নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকঃ পর্ব ৩

পূর্ব প্রকাশের পর…

ওয়াও রাইন! আপনার বর্ণনা এত্তো ভিভিড। আমি মনে হলো দেখলাম আমার সামনে, আপনাকে, মেয়েটাকে… বৃষ্টি!
কী সুন্দর সব।

অনেক আগে আমি একটা গল্প লেখা শুরু করেছিলাম। ঐখানে বৃষ্টিতে একজনের সাথে প্রথম দেখা হওয়ার বর্ণনা ছিলো। আপনার কথা শুনে মনে পড়ে গেলো। ঐটাও ছাতা বিষয়ক… দেখি মনে হয় পুরানো ডায়েরিতে আছে এখনও, আজকে বাসায় যাওয়ার পরে পাঠাবো আপনাকে।

আরেকটা স্মৃতি এখন আমার মনে পড়লো। আমার একটা বন্ধু ছিলো, প্রদীপ। মানে বন্ধু আছে এখনও, কিন্তু যোগাযোগ নাই। সে মেলবোর্ন থেকে বেশ ভালো একটা ডিগ্রি নিয়ে এখন বাংলাদেশে কোন গ্রামে একটা স্কুলের হেডমাস্টার যেন। ওর বোন থাকে মেলবোর্নে, আমাকে বললো যে প্রদীপ নাকি গ্রামের রাস্তায় লুঙ্গি পড়ে মোটর-সাইকেল চালায়! এবং হাজার হলেও বিদেশে আসবে না…

প্রদীপ খুব সুন্দর গান করতো। একদিন, আমাদের বাসায় বসে গান করছে আর এই রকম সব কথা বলছে আমাকে… প্রথম প্রেমের স্মৃতি। তারপরে একটা মেয়ের সাথে অনেক ফোনে কথা বলতো, এই সব… কিছুক্ষণ পর ভাবলাম বীচ থেকে ঘুরে আসা যায়। তো, গেলাম। মেলবোর্নের ওয়েদার খুব বিখ্যাত হঠাৎ করে বদলে যাওয়ার জন্য। আমরা যখন বাড়ি থেকে বের হলাম, তখন বেশ সুন্দর রোদ। বীচে কিছুক্ষণ পরেই দুই এক ফোটা বৃষ্টি শুরু হলো। প্রদীপ বললো, “চলো ফিরি…”
তার মধ্যেই এমন ঝড় শুরু হয়ে গেলো। আর চারপাশ থেকে ধুলা উড়ে এসে একদম লাফ ঝাপ দিয়ে আমাদের গায়ে… এত্তো বাতাস, আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম! ও আমাকে হাত ধরে একটা দৌড় লাগালো, প্রায় ১০ মিনিটের মতো, একবারও হাত ছাড়ে নাই!

কী রকম অন্যরকম লাগলো তখন… কিন্তু জানেন, এর পরে আমরা কোনদিন ঐ দিনটা নিয়ে কথা বলি নাই… যেন কখনো ঘটেই নাই এটা… বা যেন আমরা ছিলাম না আসলে… অদ্ভুত না? আপনাকে হঠাৎ বলে দিলাম… এর আগে কাউকে বলিও নাই!

আমি আসলে কখনই খুব নিয়মিত কিছু করতে পারি না। বললাম না আমার সব ছাড়া ছাড়া? আমার মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছা করে আমি আগে কেমন ছিলাম… আসলে ভুলে গেছি। বা আমি কি আমিই নাকি, সেই সন্দেহও হয় মাঝে মাঝে।

কবিতা মরবিড? জানেন মৃত্যুচিন্তা আমার সাথে থাকে সবসময়… … আর মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠলে আরো বেশি… কেমন খালি খালি একটা ব্যাপার হয় তখন। সন্ধ্যার সময় আগে বাসায় ফেরার সময় এরকম লাগতো… অথবা যদি কখনও দিনের বেলায় ঘুমিয়ে ঠিক সন্ধ্যার আগে আগে উঠি, তখনকার মতোন…

আপনি মোটেও খারাপ না… অনেএএএএক ভালো… অনেক লিখেন আরো, আজ কাজ-টাজ মাথায় থাক।

নিয়ন্তি

-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০-

নিয়ন্তি,

আগের মেইলে বলবো ভাবছলাম। কিন্তু নিজের কথা বলতে গিয়ে ভুলে গেছি। আপনি বলেছিলেন দেশে চলে আসবেন। সেই কথাটা কি এখনও মাথায় আছে? থাকলে মাথা থেকে নামায়ে কাজে রূপান্তর করেন তো ! এটা আমার জন্যে না, আপনার জন্যের সাধাসাধি করতেছি।

আমার প্ল্যান ছিলো, পাশ করার পরপরই বাইরে চলে যাবো। ইউএস, নয়তো কানাডা, পড়াশোনা করতে নয়তো নেহাৎ চাকরি করতেই! তারপরে আমার যাওয়া হলো না। পাশ করার পরে চাকরিতে ঢুকে গেলাম। যে কয়দিন বেকার ছিলাম, খুব বাজে লাগতো। ভাবলাম, সময় আছে, এখনই বাইরে চলে যাই। যে সময়টায় সব প্রস্তুতি নিবো সেই সময়েই হুট করে চাকরি হয়ে গেলো। বেতনের জন্যে না শুধু, কীভাবে কীভাবে জানি চাকরির লোকগুলোকেও ভালো লেগে গেলো। আমি যা চার-পাঁচ বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ায় শিখি নাই, সেই ব্যাপারগুলো ছয় মাসেই শিখে ফেললাম। আমাদের চারপাশের অতিসাধারণ মানুষগুলোর কোন একটা ডাকিনীবিদ্যার মন্ত্র শেখা আছে। দেশ তো কোনো সত্ত্বা না, মানুষগুলোই দেশ গড়ে। আর একটা কথা চুপিচুপি বলি, এই সব দূর্নীতি আর গরীবিয়ানা আমাদের দেশের ভুল পোশাক। ভেতরের কাহিনী অনেক হৃদয়-নিঙড়ানো, অনেক গভীর জীবনবোধের। মানুষের জীবনটা আসলে এতোই ছোট যে সবকিছু ঠিকমতো বুঝতে না বুঝতেই পেরিয়ে যায়। বিদেশ বিভূঁইয়ে বসে সেটা যেদিন বুঝে যাবেন, হা-হুতাশ করা ছাড়া আর কোনো উপায়ই থাকবে না!

এখন আর আমার বাইরে যেতে ইচ্ছা করে না। সব বাদ।

আমার মা’কে ছাড়া থাকতে ভালো লাগে না। ছোটবেলা থেকেই মায়ের কোলঘেঁষা আমি। মা অনেক কষ্ট করেছে, আর্থিক কষ্টের চেয়েও বেশি, মানসিক কষ্ট। আমাকে অনেক সংগ্রাম করেই বড়ো করেছে। এগুলো সংগ্রাম দেখাও যায় না, শুধু যুদ্ধ করতে করতে তাঁর শরীর ভেঙেছে, মন দূর্বল হয়ে গেছে। হঠাৎ করে কেউ দেখলে চমকে উঠবে, এই মানুষটা এমন ভেঙে পড়েছে কেনো! কিন্তু উনি কাউকে বলবেন না এগুলো, মহীয়সী সেজে বসে থাকবেন!

আমি যতদিনে বুঝেছি ততদিকে অনেক অন্যায় করে ফেলেছি মায়ের সাথে। এখন মনে হচ্ছে মা ক্ষমা করেই দিয়েছে, কিন্তু আমার নিজের কাছে তো ক্ষমা হয় না। এজন্যেই বাকিটা সময়, তাদের কাছেই থাকবো।

আপনি চলে আসেন। দেশের বাইরে যাই নাই কখনো, চিন্তাও করতে পারি না কতোটা একাকিত্ব! আমি বন্ধুস্বজন হারায়ে কতো একা একা ফীল করি, তারা কিন্তু আশেপাশেই আছে। যোগাযোগ নাই খালি, তাতেই আমি শেষ। ছাইয়ের মতো রুক্ষ হালকা হয়ে গেছি!! আর আপনার মতো যারা বিদেশে আছেন, তাদের অবস্থা কেমন তা আমার “বিখ্যাত” কল্পনাতেও আসবে না। না হয় দেশে এসে লুঙ্গি না পড়লেন, মোটর-বাইক না চালাইলেন! 😉

রাইন
(অফিসের কাজের মৃত্যু ঘটায়ে দিলাম বোধহয়?)

-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০-

রাইন,

হা হা! আপনার শেষ কথাগুলো পড়ে এমন জোরে হেসে উঠসি, আমার দিকে আমার কলিগ তাকাচ্ছে। বলে যে… “শেয়ার দ্যা জোক”। এখন এইটা কেমনে শেয়ার করি?
এই জিনিশগুলা খারাপ লাগে বিদেশে, সব তো বুঝানো যায় না। অবশ্য সেটা আর বিদেশ কেন… সব তো কোথাওই বোঝানো যায় না!

তবে হ্যাঁ। দেশে ফেরার চিন্তা মাথায় আছে আসলেই। কী করবো ওটাই হলো ব্যাপার। আমি আসলে বাংলাদেশের জন্য একদমই আনাড়ি। এখন গেলেও কেমন একটা হারিয়ে যাওয়া রকম লাগে। কিছুই চিনি না, নিয়ম বুঝি না… শুধু ভাষা বুঝি… আর চারপাশের মানুষগুলা দেখতে আমার মতোন.. … এই সব চিন্তা করে ভয় লাগে একটু। আবার নতুন সব কিছু!

তারপরেও ফিরবো। এই রকম ফ্র্যাগমেন্টেস থাকতে আমার ভালো লাগে না আর। ঐ যে বললেন… “সারি সারি ফ্রেম… মুখ…” ঐ রকম!

আমার মনে হয় দেশে ফিরলে এই… ছাড়া ছাড়া ভাবটা কমবে একটু। কারণ ছোটবেলার স্মৃতি তো আছেই ঢাকাতেই… তাই কিছুটা হলেও আমার মতোন লাগবে…

মাঝখান থেকে একটু একটু হাওয়া যদিও… তা সেই রকম তো হয়ই… পাজলের সব পিস এক সাথে বেশিদিন থাকে নাকি? আমার এরকম অনেক হারায়… তারপরে হঠাৎ কখনো ঘর পরিষ্কার করতে করতে সোফার পেছন থেকে, বা কার্পেটের তল থেকে, বা ম্যাট্রেসের নিচে আবিষ্কার করি! তখন মনে হয়, আরে, এ যে ছিলো আমি তো ভুলেই গেসিলাম, কী আজব! ঐ রকম হয়তো লাগবে আমার ঢাকায় গেলে, কে জানে…

আপনার আম্মার গল্প বলেন। কীভাবে কষ্ট দিলেন? বলেনননন…

আর হ্যাঁ, কাজের মৃত্যু ঘটসে আপাতত। বলেন ইন্নালিল্লাহ! 🙂

-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০–

(চলবে)

২,২১৬ বার দেখা হয়েছে

৩৮ টি মন্তব্য : “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকঃ পর্ব ৩”

    • আন্দালিব (৯৬-০২)

      শেষ তো করতেই হবে কবীর ভাই। একটা লেখার গতি আসলে টেনে নিয়ে গেলে ঝুপ করে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক। আমি মোটামুটি একটা ছক বানিয়ে লিখছি। এবং লেখাটা পুরোপুরি একসাথে পড়লে হয়তো সেই প্যাটার্নটা, মূল বক্তব্যটা ফুটে উঠবে। কতটা পারবো জানি না, তবে চেষ্টা করবো। এখন যদি সেটা না করে, পর্বের পর পর্ব চলে... তাইলে তো সিরিয়ালের মতোন হয়ে যাবে! 😕 😕

      প্রাথমিক প্ল্যান ছিলো তিন পর্বের। এখন সবার রেসপন্সে খুশি হয়ে আরো দুই পর্ব লিখবোই! তারপরে টানতে গেলে নিজেই টান খেয়ে যাবো! 🙁

      জবাব দিন
  1. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    দারুন :hatsoff:

    বিদেশে না-যাওয়ার কারণটা কি সুন্দর করে বলেছো!
    দেশে ফেরার ডাকটাও প্রচন্ড! :thumbup:


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
    • আন্দালিব (৯৬-০২)

      বিদেশে এখন আমার অনেক বন্ধু চলে গেছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার গ্রুপের প্রায় সবাই-ই। বাকি যে দুইতিনজন আছি, তারাও হয়তো সামনে চলে যাবো। সব মিলিয়ে এই অবস্থাটা আমার বাস্তবতা এখন...

      ধন্যবাদ মাহমুদ ভাই, পড়ার জন্যে।

      জবাব দিন
  2. আগের পর্ব গুলো চুপচাপ পড়ছিলাম।কি যে লিখবো বুঝছিলাম না!
    কিন্তু এইবার আর না লিখে পারছি না,এত বেশি ভালো লেগেছে! :boss:
    বিদেশ যাওয়া টা আমার অনেক বেশি অপছন্দের।তাও যদি কখনো যেতে হয়য়,সেই একাকিত্বের কথা ভেবে এখন ই ভয় পাই। 🙁
    লেখাটা থামাবেন না ভাইয়া,প্লিজ

    জবাব দিন
  3. সামি হক (৯০-৯৬)

    কোন একটা অসাধারণ বই পড়ার সময় আমার বইটার শেষ জানতে থাকার একটা তাড়া থাকে। আবার বইটা শেষ করে একদম ভালো লাগে না কেন শেষ হয়ে গেল। তোমার লেখাটা পড়ে আবারও সেই একই রকম অনুভূতি জাগছে।

    ভালো লাগছে, চালিয়ে যাও

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।