তুমি ভাসবে হৃদয় মাঝে – ৮

তুমি ভাসবে হৃদয় মাঝে – ৫ | | | | তুমি ভাসবে হৃদয় মাঝে – ৬
তুমি ভাসবে হৃদয় মাঝে – ৪ | | | | তুমি ভাসবে হৃদয় মাঝে – ৭
তুমি ভাসবে হৃদয় মাঝে – ৩
তুমি ভাসবে হৃদয় মাঝে – ২
তুমি ভাসবে হৃদয় মাঝে – ১

“This is for you.” … আমার এই আকষ্মিক ‘আক্রমণ’ তাকে খানিকটা বিভ্রান্তিতে ফেলেছে মনে হচ্ছে। দিনে প্রথমবার দেখাতেই কোন রকম হাই-হেলো ছাড়া কেউ যে এভাবে approach করতে পারে এটা ধারণা করতে পারেনি বলেই আমার মনে হয়। ঝকঝকে চোখদুটিতে বিষ্ময় আর সংকোচ, সেই সাথে একটা লুকানো হ্যাপি-হ্যাপি ভাব। ঠোঁটে একটা দুষ্টুমিঠাসা হাসি ঝুলে আছে যেটার মর্মার্থ বের করতে পারলাম না।

এই সব গিফট দেওয়া-দেওয়ি আমার হয় না। আমার জীবনে প্রমিনেন্টলী মনে রাখার মত কাউকে গিফট দিয়েছি অথবা আমার গিফট পেয়ে খুশিতে কেউ খুব শারীরিক কসরত করা শুরু করেছে, এমন দৃশ্য আমার স্মৃতিতে নেই। অভিজ্ঞতার অভাবের কারণেই মনে হয় র‌্যাপিংটাও ঠিকমত করতে পারিনি। মনে হয় সেটা দেখেই “কৌতুকাপ্লুত” হচ্ছে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে তার চেহারায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনুভুতির বায়োস্কোপ পর্যবেক্ষণ করছি; যতই করছি ততই আবার সেই নতুন দিনের মত মুগ্ধ হচ্ছি। ইস্‌! খোদা কি সুন্দর জীব বানাইলা দুনিয়ায়!! … আজকে তাকে অসম্ভব রূপবতী লাগছে। বৈশাখী সাজে মেয়েদের সাধারণত অসাধারণ লাগে, অন্তত আমার কাছে। বৈশাখী র‌্যালীগুলোর সৌন্দর্য ফিফটি পার্সেন্ট মেয়েদের এ্যাপারেল-এর উপর নির্ভরশীল বলে আমার মনে হয়।
কিন্তু এই মেয়েটার মধ্যে অন্যরকম কিছু একটা আছে যেটা তাকে অনন্য-সাধারণ করে আমার চোখে ধরা দিয়েছে। কমলা আর গোলাপী, দুটি রং-ই আমার কাছে খুব ক্যাটক্যাটে লাগত। কিন্তু ও এত সুন্দর একটা কম্বিনেশন করেছে যে আমি “সুন্দর” শব্দটা মুখে উচ্চারণ না করে পারলাম না।
“কিছু বললেন?” – গিফটএর অপরিপক্ক মোড়কটা খুলছিল সে, সেখান থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকালো।
“না… আই মিন… তোমাকে আজ ভাল দেখাচ্ছে।”
“ব্যাস? এই??”
“Actually…. সিরিয়াসলী গর্জিয়াস দেখাচ্ছে… হুমম… রিয়েলী… I mean it!!”
তার মুখে আবার একটা সলজ্জ হাসি উপস্থিত হল। “থ্যাঙ্কস আ লট, জিনিসটা আমার পছন্দ হয়েছে।” কথা বলতে বলতে তার মোড়ক খোলা শেষ। কি উত্তর দিব ভেবে না পেয়ে বললামঃ “মমম… মনে হয় আমার তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ কারণ আমার গিফট দেওয়া হয়না। আমি কাউকেই এ পর্যন্ত কোনো সুইট্যাবল গিফট দিতে পারিনি। আমার এই ব্যাপারটাই কেন জানি আসেনা। Appreciation-এর ধন্যবাদ আর কি।”
“কই? প্রমাণ তো হল না…”
“আচ্ছা, কি ঊইশ করব? বার্থ ডে নাকি নববর্ষ?”
“বার্থ ডে? কার?”
“কেন তোমার আজ বার্থ ডে না?”
“তাই নাকি? আমি কবে বললাম এটা আপনাকে?”
“সেদিন তুমি চলে যাবার সময় যেভাবে বলে গেলে… আমি ভাবলাম বুঝি আজ তোমার বার্থ ডে।”
শুনে সে কি খিলখিল হাসি। আমি তো বেশ বিব্রত বোধ করতে থাকলাম। আমার ধারণা তাহলে ভুল ছিল? O Crap… মাখিয়ে ফেলেছি; এখন কি হবে?? ওর আমার ছোট হয়ে যাওয়া চেহারা দেখে মনে হয় করুণা হচ্ছে, সে হাসি থামিয়ে বললঃ “সরি, কিছু মনে করবেন না…” আবার একটু হাসি চাপার চেষ্টা… “শুভ নববর্ষ”! আমি এতটাই হতভম্ব যে উত্তর দিতে ভুলে গেলাম।

একসাথে বসে বৈশাখী প্রোগ্রাম দেখছি। আমার আজ আসার কথা না এই সময়টায়। আসলাম, যাতে একটু সময় কাটানো যায়। সব সময় তো দেখা হয়ে উঠে না; আর আজ একটা খুব স্পেশাল দিন ভেবেছিলাম – কিন্তু এভাবে যে আমার ধারণা ভুল প্রমানিত হবে বুঝিনি। কিছুক্ষণ পর আমাদের ব্যাচের পোলাপান পারফর্ম করবে। আমাকে বলেছিল গান-টান করতে দু’একটা, না করে দিয়েছি। অন্য বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হওয়া যাবেনা আজ। এমন সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়?!
“আপনি গান গাইবেন না?” প্রায় হঠাৎ করে এই প্রশ্ন।
“নাহ্‌… ইচ্ছে করছে না।”
“বৈশাখী প্রোগ্রামে আপনি অংশ নিচ্ছেন না কেমন কথা হল?”
“প্রতিবার যাই, এবার না করে দিয়েছি।”
“আমি তো আপনার গান শুনতে পাব ভেবেছিলাম।”
আমার খারাপ লাগতে থাকল; আহারে! ও অপেক্ষা করছিল, তা-ও আবার আমার গান-এর জন্য? কি করার, কোন রকম প্রিপারেশন নাই – এখন স্টেজে ওঠাটা রিস্কি। তাছাড়া এরকম প্রেস্টিজিয়াস প্রোগ্রাম… অন্ততঃ আমার কাছে। কারণ এটা দেশী আমেজের জিনিস; আমার কাছে এর মূল্যায়ন অন্য লেভেলের। আমি বললাম – “আমার তো কোনো প্রাকটিস করা নাই। এবারে ভেবেছিলাম করবনা। এখন তোমাকে কি শুনাব?”
“আমি জানি না… আমার খুব শুনতে ইচ্ছা করছে।”
“আমি তো বাজে সিঙ্গার, আমার গান শুনতে ইচ্ছা করছে? মিলাতে পারছি না…”
হঠাৎ স্টেজের পেছন থেকে এক বন্ধু হাত ইশারা করে আমাকে ডাকতে থাকল। আমি উঠে যেই যাব তখন খুব বেশি আশাতীতভাবে সে আমার হাত টেনে ধরল। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম, কি করব বুঝে উঠতে পারছি না। আমার হৃদয়ের ভেতর বৈশাখী ঝড় শুরু হয়ে গেছে তার ছোঁয়ায়, আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছি হৃদপিন্ডে রক্তপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি, একই সাথে শান্ত আর অস্থির এই দুই অনুভুতির লড়াইয়ে আমার ভেতরটা লন্ডভন্ড হয়ে গেল বলে! চারিদিকের অনেক শব্দ ছাপিয়ে তার কন্ঠস্বর কানে এলঃ “প্লিজ, আমার জন্মদিনের উপহার হিসেবে অন্তত গাও না একটা গান।”

আমি দর্শক সারিতে তাকে দেখতে পাচ্ছি। হাসি হাসি মুখ করে বসে আছে। আমার সাথে তখন যে মজা করেছিল সেটা বোধ হয় মনে পড়ছে। আমি কিছু মনে করিনি। বরং আমার অন্যরকম অনুভুতি হয়েছে তার এই Prank-এ সামিল হয়ে। আমি সাব্জেক্ট ছিলাম তাতে কি? ইন্সট্রুমেন্ট হ্যান্ড-ওভার করে আমি আমার জায়গায় ফিরে গেলাম। সে গাঢ় স্বরে বললঃ “অসম্ভব সুন্দর হয়েছে, আজকের দিনে আমার জন্য একটা পারফেক্ট গিফট। গানের কথা যদিও বলে ‘কি দেব তোমায় আজ উপহার’ তবু আমার মনে হয় আমি আমার জন্মদিনের উপহার পেয়ে গিয়েছি।” তার এই আনন্দ দেখে আমার মনে হতে লাগল আমার মিউজিক শেখাটা (যতটুকুই পারি যেন-তেন করে) সার্থক। জীবনের কোনো একটা সময় ছাদের গিটারিস্ট হবার খুব সখ হয়েছিল। ফ্যামিলি গ্যাদারিং হলে মাঝে মাঝে ছোটখাট পিকনিক-মত হয়, তখন এই জিনিসটা কোয়াইট আ গুড এন্টারটেইনমেন্ট। আমার মনে হতে লাগল, আমার ‘এন্টারটেইনার’ হবার মোটিভ সম্পূর্ণ সফল।
এবার আমি তাকে প্রশ্ন ছুড়লামঃ “এই, তুমি আমাকে বলনি কেন? তখন ওরকম করলে কেন?”
“তোমাকে একটু চক্কর খাওয়ালাম।” সকৌতুক জবাব।
“হুমম… বুঝলাম… যাই হোক আমি মাইন্ড করিনি; ইন ফ্যাক্ট আমার ভাল লেগেছে পুরো জিনিসটা। আর… থ্যাঙ্কস।”
“কেন থ্যাঙ্কস কেন?”
“For calling me that way… you know.” … তার ব্লাশ করাটা উপভোগ করলাম। “তোমার ‘আমি মাইন্ড করিনি’ টা আমি এটার সাথেও মার্জ করে নিলাম।” সে একটু সময় নিয়ে উত্তর করল। আমার সম্মতিসূচক নড করার পর আবার বললঃ “বাই দ্য ওয়ে, একই রকম জিনিস আমার একটা আছে।” “মানে??” আমি একটু অবাক; “যেই ব্রেসলেটটা তুমি দিয়েছ, সেটা।” তার চোখে আবার দুষ্টুমি খেলে গেল।
আবার আমি আরেক দফা ধরা খেলাম। স্বীকার করেই বললামঃ “তোমার জন্মদিনের দিন আমি শুধু ধরা খাচ্ছি কেন?”
“আমার কাছেই তো, আর তো কেউ না।”
“তা অবশ্য; well… ব্যাপার না।”

প্রোগ্রাম শেষ হয়েছে বেশ আগে। একসাথে লাঞ্চ করেছি আমরা। এখন পড়ন্ত বিকাল। অকল্পনীয় সুন্দর একটা আকাশ। মেঘগুলোর ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলোর যে একটা Silver Lining হয়েছে, দেখার মত। সারাদিন বেশ রোদ ছিল। আমাদের particularly কোনো সমস্যা না হলেও রাস্তায় বের হওয়া একটা ভয়ানক ব্যাপার ছিল কোনো সন্দেহ নেই। এখন মনে হয় প্রকৃতি আমাদের সরি বলছে… she is being nice. ঠিক আছে, ক্ষমা করা হল। সন্ধ্যার সময় আরেক দফা প্রোগ্রাম হবে। ওটা আবার একটু রক ফ্ল্রেভারের। এই অংশটা করা নিয়ে স্যারদের ব্যাপক আপত্তি ছিল পরে নাকি খুব ঝামেলা করে সাইজ হয়েছে। তবে আমার এখন আর থাকার মুড নাই। আমি আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় বিকেল কাটাচ্ছি এখন – কারণ একটু আগে ও আমাকে বলেছেঃ “চল না আজ হেঁটে হেঁটে বাসায় যাই?”

এমন সুযোগ কি কেউ হাতছাড়া করে???

… To be continued

৯১৫ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “তুমি ভাসবে হৃদয় মাঝে – ৮”

  1. বৈশাখী সাজে মেয়েদের সাধারণত অসাধারণ লাগে, অন্তত আমার কাছে। বৈশাখী র‌্যালীগুলোর সৌন্দর্য ফিফটি পার্সেন্ট মেয়েদের এ্যাপারেল-এর উপর নির্ভরশীল বলে আমার মনে হয়।

    আমিও অগোরে ভালা পাই। 😡 😡 😡

    জবাব দিন
  2. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    ধারাবাহিকের এই এক যন্ত্রণা......... অপেক্ষায় থাকা। অবশ্য তোমারে কি কমু। নিজেই তো খেলাপি হইয়া আছি। প্রেম কাহানি ভালোই জমতেছে। আরো জমাও......... ;;;


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।