ঘাই

শেখেরটেক হাট থেকে আকাবাকা হয়ে পুব দিকে যে রাস্তাটা চলে গ্যাছে, পদ্দাপদ্দি নদীর ধার ঘেষে, ওটা ধরে মাইল চারেক সামনে গেলে যে গ্রামটা চোখে পড়ে তার নাম তালুকদার বাড়ি। গ্রামটা চিনা খুব সহজ, কারন ইংরেজ আমলে শাহ তালুকদার জমিদার ছিলেন, সেই আমলের বিরাট আলিশান প্রাসাদের মত বাড়ি অত্র এলাকা তো বটেই, জেলাতে আছে কিনা এই নিয়ে দারুন সন্দিহান এলাকার মানুষ। আর একটা সহজ চিনার উপায় আছে তালুকদার বাড়ি। একটা বকুল গাছ। বিরাট গাছ, একদম ছাতার মত দেখতে, বৃষ্টির সময় গাছের নিচে দাড়ালে বেশ খানিকটা সময় ছাট থেকে বাচা যায়। পনের মাইল দক্ষিনে রায়বাজার, সেখান থেকেও পরিষ্কার চোখে পড়ে বকুল গাছটা। তালুকদার বাড়ি গ্রামের গর্ব এটা।
বাড়িটা বিশাল, উচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মুল ফটক থেকে প্রাচীরের বাইরে ধার ঘেসে সোজা উত্তরে গেলে প্রথমেই পরে বিরাট সুপারি বাগান, সুপারি বাগানের ভিতর দিয়ে একটু বায়ের রাস্তা ধরে তিন মিনিট হাটলে পরে আম বাগান, প্রায় আশিটা গাছের বিরাট বাগান। আম বাগানের মাঝখানে প্রায় একশ বছরে পুরোনো পুকুর আছে একটা। নামেই পুকুর, মজে গেছে, কেউ যত্ন নেয়না, যদিও পানি থাকে ওখানে বারোমাস।
জমিদারি যদিও নেই, প্রতিপত্তি কমেনি তালুকদারদের। ষষ্ট পুরুষ আব্দুল মজিদ তালুকদার তিন বার চেয়ারম্যান ছিলেন, তার ছেলে বছর চল্লিশের হাফিজ তালুকদার বাবার ফেলে যাওয়া হাল ধরেছেন শক্ত হাতে। পঞ্চম পুরুষের রেকর্ডটাই একটু যা খারাপ ছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময়, তবে গল্পের খাতিরে সেদিকে যাওয়াটা মনে হয় ঠিক হবে না।
পদ্দাপদ্দি নদীটা এখন মরা, আগে বজরা আসত, দেবী চৌধুরানীর বজরা এসেছিল বার দুই, তালুকদার বাড়ির প্রথম পুরুষ, শাহ পরি তালুকদারের সংগে ওনার বেশ ভাব ছিল শোনা যায়। সেই খাতিরে আসা। অবশ্য নন্দি পাড়ার নাপিত গুলো অন্য কথা বলে, ডাকাতি বা বখরা ভাগাভাগি এইসব আরকি। যাইহোক, পদ্দাপদ্দির সেই রুপ আর নাই, গ্রীষ্মে হাটু পানি, বর্ষায় যা একটু হয়, অনেকটা বিলের মত ছপ ছপানো, স্রোত নাই। কৃ্ষকরা ধান লাগায় নদীর ধারে, পানি বাড়ে, ধানের গাছও বাড়ে, আর কৃ্ষকরা কোচ আর কোশা নিয়ে রাতে-দিনে পড়ে থাকে নদীতে, মাছ ধরার জন্য।
নিঃসন্তান হাফিজ তালুকদারের নেশা বলতে অই একটা। কোচ দিয়ে মাছ ধরা। জমিদারী প্রথার সংগে একদম যায় না ব্যাপারটা। খুব বিরক্ত হতেন মজিদ তালুকদার, ছেলের এই বদ নেশায়। কিন্তু ছেলেকে ফেরানো যায়নি, বর্ষার পানি পদ্দাপদ্দিতে আসা মাত্র ছেলে উধাও, দিন নেই রাত নেই, নদীতে কোচ নিয়ে ঘুরাঘুরি। ছেলেকে ফিরানোর জন্য অনেক কিছু করেছেন, এমনি কি আশেপাশের দশ গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েকে বউ করে এনেছেন, কিন্তু ছেলের মতি ফেরেনি। শেষে উপায় না দেখে আক্কাসকে বেধে দিয়েছেন হাফিজের সঙ্গে, একটা পাচ ব্যাটারীর টর্চ আর বল্লম দিয়ে, বলা তো যায় না, শত্রুর অভাব নেই চারপাশে।
মজিদ তালুকদার গত হয়েছেন তা প্রায় বছর পাচ, কিন্তু আক্কাস নিয়মটা বদলায় নি, ছায়ার মত থাকেছে হাফিজের সাথে গত বিশ বছর, দিনে ছাতা আর রাতে বল্লম নিয়ে। বদলাও দিয়েছেন হাফিজ তালুকদার, অভাবের সংসারে পর পর তিনটা মেয়ে হয়েছে আক্কাসের, মাঝের মেয়ে, সালেহাকে নিয়ে এসেছেন নিজের কাছে, মেয়ের মত রাখবেন এই ইচ্ছায়। কৃ্তজ্ঞতায় বিক্রি হয়ে গেছে আক্কাসের মন, এই না হলে তালুকদার বংশ, এতবড় উদারতা তাদেরই মানায়, মনকে বুঝিয়েছে সে।
কোচ দিয়ে মাছ ধরার একটা নিয়ম আছে। কোশা নিয়ে খুব আস্তে আস্তে ঘুরতে হয়, যেন পানিও টের না পায়। ধানের ফাকে ফাকে ঘুরে বেড়ায় প্রমান সাইজের মাছ, মাঝে মাঝেই ঘাই মারে। একেক মাছের ঘাই একেক রকম। কোন কোন মাছ এক জায়গা সহজে বদলায় না, মানুষের মত, এইগুলা মারা খুব সহজ। একবার ঘাই দেখে বুঝতে পারলে খুব সাবধানে কোশা চালিয়ে নিতে হয় কাছাকাছি জায়গায়। এরপর চুপ করে অপেক্ষা, আবার আসবেই, ধৈর্য্য হারানো যাবে না, তাহলে পুরা খেলাই খতম, আবার ঘাই আসবেই। পাচ মিনিট, দশ মিনিট, আধা ঘন্টা, এই সময় টুকু একটা খেলা। এরপর ঘাই আসলেই সা-ঝাক করে ছুড়ে দিতে হবে কোচ, গেথে ফেলতে হবে খুব শক্ত করে, যাতে ছুটে না যায়। মাছটা এই সময় তড়পাবে অনেক, অইটা দেখতে খুব আরাম, আহ, শিকারে একটা মজা আছে না।
কোন কোন মাছ আবার এক জায়গায় ঘাই মারে না। একটা দিয়ে একটু জায়গা বদল করে, যাযাবর টাইপ, ওদের গতিবিধিও বুঝা যায় ঘাই এর ঢেউ দেখে, এরপর কোশা নিয়ে জায়গায় গিয়ে অপেক্ষা, আগের মতই, এরপর সা-ঝাক। আহ কি তৃপ্তি।

“আম বাগানের পুকুরটা দেখছ নাকি ঈদানীং আক্কাস”, একদিন বাজার থেকে ফিরতে ফিরতে আক্কাসের কাছে জানতে চান হাফিজ তালুকদার। “কোন একটা বড় মাছ আটকা পড়ছে মনে হয়।”
“জী হুজুর, একটা কাতলা, পাচ কেজির কম না”। পাচ কেজি……। চোখ চকচক করে হাফিজ তালুকদারের, “এইটা আসল ক্যামনে”?
“বানের পানির লগে ডুকছে মনে হয়, গত বছর”।
রুইয়ের চেয়ে কাতলা মাছে তেল বেশি থাকে, কাতলা মাছ যত বড় হবে, পেটে তেলের পরিমান তত বেশি, চাখতে তত বেশি মজা। আর পুকুরের মাছ যেহেতু, খুব কঠিন হবে না কাজটা।

রাতের বেলায় তার কি কি দরকার এইটা বিবি সাহেবের মুখস্ত, প্রথমে হাত মুখ ধোয়ার জন্য পানি সাবান টুল, এরপর একটু বিশ্রাম নিয়ে অজু-নামাজ, রাতে খাবার পর একটা কর্পুর দেয়া পান।

“সালেহার বয়স কত হল?” বেমক্কা এই প্রশ্নে হকচকিয়ে যান বিবি সাব। সামলে নেন দ্রুত।
“কত আর, ষোল হয় নাই”।
“ষোল বচ্ছরের মাইয়া, শাড়ি পইড়া আমার সামনে আসতে দিছ ক্যান, সালোয়ার নাই, সালোয়ার পড়তে পারে না”।
“মেয়ে বাপের সামনে শাড়ি পইড়া আইতে পারব না”?
“তোমারে অত বেশি বুঝতে হইব না, ওরে শাড়ি পইড়া আমার সামনে আসতে নিষেধ করবা, প্যাট দেখা যায়, আমার এইগুলা পছন্দ না”।

অনেক দিন পরে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজের আগে আগে গোছল করেন হাফিজ তালুকদার। ঘুম তো বটেই, নামাজের মাঝেও তার সামনে কাতলার পেটটা দুলতে থাকে।

নাহ মাছটা আজ কালকের মধ্যে গাথতে হবে। দেরী হলে অন্য কারও চোখে পড়ে যেতে পারে।

৩,৪৮১ বার দেখা হয়েছে

৪৬ টি মন্তব্য : “ঘাই”

  1. তাইফুর (৯২-৯৮)
    বদলাও দিয়েছেন হাফিজ তালুকদার, অভাবের সংসারে পর পর তিনটা মেয়ে হয়েছে আক্কাসের, মাঝের মেয়ে, সালেহাকে নিয়ে এসেছেন নিজের কাছে, মেয়ের মত রাখবেন এই ইচ্ছায়
    নাহ মাছটা আজ কালকের মধ্যে গাথতে হবে। দেরী হলে অন্য কারও চোখে পড়ে যেতে পারে।

    ওয়ালিউল্লাহ'র মজিদের কথা মনে পরে গেল।
    চ্রম বস চ্রম


    পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
    মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

    জবাব দিন
  2. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    আমাদের 'বিয়াদওওওওফ, কি হইছ্যাওওওও' স্যারের কথা মনে পড়ে গেল...
    স্যার বলতেন,'ছোট বেলায় পড়ছি-আলিফ খালি, বে খালি, ছা'এর এক নুক্তা...' সেই রকম এখনকার মাইয়াগো দেখি-পেট খালি, পিঠ খালি, কপালে এক নুক্তা(টিপ আর কি!!)...'
    =))

    ফয়েজ ভাই :salute:


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  3. তারেক (৯৪ - ০০)

    কঠিন গল্প! খুব ভাল লাগলো পড়ে। এই যে শুরু থেকে আস্তে আস্তে কাহিনি ঘনিয়ে আনা, তারপরে একদম শেষ লাইনে এসে ঘাই মারা- দুর্দান্ত লাগলো।
    আপনি ভাই বস পাবলিক দেখি! আরেকটু বড় লেখায় হাত দেন, আরো জমে উঠুক।
    আপাতত পাঁচ তারা দিলাম, এর চেয়ে বেশি দেয়ার উপায় নাই এখানে।


    www.tareqnurulhasan.com
    www.boidweep.com

    জবাব দিন
  4. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, ওগুলো কাটাতে পারছিনা, পারছিনা বলাটা ঠিক হলনা, কাটানোর চেষ্টা করছিনা, সময় পাচ্ছিনা।
    সীমাবদ্ধতা না কাটিয়ে বড় লেখায় হাত দিতে সাহস পাচ্ছিনা, লেখা ঝুলে যাবে মনে হচ্ছে।

    লেখাটা ভাল লেগেছে যেন ভাল লাগল।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
    • ফয়েজ (৮৭-৯৩)

      সানাউল্লাহ ভাই, আপনি আমার লেখা পড়েছেন, এই আনন্দ আমি রাখি কই। :shy:
      আমার লেখা আপনাকে ভাবায়, আমার পাও তো আর মাটিত পড়তেই চাইতেছে না। 😀
      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, লেখাটা পড়ার জন্য।


      পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

      জবাব দিন
  5. টিটো রহমান (৯৪-০০)

    ভাই এইটা কি লিখলেন? 😮 😮 😮
    :boss: :boss: :salute: :salute:
    আমি এমন লিখতে পারি না ক্যান ~x( ~x( ~x(

    হাফিজ তালুকদারের নেশা বলতে অই একটা।..............প্যাট দেখা যায়, আমার এইগুলা পছন্দ না.......................নাহ মাছটা আজ কালকের মধ্যে গাথতে হবে। দেরী হলে অন্য কারও চোখে পড়ে যেতে পারে।

    অসাধারণ।

    অফ টপিক: আমার ক্যাডেট নাম হাফিজ ~x( :(( :(( :((


    আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই

    জবাব দিন
    • ফয়েজ (৮৭-৯৩)

      আরে টিটু কি কও তুমি, এমন লিখলে তো তোমার রেট কইমা যাইব, তুমি মিয়া যে কি একটা মাল ওইটা এক লেখাতেই বুঝা গ্যাছে।

      বুইড়ার নাম তো হাফিজ তালুকদার, তুমি তো আর তালুকদার না। আর কত ভাল ভাল হাফিজ আছে না, এই যেমন ধর মেজর হাফিজ 😀


      পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।