কাল যাবো ফিরে আমার প্রিয় বঙ্গোপসাগরের তীরে

কাল কলেজে যাবো। টিনের কালো ট্রাংকটা এখনো গোছানো হয়নি। ইউনিফর্মটা খুঁজে পাচ্ছি না। বেল্ট, ক্যাপ, সু কোথায় যে রাখলাম! টুথপেস্ট কেনা হয়নি, সাবানও না। শ্যাম্পু, জুতার কালি, ব্রাসো- এসব কখন কিনবো? নেইল কাটার, রুমাল, টুথব্রাশ ………… আম্মা’টা যে কি? একটুও দেখে রাখে না।

গেঞ্জি, আন্ডারওয়ার না হয় কলেজে গেলেই ইস্যু করবে, কিন্তু লুকিয়ে দুটো লুঙ্গি তো নিতে হবে। হাউস মাস্টার একটা সিজ করলে আরেকটা থাকবে। আব্বার কাছ থেকে এবার বাড়তি টাকাও নিতে হবে। এ কারণে নানা অজুহাত দিতে হবে জানি। কিন্তু সেগুলো তো মুখস্ত। সিনিয়র হয়েছি। রাত জেগে পড়তে হয়। বিস্কিট কিনে রাখতে হয়। আসলে সত্য তো ওই টাকায় সিগেরেট ফুঁকবো! ফৌজদারহাটে ঢুকার আগে আন্ডারওয়ার অথবা মৌজার ভেতরে লুকিয়ে নিতে হবে। ক্যাপস্ট্যান মিক্সারের প্যাকেটটা কোথায় লুকবো? আমি ভাবতেই থাকি।

সকালে উঠে ইউনিফর্ম পড়ে কমলাপুর স্টেশনে গেলেই বন্ধু, সিনিয়র, জুনিয়রদের সঙ্গে দেখা হবে। আমার সঙ্গে কে যাবে স্টেশনে? আব্বা, ছোট ভাই, বোন………. মতিঝিল কলোনীর বাসার বারান্দা থেকে আম্মা তাকিয়ে থাকবে যতোক্ষণ আমি চোখের আড়াল না হই। এতোজনের যাওয়ার দরকার কি? একাই তো যেতে পারি। আমি তো এখন বড় হয়ে গেছি!

তারপর একসময় উল্কা ছাড়বে। আমরা হৈ-হল্লা করতে থাকবো। বন্ধুদের সঙ্গে মজা হবে। খাবার ভাগ করবো। ছুটির দিনগুলো কে কি করে কাটিয়েছি সেসব গল্প চলবে। কমলাপুর থেকে উঠবে সাঈদ, মিজান, হাসিবুল, মঞ্জুর ওয়াহিদ, শহীদ, ফাহাদ, তেজগাঁও থেকে উঠবে জিয়াউল। ওদের বাসা থেকে স্টেশন পরিস্কার দেখা যায়। ভৈরব থেকে শম্ভুনাথ, আশুগঞ্জ থেকে আলী নূর …… অনেকে। প্যারোডি বা সিনেমার গানের কোরাস গাইবো ট্রেনটা কোনো স্টেশনে থামলে। যাত্রী আর হকাররা অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকবে। এরা আবার কারা? বাচ্চা পুলিশ, আনসার নাকি আর্মি?

জুনিয়রগুলোকে একটু টাইট দিতে এবার। ক্লাশ ইলেভেন কি ওরা জানে না? যম! সাক্ষাৎ যম। ক্লাস টুয়েলভ বেরুলে আমরাই তো রাজা। কলেজ চালাবো। কতো ধানে কতো চাল সেটা বোঝানো শুরু হোক না ট্রেন থেকেই। আচ্ছা ক্লাস সেভেন তো যাচ্ছে এবার। মাত্র গত টার্মে ওরা ঢুকেছে। দেখবো ওদের সঙ্গে মজা করে। “হেই…………. ইউ?” “ইয়েস ইউ বয়।” “কামঅন হোয়াটস্ ইউর নেইম?” “ব্লাডি ক্লাস সেভেন!! গান জানো? নাচ? অঞ্জু ঘোষের মতো নাচতে পারো?” “না? তাহলে কি পারো? ব্লাডি ফুল!!” “স্টার্ট ফ্রগ জাম্প, কুইক……………”

মজা করতে করতে একসময় উল্কা হয় ফৌজদারহাট নয় চট্টগ্রাম স্টেশনে আমাদের নামাবে। ট্রাংকটা মাথায় করেই হেটে নয়তো বাসে করে ছুটবো আমাদের প্রিয়-অপ্রিয় উপ-কারাগার ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের দিকে। ইস্ ছুটির দিনগুলো এভাবে শেষ হয়ে যায়! আবার পিটি, আবার প্যারেড! হাউস ইন্সপেকশন, গার্ডেনিং, প্রেপ, পরীক্ষা!! হেল..

হ্যা, কাল ঠিকই ফৌজদারহাট যাচ্ছি। ক্লাস ইলেভেন নয়, এক্স ক্যাডেট হয়ে। কলেজের ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। গত বছরও গিয়েছিলাম। কাল আবার ফিরে যাবো শৈশবে। নস্টালজিয়া গায়ে মেখে ফিরবো।

আজ সারাদিন শুধু শুনেছি ভাইভের নস্টালজিয়া। কবে যাবো ফিরে……….. বুড়িগঙ্গার (পড়ুন : বঙ্গোপসাগরের) তীরে আমার ……..

৮,০৪৮ বার দেখা হয়েছে

৮২ টি মন্তব্য : “কাল যাবো ফিরে আমার প্রিয় বঙ্গোপসাগরের তীরে”

  1. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    লাবলু ভাই,
    কতদিন আগের কাহিনী আঁকলেন! কিন্তু আমি নিশ্চিত, এখনকার ক্যাডেটদেরও এই একই গল্প, একই চক্র, হয়তো যুগের দাবিতে কিছুটা আধুনিকায়িত, কিন্তু মূল নির্যাস সেই একই।
    প্রচন্ড নস্টালজিক লেখা। ৫১তম প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠান নিশ্চয়ই সুন্দর এবং সফল হবে। এর পর আপনার আরেকটি লেখা দাবি থাকবে 🙂


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  2. মো. তারিক মাহমুদ (২০০১-০৭)

    বরিশাল যাবার সময় আমাদের কলেজের সামনে দিয়েই যেতে হয়, আমার বাসা বরিশালে হওয়ায় প্রায়ই কলেজের সাথে আমার দেখা হয়; কলেজের সাথে মনে মনে কথা হয় ... কিন্তু সে কথা কলেজের কানে পৌছায় না ... ...

    জবাব দিন
  3. তৌফিক (৯৬-০২)

    সিগারেট লইয়া কত কাহিনি!!! ক্লাস টুয়েলেভ-এ থাকতে এমন কড়াকড়ি হইছিল, আন্ডারওয়্যারের ভিতর সিগারেট আছে কিনা দেখার জন্য কইতে শরম লাগে এইরকম জায়গায় থাবা দিয়া দেখত। পোলাপাইনও কম যায় না, এইটার কাউন্টার হিসাবে রানের সাথে নিক্যাপ দিয়া সিগারেটের প্যাকেট বাইন্ধা নিয়া যাইত। ওইখানে কেউ চেক করত না।

    নস্টালজিক হয়া গেলাম লাবলু ভাই।

    জবাব দিন
  4. ইউসুফ (১৯৮৩-৮৯)

    সানা ভাই,
    আমি কলেজ থেকে মাত্র ঘন্টাখানেকের চেয়েও কম দুরে - ভাবছি কবে যাব কলেজে। নস্টালজিয়াকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার মত এই ভাবনাটাকেও উপভোগ করছি ....অনেকটা হাতের নাগালে টেবিলের উপর এক প্যাকেট সিগারেট রেখে ইচ্ছা করে প্রচন্ড সিগারেট এর নেশায় কষ্ট পাবার মত....

    জবাব দিন
  5. ভাই,
    জটিল লেখা। :boss: :boss:

    একদম নস্টালজিক হয়া গেলাম এইটা পইড়া...
    সেই যাওয়ার আগের দিনের ব্যাগ গুছানোর স্মৃতি মনে পইড়া গেলো। ছুটির পর সবাই একসাথে আবার বাসস্ট্যান্ডে জমা হতাম... কী ভীষণ চিৎকার কোন বন্ধুকে অনেকদিন পর দেখলে !!

    আহা !! ইশশ --- মিস করি মিস করি
    :dreamy: :dreamy: :dreamy:

    জবাব দিন
  6. মঞ্জুর (১৯৯৯-২০০৫)

    জটিল লেখা ভাইয়া।কাল আমাদের কলেজেও ভাইয়ারা যাবে।একক এর সাথে কলেজের ফুটবল খেলা আছে।আর এইবার যারা বের হবে কলেজ থেকে তাদের registration হবে।
    আশা করছি কাল দিনটা খুব খুব খুব... ভাল যাবে আপনার ভাইয়া।

    জবাব দিন
  7. রকিব (০১-০৭)

    সানা ভাই, দিলেন তো বিষণ্ণ করে। ২ বছরের বেশি হয়ে গেল, না কলেজ, না ফ্রেণ্ড- কাউকে দেখি না (ভার্চুয়ালি দেখে মনে শান্তি মেলে না।) কবে যাবো ফিরে 😕 😕


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  8. রায়হান আবীর (৯৯-০৫)

    একজনরে আমি চিরশত্রু ঘোষণা করছি। তার কারণ গতবছর কুয়াকাটা ট্যুরে আমি কলেজে একটূ ঢু দিতে চাইছিলাম- তার চক্রান্তে পারি নাই। এরপর আর যাওয়াও হইলো না ...

    কলেজ গমন দারুন হোক ... আর ভাইভের ফ্যান দেখে আনন্দে উদ্বেলিত হইলাম ..

    জবাব দিন
  9. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    কলেজে যাওয়া হতো দল বেধে লঞ্চে করে... আহ কত মজাই না হতো :dreamy:

    লঞ্চ জার্নি এখনো আমার কাছে বেস্ট জার্নি, পূর্নিমার রাত হলে তো কথাই নাই


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  10. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    মনে হলো আপনার সাথে আমিও যেন কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছি।
    চমৎকার।
    যাত্রা শুভ হউক।
    ফিরে এসে আরেকটা লেখা চাই।


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  11. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    ওহ! আপনার দেখি অর্ধশততম লেখা হয়েছে।
    অভিনন্দন। কী-বোর্ড তুলেন, আর এই খুশিতে কেক-কুক খাওয়ান। :clap: :clap:


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  12. সামিয়া (৯৯-০৫)

    বহুদিন পর কলেজ নিয়ে এত্ত সুন্দর একটা লিখা পড়লাম ভাইয়া, :dreamy:
    একদম প্রথম প্রথম, কলেজ নিয়ে অসংখ্য লিখার ভিড়ে তারেক ভাই মাঝে মাঝে আচার পোস্ট দিত, সেইটা সবাই খুবলা খুবলি করে পড়তাম...আর এখন আচারে আচারে ভরে গেছে সিসিবি, পোলাও আর পাওয়া যায় না। তাই একটূ পোলাও পেলেই সাগ্রহে একটান দেই। 🙂
    লিখাটা সেইরকম সুন্দর, ভালমত চিটাগাং ভ্রমণ শেষ করে আসেন, তারপর আবার ছবি ব্লগ দিয়েন :grr:

    জবাব দিন
  13. সামি হক (৯০-৯৬)

    সানাউল্লাহ ভাই একদম নস্টালজিক করে দিলেন...আপনাদের কলেজ বঙ্গোপসাগরের পাড়ে আর আমাদের পদ্মার পাড়ে। আহা যদি যেতে পারতাম এরকম করে আবারো।

    কেমন কাটালেন দিনটা? একটা লেখা চাই।

    জবাব দিন
  14. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসেছি। ফিরে এসেছি অনেক অনেক এনার্জি নিয়ে।

    কিন্তু ফটোব্লগ তো দেখি আমি দেওয়ার আগেই জ্বলজ্বল করছে। :guitar: :guitar: :guitar:


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  15. মেহবুবা (৯৯-০৫)

    সানা ভাই,
    খুব সুন্দর করে আমাদের কে নস্টালজিক করে দিলেন।
    একবার বাসে উঠার আগে আম্মুকে বলেছিলাম......।সারফ এক্সেল কিনা হইনি। সেই বকা আমি ভুল্লেও আমার মা এখনো ভুলেন নি।হিহি।
    তখন মনে হচ্ছিল বাস টা ছারতে এত দেরি করছে কেন?কখন আম্মুর চোখের সামনে থেকে জাবো......
    কলেজে জ়াবার পর দিনি আম্মু কুরিয়ার করে পাঠিইয়ে দিয়েছিলেন......
    তখন মনে হচ্ছিল আম্মু আসলেই অনেক ভাল।নইলে পকেট মানিটা নস্ট হত হতচছারা সারফ এক্সেল্ র জন্য।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।