আমার চলে যাওয়া!!!

কয়টা বাজে দেখতে পারলে খুব ভাল হত-ভাবলাম আমি। বেশ কিছুক্ষণ আগে কে জানি বলে গেল আর দেড় ঘণ্টা বাকি। কতক্ষণ আগের কথা সেটা, আধা ঘণ্টা? বিশ মিনিট? আমি হাঁক ছেড়ে ডাক দিলাম,
-‘আনিস ভাই, এই আনিস ভাই…’
-‘জ্বি ভাইয়া, কিছু বলবেন?’
-‘আর কতক্ষণ বাকি?’
-‘উম্‌…আর পঁচিশ মিনিট বাকি…কিছু এনে দেব??’
-‘না থাক, থ্যাংক ইউ!’

আর পঁচিশ মিনিট! তারপরই সব কিছুর উর্ধ্বে চলে যাব আমি। শুনেছিলাম মৃত্যুদন্ড কার্যকর হবার আগে মানুষের নাকি নার্ভাস ব্রেকডাউন ঘটে…আমার তো তেমন কিছু হচ্ছে না…শুধু হুড়মুড় করে স্মৃতিরা এসে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে!

দু’বছর আগেও কে ভাবতে পেরেছিল আমার শেষটা এমন হবে? ঢাকা ভার্সিটি থেকে লোকপ্রশাসনে মাস্টার্স শেষ করার পর দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিলাম চাকুরী খোঁজা। আমার মতন ভাবাবেগহীন, বাস্তববাদী মানুষের মোটামুটি মানের চাকুরী পাওয়া কঠিন হবে না- ভেবেছিলাম আমি। আর ঠিক করেছিলাম চাকুরী পাবার পরপরই শুরু করব এমবিএ। এমবিএ শেষ হতে হতে বেশ অভিজ্ঞতা হয়ে যাবে…এরপর আরও ভাল মানের চাকুরী…অর্থাৎ সব কিছু হবে প্লান মাফিক!!! ছয় মাস খোঁজাখুঁজির পরও আকাংখিত চাকুরী না পেয়ে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়লাম…তারপরও চাকুরী খোঁজা ছাড়িনি…এরপরই ঘটল সেই ঘটনা…

ভেবেছিলাম চাকুরীর প্রয়োজনে সব কিছুই আমি করতে পারব…কিন্তু আমি ভুল ভেবেছিলাম…আমি সব কিছু কি ছোট্ট একটা কাজই করতে পারি নি…শেষ যে কোম্পানীতে চাকুরীর আবেদন করলাম, ওটা ছিল দেশী একটি প্রতিষ্ঠান- মালিকের নাম মোঃ আইনুল হোসেন- ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদ। চাকুরীর সবকিছু ছিল আমার মনমতন…বেতন, সুযোগ-সুবিধা, পোস্টিং- সবকিছু…যেদিন ভাইভা দিতে গেলাম গিয়ে শুনলাম মালিক নিজে আমার ভাইভা নেবেন! ‘ব্যাপারটা অস্বাভাবিক’- বলেছিল ওখানকার অন্যান্য কর্মচারী-কর্মকর্তারা…ভাইভা বোর্ডে আমি কিছুটা নার্ভাস ছিলাম। আইনুল হক একাই ছিলেন বোর্ডে। সবার আগে আমার যেটা চোখে পড়ল তা হল লোকটার এক হাত কাটা…
-‘আপনার বাবার নাম মোঃ মাহ্‌মুদুল ইসলাম? মুক্তিযোদ্ধা?’- প্রশ্ন করেছিলেন তিনি।
-‘জ্বি স্যার’- মনে মনে খুশি হয়ে জবাব দিয়েছিলাম আমি।
-‘দেখুন, আজ আপনার ভাইভা নেবার কথা থাকলেও বিশেষ কারনে নিতে পারছিনা…এক কাজ করুন, আগামী পরশুদিন আসুন। আর আপনার বাবাকেও সাথে করে আনবেন…আপনার বাবার মতন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সামনাসামনি দেখার সুযোগ ছাড়া ঠিক হবে না…’
-‘অবশ্যই স্যার’- আমি খুশিতে একেবারে গদগদ হয়ে বললাম!

বাসায় গিয়ে বাবাকে যখন জানালাম বাবা কেমন জানি চুপ করে গেলেন। আমার বাবাকে সারা জীবন দেখে এসেছি প্রাণচঞ্চল, অফুরান প্রাণশক্তিতে ভরপুর। এমনকি মা মারা যাবার পরেও তাতে এতটুকু ভাটা পড়ে নি…কিন্তু আজ তাঁকে এমন মলিন দেখাচ্ছে কেন??? আমি কোন উত্তর খুঁজে পেলাম না। রাতে খেতে খেতে জানালেন তিনি আমার সাথে যাবেন। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আমি।

নির্দিষ্ট সময়ে বাবাকে নিয়ে অফিসে চলে গেলাম। রিসিপশন থেকে সরাসরি মালিকের কামরায় গেলাম আমরা। আইনুল সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে বাবাকে নিয়ে চেয়ারে বসালেন এবং প্রশ্ন করলেন,
-‘মাহ্‌মুদ ভাই কেমন আছেন?’
-‘ভাল’- শুকনো কন্ঠে বাবার উত্তর।
-‘আপনি এসেছেন-আমি যে কি খুশি হয়েছি আপনাকে কি আর বলব…!!!’
-‘কেন আসতে বলেছ???’
-‘আপনার ছেলের বায়োডাটা দেখে আপনাকে চিনে ফেলি, কথাবার্তা শোনার পর নিশ্চিৎ হলাম আপনিই…দেখা করার এই সুযোগ কিভাবে ছাড়ি বলুন???’
-‘ব্যাস, এই???’
-‘আর একটা ব্যাপার…আপনার ছেলের চাকুরী…’
-‘বল, শুনছি…’
-‘আপনার ছেলের চাকুরী না হবার কোন কারন নেই…যোগ্য ছেলে…তবে, শর্ত একটাই- আপনাকে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে!’

এই পর্যায়ে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল, আমি প্রশ্ন করলাম,
-‘বাবা কেন আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে যাবে??’
-‘দু’টো কারনে, এক-আমাকে গুলি করে হাত পংগু করে দেওয়ায় এবং দুই- বিশ বছর আগে ভরা জন-সভায় আমাকে সবার সামনে থুথু দেওয়ায়…!!!’
– কুতকুতে চোখে জানাল আইনুল হোসেন।
-‘বাবা, কি বলছেন উনি!!!’
– ‘গুলি করেছিলাম একাত্তর সালে, ও যখন রাজাকারদের দলে যোগ দেয়…দুর্ভাগ্যক্রমে গুলিটা বুকে না লেগে হাতে লাগে…আর থুথু দিয়েছিলাম
জন-সভায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মায়া-কান্না করার কারনে…সুতরাং বুঝতেই পারছ, ক্ষমা চাওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না…!’
-‘সেক্ষেত্রে আপনার ছেলের চাকুরীটা হবে না…’ আক্রোশভরা কন্ঠে বলল এক কালের প্রতাপশালী রাজাকার।

মানুষ হিসাবে আমি ভাবাবেগহীন, বাস্তববাদী- এসব কিছুকে মিথ্যা প্রমান করে লাফ দিয়ে উঠে কলমের মুখ খুলে ধাই করে ব্যাটার বুকে বসিয়ে দিলাম…মসী যে আসলেই অনেক শক্তিশালী-তা প্রমান করে কিছুক্ষণ ছটফট করে মারা গেল আমার সম্ভাব্য বস মোঃ আইনুল হোসেন! রক্তমাখা হাতে বাবার দিকে তাকালাম আমি। বাবা একটা কথাও বললেন না, তবে খেয়াল করে দেখলাম তাঁর তেজী, প্রাণচঞ্চল ভাবটা ফিরে এসেছে…

এরপরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে গেল…মামলা হলো…সাক্ষী-জেরা…রায়…আমার ফাঁসি হয়ে গেল। জেলে বাবা একবারই দেখা করতে এসেছিলেন,
তেমন কথা হয় নি…যাবার বেলায় শুধু বলেছিলেন- ‘তোমাকে নিয়ে আমি গর্বিত!’

আমার জেল জীবনটা মন্দ কাটে নি…আসামী, পুলিশ এমনকি জেলার সাহেবও আমার সাথে খুব ভাল ব্যবহার করেছেন…প্রায়ই এসে জিজ্ঞাসা করতেন কিছু লাগবে কিনা…আমি বেনসন ছাড়া চাইবার মতন আর কিছু খুঁজে পাই নি…সবচেয়ে অবাক লাগে দাগী আসামীদের ব্যবহার দেখে…আমি একা একা প্রায়ই কবিতা আবৃত্তি করতাম, বাংলা এবং ইংরেজী- দুটোই…একবার এক ইংরেজী কবিতা আবৃত্তি শুনে কাঠ শামসু- যে কিনা কাঠের ব্যবসায়ী থেকে ক্যাডার হয়েছে এবং তেরটা মার্ডার কেসের আসামী, তার কি কান্না!!!
আমি প্রশ্ন করেছিলাম, ‘ঐ মিয়া কাঁদ কেন? কবিতার মানে কি কিছু বুঝেছ???’
-‘ভাই, মানে বুঝি নাই, তয় আপনের পড়া দেইখ্যা পোলাডার কথা খুব মনে পড়তাছে…’বলেছিল সে।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি, যে যেমনই হোক- শেষ পর্যন্ত সবাই মানুষই…কারও ভাই, কারও বাবা…!!!

দূরে শব্দ হতেই বর্তমানে ফিরে এলাম আমি। আর বোধহয় বেশিক্ষণ বাকি নেই। একটা কাজ বাকি আছে, যাতে আমার যাওয়াটা সুন্দর হয়। মনের পাতায় এক এক করে জীবনের সকল ব্যর্থতা, না পাবার বেদনা লিখতে শুরু করলাম…এরপর সেটার উপরে রাখলাম দুঃখ-কষ্টগুলোকে…মনে মনে রোল করে ফেললাম…ছোট-খাট সাফল্যগুলোকে বানালাম ফিল্টার…এরপর রাগ, ক্ষোভ, হিংসা, ঈর্ষাকে জ্বালিয়ে- সবকিছু মিলিয়ে সিগারেটের মতন পুড়িয়ে নিঃশেষ করতে লাগলাম…আমার শুরু হয়েছিল শূণ্য দিয়ে…শেষটাও সেরকম হোক!!!

জেলার সাহেব লোকজন নিয়ে চলে এসেছেন। সবকিছু প্রস্তুত। আমাকে জানালেন আমার ফাঁসি কার্যকর হবে ঠিক সকাল সাতটা পাঁচ মিনিটে। ‘সময়টা রাউন্ড ফিগার হলে ভাল হত’- ভাবতে ভাবতে হেসে ফেললাম…জেলার সাহেব অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন, এরপর আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন শেষ কোন ইচ্ছা আছে কিনা। আমি একটি সত্যিকারের সিগারেট চাইলাম। সিগারেট শেষ করে সেন্ট্রিকে বললাম,
-‘যাবার বেলায় সিগারেট দুটো মন্দ লাগল না!’
-‘কিন্তু আপনি তো খেলেন একটা!!!’
আমি কোন জবাব না দিয়ে শুধু একটু মুচকি হেসে ধীরে ধীরে ফাঁসীর মঞ্চে উঠে গেলাম…পেছনে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল সেন্ট্রি…!!!

২,৮১০ বার দেখা হয়েছে

৫৪ টি মন্তব্য : “আমার চলে যাওয়া!!!”

  1. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    দুই দুইটা ব্লগিকা(সাইজ ব্লগের মত কিন্তু নামে কমেন্ট)প্রস্পব কইরা আমি এট্টু কেলান্ত।এইখানে আমি বিশাল একটা কমেন্ট করুম একটু রেস্ট লয়া লই।

    জুনা ভাইজান-ম্যায় তেরা ফ্যান বন গিয়া মামু!

    জবাব দিন
  2. তাইফুর (৯২-৯৮)

    জুনা ... অসাধারন ... (আর কত প্রশংসা নিবি ??)
    'এক সিগারেট, দুই সিগারেট' ... বুঝতে পারলাম না। নিজেকে বোকা বোকা লাগতেছে। :-B
    একটু বুঝায়ে দিবি ??


    পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
    মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।