নারী দিবস নিয়ে একটা কিছু লেখার চেষ্টা

১.
শুরুতেই নারীর জয়গান গাই। আজ দেওয়া হল অস্কার পুরস্কার। এবার সেরা পরিচালক হলেন ক্যাথারিন বিগোলো। অস্কারের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেলেন। তার ছবিটির নাম দি হার্ট লকার। সেরা সিনেমার পুরস্কারও পেয়েছে এটি। আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ ১০০ বছরে পা দিল। এরকম এক দিনে এর চেয়ে ভাল পুরস্কার আর কী হতে পারে।
বাড়তি কিছু তথ্য দেই। ক্যাথারিন বিগোলো জেমস ক্যামেরুনের সাবেক স্ত্রী। তারা দুজন একসাথে ছিলেন ১৯৮৯ থেকে ৯১ সাল পর্যন্ত। অ্যাভাটর পরিচালক নিজেও মনোনয়ন পেয়েছিলেন। জানিয়ে রাখি সান্ড্রা বুলক পেয়েছে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার, দি ব্লাইন্ড সাইড ছবিতে, আর জেফ ব্রিজেস দি ক্রেজি হার্ট থেকে পেয়েছে সেরা অভিনেতার অস্কার।
২.
আমার মা সাত বোন এক ভাই। আমার নানা মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আমার মার কাছে আমার নানীকে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আর কারো উপর ভরসা পাই না। তুই তোর মাকে দেখে রাখিস।’
আমার নানী একেবারেই গ্রামের মেয়ে। লেখাপড়া জানতেন না। অনেকদিন বেঁচে ছিলেন, আমার নানাও। আমার নানার সহায়-সম্পত্তি ভালই ছিল। তাও তিনি ভরসা পেলেন না, একা হয়ে যাওয়া আমার নানী কিভাবে জীবন কাটাবেন সেই দুশ্চিন্তা তাঁকে পেয়ে বসেছিল।
জন্মের পর প্রথম দেখেছিলাম আমার মাকে। সেই প্রথম দেখা কেমন ছিল তা মনে রাখার তেমন কারণ নেই। তবে আমি জীবনেও ভুলবো না প্রথম যখন আমার মেয়েকে দেখি। আমার বিয়ের কথাবার্তা যখন চূড়ান্ত, তখন বউকে বলেছিলাম বিয়ে করার একটা বড় কারণ আমার একটা মেয়ে চাই। আমি মেয়ে পেয়েছি। মেয়েটাকে যখন লেবার রুম থেকে নিয়ে এসে আমার মা আমার হাতে দিয়েছিল সেই অনুভূতি কোনো বাবাই কি কখনো ভুলতে পারে।
আমার যখন দ্বিতীয় সন্তান হবে, ডাক্তাররা কিছুতেই বলে না ছেলে না মেয়ে। সনোগ্রাম করার পর প্রতিবার ডাক্তার বলেছে বাচ্চা উল্টে আছে, বুঝা যাচ্ছে না। এটা এক ধরণের কৌশল। মেয়ে হলে ডাক্তাররা সাধারণত বলতে চায় না। আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমার আবার মেয়ে হবে। এবং অবাক বিষ্ময়ে দেখলাম আমার মতো খুশী কেউ না। একটা মেয়ের পর ছেলে হওয়াই যেন নিয়ম। সেই নিয়ম মেনে আমার ছেলেই হলো। মাঝে মধ্যে ভাবি আরেকটা মেয়ে হলে কেমন হয়?
আমার মেয়েটা তীব্র অভিমানী। মুখ ফুটে কিছু বলে না। উদাহরণ দেই। দোকান থেকে চিজ নিয়ে আসি। ফ্রিজে থাকে। আমার ছেলে একটার পর একটা খেতে থাকে। দেখা যায় ১৬ টার এক প্যাকেটের মধ্যে ছেলে খেয়ে ফেলেছে ১৪টা, মেয়ে দু’টা। প্রিয়ন্তীকে যদি বলি তুমি কেন খাও না, উত্তর দেয় আমার ভাল লাগে না। কথাটা কিন্তু সত্যি না। যেমন, আজ সকালে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বললাম, আমি যদি চুপি চুপি তোমাকে একটা আলাদা চিজ প্যাকেট এনে দিই, তুমি কি লুকিয়ে রাখতে পারবা। সে অদ্ভুত একটু দৃষ্টি দিয়ে বললো, পারবো বাবা। কিন্তু ভাইয়া চাইলে তো আম্মু দিয়ে দেবে।
এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। আমার মেয়েটার তীব্র অভিমানের শত শত ঘটনা আছে তার এই ৬ বছরের জীবনেই। জন্ম থেকে মেয়েটাকে দেখছি। চোখের সামনে বেড়ে উঠছে মেয়েটা। তার যেমন তীব্র অভিমান, তেমনি তীব্র ভালবাসা। আমাদের দুজনেরই বয়স বাড়ছে। বাবা এখন আমি, এক সময় ছেলে হয়ে যাবো। আমার মেয়ে আমার মায়ের জায়গা দখল করবে। শেষ বয়সে এই মেয়েটাই আমাকে আগলে রাখবে, আমি জানি। আমার ছেলে কি করবে? সত্যি আমার ধারণা নেই।
৩.
নারী দিবস নিয়ে কিছু একটা লিখতে চেয়েছিলাম। লিখতে যেয়ে আমার মেয়ের কথাই খালি লিখলাম। আজ খালি মনে হচ্ছে, আমার মেয়েকে অনেক শক্ত হতে হবে, অভিমান কষ্ট দেয়। তাকে অনেক কঠিন করে তুলতে হবে।
আবার এই যে, আমার মেয়ের এতো মায়া, সেই মায়া কমে যাক সেটা কি ভালো? একটা ছেলেকে মায়ায় ভরিয়ে রাখবে গোটা জীবন-সেটাও তো চাই। সেই মায়ার কিছু অংশ না হয় বাবার জন্যই রেখে দিল।

৪.

আমি আসলেই জানি না, নারী দিবসের লেখা কিরকম হতে হয়। তার চেয়ে বরং সবাইতে শ্রদ্ধা জানাই, ভালবাসা জানাই। সালামও করি।
নারীর ভালবাসা পেয়েছি, তীব্র মায়া তুলে রেখেছে আমার জন্য। অবহেলা যা পেয়েছিলাম তা ভুলিয়ে দিয়েছে। সেই নারী কখনো আমার মা হয়ে এসেছে, কখনো প্রেমিকা, কখনো বউ, কখনো বন্ধু, আবার কখনো মেয়ে হয়ে এসেছে। তাদের প্রতি আমার আজীবনের ঋণ।
৫.
কবিতা সিংহ-এর এই কবিতাটা পড়ি

ঈশ্বরকে ঈভ

আমিই প্রথম
জেনেছিলাম
উত্থান যা
তারই ওপিঠ
অধঃপতন !

আলোও যেমন
কালোও তেমন
তোমার সৃজন
জেনেছিলাম
আমিই প্রথম।

তোমায় মানা
বা না মানার
সমান ওজন
জেনেছিলাম
আমিই প্রথম।

জ্ঞানবৃক্ষ
ছুঁয়েছিলাম
আমিই প্রথম
আমিই প্রথম
লাল আপেলে
পয়লা কামড়
দিয়েছিলাম
প্রথম আমিই
আমিই প্রথম।

আমিই প্রথম
ডুমুর পাতায়
লজ্জা এবং
নিলাজতায়
আকাশ পাতাল
তফাৎ করে
দেওয়াল তুলে
দিয়েছিলাম
আমিই প্রথম।

আমিই প্রথম
নর্ম সুখের
দেহের বোঁটায়
দুঃখ ছেনে
অশ্রু ছেনে
তোমার পুতুল
বানানো যায়
জেনেছিলাম
হেসে কেঁদে
তোমার মুখই
শিশুর মুখে
দেখেছিলাম
আমিই প্রথম।

আমিই প্রথম
বুঝেছিলাম
দুঃখে সুখে
পুণ্য পাপে
জীবন যাপন
অসাধারণ
কেবল সুখের
শৌখিনতার
সোনার শিকল
আমিই প্রথম
ভেঙেছিলাম
হইনি তোমার
হাতের সুতোয়
নাচের পুতুল
যেমন ছিল
অধম আদম

আমিই প্রথম
বিদ্রোহিনী
তোমার ধরায়
আমিই প্রথম।

প্রিয় আমার
হে ক্রীতদাস
আমিই প্রথম
ব্রাত্যনারী
স্বর্গচ্যুত
নির্বাসিত
জেনেছিলাম
স্বর্গেতর
স্বর্গেতর
মানব জীবন
জেনেছিলাম
আমিই প্রথম।

৩,১৯৪ বার দেখা হয়েছে

৩৬ টি মন্তব্য : “নারী দিবস নিয়ে একটা কিছু লেখার চেষ্টা”

  1. আছিব (২০০০-২০০৬)

    :boss: ভাই,অসাধারণ,আমাদের সবার মনের কথাই মনে হয় আপনি খুব সহজ কতগুলো ঘটনা দিয়ে প্রকাশ করে দিলেন। অসংখ্য ধন্যবাদ বস
    প্রিয়ন্তীমনির জন্য ভালোবাসা রইল। :thumbup:

    প্রতিটা নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি :salute:
    নারীদিবস বলে শুধু আজই না,প্রতিদিনই ভালোবেসে যাব নারীদের,হোক সে মা,হোক সে বোন,হোক সে.........ইয়ে মানে...এখানেই কবি নীরব 😕 :shy:

    জবাব দিন
  2. আছিব (২০০০-২০০৬)

    ওহ...শওকত ভাই,আরেকটা জিনিস......নার্ভাস নাইন্টিজে চলে আসছেন... :clap: ...স্লগ মাইরা সেঞ্চুরি কইরা ফালান.........মানে বরাবরের মতই ছক্কামারা পোস্ট চাই,তয় স্ট্রাইকে বল বেশি ফেইস কইরেন,আজকাল খেলোয়াড় বাইড়া গ্যাছে সিসিবি-তে 🙂

    জবাব দিন
  3. রকিবুল ইসলাম (৯৯-০৫)
    সেই নারী কখনো আমার মা হয়ে এসেছে, কখনো প্রেমিকা, কখনো বউ, কখনো বন্ধু, আবার কখনো মেয়ে হয়ে এসেছে। তাদের প্রতি আমার আজীবনের ঋণ।

    শ্রদ্ধা রইলো সব নারীর প্রতি।

    জবাব দিন
  4. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    বহুদিন পর কোন লেখা পড়ে 'প্রিয়তে যোগ কর' লিঙ্কটায় ক্লিক করলাম। 🙂
    এতো সুন্দর লেখাতেও ফাইজলামি করার লোভটা সামলাতে পারছি না।

    মাঝে মধ্যে ভাবি আরেকটা মেয়ে হলে কেমন হয়?

    বেস্ট অব লাক। 😉


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  5. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    নারী দিবস নিয়ে লিখলে আমি রীতিমতো একটা ভাষণ লিখে ফেলি....... ~x( আর ব্যাটা মাসুম এত্তো সুন্দর কথা এত্তো সহজে লিখলো ক্যামনে? মেয়ের বাপ বলে? কেক খাইতে আইলা না আজকা? 😀

    আমার একটা মেয়ে নাই কেন? .......... না, না; আছে, আছে, আমারো মেয়ে আছে একটা। ওর যখন বিয়ে হবে তখন আমিও এমন একটা লিখবো। :goragori:


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  6. রাফি (২০০২-২০০৮)
    আমার ছেলে কি করবে?

    ভাই ছেলেরে তো পুরা মাটির সাথে মিশাইয়া দিলেন ভাই।আমার বাসায়ও একই অবস্থা।আমার ছোট বোনের মান-অভিমান ভালোবাসা সব একেবারে এক্সট্রিম।


    R@fee

    জবাব দিন
  7. আদনান (১৯৯৪-২০০০)

    আপনার রম্য পড়তে পড়তে অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে, ভেবেছিলাম রম্য লিখেছেন । পড়তে গিয়ে ইমোশনাল হয়ে গেলাম । প্রিয়ন্তী মামনির জন্য অনেক দোআ আর শুভকামনা থাকলো ।

    জবাব দিন
  8. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    🙂

    জিহান তো এখনি মাঝে মাঝে ফোন করে আমি লাঞ্চ করেছি কিনা জানতে চায়। ঘুম পাড়ায় মাঝে মাঝে আমাকে। জটিল ব্যাপার স্যাপার।

    মেয়ের বাপ হওয়া আসলেই অসাধারন। যাদের মেয়ে নেই তাদের জন্য দুঃখপ্রকাশ করাই যায়।

    লেখাটা ভালো লেগেছে মাসুম ভাই।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  9. টুম্পা (অতিথি)

    ভাইয়া এ্যাত্তো দারুণ কেমনে লিখেন?! রম্য ভেবে পড়তে শুরু করছিলাম...পড়তে পড়তে আমার আব্বার কথা মনে পড়ে গেল। আমার আব্বা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা 🙂 প্রত্যেক মেয়ের কাছেই তাই...
    প্রিয়ন্তীর জন্য অনেক অনেক আদর ...তবে ...
    অভিমান ভালো না। শুধু শুধুই কষ্ট দেয়।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।