কৈশোর ৪

সব ভালো জিনিশেরই বোধহয় একটা শেষ থাকে। আমাদের জীবন আবার এতোই অদ্ভুত- অনেক কিছুই শেষ হয়েও শেষ হয় না। এই গল্পের শেষটুকু আমি এখনও কাউকে বলি নাই। এই লেখাটাও আগে শেষ করি নাই। এখন কেন জানি মনে হচ্ছে শেষ করতে হবে। সব কথা ফুরুলে নির্বাক বসে থাকা নির্জন বাতিঘরের কাছে আর কোনও কথা জমা থাকবে না। সেভাবে নির্ভার হওয়াটাও জরুরি মনে হচ্ছে এখন।

৫ই জুন মেসেজটা পেয়েছিলামঃ “যতদূরে গেলে দূরে যাওয়া হয়, তার চেয়ে কত দূরে তুমি?… কেমন আছো বেকুব?”
পেয়ে থমকে গেছি। অপরিচিত নম্বর। কিন্তু সম্বোধনটা এত চেনা! আমাকে এইভাবে একজনই তো ডাকতো, ডেকেছিল। সেই ডাক পুরোনো হতে হতে অশ্রুতির গভীরে চলে গিয়েছিল। একটা বাক্যে ভুস করে শুশুকের মতো ভেসে উঠে চমকে দিল আমাকে!

আমরা দু’জনই অনেক ছোট ছিলাম। বোধগুলো তখনও সেভাবে ফুটেনি। হয়তো বুঝতামও না কি অনুভব করতাম! আশাপাশের বড়োদের দেখে দেখে শিখে নিয়েছিলাম কিছু স্বর, কিছু অনুভূতি। হয়তো সেগুলোর অনুকরণ করতাম। কিন্তু আমার হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়াটা তো স্বতঃস্ফূর্ত ছিল! এই যে বন্ধুদের হৈচৈ ভালো লাগত না আর, মাঝে মাঝে ইচ্ছা করতো একা থাকি। খুব মনোযোগী ছিলাম পড়াশোনায়, সেটাতে আরও মনোযোগী হয়ে গেলাম! পরীক্ষার খাতা দেয়ার সময়ে, বা ক্লাশে পড়া ধরলে যখন সব পারতাম, দু’জোড়া চোখে প্রশংসা ঝরে পড়তো! ঐ দুটো চোখ আমি ব্যাগে ভরে বাসায় নিয়ে আসতাম মনে হয়!

কথা এককান দু’কান হতেও দেরি হলো না! আমরা তো তখনও কপটতা শিখি নাই। তুচ্ছ হাসিতেও মানুষ কতকিছু বুঝে নেয়, আর আমরা তো গল্প করতাম অনেক অনেক। এখন মনে পড়ে, কী আবোল-তাবোল বিষয়েই না কথা হতো! অনেকের টিপ্পনি, বাকাঁহাসি উপেক্ষা করে আমাদের মাঝে চলতো অদ্ভুত অকপট সারল্যমাখা সব হাসি, চাহনি আর আবেগ! শেষমেশ পরিণতি দূরত্ব হবে এটাও আমরা একসময়ে বুঝে গেছি। হৃদয়-ক্ষরণের দুঃখবোধ খুব উন্মাতাল করেছিল। মনে হয়েছিল গলার মাঝে দলা পাকিয়ে উঠছে কান্না। একদিন বিকেলে আমরা শেষ কথা বলেছি, জানতাম যে এটাই শেষ কথা- পরদিন ওরা চলে যাচ্ছে। ওর বাবার বদলি হয়ে গেছে। যোগাযোগ থাকবে না জেনে আমরা বলি নাই, চিঠি দিও। তবে মনে আছে অনেকদিন পর্যন্ত আমি মনে মনে ভাবতাম ওকে চিঠি লেখার কথা। খুবই নাবালক চিন্তা হয়তো। আবার হয়তো খুব বেশি সৎ!

ওর ডান পাশে একটা গজদাঁত ছিল। হেসে উঠলেই ঝিকিয়ে উঠত। অনেক প’রে বুঝেছি, সেই হাসি ক্ষমাহীনভাবে বুকে গভীর আঁচড় কেটে গেছে। আমাকে অনেকটাই বেঁধে ফেলে অনেকদূরে চলে গেছে। অনেকগুলো বছর পরে ২০০২ সাল। আমি তখন ওমেকায় কোচিং করি, সাথে সানরাইজেও। বুয়েটে চান্স পেতে হবে। ওমেকার সিঁড়ি দিয়ে এক ক্লান্ত দুপুরে উঠছি। নিজের ক্লাশে যাবো। উঠেই যে রুমটা ওটার দরজা খোলা। বেঞ্চিতে একটা মেয়ে বসে আছে। ঈষৎ ঘাড় বেকিয়ে হাসছে। পাশের মেয়েটির সাথে গল্পে মশগুল। আমি একটা পদক্ষেপ মিস করলাম! দুপুরের তীর্যক রোদে ঝিকিয়ে উঠল গভীর ক্ষতের দহন!!

এটা গল্প হলে সেখানে আমাদের আলাপ হতো। অনেক গল্প হতো। পরে দেখা হতো, হয়তো আবার “কিছু একটা” হতো। এবারে দুজনেই বড়ো বলে একটা নাম দিতে পারতামঃ প্রেম-ভালোবাসা-ভালোলাগা-পছন্দ। কিন্তু যাপিত জীবনে সেরকম ঘটে না। ঘটে না বলেই আমরা সাধারন জীবনে অভ্যস্ত হই। আমি ধীরপায়ে সিঁড়ি উৎরে চলে গেলাম আমার ক্লাশ রুমে। পড়ায় মন দিলাম। মুমু নামের মেয়েটা আবারও হারিয়ে গেল আমার জীবন থেকে!

আরও ছয় বছর পরে, বুয়েট জীবনের শেষে এসে আবার একটা মেসেজে মুমু চলে আসলো! আমার নম্বর কোত্থেকে পেয়েছিল জানি না। হয়তো কোনও বন্ধু, বা বন্ধুর বন্ধু! রিপ্লাই না দিয়ে কল্‌ব্যাক করলাম। সেদিনের কী কথা হয়েছিল, সে নাহয় উহ্য থাক। শুধু এটুকু বলতে পারি, কোন কোন গল্প এভাবেই শেষ হতে হয়। সময় আমাদের কতো কতো বদলে দেয়, সাথে পরিপার্শ্ব, পরিবার এসব ভ্যানতাড়া। ভাবতে ভালো লাগে না। চিন্তা করতে তো আরও খারাপ লাগে।

জীবনের গল্প বড়োই অদ্ভুত! এভাবে দেখা হলো কেন? দেখা হলেও কথা হলো না কেন? এরকম হাজারটা প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু উত্তরগুলো ঠিকঠাক পাওয়া হয়ে ওঠে না!

(সমাপ্ত)

৪,৭১৩ বার দেখা হয়েছে

৫৮ টি মন্তব্য : “কৈশোর ৪”

  1. রকিব (০১-০৭)

    শেষ হয়েও যেন বাকি রয়ে গেল... মোবাইলের আলাপচারিতা নিয়ে কি আরেকটা ব্লগ পাবার কোন সম্ভবনা আছে?????

    নিজের ব্লগে নিজেই প্রথম কমেন্ট দিয়ে আমার ফাষ্ট হওয়াটা মাটি কইরা দিলেন কেন x-( x-( x-( ???


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  2. হাসনাইন (৯৯-০৫)
    জীবনের গল্প বড়োই অদ্ভুত! এভাবে দেখা হলো কেন? দেখা হলেও কথা হলো না কেন? এরকম হাজারটা প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু উত্তরগুলো ঠিকঠাক পাওয়া হয়ে ওঠে না!

    কি কইলেন ভাই?? এত ঝড়ের আলামত। 🙁

    জবাব দিন
  3. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    কোচিংএর সময়কার ঘটনাটা মানতে পারলাম না... 🙁
    কেন দেখা হল না??? কেন কথা হল না??? :bash:
    কেন? কেন? 😡
    কর্তৃপক্ষ জবাব চাই... :chup:


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  4. রহমান (৯২-৯৮)

    সত্যি কথা বলতে কি, কৈশোর-১,২,৩ পড়ে পিপাসার মাত্রাটা অনেক বেড়ে গিয়েছিল আমার। গুড় থেকে মধু, তারপর মধুর ঘনত্ব বাড়ার সাথে সাথে মিষ্টির পরিমানও বাড়ছিল 😡 । কৈশোর-৪ পড়ে এখন মনে হচ্ছে গলায় কাঁটা বিধে আছে 🙁 । এখানে কেন শেষ হলো? আরেকটু বড় করা কি যায়না এই সিরিজ টা? সত্য ঘটনা না হোক, তাতে কি? কাল্পনিক ভাবে হলেও আমাদের মাঝে কৈশোর-৫ কি আসতে পারেনা?

    পাঠকদের কি মতামত???

    জবাব দিন
  5. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    আইচ্ছা এইটার একটা বাটার-ফ্লাই ইফেক্ট খাড়া করাইলে ক্যামন হয়। এই মনে কর কোচিং এ কথা হইল, কিংবা তারও আগে বগুড়ায় ঠিকানা দেয়া নেয়া হল। চিঠি লেখালেখি হল। বুয়েটে এক সাথে পড়ল।

    ঊমম, খারাপ হত না মনে হয়। তবে আন্দালিব মনে হয় তখন এত সুন্দর করে লিখতে পারত না কি বল?


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  6. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    ভালোই,

    প্রথম বাল্যের 'ডাহুক প্যায়ার' কিনা! 'একটা সম্ভাবনা আমাদেরও ছিলো' পাঠক মনে 'জলের ঘর্ষণ লাইনের' মতই সূক্ষ্ণ এই 'ঘ্রাণ সঙ্গম' চাগিয়েই 'প্রণয় এবং বিচ্ছেদের অবশ্যম্ভাবিতার' ইতস্ততঃ বোধটাকে তীব্র করে দেয়।

    :dreamy: :dreamy:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  7. জিহাদ (৯৯-০৫)

    লেখাটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম।

    হ্যাপি এন্ডিং হলে অবশ্যই ভাল লাগতো। কিন্তু এখনকার শেষটুকু মনে থাকবে অনেকদিন।

    সবকিছুর পরেও আসলে কষ্টরাই সবচেয়ে বেশি তীব্র আর সবচেয়ে বড় সত্য।

    পুরা সিরিজটাই ভীষণ ভীষণ ভাল্লাগসে।


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
  8. আহ্সান (৮৮-৯৪)

    আন্দালিব,
    বুকের গহীনের সূক্ষ্ম ব্যাথাগুলো আরেকবার জানান দিয়ে গেল, জীবনটা এরকমই...।
    লেখক হিসেবে পাঠকের অনুভূতিকে নাড়া দেয়ার ব্যাপারটিতে তুমি ১০০% সফল বলে আমি মনে করি।
    পুরো সিরিজটেকেই আমি গভীরভাবে অনুভব করেছি...।
    অনেক সাধুবাদ তোমাকে। দোয়া করি যেন কোন একদিন জীবনে আসে, যেদিন মুমু'কে আমাদের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে এক নতুন পরিচয়ে...যা আমাদের সবার কাম্য।
    ভালো থেকো।

    জবাব দিন
  9. তানভীর (৯৪-০০)

    আন্দালিব, কমেন্ট দিতে দেরী হয়ে গেল, দুঃখিত।

    তোমার এই পুরো সিরিজটাতেই কেমন যেন একটা কষ্টমাখা অভিমানের সুর পেলাম, কেন ঠিক বুঝলাম না। (কাইয়ুম ভাই, জুনা- আমার এই কমেন্টটা কেমন হইল? 😀 )

    হৃদয়ের অনুভূতিকে নাড়িয়ে দিয়ে যাওয়া এই সিরিজের গল্পগুলো অনেকদিন মিনে থাকবে।

    তুমি চমৎকার লিখ আন্দালিব।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।