পাতালে গিয়ে হাস ধরার গপ্পো

গত ১৯ মার্চ শুক্রবার, কলেজের পোলাপাইনের সাথে ব্যাপক গুল্গুল-কিল্কিল করে রাতে বাসায় ফেরার পর থেকেই হাল্কা হাল্কা পেট ব্যাথা শুরু। শরমে বউ’রে কিছু বললাম না, বদ-হজম জাতীয় ব্যাপারে টিপ্পনী শুনতে কার ভাল লাগে। সারারাত বেশ ভালই কষ্ট হল, রাতে ঘুম একদমই হচ্ছিল না। বউয়ের কাছে ব্যাপারটা আর লুকানো গেল না। এমনিতে গ্যাস্ট্রিক জনিত সমস্যা থাকার দরুন বউ আমারে “গিয়াসের বাপ” ডাকে … সে রাতে আমার একটু সিরিয়াস অবস্থা দেখে খুব একটা রসিকতা না করে সেবা করাই মনঃস্থির করল।

শনিবার সকালেও অবস্থা যেই কি সেই। এর মধ্যে সেকলো গিল্লাম, লিকুইড এন্টাসিড গিল্লাম, পেট ব্যাথা আর কমে না। আমার বিল্ডিংএর ৫তলায় মঞ্জুর (মকক ৯২-৯৮) থাকে। মঞ্জুর, মঞ্জুরের বউ আর আমার বউ মিলে খুব চেষ্টা করল আমাকে সিএমএইচ’এ নিয়ে যাবার, কিন্তু বাচ্চা পোলাপাইনের মত পেটের ব্যাথা নিয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত গিয়ে “কামান দাগার” কোন ইচ্ছাই আমার ছিল না।

অবশেষে আমার বউ মির্জাপুর ৩০ তম ব্যাচের সবার ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান মাশরুর (মকক ৯২-৯৮, বাবা শুলভ যত্নবান আচরণের জন্য যার নিকনেম হচ্ছে “আব্বা”) কে ফোন দিল। রাতের খাবারের পর মাশরুর এসে পেট টিপাটিপি করে বলল, দোস্ত চল, তোর এপেন্ডিসাইটিস হইছে … মাশরুর এর কথা আমার কাছে বেদবাক্য স্বরুপ, তাই আর দেরী করলাম না।

রাতেই ভর্তি হলাম আর কর্তব্যরত সার্জন এসে বলে গেলেন কাল সকাল ১০০০ টায় অপারেশান। মাশরুর, মঞ্জুর, মঞ্জুরের বউ আর আমার বউ হাসি দিয়া টাটা দিয়া চলে গেল।

ঘুমের অসুধের কল্যাণে রাতের ঘুমটা ভালই হল। সকালে ঘুম ভাংতেই বউ কে মাথার পাশে দেখে খুব আশ্বস্ত বোধ করলাম। মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট এসে ওটি’র ড্রেস আর একটা ওয়ান টাইম রেজর দিয়ে গেল। রসিকতা করে বললাম “পরিস্কার আছে, লাগবে না … নাকি ডক্টর থোতার ফ্রেঞ্চ কাট ফেলে দিতে বলছে ??” “পরিস্কার থাকলেও এক ঘষা দিয়া নেন স্যার” বলে মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট চলে গেল, আর আমি এক ঘষা দিতে বাথরুম … ফিরে আসার পর কাগজ সাইন করলাম “এনেস্থেসিয়া’তে আমি রাজী” টাইপ কিছু একটা … পড়ে দেখি নাই।

পৌনে দশটার দিকে ডাক পরলে নিজে নিজে হেটে ওটিতে ঢুকলাম। ভেতরে তিনটা বেঞ্চি পাতা, এরই একটাতে শুয়ে যেতে বলা হল। বুঝলাম যুদ্ধক্ষেত্রে’র জন্য সর্বদা প্রস্তুতির জন্যই হয়ত এটা ফিল্ড কন্ডিশান টাইপ ওটি। শুয়ে পরার পর বেঞ্চির দুপাশে দুটা আড়াআড়ি কাঠ লাগানো হল, অনেকটা যিশু’র ক্রুশ এর মত। আমার হাতদুটো ছড়িয়ে দেয়া হল তাতে।

ডান হাতের দিকে তাকিয়ে আছি, হঠাৎ “পাইছি পাইছি, ধর ধর, দে দে” শুনে বাম হাতের দিকে তাকিয়ে দেখি দুই মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট আমার হাতে ক্যানিউলা লাগাচ্ছে। ক্যানিউলা লাগানোর মত ভেইন খুজে পেয়ে “পাইছি পাইছি”, চাপ দিয়ে ফুলানোর জন্য “ধর ধর” আর ক্যানিউলা ঢুকানোর আহবান হচ্ছে “দে দে”। “এইটাতে হবে না” বলেই ঘ্যাচাং করে লাগানো ক্যানিউলা খুলে ফেলে আরেকবার “পাইছি পাইছি, ধর ধর, দে দে” … “নাহ এইটাতেও হবে না” … আমি যখন ৩য়বার “পাইছি পাইছি” শোনার অপেক্ষায়, তখন ওটিতে প্রবেশ করলেন এনেস্থেটিস্ট কর্নেল … হাল্কা হেসে তিনি দুই মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট কে থামিয়ে আমার ডান হাতে ক্যানিউলা পরালেন। বুঝলাম ওরা এপ্রেন্টিস … এখনো শিখছে।

পা দুটো লম্বা করে আমাকে বসিয়ে দিলেন স্যার। পরম মমতায় ‘পিপড়ের কামড়’ দিলেন নীচ থেকে ৫ নম্বর কশেরুকায় … শরীরের নীচের অংশ অবশ হয়ে যাবে, যাচ্ছে … আমার বুকের উপর আড়াআড়ি পর্দা টানিয়ে দেয়া হল। “এইখানে কাটবে … না দেখিস এইখানে কাটবে” শুনে যখন আরেকবার ক্যানিউলার ঘটনা মনে পরল (অপারেশান এর পরে আমার বউ আমার সেলাইয়ের আশেপাশে দুইটা কলমের দাগ আবিস্কার করে) ঠিক তখনি ওটিতে প্রবেশ করলেন আমার অপারেটিং সার্জন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল … হাসিমুখে ওদের সরিয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। আমি আশ্বস্ত হলাম।

“তাইফুর, তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি …” শোনার সাথে সাথেই মনে হয় আমি ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।

এরপর যেখান থেকে আমার মনে আছে তা হল, আমাকে চাকা লাগানো বেডে করে ওই দুইজন মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে। আমি চোখ মেলতেই একজন আমাকে প্রশ্ন করল “স্যার আপনি র‌্যাবে কত তে ?? আপনার ফোন নাম্বারটা একটু দেন” খুব খুশী মনেই ফোন নাম্বার দিলাম আর আশ্বস্ত করলাম তার কাজ টা আমি করে দেবার যথেষ্ট চেষ্টা করব বলে। নিজের নাম্বার ঠিক ঠিক বলে বুঝতে পারলাম আমার সেন্স, সেন্সের মতই ফিরেছে। মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট এর কাছে মোবাইলটা ধার চাইলাম … বউ’কে ফোন দিলাম … “ও বউ … আস … কাজ শেষ”

পোস্ট অপারেটিভে আমাকে শুইয়ে দেবার পর নিজের শরীরের নীচের অংশে হাত দিয়ে, “বিকেল বেলা বাজারে গিয়ে সকালে জবাই করা গরুর মাংশ হাত দিয়ে যেই ফিলিংস” সেই ফিলিংস হওয়ায় (নিজের শরীর স্পর্শ করলে আংগুল আর ওই অংশ, দুই অংশেই আওয়াজ দেয়। শুধু আংগুল আওয়াজ দিল, অপর প্রান্ত কোন সিগনাল দিল না) বুঝলাম এনেস্থেসিয়ার প্রভাব তখনও কাটে নাই। সেই এনেস্থেসিয়া কাটল রাত দশটার পর … বউয়ের আগেই আমার সিজার হইল বইলা পোলাপাইনের হাসাহাসিতে আমিও …

২২ তারিখ ওয়ার্ডে দিয়ে দেয়া হল … ২৮ তারিখ সকালে একমাসের সিকলীভ দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হল … এখন আমি আল্লাহর রহমতে পুরাই সুস্থ্য এবং পেনশন টাইপ সকল সুবিধা সহ বিশাল ছুটি ভোগ করছি।

(গুজব গুঞ্জন যাই থাকুক আমি বিশ্বাস করি আমাদের সিএমএইচ এর ডক্টর’রা অসাধ্য সাধন করতে পারেন। অন্তত আমার মা’কে যখন বাইরের প্রায় সব ডাক্তার’রাই “আর কিছু করার নেই মনে হয়” বলে অসহায় আমার হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন তখন এই সিএমএইচ’ই আমার মায়ের দায়িত্ব নিতে পিছ পা হয় নি … বরং আমার কাছে আমার মা’কে সুস্থ্য করে ফিরিয়েও দিয়েছিল। লেখার কোন অংশে পাঠকের যেন মনে না হয় আমি সিএমএইচ’কে খাটো করার চেষ্টা করেছি)

৭,৪৮৭ বার দেখা হয়েছে

১১১ টি মন্তব্য : “পাতালে গিয়ে হাস ধরার গপ্পো”

    • তাইফুর (৯২-৯৮)

      রকিব্যা
      দুইটা প্রশ্নের উত্তরই লেখাতে আছে ... 😀

      বউয়ের আগেই আমার সিজার হইল বইলা পোলাপাইনের হাসাহাসিতে আমিও
      এখন আমি আল্লাহর রহমতে পুরাই সুস্থ্য এবং পেনশন টাইপ সকল সুবিধা সহ বিশাল ছুটি ভোগ করছি

      (সম্পাদিত)


      পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
      মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

      জবাব দিন
  1. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    পানি খাওয়ার উপযুক্ত হইছেন নাকি এখনো সেলাইয়ের ফুটা দিয়া লিক করে ! 😛


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  2. আহমদ (৮৮-৯৪)
    (গুজব গুঞ্জন যাই থাকুক আমি বিশ্বাস করি আমাদের সিএমএইচ এর ডক্টর’রা অসাধ্য সাধন করতে পারেন। অন্তত আমার মা’কে যখন বাইরের প্রায় সব ডাক্তার’রাই “আর কিছু করার নেই মনে হয়” বলে অসহায় আমার হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন তখন এই সিএমএইচ’ই আমার মায়ের দায়িত্ব নিতে পিছ পা হয় নি … বরং আমার কাছে আমার মা’কে সুস্থ্য করে ফিরিয়েও দিয়েছিল। লেখার কোন অংশে পাঠকের যেন মনে না হয় আমি সিএমএইচ’কে খাটো করার চেষ্টা করেছি)

    :boss: :hatsoff: :salute:


    চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

    জবাব দিন
  3. রকিবুল ইসলাম (৯৯-০৫)
    বউয়ের আগেই আমার সিজার হইল বইলা পোলাপাইনের হাসাহাসিতে আমিও

    :khekz:
    “গিয়াসের বাপ” =))
    লুলু পাগলের গল্পের বাকীটা কই??
    আগে শেষ করেন নাইলে কিন্তু :chup: :chup:

    জবাব দিন
  4. রেজওয়ান (৯৯-০৫)

    পানি খাওয়ার এবং খাওয়ানোর উপযুক্ত হইছেন নাকি এখনো সেলাইয়ের ফুটা দিয়া লিক করে !
    😉 😉
    লুলু পাগলের গল্পের বাকীটা কই?? 😡
    সহি সালামতে ফিরছেন এটাই বড়ো কথা। :boss:

    জবাব দিন
  5. রুম্মান (১৯৯৩-৯৯)

    বস কি এখন টাংগাইলে?সুযোগ পাইলে আওয়াজ দিয়েন।দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।আর শরীরটারে একটু ক্ষেমা দিয়েন।বেশী দৌড়দৌড়ি কইরেন না।এই সময়ে (কোন সময়ে?কাটাকাটির সময়ে আর কি;সিজারের ব্যাপারটা কি আমি জুনিয়র হয়ে বলতে পারি 😉 ) ঐ বেচারারে একটু শান্তি দেন।জীবনে তো বহুত অত্যাচার করছেন। (সম্পাদিত)


    আমার কি সমস্ত কিছুই হলো ভুল
    ভুল কথা, ভুল সম্মোধন
    ভুল পথ, ভুল বাড়ি, ভুল ঘোরাফেরা
    সারাটা জীবন ভুল চিঠি লেখা হলো শুধু,
    ভুল দরজায় হলো ব্যর্থ করাঘাত
    আমার কেবল হলো সমস্ত জীবন শুধু ভুল বই পড়া ।

    জবাব দিন
  6. শাফি (০২-০৮)

    আপনার মতো একই অভিজ্ঞতা আমার হইছিল ২০০৭ ডিসেম্বর এ। আমার বেলায় প্রথমে পেট বেথা নিয়ে সিএমেইচ গেসলাম, জন্ডিস এর চিকিৎসা নিয়ে ফিরে আসছি। এরপরে আবার একই ব্যাথা নিয়ে যেয়ে অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন করায় আসছি।প্রথমবার ওয়ার্ড এ অ্যাটেন্ডেন্টরা সার্জনদের নিয়ে যেসব ভয়ঙ্কর গল্প বলছিল, নিজের অপারেশন এর সময় খুব ভয়ে ছিলাম যে কি কাটতে কি কেটে ফেলে। ঘুম ভাংগার পরে প্রথমেই হাত দিয়ে আশেপাশের সব যন্ত্রপাতি ঠিক আছে কিনা চেক করে তারপরে আশ্বস্ত হইছি :shy: ;))

    জবাব দিন
  7. আশহাব (২০০২-০৮)

    অলরেডী দুইটা মেজর (অ্যানেস্থেসিয়া) অপারেশন কইরা ফেলছি 😀 দুইটাই ডি.এম.সি. 🙂
    তবে পোস্ট অপারেটিভ এর যে কষ্ট, আর ও.টি. যাইতে চাই না :no:
    তাইফুর ভাই সহিসালামতে ফিরেছেন এটাই বড় কথা :hug:

    জবাব দিন
  8. মেহবুবা (৯৯-০৫)

    ভাই আপনি যেই বর্ণনা দিছেন তাতেতো আমি ভয় পাইয়া গেছিলাম না জানি কি হইসে! 🙁 :-/
    আমারো এই কাহিনী হইসিল ক্লাস সিক্স এ থাকতে।আমারেও সি এম এইচ এই কুরবানি করসিল।তয় পুরা পেথেডিন দিয়ে ঘুম পারাইসিল।আপ্নার মত পর্দা দেয়নি। 😀
    সাতদিন পর সেলাই কাটার পর ৯ম দিন থেকে স্কুল গেসিলাম। :-B :awesome:
    আপ্নিও যত ঘুরাঘুরি আছে কইরা ফেলান। :tuski: এইটাই সুযোগ কইলাম...মানুষের ২ বার এই জিনিস হয়না। 😀

    জবাব দিন
  9. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    এক মাসের ছুটির কথা শুনে আমারো এপেন্ডিক্স কাটাইতে মন চাইতেছে...

    লেখা পুরা উড়াধুরা :boss: :boss:


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  10. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)
    “পাইছি পাইছি, ধর ধর, দে দে”

    এইটাকে এইভাবে বললে কি বোঝায় : "পাইছি পাইছি, ধর ধর, মার মার"!!

    “এইখানে কাটবে … না দেখিস এইখানে কাটবে”

    এই ডায়লগটা কেউ এভাবে দিলে কি বোঝায় : “....... এইখানে মারবো … না দেখ এইখানে মারবো”??

    অপারেশান সাইরা তো দেখি তোমার ফূর্তি বাড়ছে!! ;;; ;;; ;;;


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।