বার-বি-কিউঃ কয়লা, পরোটা, নিউইয়ার এবং আমি!

    ২৭/১২/০৮

আমি, আমার বোন আর তূর্য যখন বনানীর শর্মা-তে দুইখান পিজা কচ কচ করে চাবায়ে খেলাম, তারপরে ঢেকুঁর তুলোনের আগেই তূর্যের দুলাভাই ফোন দিল। বনানীতেই বাসা, তিনি আর আপু কেএফসিতে খাইতে যাবেন। আমরা হাউকাউ লাগাইলাম আরেকটু আগে কইলেই তো পিজাগুলা ক্যান্সেল করতে পারতাম! :bash:

যাহোক সাথে গাড়ি ছিল বলে টান দিয়া গুলশানে গিয়ে দেখি ক্রিসমাসের লাল ফারকোট পড়ছে কেএফসি’র বুড়াটা (এরে দেখলেই ক্যান জানি ফুলানো ভুড়িটায় খোঁচা দিতে ইচ্ছা করে! ;)) )। পাশে কয়েকটা ললনা হেলান দিয়া বুড়ার ভুড়ি জড়ায়ে ধইরা ফটু তুলতেছে। দেখে ভাবলাম ক্লিক করি, সাথে ১.৩ এমপি’র মোবাইল ছিল। কিন্তু ভাবলাম যীশূর আম্মা এই রাইতে কত কষ্ট করতেছিল, মেজাই-রাও কত কষ্ট কইরা দোয়া করতে গেছিল (যদিও ঘটনা মনে হয় এই রাতে ঘটে নাই, কিন্তু পুরান অভ্যাস।), আর আমি কী না! পিজা ভরা পেট নিয়ে মুরগি-প্রাসাদে ঢুকে দ্বার-রক্ষী ভুড়িমোটা-বুড়ার পাশের ললনাদের ফটু তুলতেচি? ধিক মোরে, শত ধিক! 😐
সেদিনই সবার লগে বইসা চিকেনস্ট্রিপ (মেরিল স্ট্রিপ বা ডেমিমুরের স্ট্রিপ না! 😉 ) কামড়াইতে কামড়াইতে ডিসিশান হইল যে থাট্টিফাশটো উদযাপন করতে হবে। পুলাপাইন! কী কী জিনিশ যে আসছে। আমরা তো ঘুমাইয়া বছর পার করে দিতাম!

    ৩০/১২/০৮

আজকে শপিং করতে হবে। গরুর মাংশ, মুরগির মাংশ আর মাছ। নামে কইলাম শপিং কিন্তু আসলে কাঁচাবাজার। তো আমি সুবোধ বালকের মতোন বাসার পাশের কচুক্ষেত (চরি, এটার নতুন সুশীল নামঃ রজনীগন্ধা সুপার মার্কেট! কালে কালে কচুও সুগন্ধী রজনীগন্ধা হইছে! 😮 )-এ যাইতে চাইলাম। কিন্তু পুলাপাইন ডার্টি কাঁচাবাজার পছন্দ করে না। তারা নিয়ে গেল আগোরা, নন্দন আর ল্যাভেন্ডার। পয়সা দিতেছি আমি আর দুলাভাই, তাই কষ্টটা টের পাইলাম। ব্যাঙের ছাতা যারে সুশীলরা বলে “মাশরুম”, সেটারে আইসক্রীমের বক্সে ভরে সাদা পলিথিন দিয়ে মুড়ে বিক্রি করতেছে আর দাম রাখছে ৪০০ টাকা! 😡 রান্না করার পরে আমি আস্তে কামড় দিছি, হাজার হউক ৪০০টাকার ব্যাঙের ছাতা! মুরগি কিনলাম রান-থান মিলানো মাংশ, আর কিনলাম ষাঁড়ের কুঁজের মাংশ, মাছ কিনলাম ভেটকি দুইটা। সাথে রান্নাবান্নার বার্বিকিউয়ে যা যা লাগে কেনা হলো।

বিকালে গেলাম কয়লা কিনতে। এটাতো আর আগোরা, নন্দনে পাওয়া যায় না। কচুক্ষেতই ভরসা। কামারের দোকান থেকে ১০ কেজি কয়লা কিনে আনলাম। এইটা নিয়ে পরে বিশাল কাহিনী হইছিল।

    ৩১/১২/০৮

অবশেষে থাট্টিফাশটো এসে গেল। পুলাপাইন (মানে গুষ্টিগুড়ান যা আছে কাজিন-মাজিন সব) আসতে শুরু করলো বিকাল থেকে। আমার বুয়েটের এক দোস্ত আবার চাকরির ট্রেনিং সেরে আসছে ইটালি থেকে। সে সবাইকে সন্ধ্যায় দাওয়াত দিছিল। সেখানেও গেলাম। ফিরতে ফিরতে রাত আটটা।

সবকিছু ছাদে সেট করা হলো, চুলা কয়লা তেল মাংশ মশলাপাতি নিয়ে আমরা উঠলাম। কেরোসিন ঢেলে কয়লা ধরানোর চেষ্টা করতেছি। একঘন্টা পার হইলো, দেখি কিছুতেই আগুন ধরে না। আমার পিতা রায় দিলেন, কামারপাড়ার ফটকা চাল্লুগুলা আমারে আর তূর্যরে “মামু” বানাইছে, পুড়ানো কয়লা ধরায়ে দিছে! রাগে মনে হইল গায়ে কেউ কেরোসিন ঢেলে দিছে! :gulli: তখনই গাড়ি বের করে দৌড় দিলাম কারওয়ান বাজার। দুলাভাইয়ের “সোর্স” বললো, ওখানে “রিয়েল” কয়লা পাওয়া যাবে।

সেখানে ট্রাকের ফাঁক দিয়া, মুরগির গায়ের গন্ধ পার হয়ে একটা গহীন গর্ত থেকে কয়লা আবিষ্কার হইল। ব্যাটা আবার পাইকারি বিক্রেতা! “কিনলে একমণ নাইলে যান”- এরকম চেহারা বানায়ে বসে আছে। অগত্যা আমাদের সেটাই করতে হলো। একমণ কয়লা নিয়ে ফিরে আসলাম ছাদে। বস্তা খুলে কয়লা যা বাইর হইলো তা ছুড়ে মারলে নির্ঘাত কেউ বিশ সেকেণ্ডের জন্যে জ্ঞান হারাবে! এবারে আগুন ধরতে বেশি টাইম লাগলো না। সেই আগুনে গরুর কিছু মাংশও পুড়ে কাই হইলো। :bash:

মধ্যে মধ্যে আমি আবার নিচে বাসায় ক্ষুধার্ত খালা-মামা-গুঁড়াকাজিনদের আশ্বস্ত করতেছি, মাংশ কুকিং, ইনশাল্লাহ নতুন বছরে খাওয়া যাবে! কয়লা-ঝামেলাতে খেয়াল নাই যে পরোটার অর্ডার ছিল। সেটা দোকান থেকে নিয়ে আসার কথা দশটায়! খেয়াল যখন পড়লো তখন এগারোটা বাজে। আমি আর তূর্য আবার দৌড়ে বের হলাম। বনানীর একটা দোকানে অর্ডার ছিল পরোটার, যাইতে গিয়ে দেখি পুলিশ বনানীর সব এন্ট্রান্স বন্ধ করে দিছে। গাড়ি ঢুকতে দিচ্ছে না! আরেক ফ্যাসাদে পড়লাম। ভাইকে বললাম গাড়ি ঘুরায়ে নিয়ে আয়, আমি পরোটা ম্যানেজ করি। দোকানে গিয়ে পরোটা নিয়ে রিকশা করে ফিরছি, দুই হাতে তেলচুপা পরোটার ব্যাগ। পুলিশ আটকাল। “ব্যাগে কী?” বললাম পরোটা। “বাসা কই?” বললাম ক্যান্টনমেন্ট। কোনমতে ওখান থেকে বের হয়ে গাড়িতে ফিরলাম। চেহারা সুরত দেখে মনে হয় ছেড়ে দিছে। :-B

অবশেষে বারোটার সময় মাংশভাজা শেষ হলো! খেয়াল করলাম শেষ খাইছি বিকালে। খাবারগুলা নিচে নিয়ে এসেই খাওয়া শুরু হইলো। পিঁয়াজ-মাংশ দিয়ে পরোটাভাজা মুখে দিয়ে ভাবলাম, নাহ্‌, এই নতুন বছরটা ভালোই যাবে মনে হচ্ছে! :party:

ঐদিনের বার্বিকিউয়ের কয়েকটা ছবিঃ
গরুর মাংশশিকচারকোল
[পোস্ট লিখে রাখছিলাম কয়েকদিন আগে। মাঝে কাজের ঝামেলায় শেষ করে দেয়া হয় নাই। সিসিবি-তে আমার সময় কাটানো বাড়তেছে। এই লেখাটা শুধুই সিসিবি’র জন্যে। যারা এখানে এই পরিসরটা তৈরি করে দিছেন, তাদের সকলকে অনেক ধন্যবাদ! সবাই ভালো থাকুন!]

৩,৬৭৯ বার দেখা হয়েছে

৫৪ টি মন্তব্য : “বার-বি-কিউঃ কয়লা, পরোটা, নিউইয়ার এবং আমি!”

  1. সাকেব (মকক) (৯৩-৯৯)
    সিসিবি-তে আমার সময় কাটানো বাড়তেছে। এই লেখাটা শুধুই সিসিবি'র জন্যে।

    তোমাকেও ধন্যবাদ সিসিবিতে বেশি সময় কাটানোর জন্য...তোমার মত লেখকরা থাকলে সিসিবির স্ট্যাটাসটা আরো বাড়বে...

    আহারে! একটু মাংস যদি খাইতে পারতাম :(( ...

    যে জিনিসের ভাগ তুমি তোমার প্রতিবেশীকে দিতে পারবেনা, তা তুমি উহাদের স্মমুখে ভক্ষণ করিও না

    😡 😡 😡


    "আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
    আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস"

    জবাব দিন
  2. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    বস কি কচুক্ষেতে থাকেন নাকি 😮 😮 😮


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  3. হেহেহেহেহহ
    আইকজা আমিও বাসায় আরকু মুরগী মসল্লা দিয়া মুরগী রান্না করছি। ডিনার কইরা আসলাম। কিন্তু এইখানে আস্তা মুরগীর রান রেইখা বার ক্ষিদা লাইগা গেছে। 🙁

    আন্দালিব, সাবাস ব্যাটা। এই টাইপ লেখা দিবি। একটানে পইড়া ফালাইছি। খুব সুস্বাদু। 😀 😀 😀

    জবাব দিন
  4. রহমান (৯২-৯৮)
    ব্যাঙের ছাতা যারে সুশীলরা বলে “মাশরুম”

    আমি কি চোখে ভুল দেখতেছি? শুরুতে পড়লাম "মাশরুফ", কপি কইরা এখানে পেষ্ট করার পরে দেখি এইটা আসলে মাশরুম ~x( । নাহ্‌ আমার চশমা নিতে অইব তাড়াতাড়ি :-B

    আন্দালিব, সিসিবিতে তাইলে অনেক ভাল ভাল রাধুনি আছে দেখি। দেশে আসার পরে মার্চ-এপ্রিলের গেট-টুগেদারে তাইলে তোমারে আর কামরুলরে দিয়া একটা হাতে-কলমে বার-বি-কিউ পার্টির আয়োজন করা যাবে 😉

    জবাব দিন
  5. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)

    ক্যান্টনমেন্ট, কচুক্ষেত..............ইসসসসস পরিচিত জায়গার নাম মনটারে কেমুন কেমুন যেন কইরা দিল :dreamy: :dreamy: ।

    ওয়েলডান ব্রাদার........ভালো হইছে :guitar: :guitar: ।


    Life is Mad.

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।