শিরোনামহীন কথোপকথন – দুই

–  হ্যালু, ক্যা ফুন করছেন?

–  হ্যালো, সিরাজ ভাই আমি নাসিমা, ঢাকা থেইকা …

–   কিরে নাসিমা? আসোস কেমন? তর ফুন না পাইয়া আমি এইদিকে চিন্তায় পইড়া  গেচিলাম।

– বালা আছি। আফনের খবর কি হেইডা কন?

–  আমি তো সবসময় ভালাই থাক্কি। তয়, দুকানের কামডা ছাইড়া দিসি।

–  হায়! হায়! কন কি?

–  হ, ওহন বইয়া বইয়া রিটারমিন খাইতাছি। হেঃ হেঃ হেঃ

–  আরিকটা কাম পাইছেন নাকি মালিকে খেদাইয়া দিসে?

–   হুন, তর সিরাজ ভাইরে খেদানোর ক্ষেমতা এই দোন্যাই কেরুর নাই…

–   হ, হ, বুচ্চি … আফনেরে আমার চিনা আছে… আফনের মতো আকাইম্যা ব্যাডা আমি দুইডা দেহিনাই।

–   তর এই কথার লাইগা তরে যে আমার কি করতে ইচ্চা করে …

–   এই হুনেন, দুকান থেইকা ফূন করছি, ওহন রঙঢঙের কতা কয়োনের টাইম নাই। আফনে ঢাকা আইবেন কিনা হেইডা কন?

–   ওহন ঢাকায় আমু কেমনে?! আমার কত কাইমকাইজ আছে জানোস?

–   আফনের তো চাকরিই নাই। কিয়ের কাম আফনের? হুনেন, আমাগো খালু জাপান যাইবো দুই মাসের লাইগা। খালাম্মা এট্টা নিজোগো চিন-পরিচয় ব্যাডা খুঁজতাছে বাসায় থাহনের লাইগা। আমি আফনের কতা কইছি।

–   আমার কথা কি কইচোত?

–   কইছি, আফনে আমার বড় কাকার পুলা … হিঃ হিঃ হিঃ

–   তুইতো দেহি ম্যালা চালাক হইয়া গ্যাচোস ঢাকা থাইক্কা! হুন, আমি এট্টু ভাইবা দেহি আর এদিকের কাইমকাইজ সাইজ দিয়া লই।

–   হুনেন, আফনে তো এককান আকামের ঢেকি। ঢাকা আয়োনের একটা ব্যবস্থা হইছে, এইডা কিন্তু আর পাইবেন না। একবার আইলে তখন আরেট্টা কাম জুইট্টা যাইবো। না আইয়া শিবালয়ে বইয়া থাকলে চাকরি কেউ আফনেরে গালে তুইলা দিবো নাকি?

–  মাইয়্যা মানুষ সবসময় এট্টা ফ্যাসিলিটির মইদ্যে ফালাইয়া দ্যায় … হুন…

–   কি হুনুম? আফনের অইলো প্যাটে ক্ষিদা আর মুক্কে লাজ; মেনিমুইখ্যা বরকন্দাজ কুনহানকার… আমারে আর পাইবেন না কইলাম… বুচ্চেন?

–    যা কতা হিকচোছ না! হুন, তর খালু যাইবো কবে?

–   সিপটিম্মরে যাইবো, ওহন তো আগুষ্ট মাস, এ্যার পরের মাসে। খালু যাওনের আগ দিয়া আফনের আইতে হইবো কইলাম।

–   আইচ্চা তাইলে তর খালাম্মারে আমার কথা ফাইন্নাল কইয়া দে।

–   আমি খালাম্মারে কওনের পর কিন্তু মুড়ামুড়ি কর্তে পারবেন না, পাক্কা কথা কন ওহনি।

–    ক্যা? আমার কতা তর কানে ঢুকতাছে না, নাকি? কি কইলাম তরে?

–  চ্যাতেন কিয়ের লাইগ্যা?

–   এ্যা? চেতুম না, উনারে ধইরা সুহাগ করুম! হুন, তর খালুর লগে আমারে ফুনে ধরায় দেস।

–    খালু লাগবো না। খালাম্মাই কেস ফাইনাল। এ্যাগো বাসায় মাগী মোড়ল মিনসে গাড়ল, বুচ্চেন? … আমার আর আফনের লাহান… হিঃ হিঃ হিঃ

–     তরে ওহন সামনে পাইলে থাপড়িয়া তর দাঁত ফালিয়ে দিতাম।

[হিঃ হিঃ হিঃ … … ]

–  হুনেন, হুদাই এতো ভাব নিয়েননা। পাটুরিয়ার মন্নান ভাই আমার খুঁজখবর নিয়া যায় রিগুলার। হেই সিয়েনজি চালায়তাছে ঢাকায়। বুচ্চেন? আফনের তো কুনো কামের মুরোদ নাই। নাসিমা এতো সস্তা না! দাম আছে।

– মন্নানের লগে যাবি তো যা। তরে কি আমি বাইন্দা রাখছি?

–  মন্নান ভাইর কতা কইচি আর ছ্যাত কইরা জ্বইল্লা উঠছে, না? ওই মিয়া বুজেন না, আপনেরে ঢাকায় ক্যান আইতে কই? হেইডা কিয়ের লাইগা? যত্তসব।

–  হ, ওহন আর ভুজুংভাজুং মারন লাগবো না। তর যে অদপতন হইতাছে, দিনদিন এট্টা খ্রাপ মাইয়া হইয়া যাইতাছোস।

–   হ, আমি তো খ্রাপ মাইয়া। খ্রাপ মাইয়ার লগে দুই দিন কতা না কইলে আবার আফনের ঘুম অয়না। সিরাজ ভাই হুনেন, মায় কইলো মোমেনা নাকি বাপের বাড়িত ওহন … আপনের লগে দেখা হয়নাই? হিঃ হিঃ হিঃ

–  না, হয়নাই। অয় বাপের বাড়ি আইলে আমার কি?

–  ক্যান? অয় না আপনের পুরানু দিল্লাগি! অয় তো আপনেরে অনেক চাইতো … হিঃ হিঃ হিঃ

–  একটা চটকানি দিমু তরে ধইরা।

– এইযে হুনেন, আমি ওহন ফুন রাখুম। সাত মিনিট হইছে।

–  আপনে খালাম্মার ফুনে ফুন দিয়েন। রিজিয়া বুরে দিয়া করাইয়েন। ডাইরেট কইরেন না কইলাম। খালাম্মায় ব্যাটা মানুষ চাইলে দিবার চায় না। মিজাজ দ্যাখায় পরে।

–  আইচ্চা, করুমনে। তুই বালা থাকিছ। হুন, তর লাইগা লাল চুঁড়ি কিইন্না রাখছি। আহনের হময় আনুমনে।

–   করচেন কি? আফনের পকেড তো এমনিতেই ফুডা, আবার আমার লাইগা কিনচেন? আইচ্চা হুনেন, আমি খালাম্মার কাচ থেইকা কুনফাম হইয়া আপনেরে পাক্কা জানামুনে।

–  হ, ঠিকাসে, জানাইস। কতা হইবোরে নাসিমা। ভালা থাহিছ আর মন দিয়া কাইমকাইজ করিস।

–   আইচ্চা, আফনেও ভালা থাইক্কেন। সিলামালিকুম।

–    হ…।

.

ছবি: জিওফ্রে হিলার, ২০০৯

৫,১০৬ বার দেখা হয়েছে

৪৫ টি মন্তব্য : “শিরোনামহীন কথোপকথন – দুই”

  1. মেলিতা

    ভাইয়া সংলাপ পড়ে তো মনে হল হয় সত্যি নাসিমা লিখছে, অথবা লেখক নাসিমাকে কাছে থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। :grr: কেম্নে কি??

    এই ধাঁচের আলাপ গুলো অনেক শুনেছি, ঠিক এই রকম সহানুভূতি দেখাই নি কখনও। আপ্নি আসলে বড় মনের মানুষ। :salute:

    জবাব দিন
    • রাব্বী (৯২-৯৮)

      মেলিতা, ধন্যবাদ। নাসিমা এবং সিরাজরা তো আমাদের সুবিধাপ্রাপ্ত জীবনের সাথে মিলেমিশে আছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়।

      সমবেদনা দেখাইনি। স্নিগ্ধ ছলনার কথোপকথন ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র।


      আমার বন্ধুয়া বিহনে

      জবাব দিন
  2. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    সিসিবির অন্যতম কথা শিল্পী রাব্বী :hatsoff:
    দুইটা কথোপকথন পুরা দুই মেরুতে গেসেগা দেখি। বাফার জোনের কিছু মনে হয় সামনে আসতেসে :thumbup:

    রাব্বী, মইনুল, তাইফুর, রহমান, নাহ [৯২-৯৮] এর সবাই দেখি সেইরকম লেখে :thumbup: :thumbup:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  3. আন্দালিব (৯৬-০২)

    স্নিগ্ধ ছলনা, তাই না?

    হবে হয়তো। আসলেই হয়তো সেটা স্নিগ্ধ ছলনা।

    তিনটা পর্বের মাঝে শেষেরটা পড়েছি সবার আগে। মাঝে গত দুইদিন ভাবছিলাম ওই জেনারেশনের মানুষ না হয়ে কিভাবে তাদের কথা ধরলেন। তারপরে প্রথম পর্বটা পড়লাম আজ। মোটামুটি, গতানুগতিক, হয়তো পুর্ণেন্দু বাবু বা অন্যেরা মিলে ক্লিশে করে ফেলেছে, আমাদের মধ্যমানের মধ্যবিত্তীয় কথাবার্তাকে। এখন কোন উহ্য কথাও আমরা চেহারা না দেখে কানে কানে বুঝে ফেলতে পারি, টেক্সটে তো তার চেয়ে বেশি আসে।

    তবে আমি রীতিমত মুগ্ধ হয়ে গেলাম এই ২য় পর্বে! এতোটা সাবলীল, আর ভিভিড (ভিভিডের ভালো বাংলা নেই!)। এটা তো শুধু জেনারেশনের বদল নয়, স্থানের বদল, মানুষের শ্রেণীর বদল, প্রজন্মের বদল বলতে পারছি না, এই শ্রেণীর মানুষ হয়তো প্রজন্ম প্রজন্ম ধরে একই নিয়মে জীবনপাত করছে। উপরে উপরে যে মানুষ বা তার ভাষা দেখা যায়, শোনা যায়, সেখানে একটু নজর ফেললে হয়ত এমন ডিটেইল দেখা যেতো। আরেকটু মনোযোগ দিলে হয়তো নাসিমার ছল- কিংবা ফোন রেখে দেয়ার পরে সিরাজের মৃদু হাসি দেখতে পেতাম।

    আপনার লেখাটা সেই চিন্তা সেই কল্পনাকে উস্কে দিলো। টুপি বিয়োজন!! :hatsoff:

    জবাব দিন
    • রাব্বী (৯২-৯৮)

      আন্দালিব, তোমার কমেন্ট খেয়াল করলাম আজ। এই পর্ব সর্ম্পকে তোমার ভাল লাগা এবং মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে আমাকে লিখতে উৎসাহ জোগাবে। কথোপকথনটি কল্পনাকে এতোটা উস্কে দিতে পারবে লেখার সময় চিন্তা করতে পারিনি। নিরন্তর ধন্যবাদ।


      আমার বন্ধুয়া বিহনে

      জবাব দিন
  4. রায়েদ (২০০২-২০০৮)
    এটা তো শুধু জেনারেশনের বদল নয়, স্থানের বদল, মানুষের শ্রেণীর বদল, প্রজন্মের বদল বলতে পারছি না, এই শ্রেণীর মানুষ হয়তো প্রজন্ম প্রজন্ম ধরে একই নিয়মে জীবনপাত করছে।

    একদম মনের কথা বলসেন ভাইয়া। এ কারণেই এই পর্বটা বেশি ভালো লাগছে।

    জবাব দিন
  5. মনজুর (৮৯-৯৫)

    দেরী করে পড়ার অসুবিধা হচ্ছে.. কমেন্ট দিতে যেয়ে দেখা যায়, যা বলতে চাচ্ছি তা অন্যরা আগেই লিখে রেখেছে। এইরকম অসাধারণ গল্প হয়তো অনেকবার পড়লেও ভালো লাগে, কিন্তু কমেন্ট যত ভালোই হোক, তা কি লেখকদের দুইবার পড়তে ভালো লাগে? নিজে লিখি নাতো, তাই উত্তরটা জানি না।
    তয়, কোনো রহমে উত্তরটা যদি পজিটিভ হয়, তাইলে পরে.. সব কয়টা কমেন্ট আরো একবার পইড়া লইয়ো 🙂 😀

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।