প্রলাপ-১২

frog-umbrella3
১।
আমাদের প্রতীকী শব্দবন্ধের গোপন সংকেত জেনে ফেলেছিলো যে জোনাকীরা, কাল রাতের স্বপ্নে এসে ক্ষমা চেয়ে গেছে তারা। স্বপ্ন বেশীক্ষণ স্থায়ী হয় নি। পরীক্ষার আগের রাতের স্বাভাবিক স্বপ্নের মতোই লিখতে পারছি না,এক্সাম হলে পৌছুতে পারছি না কিংবা দেরী হয়ে গেছে-এইরকম। তাই সাদা জানলা-পর্দার উড়ে উড়ে আসা দেখে দেখে যখন ঘুম ভাঙলো,তাই দেখে ভুলে গেছি সকল জোনাকীর অপরাধ। পর্দা তখন আরও ফুলে ফেঁপে উঠছে ঝড়ো বাতাসে। অন্ধ বৃষ্টির মত্ত ঝাপটা…সেই সাথে বারান্দার রেলিংয়ে উড়ে এসে বসা ভেজা দাড়কাক এসে মনে করিয়ে দিলো অনেকদিন প্রলাপ লেখা হয় নি।
প্রলাপ লেখায় সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করে কে?
অবশ্যই ঋতু। শীতে লেখা হয় সোডিয়াম আলো মাখা প্রবল কুয়াশার কথা যেখানে নিঃশ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠে গ্র্যাভিটিবিহীন কিংবা বর্ষাতে জলভরা মাঠ। চৈত্রে-বসন্তে রোদ,ফুল-পাখি। কিন্তু কুয়াচ্ছন্ন দিনে লিখিনি কি মাঝরাতে ক্রমশ ঘেমে উঠা পিঠের কথা কিংবা বৃষ্টির দিনে উটেরা কী করে? পুরোনো উত্তরের মতো “একটি ধানগাছ হতে প্রায় চুরাশিটি ধান হয়’’ অথবা কার্তিক মাসেই সবচেয়ে বেশী উল্কাপতন দেখা যায়।

২।
অঙ্ক প্রশ্নপত্রে সত্তুর নম্বর পাওয়ার জন্য সপ্তাহজুড়ে আমাদের মরীয়া লড়াই,ঘুমের বিরুদ্ধে,ঘামের বিরুদ্ধে আমাদের সারারাত বসিয়ে রাখে টেবিল চেয়ারে। আমরা সারা রাত ভরে লাল ফুল-ঝুটিওয়ালা মোরগের মত একের পর এক ঠোকর দিয়ে যাই টেবিলের ওপর। আর রাত শেষে বুক চিতিয়ে হাটি। একসময় কত যত্ন ছিলো পরীক্ষার দিনগুলোতে। মেট্রিকের সময় পাচওয়াক্ত নামাজ, আগের রাতে পর্যাপ্ত ঘুম, ঘুমানোর আগে পেনসিলটা শার্প করা, লাল-নীল নতুন কলম ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন ঘুমাতে যেতে ৩-৪টা বাজে, দু’ এক ঘন্টা ঘুমানোর অবসরের পরই দৌড়াদৌড়ি আর ঘুমাতে ঘুমাতে পরীক্ষা দেওয়া। এক্সাম শেষে মনে হয় লর্ড। যা ইচ্ছা তা করবো,ইচ্ছেমতো ঘুরবো,খাবো,দাবো,কলকলাবো-অন্তত একটা দিন। যেন স্ট্যানলির কোন ফ্যান্টাসি মুভ্যি দেখার পর বালকের নায়কোচিত চরিত্রিত হবার বোকা বোকা স্বপ্নদৃশ্য। যার মনে নাই,আরেকটা সিলেবাসের পড়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, একদিন পিছিয়ে যাওয়া মানে একটা এক্সামেই পিছিয়ে যাওয়া।

৩।
পরীক্ষা সংক্রান্ত এইসব জটিলতা দিয়ে প্রলাপ হয় না।প্রলাপে প্রয়োজন ড্রাগনের গল্প যে কীনা চুরি করে নিয়ে গেছে সবুজ-মণিওয়ালা মুকুটের রাজকণ্যাকে।যাকে খুজতে বেরিয়েছে রাজকুমার।তারপর সোনারকাঠি-রুপারকাঠি বদল,রাজকণ্যার জেগে উঠা,কাছের কথা বলে দূরে চলে যাওয়া ড্রাগনের হাউ-মাউ-খাও,রাজকণ্যার উপস্থিতে বুদ্ধি বলে গোলপুকুরে নায়কের ডুব,কাঠের ঘর-রূপোর সিন্দুক-খাচা-সোনার কৌটা,যার ভেতরে থাকে প্রাণভোমরা। এরপর ডান পাখা ছিড়লে ছিড়ে ড্রাগনের ডানা,বাম পা ছিড়লে বাঁ।শেষে মুন্ডুপাত করে রাজকণ্যাকে উদ্ধারকার্য সম্পন্ন করার পর অর্ধেক সম্পত্তি আর ধুম ধাম বিয়ে।অবশেষে তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো।
প্রশ্ন হলোঃ রাজপুত্ররাই কেন চিরকাল রাজকণ্যাকে পায়? “বিজয়ীরা বরাবর ভগবান এখানেতে” বলে?

৪।
এইসব প্রশ্নও থাকুক। আমার ইচ্ছা হয় সন্ধ্যা হলে বাতি নিভিয়ে অন্ধকার ঘরে বসে শুনি সাকেত সাহুর বেহালা।শাস্ত্রীয় সংগীতের অবাক এই দিক।কেবল সন্ধ্যাতেই ভালো লাগে।আর কখনোই না।আর মনে পড়ে ভাস্করের কবিতা।
আর পাশ থেকে কে যেন ফিসফিস করে বলে,
“শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব –
প্রতি সন্ধ্যায়
কে যেন ইয়ার্কি করে ব্যাঙের রক্ত ঢুকিয়ে দেয় আমার শরীরে –
আমি চুপ করে বসে থাকি – অন্ধকারে
নীল ফানুস উড়িয়ে দেয় কারা, সারারাত বাজি পোড়ায়
হৈ-হল্লা – তারপর হঠাৎ
সব মোমবাতি ভোজবাজির মতো নিবে যায় একসঙ্গে
শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিন মাস ঘুমিয়ে থাকবো’’
৫।
আমারও ঘুমোতে ইচ্ছে করে ব্যাঙের মতো।সুগন্ধীময় স্বপ্নবিহীন,দুঃস্বপ্নবিহীন।

৪০৯ বার দেখা হয়েছে

৩ টি মন্তব্য : “প্রলাপ-১২”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    যথারীতি সুস্বাদু প্রলাপ। :boss: :boss:
    এই পর্যবেক্ষণের সাথে দ্বিমত :

    শাস্ত্রীয় সংগীতের অবাক এই দিক।কেবল সন্ধ্যাতেই ভালো লাগে।আর কখনোই না

    ভৈরব, ভৈরবী ,টোডি নিশ্চিতভাবে সকালের রাগ। সকালেই সবথেকে ভাল লাগে। 🙂

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।