ডায়েরীর পাতা থেকে উদ্ধার করা জঞ্জাল – ৪

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৩
বৃহস্পতিবার
মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের শেষ শিক্ষাবর্ষের কয়েকটি মাস বাকি আছে। তারপর মুক্তি, স্বাধীনতা যে যেটাই বলুক না কেন। বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায় অবস্থান করছি। কিভাবে যে বেচে আছি তা উপরওয়ালা জানেন। কলেজটা এখন একনায়কতন্ত্রের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। প্রতিটা পদে আটকানো হচ্ছে আমাদের। নিয়মের মাঝে শক্ত করে বেধে ফেলেছে আমাদের। এতটা কখনই দরকার ছিল না। Red Book এর Reference দিয়ে সব নিয়ম আরোপ করা হচ্ছে। জানিনা আদৌ তার কতটুকু Red Book এর অন্তর্গত। কখন দেখার সুযোগ হয় নি। হাউসে, একডেমী ব্লকে, গেমসের সময় কোন কিছুতে নিস্তার নেই। আতঙ্কে থাকি কখন কে কোন ব্যাপারে ধরে বসে। দ্বাদশ শ্রেনীতে পড়া সত্তেও যেরকম punctual আর proper থাকছি তাতে জুনিয়র ক্লাসগুলো ভয় পাবে। কাওকে ধরা হচ্ছে না। শুধু আমরা। কারন মাথায় ধরলে তো সব ঠিক। প্রিন্সিপাল এক এক দিন এক একটা নিয়ম আরোপ করছে আর সেটা কাজে লাগানোর জন্য সবাই উঠেপরে লাগছে। আগে কলেজের বাকি ফ্যাকাল্টিদের উপর রাগ হতো কিন্তু কিছু ব্যাপার জানার পর তাদের জন্য এখন খারাপই লাগে। কেননা আমরা কলেজ থেকে চলে যাব ৭/৮ মাস পর কিন্তু এই হতভাগাগুলো এই প্রিন্সিপালের রাজত্বে থাকবে পোস্টিং হবার আগ পর্যন্ত। এই প্রিন্সিপাল স্বয়ং ভাইস প্রিন্সিপাল কেও Show Cause করতে কার্পণ্য বোধ করেন নি।

প্রথম দিকে প্রিন্সিপালের এই নিয়ম নিয়ে কড়াকড়ি সব স্যার, ম্যাডামরা বেশ প্রসংশার চোখেই দেখছিল। যতই আমাদের উপর নিয়মের বোঝা বাড়তে থাকল ততই তারা (ব্যাতিক্রম ছিল বটে) খুশি হলো। কেননা চাপে থাকলে ক্যাডেট সোজা থাকে এটা তাদের জানা কথা। যাই হোক এই “ক্যাডেট” দের “সোজা” রাখার জন্য যখন স্যার, ম্যাডামদেরও “সোজা” করা শুরু হলো তখন আসল মজা শুরু হলো। আমাদের কলেজে জরিমানা একটি interesting এবং ফলদায়ক পানিশমেন্ট এবং এই পানিশমেন্টের আবিস্কারক ও যথেচ্ছ প্রয়োগকারী প্রিন্সিপাল স্বয়ং নিজে। তাকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া উচিত যে তিনি আবিস্কার করেছেন যে ক্যাডেটদের শারিরীকভাবে পীড়া দেওয়ার চেয়ে আর্থিকভাবে পীড়া দিলে তা অনেক বেশী কার্যকরী কারন আর্থিক পীড়া (তথা জরিমানা) বাবা-মা এর উপর দিয়ে যায় আর শারিরীক পীড়া তো পিঠে সয়।

এই ফাঁকে বলে নেই এই জরিমানা করার বিষয়টিও বেশ জাঁকজমকপূর্ন। বিউগ্‌লার বাবুল ভাই এর বিউগল বাজার মধ্য দিয়ে তথাকথিত “অপরাধী” কে (যেন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় নামভুক্ত কোন একজন) প্রিন্সিপালের অফিসে মার্চ করিয়ে হাজির করা হয়। ওহ…! একজন স্টাফ থাকেন “অপরাধী” ক্যাডেট কে মার্চ করে অফিসের ভিতরে প্রবেশ করার প্রয়োজনীয় কমান্ড দেবার জন্য। সেখানে অপরাধীকে তার অপরাধ ও অপরাধের বিচার ও শাস্তি পড়িয়ে শোনানো হয় এবং শেষে অপরাধী ক্যাডেটের সাক্ষর নেয়া হয়। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে চমৎকার একটি রাজকীয় বিচার ব্যবস্থার আচঁ খুজে পাচ্ছি।

তো যা বলছিলাম এইভাবেই চলছে কলেজ। স্যার, ম্যাডামরা অতিষ্ঠ। আর কত ক্যাডেটদের ধরবে। হাজার হোক ছেলে, ফ্রেন্ড কিংবা অনেকেই “নাতির” বয়সী। House Championship নিয়ে দেখি আমাদের চেয়ে স্যারদের বেশী মাথা ব্যাথা। ইদানিং আবার শুরু হয়েছে Inter House ED দেয়া কম্পিটিশান। আমাদের এক অংক স্যার জনাব কেতাব উদ্দিন ব্যাপারটির সত্যতা স্বীকার করেছেন। আমাদের ব্যাচমেট মাহমুদুল হাসানকে (ক্যাঃ নংঃ ১৯৪৭, নজরুল হাউস) তিনি ইডি দেন শার্টের হাতা গুটিয়ে রাখার জন্য এবং কোনভাবে সতর্ক না করেই। এর জন্য তিনি আমাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং বলেছেন যে ইডি দিতেন না কিন্তু অন্য হাউসের ইডি দেবার ব্যাপারটি এমনভাবে শুরু হয়েছে যে তিনি থাকতে পারেন নি…কি অদ্ভুত এই কলেজটা। আমাদের সবার মুখে এখন একটাই কথা…কোন রকমে ৭ টা মাস কলেজে কাটিয়ে বের হয়ে যেতে পারলেই হলো। তার উপর ইতমধ্যেই কলেজের Tuition Fee চোখে পড়বার মত বাড়ানো হলো। নূন্যতম ফি হয়েছে মাসে ১৫০০/- টাকা। আর বছরখানেক পর ক্যাডেট কলেজ ছেলে মেয়েদের পড়ানোর জন্য one of the most costly institutes হতে যাচ্ছে সন্দেহ নেই।

১,৩৭৫ বার দেখা হয়েছে

১৯ টি মন্তব্য : “ডায়েরীর পাতা থেকে উদ্ধার করা জঞ্জাল – ৪”

  1. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    ২য়
    বরাবরের মতই অসাধারন


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  2. হাসান (১৯৯৬-২০০২)

    one of the most costly institute এখানে institutes হবে।

    লেখা ভাল লাগছে, তাড়াতাড়ি পরের পর্ব দাও।

    এই প্রিন্সিপাল কি রফিকুল ইসলাম? এফসিসিতে আমাদেরকেও হেভি জ্বালাইছিলো, জরিমানার জনক।

    জবাব দিন
  3. আদনান (১৯৯৪-২০০০)

    বাপরে কলেজটাতো দেখি মাদ্রাসা বানায়ে দিছিল । বেঁচে গেছি দেখি । তোদের অবস্থাতো কেরোসিন ছিল । আচ্ছা এইটা কে রইস মামু নাকি ? আমরাও তো প্রচুর ফাইন দিলাম ।

    জবাব দিন
  4. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    এইটা বিখ্যাত প্রিন্সিপাল রফিকুল ইসলাম...ফাইন আগেও ছিল কিন্তু উনি ব্যাপারটা কে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন...


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন
  5. আহ্সান (৮৮-৯৪)

    মোকাব্বির,
    লেখা ভালো লেগেছে।
    তোমার লেখা পড়ে প্রথমে ভেবেছিলাম নিশ্চয়ই কোন আর্মি প্রিন্সিপ্যাল...আর বিউগল বাজিয়ে অপরাধীকে আফিসে ঢোকানো পড়ে তো আমি আরো কনফার্ম হলাম...।
    কিন্তূ পরে প্রিন্সিপ্যালের নাম শুনু একটু অবাকই হলাম...।

    জবাব দিন
  6. সামি হক (৯০-৯৬)

    এই রফিকুল ইসলামের নাম আগেও বেশ কয়েক বার পড়েছিলাম, ইনি কি কেমিস্ট্রির রফিকুল ইসলাম?

    ভাই, তোমার ডায়েরীর লেখাগুলো অসাধারণ, খুব সুন্দর করে তোমাদের দিনগুলো তুলে ধরেছ।

    জবাব দিন
    • মোকাব্বির (৯৮-০৪)

      সামি ভাই আমাদের রফিকুল ইসলাম বাংলা পড়াতেন। ওই বিষয়টাতে উনার দখলের তারিফ করতে চাই (একবার একটা ক্লাস নিয়েছিলেন। সোজা কথায় আমার মাথার উপর দিয়ে গিয়েছিল কারন যেসব রেফারেন্স দিচ্ছিলেন সেগুলো আমি পড়ি নাই।)
      ধন্যবাদ পড়ে দেখার জন্য। 🙂


      \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
      অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।