দন্ডিতের সাথে, দন্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে …

অনেক দিন ধরে “ব্লগ লিখি, ব্লগ লিখি” করেও ব্লগ লিখা হচ্ছে না। সময়ের অভাব, টপিকের অভাব এবং সর্বোপরি “কোয়ান্টিটি নয় কোয়ালিটি”র চক্করে ঘুরপাক খেতে খেতে, কি-বোর্ড আর আঙ্গুলের শত্রুতা চিরস্থায়ী হওয়ার আগেই তাই উপস্থিতি জানান দেয়া টাইপ পোষ্ট … বিয়াপওক তাড়াহুড়ায় লিখা … তাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি দিয়ে পড়ার জন্য অনুরোধ করতেই পারি।

“দন্ডিতের সাথে, দন্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে,
শ্রেষ্ঠ সে বিচার”।

গত ২০ জুন ২০০৯ এর অনেকগুলো প্রচার মাধ্যমে প্রচার পাওয়া একটা ঘটনা নিয়ে আমার নিজস্ব কিছু মতামত প্রকাশ করছি। গত ০৪ জুন ২০০৯ তারিখে ১৫০/১ আরামবাগ ভবনের তিন তলার সিঁড়িতে ছুরিকাঘাতে খুন হয় নটরডেম কলেজের মানবিক বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র আজিজুল হাকিম। প্রাথমিক সন্দেহের তালিকাতে কলেজের দপ্তরি-দারোয়ান সহ প্রচুর নাম থাকলেও, খুনি হিসেবে তারই সহপাঠী ইমাম ইকবাল এর নাম ছিল সর্বাগ্রে।

গ্রেফতারের পর ইমাম ইকবাল খুনের দায় স্বিকার করে নিয়েছে। খুন হয়েছে, খুনী ধরা পড়েছে, বিচার প্রক্রিয়া চলছে … এখানেই শেষ করে দিলে চলবে কি ?? ঘটনা কেন ঘটল এবং এই ধরনের ঘটনার পূনরাবৃত্তি যেন না ঘটে তার জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই লিখতে বসা।

মফস্বলের ছেলে ইমাম ইকবাল, নটরডেম কলেজে ভর্তি হবার পর প্রথমবারের মত ঢাকায় আসে। কলেজে তার অন্য দুই সহপাঠী, যাদের রোল নম্বর ঠিক পর পর (ইমাম ইকবাল ৪১০২০২২, আজিজুল হাকিম ৪১০২০২৩ এবং ডেরিক রাও ৪১০২০২৪), সেই সুবাদে তাদের পাশাপাশি বসতে হত। ভর্তি হবার পর থেকেই গত একবছর মফস্বলের “আনস্মার্ট, গেঁয়ো” ইমাম ইকবাল’কে ডেরিক রাও আর আজিজুল হাকিমের কাছ থেকে অনেক অপমান ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়। (আমরা যারা ক্যাডেট কলেজের, তারা “টিজিং” কি জিনিস হতে পারে তা টিজ করে অথবা সহ্য করে খুব ভালই জানি।)

এই টিজিং এর কারনে ইমাম ইকবাল এর কাছে কলেজ ছিল জেলখানার মত। সে তার বড়ভাই মাহবুব (যে নিজেও নটরডেম কলেজের ছাত্র ছিল) কে অনেকবার এব্যাপারে বললে মাহবুব তাকে আস্বস্ত করেন, আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। টিজিং সইতে না পেরে ইমাম ইকবাল কলেজ প্রশাসন’কে মৌখিক ও লিখিত ভাবে বেশ কয়েকবার জানাবার পরেও ব্যাপারটার গুরুত্ব অনুধাবন না করে প্রশাসনিক ভাবে কোন সমাধান তারা দেন নাই। ইমাম ইকবাল এর মনে জমতে থাকে ক্ষোভ। এমন অবস্থায় সে অনেকটা নিরুপায় হয়েই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করে। বায়তুল মোকাররমের একটি দোকান থেকে সে ছুরি কিনে এবং সার্বক্ষণিক সাথে রাখে।

টিজিং এর ভয়ে কলেজে যেতে তার মন উঠত না। তাই মে মাসের উপস্থিতি তার অনেক কমে যায়। নিয়ম অনুযায়ি তার জরিমানা হয়। দরিদ্র পরিবারের সদস্য, জরিমানার টাকা দিতে না পারায় প্রথা অনুযায়ি তার শাস্তি হয় “ওয়ার্ক প্রোগ্রাম” (ঘাস কাটা, কলেজ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা)-এ অংশ নেবার। লজ্জাজনক এই শাস্তির লজ্জা এড়াতে ঘটনার দিন কলেজ ছুটির পর লুকিয়ে লুকিয়ে ইমাম ইকবাল কলেজে যায় ওয়ার্ক প্রোগ্রামে অংশ নিতে। তাতেও রেহাই পায়নি সে, কলেজে গিয়ে শুনতে পায়, ডেরিক রাও আর আজিজুল হাকিম তাকে নিয়ে ক্লাসে প্রচন্ড ব্যাঙ্গ করেছে। পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আর নতুন অপমানের বোঝা সইতে না পেরে সে কলেজের ভেতরে আজিজুল হাকিমকে খুঁজে বের করে এবং কথা বলার এক পর্যায়ে কলেজের বড় ভাইদের সহযোগিতায় সমাধানের উদ্দেশ্যে ১৫০/১ আরামবাগ ভবনের ছয়তলার মেসের দিকে নিয়ে যায়। এই মেসটিতে ইমাম ইকবাল একমাস আগেও থাকত। সিঁড়িতে উঠতে উঠতে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ইমাম ইকবাল সংগে থাকা ছুরি দিয়ে ……

স্কুল কলেজ গুলোতে টিজিং বন্ধ হোক, আমি আমরা যদি ভুল পথে হেঁটেও থাকি সে ভুল পথে যেন আর কেউ না হাঁটে। আর কোন আজিজুল হাকিম যেন অকালে প্রাণ না হারায়, আর কোন ইমাম ইকবাল যেন খুনী না হয় …

৬,৭৯৫ বার দেখা হয়েছে

৮১ টি মন্তব্য : “দন্ডিতের সাথে, দন্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে …”

  1. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    লেখককে চেনা চেনা লাগে! কোথায় দেখেছি বলেন তো?

    ফাঁকিবাজি পোস্ট দিয়ে প্রত্যাবর্তন মানি না। ফাঁকিবাজি নিপাত যাক, "আর্টসফিকশন" মুক্তি পাক।

    স্কুল কলেজ গুলোতে টিজিং বন্ধ হোক, আমি আমরা যদি ভুল পথে হেঁটেও থাকি সে ভুল পথে যেন আর কেউ না হাঁটে।
    একমত।


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  2. তানভীর (৯৪-০০)

    খবরটা আমারও দৃষ্টিগোচর হয়েছিল ভাইয়া। খুব মর্মান্তিক একটা ঘটনা।
    ছোট ছোট ঘটনা যে এক পর্যায়ে কত বড় ঘটনার সূত্রপাত করতে পারে এটা তারই প্রমাণ! আমাদের উদাসীনতাও এর পিছনে একটা বড় কারণ হতে পারে। কিশোর বয়সী মানুষদের সাথে আমাদের আরেকটু যত্ন সহকারে, একটু মনযোগ দিয়ে কথা বলা উচিত।

    অফটপিকঃ অনেক, অনেক পর লিখলেন। আপনাকে খুব মিস্‌ করছিলাম। :hug: :hug:

    জবাব দিন
    • তাইফুর (৯২-৯৮)

      দোস্ত,
      আমি নিজেও বলদের মত কলেজে বহুত পোলাপাইনরে ব্যাপক টিজ করতাম।
      এখন চিন্তা কইরা দেখি ... খামাখা কষ্ট দিতাম পোলা গুলারে।


      পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
      মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

      জবাব দিন
  3. রকিব (০১-০৭)

    অবশেষে ফিরে এলেন তাইফুর ভাই। ভাবী কেমন আছেন?

    স্কুল কলেজ গুলোতে টিজিং বন্ধ হোক, আমি আমরা যদি ভুল পথে হেঁটেও থাকি সে ভুল পথে যেন আর কেউ না হাঁটে।

    :thumbup:


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  4. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    মর্মান্তিক। ক্রাইম জিনিসটা আসলে বড়ই জটিল। একটামাত্র অপরাধের সাথে কতকিছু জড়িয়ে থাকে।
    যহোক তাইফুর ভাই, নিয়মিত লেখা চাই। ফাঁকিবাজি বন্ধ করেন।

    জবাব দিন
  5. ঘটনাটা শুনছিলাম, ‍ডিটেইল জানতাম না। এভাবে চিন্তা ‍করিনি... টিজিং আসলে পুরোপুরি বন্ধ করা খুব কঠিন, সচেতনতা বাড়ানো দরকার। বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগূলোতে প্রতিকারমূলক ম্যাকানিজম থাকা প্রয়োজন, অমবুডসপারসন বা ‍‍এই জাতীয় কোন পদ। এমন আর না হোক।

    জবাব দিন
  6. মাহমুদ (১৯৯৮-২০০৪)

    ওই সব নটরডেম ফটরডেম কলেজেই এইসব হইব...একসাথে পাংগা না খাইলে কারও জন্য কোনো ফিলিংস্ আসে নাকি?ক্যাডেট কলেজে সবাই সবাইরে টিজ করে,আর বিপদে পড়লে একজন আরেকজনের লাইগা জান দিয়া দেয়..

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।