বিশ বছর পর … বিশ বছর আগে …

বিশ বছর আগে …

১। মফস্বল শহরগুলোতে কোন গৃহশিক্ষক একবার কোন পরিবারে ঢুকে গেলে ব্যাস … ওই পরিবারের সবগুলো সন্তান তখন সতীর্থ না হয়ে যায় কোথায়। উপরন্তু সেই গৃহশিক্ষক যদি ডাকসাইটে, স্বনামধন্য কেউ হন তবে তো কথাই নাই। পরিবারের কর্তা, কর্তৃ তখন নিশ্চিন্ত মনে সবগুলো সন্তানকে তার কাছে সপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হন। বড় দুই বোন কে পড়িয়ে তিন নম্বর বোনটিকে যখন ডাকসাইটে সেই রকম এক গৃহশিক্ষক গণিত পড়াচ্ছেন, তখন তিনি আড়চোখে বাড়ির ছোট ছেলেটির দিকেও তাই নজর রাখেন। সন্দেহ নেই, পড়ার ঘরের টেবিলটাতে তার সামনে আগামী বছর থেকে এই ছেলেটিও বসতে যাচ্ছে।

২। সেই দিনগুলোতে, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। সন্ধ্যেবেলা শিক্ষকটি যখন তিন নম্বর বোনটিকে পড়াচ্ছেন, বিদ্যুৎ চলে গেল। বড়বোন মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়ার ঘরে নিয়ে যাচ্ছে আর ছোট ভাইটি বাড়ি মাথায় করে চেচাচ্ছে আর গান গাচ্ছে … “আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি ই ই, আ হা হা হা হা” পড়ার ঘর থেকে শিক্ষক ছোট ভাইটিকে ডেকে পাঠালেন, অংক বই নিয়ে বসতে বললেন বোনের পাশে … ভেতর ঘরে বই আনতে যেয়ে মায়ের মিটিমিটি হাসি দেখে ছেলেটির গা জ্বালা করে উঠল। ছুটির আমেজ মনের কোণে মিশিয়ে দিয়ে মোমের আলোয় অংকের মত খটখটে বই আর খাতা নিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও বসতে হল তাকে।

৩। এই সময় মোমের আলোর ডাকে একটা সবুজ ফরিং উরে এসে শিক্ষকের গায়ে এসে বসলে তিনি পোকাটিকে দুই আঙ্গুলে ধরে মোমের আগুনে জ্যান্ত পোরাতে থাকলেন। বোনটি তখন অংকে মগ্ন। পড়ায় মন নেই বলে শুধু ছেলেটিই পুরো হত্যাজগ্যটা দেখল, দেখতে বাধ্য হল। পোকাটার মাথায় আগুন জ্বলে উঠলে শিক্ষকের ঠোটে অপার্থিব নিষ্ঠুর ক্রুর হাসি ফুটে উঠল। ছেলেটি শিক্ষকের চোখের দিকে তাকালো। চশমার পেছনের চোখ দুটো দেখে গা শিউরে উঠল ছেলেটির।

বিশ বছর পর …

১। সন্ত্রাসী’টার জন্য বিন্দুমাত্র মায়া হচ্ছে না ছেলেটির। ১১ খুনের আসামী, মামলা আছে প্রচুর কিন্তু ভয়ে কেউ স্বাক্ষি দেয় না বলে স্বাক্ষির অভাবে … ধরতে গিয়ে ব্যাপক রিস্ক নিতে হয়েছে। লুঙ্গী, স্যান্ডোগেঞ্জীর ছদ্মবেশটা মন্দ ছিল না যদিও, কিন্তু তুলে আনাটা ছিল বিশাল ঝামেলা। প্রকাশ্য দিবালোকে একটা মানুষ ছিনতাই করা কি এত সোজা ?? তাও আবার এই পিশাচ টা কে। আইনের লোক বলে পরিচয় দিতে হলে তো আর ……। জীবনের প্রথম এচিভমেন্টটা নিজের কাছেই বেশ উপভোগ্য আর নাটকীয় মনে হল ছেলেটার। যাক, গত ৯ দিনের পরিশ্রম বৃথা যায় নি …

২। অপারেশন শেষে রুমে ফিরে মৃদু হাসল ছেলেটা … কত রকম গল্প শুনেছে … বিফোর ইফেক্ট … আফটার ইফেক্ট … ফুহ্ … বুড়িটাকে সাবাসি দিতে ইচ্ছে করছে, বুড়িটা লাশের গায়ে থুথু দেবার পর যখন ছেলেটা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, মরেই তো গেছে … বুড়ির উত্তরটা ছেলেটির ‘জাষ্টিফিকেশান’টাকে আরও অনেক মজবুত করে দিল … সব অন্তর্দ্বন্দ শেষ।

৩। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মনে আবার মৃদু হাসল ছেলেটা, হাসিটা কেমন যেন অপার্থিব, নিষ্ঠুর আর ক্রুর মনে হল তার, নিজের চোখের দিকে চোখ পরতেই শিউরে উঠল … ঠিক তখুনি মনে পরে গেল বিশ বছর আগে দেখা গণিত শিক্ষকের সেই হাসি আর সেই চোখ …

৪,৬৮৪ বার দেখা হয়েছে

৮৫ টি মন্তব্য : “বিশ বছর পর … বিশ বছর আগে …”

  1. সাকেব (মকক) (৯৩-৯৯)

    হমম...কনটেন্টস নিয়ে নিরপেক্ষ মন্তব্য করাটা বেশ কঠিন মনে হচ্ছে... 🙁

    তবে, লেখা যথারীতি উরাধুরা... :hatsoff:


    "আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
    আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস"

    জবাব দিন
  2. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    আমার দোস্তের পোস্টে কমেন্ট এ ফার্স্ট প্লেস ধরার জন্য দুইজন জুনিয়র পাঠাইছিলাম 😀 ওরা দেখি কমান্ড খুব সুন্দর ভাবে পালন করছে 😀 😀 গুড গুড B-) যাক, সাকেব আর মান্নান ক্যান্টিনে গিয়া আমার নাম দিয়া কোক খায়া আয় :grr: আর গোল্ডটা দিয়া যা :grr:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  3. তৌফিক (৯৬-০২)

    এতো ভালো একটা লেখা, কিন্তু কেউ ভোট দিল না!!!!

    আগেও বলছি, আবারো বলি। আমরা মির্জাপুরিয়ানরা কোয়ালিটিতে বিশ্বাস করি। B-)

    উরাধুরা বস, সত্যি উরাধুরা :boss: :boss: :boss:

    জবাব দিন
    • তাইফুর (৯২-৯৮)

      সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের জন্য তৌফিকের ব্যাঞ্চাই চাই ... 😛
      (তৌফিক ... অনেক ধণ্যবাদ ... অনেক কিছু লিখতে চাচ্ছিলাম, সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে তাই ... 😕 লিখতে পারলাম না।)


      পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
      মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

      জবাব দিন
  4. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    তাইফুর ভাই, কি হাল্কা...কি ভারী...যাই লিখতেছেন তাই ফাটাফাটি হইতেছে... :thumbup:
    আপ্নে যেখানেই হাত দিতেছেন সোনা হইয়া যাইতেছে... :clap:
    নাকি উলটা???? :-B


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  5. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)
    ছেলেটি শিক্ষকের চোখের দিকে তাকালো। চশমার পেছনের চোখ দুটো দেখে গা শিউরে উঠল ছেলেটির।

    নিজের চোখের দিকে চোখ পরতেই শিউরে উঠল … ঠিক তখুনি মনে পরে গেল বিশ বছর আগে দেখা গণিত শিক্ষকের সেই হাসি আর সেই চোখ …

    :boss: :boss: :boss: :boss: :boss:

    কি কি যে মাথার মধ্যে এসেছে, গুছিয়ে লিখতেই পারছি না। মানুষ হয়ে জন্মেছি বলে খুব আফসোস হয় কখনো কখনো।


    Life is Mad.

    জবাব দিন
  6. কামরুলতপু (৯৬-০২)

    তাইফুর ভাই নিয়মিত লেখতেছে দেখতেই ভাল লাগে। আমি অবশ্য তাইফুর ভাইরে খুব ভয় খাই। যাই হোক ভয়ে ভয়ে কই ভাইয়া লেখাটা ভাল লাগছে। আমি প্রথমে ভাবছিলাম বুঝি প্রাইভেট টিউশনির একাল সেকাল নিয়ে লেখা তাই পড়ে চমক খাইছি।

    জবাব দিন
  7. টিটো রহমান (৯৪-০০)
    বিভাগঃ পড়াশোনা, মির্জাপুর | 200 বার পঠিত | প্রিয়তে যোগ কর

    বিভাগ অনুযায়ী লেখাটায় অনেক শিক্ষনীয় বিষয় ছিল............... :-B

    ভাই সেইরম হইছে
    আপনেরে :hatsoff: :hatsoff:


    আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।