প্রিন্সিপাল এসেম্বলী!! (সিসিবি ভার্সন) পর্ব ৩

১ম পর্ব
২য় পর্ব

৫।

-জুনায়েদ, তোর কাছে ম্যাচ বা লাইটার আছে? পকেটের শেষ সিগারেটটা ধরাবো…

পাভেল ভাই (‘৯৩) এর কথা শুনে থমকে গেলাম। আমার জানা মতে উনি তো সিগারেট খেতেন না। কবে থেকে শুরু করলেন?? যাই হোক, কথা না বাড়িয়ে পকেট থেকে ম্যাচ বের করে দিলাম। উনি বুক পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে অস্ফুট স্বরে গালি দিয়ে উঠলেন,
-যাঃ…সিগারেট দেখি ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে…!
-বস আমার কাছে আছে। দেব???
-নারে, লাগবে না…সিগারেট নষ্ট হয়ে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেছে, এই মন খারাপ ভাবটা থাকুক কিছুক্ষণ…এক কাজ কর, একটা কলম আর খানিকটা কাগজ এনে দে তো…একটা কবিতা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে!!!

কাগজ-কলম এনে দিয়ে মনে মনে ভাবলাম, কবি না হয়ে কত ভালই না হয়েছে! ইচ্ছেমতন সিগারেট খেতে পারি…

‘৯৩ এর বেশিজন আসার কথা না, কেননা ব্লগেও সক্রিয় হাতে গোনা দু একজন। অনেক আগে বাহলুল ভাই ছিলেন মোটামুটি রেগুলার…তিনি তো এখন আর আসেনই না…একমাত্র সক্রিয় সদস্য আছেন মান্নান ভাই…ভাবতে না ভাবতেই দেখি মান্নান ভাই হাজির!!!
-তুই জুনায়েদ না?
-জ্বী মান্নান ভাই।
-আমারে চিনলি ক্যামনে??
-ল্যুভরের ভিতরে আর আইফেল টাওয়ারের সামনের যে ছবি দিছিলেন…চিনব না কেন??
-আচ্ছা…ভালো কথা, সরি রে…নতুন বছরের প্রথম প্রহরেই কবিতা দিয়ে তোদের বিরক্ত করেছি…
-বস, কি যে বলেন না! আমারে বলছেন ঠিক আছে, অন্য কারো সামনে এইসব বইলেন না…জানেনই তো, পোলাপাইনের মুখ কেমন…ফট করে কোন বিশেষণ শোনায়…কে জানে!!!

এরপর দেখি খুবই পরিচিত টাইপ অপরিচিত এক ভাই…’কোথায় দেখেছি’ ভাবতে ভাবতে অন্যদিকে সরার চেষ্টা করতেই সেই ভাই বলে উঠলেন,
-দুষ্ট জুনা, কই যাস???
-না মানে ইয়ে…এই তো…
-চিনতে পারছিস তো??
-কি যে বলেন না, বস। আপনাকে চিনব না…’৯৩ এর পতাকা তো আপনাদের দু’একজনেরই হাতে (চিনতে না পেরেও চামে কি স্মার্ট জবাব দিলাম…ওরে জুনায়েদ হবে হবে…!!!)

এমন সময় কাইয়ূম ভাই কোত্থেকে জানি এসেই ঐ ভাইকে দেখে বলে উঠলেন,
-আরে! সাকেব না?? তুই বেঁচে আছিস?? গুড…

সাকেব ভাই! আচ্ছা, তাই তো বলি এত পরিচিত লাগছিল কেন?? অবশ্য আমারই বা দোষ কিসের প্রায় ৭/৮ বছর কোন খবর নেই, ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক!!!

‘৯৩ এর সবাই চলে যেতেই কাইয়ূম ভাই আমাকে বললেন,
-‘৯২ এর সবাইকে ঠিকমতন জায়গায় বসিয়ে দিয়ে আসবি…কোন ঝামেলা যেন না হয়…!!

কাইয়ূম ভাইএর মুখঃনিসৃত সাম্প্রদায়িকতার বিষ-বাষ্পে বিষাক্ত হয়ে আমি এগিয়ে গেলাম ‘৯২ এর ভাই বোনদের স্বাগত জানাবার জন্য।

৬।

ব্লগে ‘৯২ এর ভাইদের আনাগোনা অন্যন্য অনেক ব্যাচের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। বেশ কয়েকজন আছেন মোটামুটি চেষ্টা করেন রেগুলার থাকার জন্য। প্রথমেই আসলেন রহমান ভাই। পিকনিকে অল্পের জন্য আসতে না পারার যন্ত্রণা কিছুটা হলেও ভোলার জন্য এবার আগে থেকেই সব ম্যানেজ করে রেখেছিলেন। ব্যাপক মাঞ্জা মেরে, চুল ব্যাক ব্রাশ করে এসেছেন!

-রহমান ভাই, কেমন আছেন? বস, অনেক দিন লেখা দেন না…ব্যস্ততা বেশি নাকি??
-জুনা নাকি? আছিস কেমন? হ রে…ব্যস্ততা যাচ্ছে…সবচেয়ে বড় কথা, ইদানিং রেগুলার ‘শ্যাম্পু’ করতে হচ্ছে…বিবাহিত ফৌজিদের দুইটা হেডকোয়ার্টার-একটা অফিসিয়াল আর একটা…তো, অন্য হেড কোয়ার্টার থেকে কড়া নির্দেশ ‘ঐ সব খুশকি-মুশকি’ লেখা চলবে না…!!! ফলে ইচ্ছে থাকা স্বত্ত্বেও…বুঝিস ই তো…

আমি এইসব শুনে ‘টুশকি’ খাইলাম। বসে কয় কি?? বিয়ে করলে এত নিয়ম-কানুন!!!

এমন সময় সায়েদ ভাই এর গলা,
-ঐ ব্যাটা, তুই আমার ‘টুশকি’ খাইলি ক্যান??
-কি করুম বস? আপনি আর নতুন করে দেন না…তাই তো, পুরানোগুলো চিবাইতে চিবাইতে কখন জানি টুক করে খেয়ে ফেলেছি…
-খালি পাকনামি করস, না? দাঁড়া…

মাহফুজ ভাইকে দেখলাম কি জানি খুঁজছেন। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,
-বস, কেমন আছেন? কি খোঁজেন?
-সহজ কবিতা খুঁজি…এইমাত্র মনে হয় দেখলাম একটা…কই যে গেল???

এতদিনের অভিজ্ঞতায় কবিদের ভালো মতনই চিনে ফেলেছি, তাই মাহফুজ ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম কাগজ-কলম এনে দেব কিনা…উনি কিছু না বলে সামনে চলে গেলেন। আমি অবশ্য এতে অবাক হলাম না। উনি যে কম কথার মানুষ-এটা তো আগে থেকেই জানি…একারনেই ব্লগেও তো তেমন একটা কথা-বার্তা বলেন না…

হঠাৎ দেখি হা হা হা করতে করতে এলাকা কাঁপিয়ে আরিফ ভাই আসছেন। সাথে ‘স্বপ্নচারী’ মঈনুল ভাই এবং ‘সাল্লু’ ওরফে সালাউদ্দিন ভাই…মঈনুল ভাই এর কি এক কথা শুনে আরিফ ভাই সেই কলেজের পরিচিত হাসি দিয়েছেন। ব্লগে মঈনুল ভাই প্রায়ই ‘অসংলগ্ন’ কথা বললেও এখন দেখলাম তেমন করে বলছেন না…’হুম! এই জন্যই এখন আর পোষ্ট দিচ্ছেন না…অথচ, সবাই কি আগ্রহ করেই না ওনার লেখা পড়ে!!’ মনে মনে পৃথিবীর সকল ভালো লেখকদের অনেক অনেক ঝাঁড়ি দিলাম…’কি হয়, একটু বেশি বেশি লিখলে????’

‘তাইফুর ভাই এখনো আসলেন না’ ভাবতেই পকেটের মধ্যে কিলবিল করে উঠল। ফোনটা বের করে দেখি মুঠোবার্তা!
‘paye plaster niya chit hoya achi. Ankle twist hoiche gotokal. Amar r picnic jawa holo na’

সাথে সাথে রিং করলাম,
-বস, পিকনিকের বার্তাটা আবার পাঠাইছেন…না আসার জন্য এর চেয়ে ভালো কোন অজুহাত পাইলেন না??
– কস্কিরে? সেইম এসএমএস নাকি? মিসটেক হয়ে গেছে…
-এই এক্সকিউজটা ভাল হয় নাই…অন্য আরেকটা দেন…যেমন ধরেন, ব্যাপক কোন অপারেশনে যাচ্ছেন কিংবা অত্যন্ত জরুরী কাজে ঢাকার বাইরে আটকা পড়ে গেছেন…ইত্যাদি ইত্যাদি…
-মশকরা করিস না…শরীরটা সত্যিই ভাল না…নাইলে কি আর এইরকম অকেশন মিস করি!!!
-ব্যাপার না…নেক্সট টাইম…তবে, আজ-কালকের মধ্যে লেখা না দিলে আপনার নামে সবার কাছে প্রপাগান্ডা ছড়াবো, যে ইচ্ছে করেই আপনি আসেন নি…
-লেখার তো টাইম পাই না রে…
-ওসব বুঝি না…এবার একটা ‘কমার্স-ফিকশন’ লেখা দেবেন…না হলে কিন্তু…!!!
-আচ্ছা যা, দিমু নে…!

আর মনে হয় ‘৯২ এর কেউ আসবেন না। কাইয়ূম ভাই এর কাছে গিয়ে ওনাদের ব্যাচের প্যারেড স্ট্যাট দিলাম। দেখি কাইয়ূম ভাই এবং কামরুল ভাই খুব চিন্তিত ভঙ্গিতে কি জানি আলোচনা করছেন। আস্তে করে প্রশ্ন করলাম,
-কোন সমস্যা নাকি?
-আর বলিস না, হল রুমের মধ্যে ব্যাপক হৈ চৈ হচ্ছে…কয়েকবার করে বলেও পোলাপাইনদের চুপ করানো যাচ্ছে না…কলেজের মতন তো আর শাউট করা যাবে না…কিন্তু কিভাবে যে সবাইকে থামাই…
-বস, এক কাজ করলে কেমন হয়? ডিজিটাল ডিসপ্লেতে ‘উপস্থিত আছেন’ কলামের সবচেয়ে উপরে বড় করে লিখে দেন ‘ব্লগ এডজুটেন্ট’! এতে কাজ হলেও হতে পারে…
-ভালো বুদ্ধি দিছস তো…দেখি ট্রাই করে…

মিনিট খানে পর ডিসপ্লেতে বড় করে দেখা গেল। ‘ব্লগ এডজুটেন্ট’ অনলাইন! ব্যস!!! কথা-বার্তা হঠাৎ করে কমে গেল। শুধু তাই না, সবাইকে দেখলাম ঠিক-ঠাক করে বসছে…!! Once a cadet, always a cadet…!!! ;;;

জিহাদ মঞ্চে উঠে সবগুলো মাইক অন করে ‘টেষ্ট…টেষ্ট…’ বলে চেক করে দেখল। তারপর নেমে এসে জানালো,
-সব প্লাগ-ইন চেক করে দেখলাম। কোন সমস্যা নেই, সব ঠিক আছে…

এমন সময় এক জুনিয়র এসে ওকে জানালো, গেটে ঢোকার সময় অনেকেই ভুল ইউজার নেম বা পাস বলছে…ফলে ঢুকতে পারছে না…

‘লোকজন এই সহজ কাজটা কেন ভুল করে বুঝি না’ বলে গজগজ করতে করতে ও মেইন গেটের দিকে চলে গেল। আমরাও বের হয়ে হলের সামনে দাঁড়ালাম, কেননা ইতোমধ্যেই ‘৯১ ব্যাচ আসা শুরু হয়ে গেছে।

২,১০৬ বার দেখা হয়েছে

৫৬ টি মন্তব্য : “প্রিন্সিপাল এসেম্বলী!! (সিসিবি ভার্সন) পর্ব ৩”

  1. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    দারুন দারুন :clap: :clap: :clap:


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  2. সামিয়া (৯৯-০৫)

    চরম হইসে। তাইফুর ভাইকে চরম বাঁশ দিসেন 😀 । খুব খুশি হইসি :thumbup: নিজেরেও একটু বাঁশ দিয়ে নিতে পারতেন :chup:

    জুনা ভাই, কেমনে আপনি সবার নামধাম মনে রাখেন?? কাগজ কলম নিয়ে প্রথমে কি লিস্ট করে নিসেন??

    জবাব দিন
  3. বন্য (৯৯-০৫)

    চ্রম হইতেসে বস.. তবে সামনে মনে হয় অশনি সংকেত :grr: :grr:

    অফটপিক: থ্রি ইডিয়টের Give me some sunshine//Give me some rain//Give me another chance//I wanna grow up once again..গান্টা শুনলেই জুনাভাই ও জেসিসি বৃক্ষ গংয়ের কথা মনে পড়ে 😀

    জবাব দিন
  4. পাভেল (১৯৯৩-৯৯)

    সিগারেটতো ভাল জিনিস জুনায়েদ। কবিতা নামাইতে কবিকূল কি জাতীয় বস্তুসকলের স্বাদ গ্রহন করিয়া থাকে তাহা আর ভদ্রসমাজে নাই বলিলাম।
    তবে লেখা ব্যাপক আনন্দের হইতেছে, চালিয়ে যাও বাছা 😀

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।