পুরোনো পাতায়ঃ বরফের দেশের গল্প ১০

৪ মার্চ ২০১৪, বৃহস্পতিবার, সন্ধ্যা ৭টা
ইদানিং প্রথম আলো পড়ি না। আমি মনে করি এরচেয়ে সাদা বরফের দিকে চেয়ে থাকলে কিংবা কোমর ধরে উঠাবসা করলে যথাক্রমে চোখ ও স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। তারপরেও মানুষ বিগম্যাক কিনে কিংবা পান করে মনস্টার এনার্জি ড্রিঙ্ক তাই আমিও অসুস্থ স্বাদ পেতে প্রথম আলোর পাতায় ঢুঁ মারি। আজ ঢুঁ মারতেই খেলার পাতায় একটি লেখা চোখে পড়লো। আলোর মাঝে কালোর কষ্ট। কথায় বলে ব্যবহারে বংশের পরিচয়। আর আমি বলি, “প্রথম আলোর সংবাদ শিরোনামেই লেখকের পরিচয়।” উৎপল শুভ্র আরো একটি রসে ভরা ক্রীড়া সাহিত্য প্রসব করেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রথমেই একটি ছবি। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরীর পরে উল্লসিত আনামুল হক। তাকে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছেন অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রবাদ পুরুষ, বিবাহের উপযুক্ত পুরুষের তালিকায় আজীবন প্রথম স্থান অধিকারী, পূর্ব পাকিস্তানের কোটি — ৫ নারীর দিনরাত্রি এক করে দেবার ক্ষমতা সম্পন্ন, বুমবুম শহীদ আফ্রিদি ওরফে ম্যারী মি আফ্রোদিতি। যাক, প্রথম আলো পড়ছি নিশ্চিত হলাম। গতকাল বাঙলাদেশ ৩২৬ করেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জিততে পারেনি। ইদানিং মুশফিকের অতিরিক্ত রক্ষনাত্মক কাপ্তানগিরি নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। যাই হোক, কিছুটা পড়ার চেষ্টা করে একটু দূরে গিয়েই মাথা চুলকানো শুরু করলাম। ক্রীড়া প্রতিবেদন অথচ পূর্ণেন্দু পত্রী আর হেলাল হাফিজের উদ্ধৃতির ছড়াছড়ি। সাহিত্য পাতা পড়ছি না খেলার পাতা বোঝার উপায় নেই। মন্তব্যের ঘরে গিয়ে দেখি পাঠকদের প্রশংসায় একেবারে ভিজে গিয়েছে সবকিছু। মানে প্রতিবেদনটি। হাল ছেড়ে দিয়ে এসে পড়লাম। এই লেখা পড়ে শেষ করা সম্ভব না। খেলার পাতায় একটি লেখা। এতে নেই খেলা বিষয়ক কোন গবেষণা, কোন অনুসন্ধানী প্রশ্ন কিংবা কোন বিশেষ পর্যবেক্ষণ। প্রথম আলো দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র গুলোর একটি। শীর্ষস্থানীয় বলেই নিজেকে খোদা-ভগবান ভাবা শুরু করেছে বেশ কিছুদিন হলো।

মার্চ ৯, ২০১৪, রবিবার, বিকাল ৫টা ২৫মিনিট
মাঝে অনেক কিছু নিয়ে লেখার কথা ভেবেছিলাম। সময় সঙ্কীর্ণতায় হয়ে উঠলো না। “সময় সঙ্কীর্ণতা” এই বাক্যাংশটুকু প্রথম শুনেছিলাম লালমনিরহাটে। অফিস থেকে সৌরবিদ্যুৎ পরিদর্শনের কাজে গিয়েছিলাম। ২০১০ সালের কথা। গ্রামীন শক্তির ব্রাঞ্চ ম্যানেজার লোকটার নাম মনে নেই তবে বাড়ি গাইবান্ধা। খুব সুন্দর করে কথা বলতেন। কোন এক বাড়িতে চা-নাস্তার জন্য বসতে বললে উনি বলে উঠেন, “সময় সঙ্কীর্ণতায় আছি, আরেকদিন এসে খেয়ে যাব।” সেই থেকে কথাটি খুব মনে ধরে ছিল। যা বলছিলাম। ৪ মার্চের পর ছোটখাট অনেক কিছু হয়ে গিয়েছে যেগুলো নিয়ে ছোটখাট লিখালিখি করা যেত। এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের পরাজয়, প্রথম আলোর খেলার পাতায় পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সীমাহীন বন্দনা। তবে হ্যাঁ এর মাঝে ৪ তারিখে প্রকাশিত উৎপলের ক্রীড়া রসে তিন আঙুলের এক চিমটি লবণ ছিটিয়ে এসেছিলাম। ছোট একটি মন্তব্য করেছিলাম। কোন অশ্লীলতা ছিলনা। ছিলনা কোন ঘৃণাপ্রসূত উক্তি। তারপরেও প্রথম আলোর কথিত নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক বিধায় মন্তব্যটি প্রকাশ পায় নি। এরকম ঘটনা অনেকের সাথে অনেকবার হয়েছে। আমার সাথেও এর আগে একবার হয়েছে। ভুলে গিয়েছিলাম। একটি সংবাদপত্র তাদের পাঠকের গঠনমূলক-সমালোচনা-মন্তব্য অনলাইন খবরের পাতায় প্রকাশ হতে দিচ্ছে না—বাকস্বাধীনতা নিয়ে এরকম উৎকৃষ্ট মস্করা পৃথিবীর আর কোথাও করা হয় কিনা জানা নেই। ইংরেজীতে যাকে বলে, “irony at its best.” তবে সে যাই হোক, ফরজ বাদ দিয়ে এসব নফল নিয়ে টানাটানি বাদ দেই। দেশে সমস্যার শেষ নাই এদিকে আমি খেলার পাতায় মন্তব্য ছাপলো কিনা সে নিয়ে হইচই। দেশের ফরজ সমস্যাগুলোর আশু সমাধান হওয়া দরকার। মাঠে নামতে হবে হে জনগণ। জাগো বাহে কোনঠো সবাই? শেখ সাহেবের স্বাধীনতার ডাকের মাসে প্রত্যেক ঘরে ঘরে ফরজের দুর্গ গড়ে তুলতে হবে যাতে নফল-কর্মকারেরা বাঙলার মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। দেশ নিয়ে পাতা পাতা দিনলিপি লিখা আর দেশাত্ববোধের চারণভূমিতে ঘাস খাবার মাঝে কোন ফারাক নেই।

মিস্টার মার্কিন নেভি নাফিস উজরাত গিয়েছে পুয়ের্তো রিকো স্প্রিং ব্রেক উদযাপন করতে। ফেবুতে উষ্ণ তাপমাত্রার স্তুতি বর্ণনা করে স্ট্যাটাস, চেক-ইন দেখছি আর হিংসায় গা জ্বলে যাচ্ছে। তবে আশার কথা এখানে তাপমাত্রা অবশেষে নেমে এসেছে। তিন মাস পরে এই প্রথম আন্দ্রে সেলসিয়াস দাদু হেঁটে শূণ্যের এপারে দশ কদম চলে এসেছেন। ঋতু পরিবর্তনের এই সময়টায় প্রকৃতি হয়ে যায় কদর্য ও নোংরা। আধা গলা বরফ, গত তিন-চার মাসে ছিটানো লবণ-বালির মিশ্রণের সাথে মিশে গিয়ে কাঁদা হয়ে পড়ে থাকে রাস্তায়, ফুটপাথে। রাস্তার পাশে জমে থাকা বরফের গায়ে তখন গাড়ির চাকার কাঁদা পানির ছিটা। টিউলিপের অপেক্ষায় আছি। আশা করি এবারে সময় মতই ফোটার সুযোগ পাবে তারা। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানটি এভাবে হারিয়ে গেল কিভাবে ব্যাপারটা ঠিক মাথায় ঢুকছে না এবং মেনে নিতে পারছি না। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে মানব সম্প্রদায়ের কিছু অসহায়ত্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখি দেখিয়ে দিয়ে যায় এসব দুর্ঘটনা। মাত্র উড্ডয়ন করা একটি বিমান স্থলভাগের উপর থাকা অবস্থায় রাডার থেকে সম্পূর্ণ গায়েব হয়ে যাওয়া কিভাবে সম্ভব তা আমার ভোঁতা মাথায় ঢুকছে না। বিভিন্ন বিমান বিষয়ক উপন্যাস পড়ে যতটুকু অল্পবিদ্যা অর্জন করেছি সেই আলোকে জানি যে বোয়িং ৭৭৭ এর মত আধুনিক বিমানে দুই বা ততোধিক সাধারণ যোগাযোগ এবং জরুরী যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। এরা একে অন্যের সম্পূরক হিসেবে কাজ করে। সবকিছু একসাথে বিকল হয় কিভাবে জানা নেই। যন্ত্রপাতি বলে কথা। নাকি এখানে গুরুতর কোন কিছু লুকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে? দুইটি খোয়া যাওয়া পাসপোর্টে অন্য যাত্রী আরোহনের ব্যাপারটিও সন্দেহজনক। ৩০ ঘন্টার উপরে হতে চললো এখনো আস্ত কিংবা বিধ্বস্ত একটি বিমানের খোঁজ মিলছে না ব্যাপারটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে। ২১৭ জন যাত্রীর আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবের কথা চিন্তাও করতে চাইছি না। এর চেয়ে সরাসরি দুঃসংবাদ কানে আসা তুলনামূলকভাবে ভাল।

মার্চ ১০, সোমবার, ২০১৪ রাত ১১টা
অফিসের কলিগ ব্রায়ান রবিবার রাতে হঠাৎ ফোন করে বললো কালকে খালি আছি কিনা। তাহলে আমাকে নিয়ে স্ন‌ো-শুয়িং এ যাবে। এককথায় রাজি হয়ে গেলাম। স্প্রিং ব্রেকে গোটা শহর খালি। সবাই বেড়াতে গিয়েছে। আগেও বলেছি বড় ছুটিগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক এই শহর ভুতুরে শহরে পরিণত হয়। যা বলছিলাম, একটু আগে ব্রায়ানের বাসা থেকে ফিরলাম। যারা জানেন না তাদের জন্য বলছি, স্ন‌ো-শুয়িং হলো বরফের উপর দিয়ে হাঁটা। তবে সেই হাটার জন্য বিশেষ জুতো আছে। আসলে জুতো বলা ভুল হবে। আয়তাকার প্লাস্টিকের স্কেটবোর্ড, নীচে ইস্পাতের দাঁত লাগানো ও উপরে পরে থাকা জুতো ফিট করবার ব্যবস্থা। অভিজ্ঞতাটা অনেকটা অনেক বড় চপ্পল পরে বাচ্চারা হাটার চেষ্টা করলে যেরকম তার প্রায় কাছাকাছি। বেশ কয়েকবার পায়ে পা জড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছি। কপাল ভাল চারিদিকে নরম বরফ তাই ব্যথা লাগে নি। আমাদের সাথে ছিল ব্রায়ানের দুই সাথী কেটি ও লুসি। হাস্কি মা ও তার মেয়ে ল্যাব্রাডর-শঙ্কর। এখন পর্যন্ত যে কয়টি গৃহস্থালীর কুকুর দেখেছি তারমাঝে এরা সবচাইতে প্রশিক্ষিত। সবসময় শুনছে ব্রায়ান কি বলছে তাদের এবং সেই প্রেক্ষিতে নড়াচড়া করছে। মেয়ে লুসি আমার আশেপাশে অনেকক্ষণ ঘোরাফেরা করলো আদর পাবার আশায়। এতক্ষণে সন্দেহপ্রবণ দৃষ্টি চলে গিয়েছে। স্নো-শুয়িং শেষে ব্রায়ানের বাসায় গিয়ে গ্রিলে অরগানিক গরুর মাংসের প্যাটি ভাজলাম। এই দুর্গম এলাকায় ওয়ালমার্টের বিকট গন্ধযুক্ত বিস্বাদ গরু কেনা বন্ধ করেছি দেড় বছর। ব্রায়ান এলাকাবাসী বলে স্থানীয় কৃষকের সাথে যোগাযোগ করে মাঠে চড়ে বেড়ানো গরু বা মার্কিনি ভাষায় অরগানিক গরু বা বিলাতি ভাষায় ফ্রি-রেঞ্জ, হাইয়ার ওয়েলফেয়ার গরুর মাংস সংগ্রহ করে প্রতিবছর। বার্গারের স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে। ব্রায়ানের সাথে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমান নিয়ে বেশখানিকটা আলাপ হলো। আমি ভাবছি দৈর্ঘ্যে ২০৯ ফিট ১ ইঞ্চি, প্রস্থে ২০ ফিট ৪ ইঞ্চি, খালিপেটে ওজন ১৩৪,৮০০ কেজি, বোয়িং ৭৭৭-২০০ বিমানটি সর্বসম্মতিক্রমেই গায়েব হয়েছে কিনা কে জানে। অতলান্তিকের এপারের কাকাবাবুরা গুপ্তচর উপগ্রহ দিয়ে ইরানের বেকারীর উপর নজরদারী করতে পারলে একটি বিমান খুঁজে দেয়া তো ডালভাত। তিন দিন হয়ে গেল হদিশ নেই। বিমানের যাত্রী, চালক, কর্মীদের পরিবার পরিজন কিভাবে দিন কাটাচ্ছে সেটা চিন্তা করার সাহসও পাচ্ছি না।

বাঙলাদেশ ক্রিকেট দলের জার্সি আবার পরিবর্তিত হয়েছে। এটা শুধু টোয়েন্টি২০ বিশ্বকাপের জন্য নাকি সামগ্রিক পরিবর্তন তা আর জানা হয় নি। বেশখানিকটা কমলার উপস্থিতি নতুন জার্সিতে। একটি ভিডিও দেখলাম সেখানে একজন ব্যাখ্যা করছেন জার্সির নকশা স্মৃতিসৌধ ও বাঙলাদেশের স্বাধীনতায় অনুপ্রাণিত হয়ে করা। বেশখানিকটা খুটিয়ে দেখে স্মৃতিসৌধ বা স্বাধীনতা যুদ্ধের অনুপ্রেরণা খুঁজে না পেয়ে হাল ছেড়ে দিলাম। এদিকে আমার কেন যেন মনে হয় বাঙালীর রসবোধ দিনকে দিন লোপ পাচ্ছে। অবশ্য মতিকন্ঠের মত স্থূল ব্যাঙ্গ আক্ষরিক অর্থে নেয়ার মত মানুষ থাকলে ফেবুর ক্রিকেটরঙ্গ গ্রুপের সূক্ষ্ম ব্যাঙ্গাত্মক লেখা ধরতে না পারাটাই স্বাভাবিক। গতকাল প্রমাণ পেলাম যখন দেখলাম সম্ভাবনাময় খেলোয়ার জিয়াউর রহমানের মূল দলে ঠাঁই না হওয়া নিয়ে একজন হতাশ হয়ে ব্যাঙ্গাত্মক পোস্ট দিয়েছে। আর যায় কোথায়? সেটাতে মানুষজন তাকে বিভিন্ন উপাধি, প্রাণিকূলের সন্তানাদীতে রূপান্তরীত করে ফেললো নিমেষে। ঘন্টাখানেক পরে আরো কিছু সদস্য বুঝতে ও মন্তব্য করতে শুরু করলো যে এটা তো ব্যাঙ্গাত্মক পোস্ট!
… নিরেট বিনোদন।

১১ মার্চ ২০১৪, মঙ্গলবার, বিকাল ৫টা
অফিসে এসেছি পড়াশুনা করতে। অফিসের এক দেশী সহকর্মীর জ্বালায় পড়াশোনাটা ঠিক করা হচ্ছে না। ভাবলাম কেটে পড়ার আগে দুই-চার লাইন লিখে নেই। সকাল থেকে একটা ছবি ঘুরেফিরে দেখছি। আকাশ থেকে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজকে দেখার সুযোগ কখনো হয়নি। সেটাও গতকাল করে দিল বাঙলাদেশ বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার পাইলট আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ফারাবী। আমাদের দুই ব্যাচ ছোট এই ভাই কলেজের আশেপাশে গিয়েছিল হয়তো, মোবাইলের ক্যামেরায় ছবি তুলে নিতে ভুলেনি। এবং সেই ছবিটির ফ্রেম এতই চমৎকার হয়েছে যে একটু পরপর খুলে দেখছি। প্রত্যকেটি স্থাপনা ফ্রেমে বন্দী ও স্পষ্ট। মূহুর্তের মাঝে ফেবুতে শেয়ারে শেয়ারান্ত হলো ছবিটি। ধন্যবাদ দেয়ার ভাষা খুঁজে পাইনি। আমি চিন্তা করছিলাম ফারাবীর কথা। যখন সে কলেজের উপর দিয়ে চক্কর দিচ্ছিলো। দেখছিলো ছেলেদের গেমস টাইমের ছোটাছুটি। সেই অনুভূতির সাথে কোন কিছুর তুলনা হবার নয়। হয়তো মাঠে থাকা এক বা একাধিক ক্যাডেট খেলা থামিয়ে আকাশে তাকিয়েছে। ধরে নিয়েছে কোন বড় ভাই পাইলট সেখানে আছেন নিশ্চিত। যেমনটা আমি ভেবেছিলাম।

১৬ মার্চ ২০১৪, রবিবার বিকাল ৫টা ২৫মিনিট
মার্চ মাসটি নিয়ে খুব বিরক্ত। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও পরবর্তিতে স্বাধীনতার ঘোষণা ব্যতিত বাঙলাদেশের ইতিহাসে ভাল কিছু হয়েছে বলে খেয়াল আসছে না। ২৬ মার্চের আগের রাতটাই তো পাকিস্তানী হানাদারদের হত্যা উৎসবে মেতে উঠার রাত। কলেজে থাকতে আমাদের ব্যাচের (৩৬ মির্জাপুর) নজরুল হাউজ মার্চ মাসকে কুফা বলতাম। যত ভেজাল লাগতো এই মাসে এসে। হয়তো আগে পরেও লাগতো কিন্তু দোষ চাপানোর জন্য ছিল মার্চ মাস। না চাইতেও আবার সেই কথা গুলো মনে পড়ছে। ঢিলা প্রফেসরের পাল্লায় পড়ে পড়াশোনা নিয়ে নিজেই সুবিধা করতে পারছি না। তার উপর দুঃসংবাদ শুনতে হয়েছে তিনটি। ফেনি গার্লসের মেয়ে জ্যোতির বাবা মারা গেলেন সড়ক দুর্ঘটনায়। দুইদিন পরেই ছিনতাইয়ে গুলিবিদ্ধ হলেন ফৌজদারহাটের আরেক ছোট তাহসিনের বাবা। এই দুটোর ধাক্কা সামলানোর আগেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় কোমায় চলে গিয়েছে বরিশালের ছেলে ইয়াসির, কুমিল্লার আব্দুল্লাহ জামি আহত। ইয়াসির পিছে বসা ছিল, মাথায় হেলমেট ছিলো না। জামির মাথায় হেলমেট ছিল। দ্রুত চালাতে থাকা জামি অন্ধকারে (ভোর ৪টার কাহিনী) স্পীড ব্রেকার দেখেনি। ধরে নিচ্ছি স্পীড ব্রেকারে ডোরাকাটা রঙও করা ছিলো না। প্রায় একই ধরনের বিপদে পড়েছিলেন আমার মামা আজ থেকে বছর ছয়েক আগে। সিএনজি অটোরিকশা চালক পিচের মাঝে লুকিয়ে থাকা স্পীডব্রেকার দেখেনি। সেই থেকে কোমরের সমস্যায় ভুগছেন। হেলমেট পরে থাকলে ইয়াসিরের আঘাত আজকে অন্য মাত্রায় হতে পারতো। দ্রুতগতির ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না। অনেকে বলে বয়সের দোষ। আমি সেটা মানে নারাজ। গতি জড়তায় এ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বেড়ে যেতে তরুন বয়স লাগে না। নইলে মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালাতে না জানা আমি কখনো জমে যাওয়া লেকে ১৫০ কিঃমিঃ/ঘন্টা বেগে স্নো-মোবিল চালাতাম না। গতি-অদ্ভুত এক মাদক। পারিপার্শ্বিকতা ও পরিণাম ভুলিয়ে দেয়। মোটরসাইকেল নিয়ে সবসময়ই একটা এলার্জি কাজ করে আমার মাথায়। সবশেষে ২০১২তে মেহেরপুরে সুষমার (মগকক ২০০৫) এর বিয়ে খেতে গিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে হাত-পা ছিলে ফেরত আসার পর জীবনের শিক্ষা হয়ে গিয়েছে। ঘুরে ফিরে একটা কথাই মাথায় আসছে। একটি হেলমেট পরে নিলে কি হয়? বাঙলাদেশে নিয়মের কড়াকড়ি করার বেশ কয়েকবার চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু মানুষজন তারপরেও দমে যায় নি। শুধুমাত্র ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ম নিয়ে কড়াকড়ি করা হয়। অন্যন্যগুলোতে একটা পর্যায়ে শিথিল। অন্তত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাই বলে। মনমানসিকতা একটি বড় বিষয়। বিদেশে গাড়িতে উঠে সীটবেল্ট বাধা মোটরবাইক কিংবা সাইকেল চালাতে গেলেও হেলমেট পরাটা খুব সাধারণ ব্যাপার। ওদের কাছে যতটা না আইন মানা তারচেয়ে বেশী অভ্যাস। সেক্ষেত্রে প্রশ্নটা ডিম আগে না মুরগী আগের মত হয়ে যাচ্ছে। অভ্যাসটা কিভাবে হলো? কড়া আইন ও তার প্রয়োগে নাকি মার্কিন নাগরিকদের মাঝে বীর পুরুষের সংখ্যা কম। তারা আদিকাল হতেই বেশী সতর্ক তাই নতুন করে আইন বানানো লাগে নি? এত গরমের মাঝে হেলমেট পরা—তাপমাত্রার সম্পর্ক কি আছে? খরচও হয়তো একটি আমলে নেবার মত বিষয়। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ঢাকায় আমি স্কুলের কিছু বন্ধুর সাথে আড্ডা দেই। যাদের প্রত্যেকের মোটর সাইকেলের পিছনে একটি অতিরিক্ত হেলমেট বাঁধা থাকে। এদের মাঝে কারো গাড়ি আছে। সেই গাড়িতেও হেলমেট রাখে যাতে প্রয়োজনে আড্ডায় কেউ চাইলে দেয়া যায়। ব্যাপারটা তাহলে অভ্যাসে দাঁড়ালো। সাথে সবার সহযোগিতা।

টি২০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী, আইয়ুব বাচ্চু ও মাইলস, ফ্ল্যাশমব ইত্যাদি নিয়ে ফেইসবুকের প্রান্ত থেকে প্রান্তে অনেক কিছু ঘটে গেল। ব্যস্ততা ও নিস্পৃহা মিলিয়ে কিছু লিখতে চাইছি না। বাঙলাদেশে ফেইসবুক কতটা ক্ষতি করেছে কিংবা করছে সেটাও একটা কোয়ালিটেটিভ প্রশ্ন। সেদিকেও যাচ্ছি না। কিন্তু বড় ক্লান্ত লাগে নিজেকে। মাদকাসক্ত, নিয়ন্ত্রণহীন এক যুবক আমি। প্রতিজ্ঞা করি আজকে থেকেই বন্ধ। লিখবো, বই পড়ব‌ো। তারপরেও প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ফেবুতে উঁকি দিচ্ছি। এদিকে অনেক আগডুম বাগডুমের সাথে ইদানিং জড়িয়ে পড়েছি, তাই খুব ইচ্ছা থাকা সত্বেও সাময়িক হলেও প্রোফাইলটি বন্ধ করতে পারছি না। ভয়াবহ সমস্যা। ফেবু রিহ্যাব সেন্টার খোলা যায় কিনা এই নিয়ে চিন্তাভাবনা করা দরকার। তবে মন্দের ভাল খুশির সংবাদ হলো, বই পড়ার অভ্যাস ফেরত এসেছে। বিপুদ উদ্যমে তিনটি বই শেষ করে চতুর্থ ও পঞ্চম চালাচ্ছি। দুটো বই একসাথে পড়ি। ব্যাপারটা ঠিক হচ্ছে কিনা কেউ মন্তব্যের ঘরে জানাবেন। আমার মতে থ্রিলারের মত উপন্যাস গুলো দুটো একসাথে চালানো যায়। আপাদত পড়ছি গনজো জনরার বিখ্যাত বই ফিয়ার এ্যান্ড লোদিং ইন লাস ভেগাস। শেষের কিছু পাতায় আছি। বইয়ের অনুকরণে নাম চলচিত্রটি দেখে ফেলতে হবে সময় করে। জনি ডেপ ও বেনিসিও দেল তরো অভিনিত ছবিটির রেটিং ভাল দেখলাম। সাথে আরো পড়ছি ডেভিড লেন্ডারের ওয়ালস্ট্রিট থ্রিলার মিকি আউটসাইড। ধূমপান ছেড়ে দিয়েছি দেখে খুচরো পয়সায় অনলাইনে বই কিনতে গায়ে কম লাগছে।

সকালে মায়ের সাথে কথা হয়েছে। তিন সপ্তাহ পর ফোন করেছি। ধরার পরে মায়ের প্রথম কথা ছিল, “কি মাকে ভুলে গেছ নাকি?” ছোটবেলায় অপরাধ করে ধরা পড়ে নির্লজ্জের মত যেভাবে অস্বীকার করতাম সেভাবেই উত্তর দিলাম, “আরে নাহ! কি যে বলো?” মুখ ফুটে ভালবাসার কথা তো দূরে থাক, আজ অব্দি কোন আব্দারও করিনি। মুখ দেখে এই মহিলা সবসময় বুঝে নিয়েছে। সবই জানে তারপরেও খোঁচা দিতে ভালবাসে। এই কারণেই দেশে যেতে চাই। কারণ মাকে মনে করে প্রতিদিন ফোন করে ভালবাসা দেখাতে পারবো না। রান্নাঘরে বা টিভিরুমে মায়ের নড়াচড়ার শব্দ শুনে আশ্বস্ত হওয়া আমার জন্য অধিকতর স্বস্তিদায়ক।

১,১০৪ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “পুরোনো পাতায়ঃ বরফের দেশের গল্প ১০”

  1. টিটো মোস্তাফিজ
    প্রথম আলো দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র গুলোর একটি। শীর্ষস্থানীয় বলেই নিজেকে খোদা-ভগবান ভাবা শুরু করেছে বেশ কিছুদিন হলো।
    বিমানটি সর্বসম্মতিক্রমেই গায়েব হয়েছে কিনা কে জানে।
    ফেবু রিহ্যাব সেন্টার খোলা যায় কিনা এই নিয়ে চিন্তাভাবনা করা দরকার।

    :gulli2: :gulli2: :gulli2:


    পুরাদস্তুর বাঙ্গাল

    জবাব দিন
    • মোকাব্বির (৯৮-০৪)

      বিষয়গুলো নিজেরাই গুল্লি! বেইজিং যাওয়ার বদলে এখন এখন বঙ্গোপসাগর, ভারত সাগর, কাজাখস্তানের দিকে নজর পড়ছে। অনেকে বলছে ইউক্রেনের উত্তপ্ত অবস্থা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আনার একটা চেষ্টা থাকতে পারে।

      তবে ফেবু রিহ্যাব সেন্টার খোলা নিয়ে আসলেই চিন্তা করছি! 😕 😕 আমার অবস্থা সঙ্গীন। 🙁

      আর প্রথম আলোর কথা বাদ।


      \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
      অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

      জবাব দিন
  2. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    পত্রিকা পড়া বাদ দিছি বহুদিন, মাঝে মাঝে হেড লাইনে চোখ বুলাই। আর ফেসবুকে কেউ কিছু শেয়ার করলে দেখা হয়। প্রথম আলোর খেলার পাতা নিয়ে আর কি বলবো, তাও ওরা সাহিত্য নিয়ে থাকলে আমি খুশী, টিমের ভিতরের আজাইরা পলিটিক্স আর উস্কানিমূলক লেখা যদি তাও বন্ধ থাকে।

    মালয়েশিয়ার বিমান নিয়ে যা হচ্ছে তা দেখে আমি মোটামোটি হতবাক। সব কিছু খুটিয়ে ফলো করার চেষ্টা করছি। প্রতিদিন ঘটনা এমন নতুন নতুন মোড় নিচ্ছে কোন কূল কিনারা পাচ্ছি না। প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতার যুগে বিশেষ করে ৯/১১ এর পরে এয়ারক্রাফট সিকিউরিটি যে পরিমানে বাড়ানো হয়েছে তার পরেও কিভাবে একটা বিমান কিভাবে জাস্ট হাওয়া হয়ে যেতে পারে মাথায় ঢুকছে না।

    সচেতনতার কথা বলে আমার মনে হয় না বাঙ্গালীকে হেলমেট পরানো যাবে, আইনের মাধ্যমে লাইনে আনতে হবে, এর পরে যদি অভ্যাস হয়। সেই সাথে নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে হেলমেট ছাড়া বাইক চালানোর দৃশ্য বন্ধ করতে হবে।

    দুটো বই এক সাথে পড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল কলেজে থাকতে। নতুন আশা বই ভাগাভাগি করে পড়তে গিয়ে এই অবস্থা হতো, টাইম স্লট ভাগ করা ছিল, কেউ নিতো আফটার লাঞ্চ, কেউ প্রেপে কেউ আবার লাইটস অফ এর পরে। যে স্লটে ভাগে পেতাম সেই স্লটে ঐ বই পড়তাম, বাকি সময় অন্য কোন বই। মন্দের ভাল বলা যায়।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
    • মোকাব্বির (৯৮-০৪)

      কলেজে স্লটে দুইটা বই না চালাইলেও স্লটের বইয়ের জন্য অপেক্ষা করতাম। অপেক্ষাকৃত নিন্ম শ্রেণির পাঠক ছিলাম বলে আমার কাছে বই আসত জয় সবার পরে অথবা খুব বাজে সময়ে, যেমন কোয়াইট হাওয়ার কিংবা রাত দুইটার পর।


      \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
      অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।