কৈশোর

56

রাত দুইটার সময় যদি কেউ ঘুম ভাঙিয়ে বলে “স্যার আপনারে ডাকে”-তাহলে কেমন মেজাজ গরম হয়!ঠিক সেই ঘটনাই ঘটলো!রাত দুইটায় হাউজ বেয়ারা গফুর ভাই দরোজা ধাক্কিয়ে ঘুম ভাঙালো,বললো
-আপনারে স্যার ডাকতাসে!
-“স্যার মানে?কোন স্যার?”আমার গলায় তীব্র বিরক্তি!
-ডি এম সাবের স্যার।স্যার ওইখানে খাড়ায়া আছে।
জানালায় দাঁড়িয়ে দেখলাম ডি এম রুমের লাইটা জ্বালানো,বাইরে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে!সাবের স্যার,ক্যাডেট কলেজে সবচেয়ে অপছন্দ করি এমন স্যারদের একজন।আমাদের ইংরেজী পড়ায়।পড়ায় মানে ক্লাসে আসে আর কি!পড়াশোনা কিচ্ছু নাই!আর ক্যাডেটদেরও নাক একটু উঁচু,ইংলিশ ভার্সনে পড়ি…ইংরেজী তো আমরা পারিই!তাই স্যারও অবসরে শুধু কার কী ফল্ট আছে এইসব খুঁজে বেড়ায়!আর সবসময় দেখেছি ইংলিশ ডিপার্টমেন্টটাই বজ্জাত হয় সবচেয়ে বেশী।আর ইয়াং টিচারদের গ্রুপদেরও নাম থাকে আলাদা,যেমন বন্ড,ডগ স্কোয়াড ইত্যাদি!
অতএব স্যারও সেইরকম,ইয়াং আর ইয়াং টীচারদের যতগুলো দোষ আছে সব উনার মাঝে আমরা পাই!সারাক্ষণ ক্যাডেটদের জ্বালায়,এইটা ওইটা দোষ নিয়ে পড়ে থাকে!আর আছে বিখ্যাত ঝটিকা অভিযান!হঠাৎ করে একদিন এসে লকার সার্চ শুরু করবে।ফোর্থ লকারের ঘুপচিতে লুকানো নোংরা ময়লা মোজা থেকে শুরু করে এমপিথ্রি,মোবাইল,হিটার-সব ওনার টার্গেটের অন্তর্ভুক্ত!একবার নাকি এক ক্যাডেট স্যার আসতেসে শুনে তাড়াতাড়ি করে mp3 রাখসিলো আন্ডারওয়্যারের ভেতরে-এইজন্যা যে স্যার হয়তো ওই জায়গা সার্চ করবে না!আর ব্যাটা খবিস।এসে সরাসরি বলে তোমার ওইটা এমন ঊঁচা হয়ে আছে কেন? আর বেচারা লজ্জায় ভয়ে কান্নাকাটির মতন অবস্থা…মনে মনে ভাবি যদি mp3 টা না থাকতো!
এই হচ্ছেন স্যার!আর রাত দুইটার সময় সে ক্যাডেটদেরকে ডেকে পাঠাবে ইনভেস্টিগেশনের জন্য সেটা তো নিতান্তই স্বাভাবিক!এটাও বুঝলাম অবস্থা বেশী সুবিধার না।মনে মনে একটু হিসাব করে নিলাম কাহিনী কী হতে পারে।ক্যাডেট হিসেবে আমি তেমন ডিসিপ্লিন্ড নই!কিন্তু এটাও সত্য যে আমার সাহসও নেই তেমন!অতএব কোন ইলিগ্যাল আইটেম রাখার মতন অবস্থাও আমার না!ভেবে দেখলাম গত এক্সপ্তাহের মাঝে খালি মাঝরাতে ক্রিকেটা খেলা ছাড়া উল্টা পাল্টা কিছু করিও নাই!আর হতে পারে কাঠাঁল খাওয়া।গত বৃহস্পতিবার ডিনার শেষে হাউজে আসার সময় পোলাপাইন কাঠাঁল নিয়ে আসছিল,রাতে খাওয়ার সময় আমি গার্ড দিয়েছিলাম!সেটা তো ধরা খাওয়ার কথাই না!আমি নিজে গার্ড দিচ্ছিলাম-অতএব সে রকম কিছু হলে অবশ্যই আমার চোখে পড়তো!
তবুও মনে খুব একটা সাহস আনতে পারলাম না!এড়াবার জন্য বেয়ারাকে বললাম, “গিয়ে বলেন ঘুমাইতেসি!”
-আমারে কইসে ডাইক্যা তুলতে,না গেলে নিয়া যাইতে!
-আরে,বলেন উঠে না!
-তাইলে তো আবার পাঠাইবো!”-গফুর ভাই নাছোড়বান্দা!
এবার আমি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি,”ফাইজলামি নাকি!রাত দুইটার সময় ঘুম ভাঙ্গায়া যাইতে ডাকে,ওয়ারেন্ট আছে কোন?”
-ওয়ারেন্ট ফোয়ারেন্ট বুঝি না,ভাই তুমি যাও,না গেলে পরে হে আইবো!
-আসুক আমি যাবো না!এখন ঘুমাবো!
মুখে এটা বলি ঠিকই,কিন্তু দাঁড়িয়ে শার্ট জড়িয়ে নিলাম গায়ে!তারপর চললাম দোতলায়!ডি এম!আমার চিল্লাচিল্লিতে দু’একটা পোলাপাইন জেগে উঠেছে।ওদের মুখে স্পষ্ট বিরক্তি!সৌরভ জিজ্ঞেস করলো,কি হয়সে দোস্ত?
-আরে কিছু না,সাবু ডাকসে!
সাবু হইল সাবের স্যার এর নাম!তবে সব স্যারেরই আমাদের কাছে একটা গোপন নাম থাকে…এই নাম কেবল ক্যাডেটদের ভেতরেই ইউজ করা হয়!
তাকিয়ে দেখি ওরা আবার ঘুমিয়ে পড়েছে!অগত্যা আমি রওয়ানা হলাম।যেতে যেতে গফুর ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম “কিছু জানেন নাকি?”
গফুর ভাই হেসে বলে,নারে ভাই,আমি জানবো কেমনে?
-দেখসেন,ব্যাটা আপনাদেরও ঘুমাইতে দেয় না!
এইসব বলে গফুর ভাইয়ের মন ভেজাবার চেষ্টা করি!গফুর ভাই শান্ত জবাব দেয়-“এইটা তো আমাগো ডিউটি”
কী সুন্দর প্রবোধ!নিজের ডিউটি পালনে কী সচেতন!আর আমরা-কিভাবে কেমনে লাইনচ্যুত হওয়া যায় সেই দিকে প্রবল সজাগ!এই হাউজ বেয়ারাদের মাঝে মাঝে খুব আপন মনে হয়!গত ছয় বছরে কত টিচারদের পেয়েছি…অথচ কারোর জন্য কোন ফিলিংস নাই!আর টিচারদের সম্পর্কে বিতৃষ্ণা জন্মেছে বেশি!স্যাররা কেমন যেন আমাদের শত্রু ভাবে!কাকে কোনদিক থেকে বাঁশ মারতে পারবে,কাকে ইডি দিতে পারবে,জরিমানা করে হিরো হতে পারবে সে চেষ্টায় মগ্ন!আমরা এগুলোকে বলি প্রমোশনের লাইন ক্লিয়ার!তবে সিনিয়র টিচাররা কিছু আছে এসব থেকে ভিন্ন!ক্ষমা,নরম কথা,মোটিভেশন লেকচার ইত্যাদিই তাদের যথেষ্ট!আর ক্যাডেটরাও এই কথা দ্বারা ইনফ্লুএন্সড হয় খুব!শুধু তাদের বুঝিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় একবার!এইসব ভেবে ক্যাডেটদের খুব মহৎ মনে হয়!তবে ব্যাতিক্রম যে নেই,তা না!কিছু মানুষ তো আছেই মহত্ত্বক্ব দুর্বলতা ভাবে!তবে গণতন্ত্রী ক্যাডেট সমাজে এরা তেমন পাত্তা পায় না!
আর বেশীর ভাগ টিচাররাই…বড় ভাইয়ের মতন বয়স,এসে বলে আমরা তোমাদের বাবা মার মতন!আমাদের রেস্পেক্ট করবা!শুনলেই গা জ্বলে যায়!জুনিয়র থাকা অবস্থায় এদেরকেই দেখতাম,প্রিফেক্টরা যখন আমাদের চার্জ করতো…এঁনারা হয়তো পাশে দাঁড়ায়া দেখতো!যেই কলেজ একটু চেঞ্জ হলো,হেড কোয়ার্টার থেকে আদেশ আসলো চার্জ করা যাবে না,এঁরা তখন হয়ে গেলো মোহব্বত ম্যান টু রেসকিউ!তাহলে এতদিন এদের এই মমতা কই ছিলো?খালি একটা হুজুগ পেলেই হয়!
এইসব ভাবতে ভাবতে মনটা বিষিয়ে উঠলো!

নিচে নেমে দেখি স্যার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে হাতে সিগারেট….

(চলবে)
(অফটপিকঃছবিটার জন্য এফ সি সি’র ঊৎসকে থ্যাঙ্কস)

২,৫৫৫ বার দেখা হয়েছে

৩৬ টি মন্তব্য : “কৈশোর”

  1. রাশেদ (৯৯-০৫)

    লেখা ভাল লাগছে। কলেজে যাবার আগে শেষ করবা??? নাইলে আমাদের অনেকদিন বসে থাকতে হবে। লেখাটা পুরাতন কথা মনে করায়ে দিচ্ছে। গফুর ভাই তাইলে এখন মেঘনায়। আরেকটা কথা উপরের ছবিটা কলেজের ঠিক কোন জায়গা থেকে তোলা হয়েছে?


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
  2. তানভীর (৯৪-০০)

    গফুর ভাই ছিলেন বেশ ভালোমানুষ টাইপ। আমাদের হাইসে ছিল ইউনুস ভাই আর মোবারক ভাই। কলেজের দিনগুলার কথা মনে পড়ে গেল। 🙁

    সিরিজের শুরুটা ভালো হয়েছে। পরের পর্বগুলো দিতে দেরী কইর না।

    জবাব দিন
  3. রেশাদ (৮৯-৯৫)

    লেখা ভালো হইসে, কিন্তু ভাইয়া একটু সাবধান হলে হতোনা?
    এখনো যেহেতু তুমি কলেজেই আছো, স্যারদের নিকনেম ইউজ করা কি ঠিক হচ্ছে?
    ভালো থাকো ভাইয়া আর আমার মত হলো নিকনেম পালটে দাও। দেখি অন্যরা কি বলে...

    জবাব দিন
  4. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    ভ্যাকেশন আছেই আর ২/৩ দিন। এই পোলা শিওর ঝুলায়া রাখবে...grr..

    পড়ার সময় ভেবে নিয়েছিলাম নামগুলো কাল্পনিক...যদি না হয়, শুধু নিক রাখার পক্ষে ভোট দিলাম...


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  5. রকিব (০১-০৭)

    শাহরিয়ারের ব্যাঞ্চাই। এমন এক জায়গায় নিয়া ঝুলাইছো !!!! 😡 😡 😡
    পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
    অফটপিকঃ ছুটি শেষ কবে??


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  6. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    এইখানে কেউ লেখা শেষ করে! x-(
    অই হারামি, যা গিয়া তোর মাস্ফু ভাইয়ের কাছ থেইকা লুংগিটা নিয়া পইড়া আয়। পাংগাইয়া লাল কইরা ফালামু।


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।