আফসোস রিটার্নস্‌…

– ‘কিরে ব্যাটা! কি করস??’
– ‘কি আর করুম, নেট ব্রাউজ করি…’
– ‘সারাদিন তো করিস ঐ এক কাজ…’
– ‘না করার কি আছে? আমার তো এখন অখন্ড অবসর…!’
– ‘হা হা হা…কবে তোর ‘অখন্ড অবসর’ থাকে না…???’
এই পর্যায়ে হাল্কা মাইন্ড খাইলাম, ‘হালায় আমারে পঁচাইল নাকি?’ ভাবতে ভাবতে বললাম,
– ‘ইয়ে…মানে…অফিসিয়ালি আর কি…কেবলই সেমিস্টার শেষ হইল তো…!!!’

সেদিন জাফরের সাথে কথা শেষ করে ফোনটা রাখার পর হঠাৎ করে অনেক পুরনো স্মৃতি পড়ে গেল…

যারা পড়ালেখায় খুব ভাল হয় তাদের ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা…!!! নিয়মিত পড়াশুনা করা, ক্লাস ফলো করা, নোট করে পড়া, রুটিন করে পড়া…এ সব কিছুই একজন ভাল ছাত্রের বৈশিষ্ট্য। কলেজের ভাল ছাত্রগুলোও এর ব্যতিক্রম ছিল না। যে কোন টার্মের শুরু থেকেই তাদের সব কার্যক্রম হত প্ল্যানমাফিক। ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে সব পড়া আগে থেকেই করে আসায় নতুন করে বোঝার কিছু থাকত না, বরং তারা বারবার রিভিশন দিয়ে সব ঝাঁঝরা করে ফেলত। নতুন টার্মের প্রথম দু’একদিন হাল্কা চালে পড়াশুনা করতে করতে শুরু হত তাদের সিরিয়াসনেস…যা চলত শেষ পরীক্ষা পর্যন্ত…

আর আমাদের ব্যাপার ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত…বাড়ি থেকে কিছু আগাম পড়ে আসতাম না (খুব বেশি হলে কিছু ম্যাথ করে আসতাম…তাও জিনিসটা এমন ছিল যে, নিজের জন্য নয়- বাপ-মা’র জন্য পড়ছি!!!) । টার্মের প্রথম দিন থেকে আমাদের যে ‘হা হা হি হি’ শুরু হত…তা চলত পরীক্ষা আরম্ভ হবার এক সপ্তাহ্‌ আগ পর্যন্ত…নতুন নতুন বই, ম্যাগাজিন…যেখানে যা পেতাম সাথে সাথে পড়ে ফেলতাম। প্রেপটাইমগুলো খরচ হয়ে যেত গল্প করতে করতে…একটার পর একটা দিন চলে যেত, কিন্তু গল্প শেষ হত না…কাহিনী শুরু হত পরীক্ষার রুটিন দেবার পর থেকে…কোন মতে নাক কান গুঁজে কয়েকদিন পড়াশুনা করে পরীক্ষাগুলো পার করতাম…!

পরীক্ষার পর ভাল ছাত্রদের মাস্তি শুরু হত। আমাদের কাছ থেকে না পড়া গল্পের বই নিয়ে আরাম করে পড়ে তারা পরীক্ষা পরবর্তী সময়গুলো উপভোগ করত…আর এদিকে আমাদের অবস্থা হত প্রোগ্রামহীন রোবটের মত…করার মতন কিছু না পেয়ে মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়াতাম…সাথে থাকত ফলাফলের দুশ্চিন্তা! পরীক্ষার খাতা দেবার সময় ভাল ছাত্ররা যখন সাফল্যের আনন্দে উদ্ভাসিত হত, আমরা তখন স্যার-ম্যাডামদের কাছ থেকে পাশ নম্বর আদায় করায় ব্যস্ত…’আগামী টার্মে ফাটিয়ে দেব’…’এবারের মতন পাশ করিয়ে দিন’…এই সব ভুজুং-গাজুং এর মাধ্যমে শেষ হত আমাদের প্রতিটি টার্ম…!!!

কলেজ থেকে পাশ করার পরও কিছু বদলালো না…বরং কোর্স পদ্ধতির চাপে পড়ে তা হয়ে গেল আরও খারাপ…সারা বছর ধরে পড়াশুনা না করে বছর শেষে পরীক্ষার আগে আগে পড়ে কোন মতে পাশ করতে লাগলাম…ক্লাস এটেনডেন্সের কোন বাঁধা-ধরা না থাকার কারনে ক্লাসও করা হয়ে উঠত না…আমি যেদিন ভার্সিটি যেতাম-সেদিন তো রীতিমতন হৈ-চৈ পড়ে যেত…মাঝে মাঝে ক্লাসে গিয়ে আমি ঢাকা ভার্সিটিকে ধন্য করে দিয়ে আসতাম…!!

এমবিএ করতে গিয়ে সেমিস্টার পদ্ধতির সাথে পরিচয় হল…প্রথম সেমিস্টারে মাসখানেক হেব্বি সিরিয়াসলি ক্লাস করলাম,পরীক্ষাও দিলাম নিয়মিত…এই এক মাসে যত ক্লাস করেছি, হিসাব করলে তা পুরো অনার্স লাইফের অর্ধেকের কাছাকাছি তো হবেই…কিন্তু তারপর লাউ এবং কদু এক হয়ে গেল…আমি যদি কোন সেলিব্রেটি হতাম, পেপারে হেডিং আসত ‘হি ইজ ব্যাক…!!’ আর এভাবেই শেষ হয়ে গেল আমার প্রথম সেমিস্টার…!!!

জানুয়ারীতে দ্বিতীয় সেমিস্টার শুরু হবে…বাসায় তো ইতোমধ্যে বলে দিয়েছি ‘আগামী সেমিস্টারে দেখিয়ে দেব…’ বাপ-মা আমার ‘ব্যাপক সিরিয়াসনেস’ এর সাথে পূর্ব পরিচিত বিধায় তাদেরকে বেশি উৎসাহিত হতে দেখালাম না…বরং তাদের উদ্দেশ্যমূলক হাসি দেখে আমার নিজের উৎসাহেই ভাটা পড়ে গেছে…!!!

এ জীবনে বোধহয় আর ভাল ছাত্র হওয়া হল না…!!! :bash:

২,০৪৭ বার দেখা হয়েছে

৫১ টি মন্তব্য : “আফসোস রিটার্নস্‌…”

  1. জাফর (৯৫-০১)

    ওরে কবীর, কিদিলিরে!!! :gulti:
    জট্টিল হইছে। আর কিছু লোকজন পরীক্ষা দিয়ে প্রশ্ন ছিড়ে ফেলত- ২ নম্বর এর উত্তর করতে পারে নাই, কেউ আবার মার্জিন দিতে পারে নাই বলে লাঞ্চ করত না , আর আমরা ??????? :bash: :khekz:
    এইগুলা নিয়া একটা লিখে ফেল।

    জবাব দিন
  2. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    ঠিকমতন ছাত্রই হইতে পারলামনা :bash: :bash:
    ভালো ছাত্র সেতো বহুত লাইট ইয়ার দূর কি বাত :bash: :bash:
    ক্লাস আ্যাডেন্টেন্স ৬০% এর নিচে থাকলে ১০ এ ০ দেইখা ওই রাস্তাটা আর মাড়াই নাই 😀
    জুনা, মিনির কিথি লিখির জিন্য তিরে পিরা ভাষায় ধিন্যিবিদ দিলিম ;))


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  3. রেজওয়ান (৯৯-০৫)
    প্রথম দিন থেকে আমাদের যে ‘হা হা হি হি’ শুরু হত…তা চলত পরীক্ষা আরম্ভ হবার এক সপ্তাহ্‌ আগ পর্যন্ত…নতুন নতুন বই, ম্যাগাজিন…যেখানে যা পেতাম সাথে সাথে পড়ে ফেলতাম। প্রেপটাইমগুলো খরচ হয়ে যেত গল্প করতে করতে…একটার পর একটা দিন চলে যেত, কিন্তু গল্প শেষ হত না…

    আহহারে...... কি দিনই না ছিল এক্কেরে মনের কতা... :boss: :boss: :boss: :boss:

    জবাব দিন
  4. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    Junayed vai moner kotha bolar jonno :salute:


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  5. টিটো রহমান (৯৪-০০)
    এ জীবনে বোধহয় আর ভাল ছাত্র হওয়া হল না…!!!

    হিয়! জীবিন ইতো ছিট কিন?
    লিখা ভিল হিইছে

    পিরা ভাষায় ডক্টরেট কর। রবিন ভাল ছাত্র বানাইয়া দিব


    আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই

    জবাব দিন
  6. রায়হান আবীর (৯৯-০৫)

    এক্কেরে আমার কাহিনী। আমিও জীবনে...

    আইইউটিতে এক সেমেস্টার সিরিয়াস্লি পড়লে আমি এক সেমেস্টার ঘুমাইয়া কাটাই। দুই সেমেস্টারের ফলাফলের গড় করলে তা হয়ে যায়, টেনে টুনে পাস। 😀

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।