :salute:

    আর, কত জায়গার কথা যে মনে করায় দিলেন। 😡 🙁
    হায়, আমার রংপুররে... 🙁


    যেমন রক্তের মধ্যে জন্ম নেয় সোনালি অসুখ-তারপর ফুটে ওঠে ত্বকে মাংসে বীভৎস ক্ষরতা।
    জাতির শরীরে আজ তেম্নি দ্যাখো দুরারোগ্য ব্যাধি - ধর্মান্ধ পিশাচ আর পরকাল ব্যবসায়ি রূপে
    - রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

    জবাব দিন
      • কিবরিয়া (২০০৩-২০০৯)

        রংপুরে "স্টার" এই বছর তিনেকের নতুন।। (কেন মিস্কার্লেন্নি? আপ্নাগোর টাইমে নাকি "চিড়িয়াখানা" হট টব ছিল??)

        বাই-দ্য-ওয়ে, রংপুরে কয় বছর আসেন্না?


        যেমন রক্তের মধ্যে জন্ম নেয় সোনালি অসুখ-তারপর ফুটে ওঠে ত্বকে মাংসে বীভৎস ক্ষরতা।
        জাতির শরীরে আজ তেম্নি দ্যাখো দুরারোগ্য ব্যাধি - ধর্মান্ধ পিশাচ আর পরকাল ব্যবসায়ি রূপে
        - রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

        জবাব দিন
        • ফয়েজ (৮৭-৯৩)

          আরে দূর, আমাদের যামানায় আমরা কি আর এইসব জায়গায় খাইতাম নাকি, বন্ধুরা আড্ডা টাড্ডা মাইরা এই বন্ধুর বাড়িত হাজির হইতাম, আন্টি রাইন্ধা খাওয়াইতো, আর তানা হইলে যার যার বাড়িত গিয়া খাইয়া, মুখ-টুখ মুইছা আবার বিকালের খ্যাপে বাইর হইতাম।

          রংপুরে প্রতিবছরই যাই, তবে এখন আর বের হই না বাসা থেকে তেমন, যে কয়দিন থাকি দাদাবাড়ি-নানাবাড়ি-শ্বশুড়বাড়ি, মেলা গ্যাঞ্জাম, বিশাল লাট-বহর। এখন তো আর আগের মত একা নাই, বুঝছো 😛


          পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

          জবাব দিন
          • কিবরিয়া (২০০৩-২০০৯)

            বুঝালাম, আমি জিগাইলাম চিড়িয়াখানার কথা- আর আপ্নে কইলেন "শ্বশুড়বাড়ি"র "মেলা গ্যাঞ্জাম"এর "বিশাল- লাটবহরের" গল্প।। 😀
            দুইটাই কি ইকুইভ্যালেন্ট নাকি? :grr:


            যেমন রক্তের মধ্যে জন্ম নেয় সোনালি অসুখ-তারপর ফুটে ওঠে ত্বকে মাংসে বীভৎস ক্ষরতা।
            জাতির শরীরে আজ তেম্নি দ্যাখো দুরারোগ্য ব্যাধি - ধর্মান্ধ পিশাচ আর পরকাল ব্যবসায়ি রূপে
            - রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

            জবাব দিন
  8. রাব্বী (৯২-৯৮)

    হাতের লেখা খ্রাপ! চিঠি বাউন্স করে 🙁

    একটা ঘটনা মনে পড়লো। আমাদের এক ক্যাডেট বন্ধু তার র‌্যাভিনের এক চিঠি নিয়ে (তায়িনের সামনেই) টিএসসির ভরা মজলিসে মুখ ফসকে কইয়া ফেলছিলো, ১৬ লাইনে ২৭টা বানান ভুল! চিঠি আর কি পড়ুম! (এইজন্য তার অবশ্যি চড়া মূল্য দিতে হইছিলো) 😛


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন
  9. সাবিহা জিতু (১৯৯৩-১৯৯৯)

    অপেক্ষায় আছি ধরা খাওয়া চিঠি গল্প শোনার জন্য।
    অঃটঃ ভাইজানের হাতের লেখাটা এখন কেমন জানতে মঞ্চায়, ভাবীরে জিগামু নি??


    You cannot hangout with negative people and expect a positive life.

    জবাব দিন
  10. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    তোমার আবার হাতের লেখা ভালো হওয়া লাগে?
    বক্রা চক্রা করে একটা কবিতা লিখে দিলেই তো বাজিমাত।

    ্মনে হয় রাইটা্র্স ব্লক কেটে গেছে।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
  11. তাইফুর (৯২-৯৮)

    আপনার ছিড়াখ্যাতা , তেরখাদা না কি যেন খেরোখাতা পড়ার জন্য মনডা বিলা হয়া আছে বস।

    এর পরের কাহিনী খুব মজার, র‌্যাভিন কে খুজে পাওয়া, প্রস্তাব পাঠানো হিসাব-কিতাব, এক ভাইয়ার দায়িত্ব নেয়া, আর হাউস মাস্টার স্যারের কাছে অসাধারন একটি চিঠি ধরা পড়ার কাহিনী, আরেকদিন বলবো। সেই সাথে বোনাস হিসেবে আমার খারাপ হাতের লেখার ট্র্যাজেডি।

    পরের কাহিনী শুনপো ...


    পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
    মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।