মেমেন্টো

ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস না করার শাস্তি আমি এখনো মাঝে মাঝে পাই। একবারে পথে ঘাটে।

ফার্স্ট ইয়ারে আমি কার্জন হল ভালো করে চিনতামই না। দিনরাত কাটতো কলাভবনে। টিএসসিতে। ওখানে মেয়েরা কতো সুন্দর করে সেজেগুজে আসে। দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। তার তুলনায় কার্জন হলের মেয়েরা একেবারে রসকষহীন। যেমন ডিপার্টমেন্ট, তেমনি তার ছাত্রী। দুই একটা ব্যাতিক্রম অবশ্য ছিলো। যেমন জুয়োলজি। আমরা বলতাম ‘লিপ্সটিক সাইন্স।’ এই নামের অবশ্য একটা মাহাত্ম্য ছিলো। জুয়োলজিতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সঙ্খ্যা ছিলো আশঙ্কাজনক ভাবে বেশি। আর মেয়ে বেশি মানে লিপ্সটিক বেশি। ফলে ওরা নিজেরাই নিজেদের ডিপার্টমেন্টের নাম ‘লিপ্সটিক সাইন্স’ দিয়ে দিলো। এখনো আছে কিনা জানিনা।
আমাদের ডিপার্টমেন্টের নাম ছিলো এফডিসি। মেয়েদের সবার ফিগার বাংলা ছবির নায়িকাদের মতো। পারফেক্ট নাম। ঘরের কাছে হলিউড (পাবলিক এড.) থাকলে কে চায় এফডিসিতে যেতে । আমিও তাই ওই মুখো হই না। ক্লাস ফ্লাস সব বাদ।

ক্লাস না করতে করতে এমন অবস্থা হলো যে থার্ড ইয়ারে উঠেও আমি আমার অনেক ক্লাসমেটকে চিনিনা। ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার সময় একজনের পাশে সিট পড়লো, পরীক্ষার হলে এসে সে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি বায়োকেমিস্ট্রি’র? কখনো দেখিনি তো !’ মর জ্বালা। ক্লাসমেটদের সাথে খাতির না থাকলে যা হয় আর কি। পরীক্ষার হলে দেখাদেখি করা যায় না। কোন রকম টেনেটুনে পাশ। এইভাবেই বেরিয়ে আসলাম ডিপার্টমেন্ট থেকে। অনেক ক্লাসমেটদের ভালো মতো না চিনেই।

সেদিন ধানমন্ডির একটা সুপার শপে গেলাম বাসার জন্যে কিছু কেনাকাটা করতে। ট্রলি নিয়ে ঘুরছি আর এটা ওটা দেখছি এমন সময় হঠাৎ একটু পেছন থেকে কে যেনো ডাক দিলো, ‘কামরুল, এই কামরুল ।’ ফিরে তাকালাম। মুখটা চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু নামটা মনে করতে পারছি না। ট্রলিটা একপাশে রেখে মুখে হাসি নিয়ে কাছাকাছি যেতেযেতেই মনে পড়লো , এই মেয়েটা ইউনিভার্সিটিতে আমার সাথে পড়তো। কিন্তু নামটা যে কিছুতেই মনে পড়ছে না !! নাম যে ভুলে গেছি এইটা বুঝতে না দিয়েই হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ আরে, কি খবর কেমন আছো?’ জবাব আসলো ‘ভালো, তুমি ?’

মাথার ভিতরে তখন ইউনিভার্সিটি লাইফটা রিওয়াইন্ড করছি দ্রুতগতিতে। জোর করে মনে করার চেষ্টা করছি মেয়েটার নাম। কি যেনো নাম? কি যেনো নাম? জিনিয়া? নাহ! জিনিয়া তো বোরকা পড়তো। রিলা ? নাহ, ও তো ইংল্যান্ড চলে গিয়েছিলো সেকেন্ড ইয়ারেই। দীবা? কিন্তু ও হাসলে তো গালে প্রীতি জিনতার মতো টোল পড়তো। এই মেয়েটা হাসি দিলো যখন তখন তো টোল পড়েনি। তাহলে “কি নাম তার…নাম কি তার…!”
ঠিক তখুনি আমার ফোনটা বেজে উঠলো। ‘এক্সকিউজ মি’ বলে ফোনটা রিসিভ করে একটু পাশে সরে এলাম। দরকারী ফোন। কিন্তু স্মৃতিভ্রংশের আবর্তে পড়া আমি কিছুতেই ফোনের কথায় মনোযোগ দিতে পারছি না। হু-হ্যাঁ করে যাচ্ছি। মাথার ভিতরে খালি ঘুরছে মেয়েটার নাম। নইলে যে খুব বিব্রতকর অবস্থা হবে। সুন্দরী মেয়েদের নাম ভুলা ফৌজদারী আইনে দন্ডনীয় অপরাধ। তাই ফোনে কথা বলতে বলতেই মাথার উপর হাতের তালু দিয়ে বিভিন্ন এংগেলে মৃদু আঘাত করে দেখলাম। নাহ! মাথাটা খুললোনা! মরচে পড়া তালার মতোই আটকে থাকলো! ‘ কি আর করা’ এই ভেবে যখন হাল ছেড়ে দিতে যাচ্ছি ঠিক তখুনি ওহী নাজিলের মতো নামটা মনে পড়লো। খুশিতে আলোকিত হয়ে উঠলাম! ইউরেকা ইউরেকা…বুম বুম চেকা চেকা! ব্রেট লি টেন্ডুলকারের উইকেট পেলে যেমন হাওয়ায় ঘুসি দিয়ে ‘ইয়েস’ বলে আমিও এইরকম ছোটখাট একটা ‘ইয়েস’ বলে ফোনটা রেখে দিলাম।
তারপর খুব স্মার্টলি মেয়েটার দিকে ফিরে বললাম, ‘তারপর, আর কি খবর শিলা ? দিনকাল কেমন চলছে?’
জবাবটা ছিলো মর্মান্তিক, “আমার নাম কেয়া !”

৮,৭৬৪ বার দেখা হয়েছে

১৩২ টি মন্তব্য : “মেমেন্টো”

  1. কামরুলতপু (৯৬-০২)

    চামে কামরুল ভাই জানায়া দিল ভার্সিটি লাইফে কত মেয়ের সাথে ওনার পরিচয় ছিল। কামরুল ভাইর ব্যাঞ্চাই। কেন জানিনা হিংসিত হইছি এই জন্য। আহারে ভার্সিটি লাইফ ( কামরুল ভাইরটা )

    জবাব দিন
  2. তারেক (৯৪ - ০০)

    কস্কি!
    আমি যে প্রতিদিন কার্জনে ঢুইকাই দেখতাম গাছ তলায় তুই প্রায় আধ-ডজন মেয়ে নিয়া বইসা থাকতি, ওগুলা কোন ডিপার্টমেন্ট ছিলো? 😛


    www.tareqnurulhasan.com
    www.boidweep.com

    জবাব দিন
  3. টিটো রহমান (৯৪-০০)

    কার্জন হলের পোলাপানের ব্যঞ্চাই 😡 😡 হাফডজন নিয়া বইসা থাইকাও অফ টাইমে কলা ভবনে আসার জন্য 😡 😡 😡
    আমরা কোনদিন কার্জনে গেছি???? :no: :no: :no: :no: :no: :no: :no:


    আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই

    জবাব দিন
  4. সাকেব (মকক) (৯৩-৯৯)
    সুন্দরী মেয়েদের নাম ভুলা ফৌজদারী আইনে দন্ডনীয় অপরাধ।

    কিন্তু তুমি যে বললা, তোমার ডিপার্টমেন্টের সবগুলা এফডিসি ছিল?
    নাকি বিয়ার পরে সুন্দরী হয়ে গেসে? 😮


    "আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
    আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস"

    জবাব দিন
  5. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    "ওখানে মেয়েরা কতো সুন্দর করে সেজেগুজে আসে।"-

    আহা! কি সব দিন ছিলো। প্রতিদিন আমার (সমাজনিজ্ঞান) ডিপার্টমেন্ট এর সামনে (মেইন কমনরুমের সাথেই) দাড়ায়ে নোটিস বোর্ডে মনযোগ দিয়ে 'লিখাপড়া' করতাম :dreamy: :dreamy: :dreamy:


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  6. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    খেলুম না, আর কতো ভার্সিটির গল্প শুনব আর আফসোস করবো 😡 😡

    বিএমএ থেকে ছুটিতে এসে ক্লাসমেটগুলার কাছ থেকে এই গল্প শুনতাম তখন আমরা জাহাঙ্গীর আর মোস্তফা কম্পানির পাঙ্গার পার্থক্যের গল্প শুনাই দিতাম 🙁 🙁 🙁


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  7. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    আমি কি করি জান, পয়ালাই কইয়া ফালাই "তোমার/তোর নাম ভুলে গেছি" এর পর একটা বিগলিত হাসি দেই।

    প্রায় সময় দেখি ও পাশের ব্যাটা বেডিও আমার নাম ভুলে গেছে। আর যদি না ভুলে তখন একটু পার্ট নেয়। ওইটা মাইনা নেই।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  8. রাশেদ (৯৯-০৫)
    ঘরের কাছে হলিউড (পাবলিক এড.) থাকলে কে চায় এফডিসিতে যেতে

    পাবলিক এড এখনো তার সুখ্যাতি ধরে রেখেছে 😀 ক্লাসে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি 😉
    আপটপিকঃ কামরুল ভাই সত্য করে বলেন তো পাবলিক এড এ কয়দিন ক্লাস করতে আসছিলেন আপ্নে 😉


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
  9. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    বেনানা বিল্ডিং এর সিড়ির গোড়ায় বসে ধুমায়া আড্ডা, চত্ত্বরে বইস্যা কার্ড খেলা, প্রতিদিন দুই একটা প্রেম...আহা!!! :dreamy: :dreamy: :dreamy:


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  10. হোসেন (৯৯-০৫)

    আপনার ডিপার্টমেন্টের নাম এফডিসি হইলে আমারটার নাম NASA।

    সব গ্রহান্তরের আগন্তুক মার্কা মেয়েমানুষ। তাদের এই পৃথিবীর মাটি দিয়ে তৈরী করা হয়নি এটা নিশ্চিত;)

    আমার সেকশনে ৭২ জনের ৬ জন মেয়ে AKA এলিয়েন,তাদের মাঝে ১ জনের সাথে গত ৩ বচ্ছরে ১ বার কথা হইছে..."এক্সকিঊজ মি,এক্টু পাশে সরা যাবে?"


    ------------------------------------------------------------------
    কামলা খেটে যাই

    জবাব দিন
  11. সাবিহা জিতু (১৯৯৩-১৯৯৯)

    প্রিতী জিনতার মত গালে টোল পড়া সুন্দরী রেখেও তুই অন্য ডিপার্টমেন্টে কিসের "খোজ-দ্যা সার্চ" এ যাইতি বলতো?
    শেষটা চ্রম ছিলো :khekz: :khekz: :khekz:


    You cannot hangout with negative people and expect a positive life.

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।