এ্যাডাম টিজিং

ডিসক্লেইমারঃ আমি নারী বিদ্বেষী নই মোটেও …

ইভ টিজিং নিয়ে অনেক কথা হয়, পত্র-পত্রিকা-তে লেখালেখিও হয় প্রচুর। কিন্তু এ্যাডাম টিজিং নিয়ে এ জীবনে কাউকে কিছু লিখতে বা বলতে শুনলাম না। এ্যাডাম টিজিং শব্দটা ডিকশনারী-তে আছে কিনা তাতেও অবশ্য আমার সন্দেহ আছে। না থাকারই কথা। একেতো ডিকশনারী নিজে নারী, তার উপর আবার পূরুষ শাসিত সমাজে এই শব্দ চালু হলে পূরুষের দূর্বলতা প্রাকাশ পায়। ‘আমি টিজায়িত হইয়াছি’ বলে চিক্কুর দিয়ে আদতে নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করা আর যার হোক পূরুষের শোভা পায় না।

নারী মাত্রই কোমলমতি, সুশীলা, বিনয়ী, সরলা, ব্লা, ব্লা ব্লা … কিন্তু এই নারীই যখন একসাথে অনেকজন জমায়েত হন এবং ঘটনাচক্রে দৃশ্যপটে কোন ছেলে একা তিনাদের সামনে পরে যায় … তাহলেই হয়েছে। তা সেই ছেলেটি যতই ইশ্-মার্ট ড্যাসিং হোক না কেন এ্যাডাম ঠিকই টিজায়িত হন।

আমি তখন ক্লাস এইটে উঠেছি সবে। কলেজ ছুটিতে বন্ধু বলতে অন্যান্য সব ক্যাডেট কলেজের ক্লাসমেটরাই, এলাকার অন্য সমবয়সীদের সাথে তেমন খাতির নাই। বাসা বদল করে নতুন এলাকায় গিয়ে আরও ছ্যারাব্যারা অবস্থা। বিকেলে বাসা থেকে বের হয়ে আড্ডা দিতে যাই পার্কে। আর ওই সময়টাতেই এলাকার সব মেয়েরা দল বেধে বাসার সামনের রাস্তায় হাটেন। আমি খেয়াল করলাম উনারা আমার উপস্থিতিতে বিয়াপওক পুলকিত হন এবং নিজেদের মধ্যে ফিসফিসিয়ে কথা বলে ক্যালক্যালিয়ে হাসেন। একা এবং সংখ্যালঘু আমি সব কিছু উপেক্ষা করে মাথা নিচু করে রাস্তা পার হয়ে রিক্সা নিয়ে তবেই হাফ ছেড়ে বাঁচি। দিন যায় তিনাদের সাহস একটু একটু বাড়ে, আর তার সাথে বাড়ে কথাবার্তার ভলিউম … একদিন বেশ স্পষ্ট শুনলাম একজন বলছেন “ক্যাডেটে পড়ে তো … ভদ্র ছেলে … হি হি হি হি ” সাথে সাথেই আরেকজনের মন্তব্য “হুম … ভদ্র … একটু বেশিই ভদ্র … হি হি হি হি ”। বিরক্ত হলেও কষ্ট পাইনি সেদিন এই ভেবে যে, সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা, তিনারা “মুহাহা” হাসি দিতে পারেন না।

৯৮ তে কলেজের পাট চুকিয়ে কোচিং করার মহান ব্রত নিয়ে ঢাকায় আসলাম, কল্যানপুরে বাসা ভাড়া করে থাকি বিভিন্ন ক্যাডেট কলেজের আমরা ৮ জন। ধানমন্ডিতে কোচিং করে ঢাকা কলেজের সামনে থেকে বাসে উঠি … সোজা সংসদ ভবন … আড্ডা দিয়ে বাসা। এমনই একদিন, ভীড়ে গিজগিজ করছে এক বাসে উঠলাম … পরের স্টপেজে ঠ্যালাঠেলি প্রতিযোগিতায় জয়ের পুরস্কার স্বরূপ যেইনা একটা সিট পেয়ে মাত্র বসেছি, তখনই এক আগুন বাসে উঠলেন। একবার ভাবলাম “ম্যাডাম বসেন” বলে আত্মত্যাগের মহান ব্রতে নিজেকে বিলীন করে দেই। পরক্ষণেই ছোটবেলার সেইসব সুশীলা, বিনয়ী, সরলা, ব্লা, ব্লা ব্লা দের স্মৃতি ভেসে উঠায় প্রতিহিংসাপরায়ণ মন সায় দিল না। আগুন আমার ঠিক পাশে এসে দাঁড়িয়ে রইলেন। বাস ছাড়ল। খানিক পরে ব্রেকের ধাক্কায় টাল সামলাতে না পেরে তিনি সরাসরি আমার কোলে … আমি নির্বিকার। স্পর্শের সুখ উপভোগের সময় তখন একেবারেই ছিল না আমার। আলতো স্যরি বলে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন আর লাজুক চোখে তাকিয়ে রইলেন … আমার দিকে নয়, আমার সিটটির দিকে। পাশ থেকে চান্স মারা টাইপ একজন আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না … “ভাই মহিলা মানুষ, দাঁড়িয়ে আছে, আমরা জওয়ান পোলাপাইন যদি সিট ছেড়ে না দেই …” আমি বসে বসেই অত্যন্ত বিনয়ের সাথে চার বছর আগের ঝাল ঝারলাম “মহিলাদের জন্য আলাদা বাস আছে, বাকি প্রতিটা বাসে আবার আলাদা সিট আছে, তারপরও যদি আমাদের বরাদ্দের সিট থেকেও তিনাদের সিট ছেড়ে দিতে হয় তাহলে এই জীবনে আমি আর বসব কবে” … মুহুর্তে পুরো বাসের যাত্রী দুই দলে ভাগ হয়ে গেলেন। আমার বক্তব্য সমর্থনকারী “ঐ” দল আর অসমর্থনকারী “উহু” দল বিপুল উৎসাহে তর্কে বিতর্কে মেতে উঠলেন। পুরো বাসে চুপ শুধু দুই জন … এ্যাডাম টিজিং শোধ করে দিয়ে শান্ত আমি আর সিটের দিকে তাকিয়ে আমার নেমে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা আগুন মেয়েটি।

৬,৪১৩ বার দেখা হয়েছে

১৩৬ টি মন্তব্য : “এ্যাডাম টিজিং”

  1. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    আমার আগেই সন্দ হইতো যে মেয়েরা আপনারে দেখলেও নিশ্চয়ই ক্যাল্কেলাইয়া হাসে! 😛

    আমার কাহিনীতো আগেই কইছি!
    আসেন বুখে আসেন ! 😛


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  2. আন্দালিব (৯৬-০২)

    পুরুষবিদ্বেষী নারী পাওয়া যায়, কিন্তু নারীবিদ্বেষী পুরুষ পাওয়া কঠিন, মোটামুটি অসম্ভব।

    লেখা ভালো লেগেছে। আমার কাছে বাসে সীট দেয়ার ব্যাপারটিকে পুরোপুরি পুরুষতান্ত্রিক সহানুভূতির প্রকাশ বলে মনে হতো যদি মাঝখানের জায়গাতে আরাম করে দাঁড়ানোর জায়গা থাকতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েদের দাঁড়িয়ে থেকে অশ্লীল হাতের ছোঁয়া পেতে হয়, যেটা একটা ছেলেকে কখনই পোহাতে হয় না।
    তবে এই হাসাহাসি পার্টি বড়ৈ খতরনাক্‌। খিলখিলে হাসিটা যে কত গায়ে জ্বালা ধরাইতে পারে...!
    (সিরিকাস কমেনট কইরা ফেললাম মুনে হয়)

    জবাব দিন
  3. টিটো রহমান (৯৪-০০)

    লেখা সেই সেইরকম ঝাল হইছে......... :tuski: :tuski: :tuski: :tuski: :tuski: :awesome: :awesome: :awesome: :awesome: :awesome:

    বড় মরিচে বেশি ঝাল থাকে কারণ যত বড় মরিচ তত বেশি বি* .... ;)) ;)) ;)) ;)) ;)) ;)) ;)) ;)) ;)) ;)) ;)) ;;; ;;;


    আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই

    জবাব দিন
    • হা হা হাঃ.........তাইফুর ভাই।আপ্নের লেখা পইড়া আমারও ৪ বছর আগের ইতিহাস মনে পরছে।আমি তখন জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গেছিলাম।চান্স পাওনের পর :just: ভর্তি হউনের লাইগা আমারে কয়দিন পর পরই অইখানে যাইতে হইতো।বিশাল পথ পাড়ি দেওনের সময় পাবলিক বাসে একের পর এক ললনার আবির্ভাব হইতো।সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে সিট ছেড়ে দিতাম......তারপর সিটে বসে সেইসব নারীদের সে কি খুশি!!!!!!!

      তার কিছুদিন পরে আমি,তুহিন,হাসান একলগে বাসে উঠছি......এমন সময় বাসে ৩ ভার্সিটির ললনা উঠল।উঠে আমাদের ৩ সিটের সামনে দাঁড়িইয়ে রইল।হাসান আমার কানে কানে বলে,এই জাহাঙ্গীরনগরের মাইয়াগুলি ইচ্ছা কইরা চ্যাংড়া পোলাপানের সামনে দাঁড়ায়া থাকে যাতে পোলাপান সিট দিয়া দেই।
      এই কথা শুনার পর যখন আমি কইলাম যে আমিও দিসি...তখন আমারে লয়া হাসান আর তুহিন সে কি হাসাহাসি!!!
      এর পর থেইকা বাসে বসলে যতই নারী দাঁড়াক,যতই হলিউড/বলিউড সুন্দরী হোক্‌ ্্‌র টাইম দেই না।এমন কি সিট পাওনের আশায় সাইধা সাইধা কথাও কয়।একবার উইনার দিয়ে বাসায় যাবার সময় ব্র্যাক ভার্সিটির সামনে থেকে এক মেয়ে উঠেই আমার সিটের সামনে এসে জিজ্ঞেস করছিল,ভাইয়া আপনি কতদুর যাবেন?আমি জবাব দিয়েছিলাম,বাসের ড্রাইভার যেখান পর্যন্ত নিয়া যায়।উল্লেখ্য,উইনার এর শেষ স্ট্যান্ড আমাদের বাসার এখানে। 🙂

      জবাব দিন
      • বাসের ড্রাইভার যেখান পর্যন্ত নিয়া যায়

        :thumbup: :thumbup: :thumbup:

        একবার বনানী থেকে একুশে তে কইরা মালিবাগ যাইতেছিলাম। কলেজ থেকে বের হওয়ার পর পর... তখন খুব ভালো পোলা আছিলাম প্রমিজ। মহাখালীতে ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাক এর ওই স্টপেজ থেকে কয়েকটা মেয়ে উঠলো... অনেক ভীড়, তপ্ত আবহাওয়া... আমি আমার পাশের এক ললনাকে বাসের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে "আপনি বসেন" বলে ওঠার উপক্রম করতেই তিনি বললেন, "আমি দাঁড়িয়েই যেতে পারবো"......

        এইবার আমার স্তম্ভিত হবার পালা। আমার আশেপাশে বেশ হাসির শব্দ পেলাম, লজ্জায় আমি অর্ধেক হয়ে যাচ্ছিলাম। আমাকে বেকুব বানানো সেই সুন্দরী অন্যদিকে তাকিয়ে না দেখার ভঙ্গি করছিলেন-- সম্ভবত রিএ্যাকশন...
        আমার পাশে বসা ভদ্রলোক দাঁত কেলিয়ে কিছুক্ষণ হাসার পর বললেন, "এরা স্মার্ট মেয়ে, জায়গা দেয়ার আগে ভেবে দেখবেন"......
        x-( x-( x-(
        এখন আমি ভেবে দেখি... আর যাই হোক, সেইসব সুন্দরী ললনাদের জায়গা দিয়ে বেকুব হবার মত নীতিবান হইবার কোন ইচ্ছা আর কাজ করেনা 😕 😕

        জবাব দিন
  4. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    তোর বাসায় লাঞ্চ করতে আইতাছি, ভাবীর লগে ইম্পর্টেন্ট কিছু আলোচনা আছে 😉
    লেখা নিয়া কিছু কমুনা, যদিও :hatsoff: :thumbup: তারপরেও কই ফাকি বাজি থেইকা বাইরহ 😀


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  5. রকিব (০১-০৭)

    তাইফুর ভাই, তেনাদের ঘরে কি বাপ ভাই নাই??
    অফটপিকঃ বাপ ভাই আছে, কিন্তু মুনে হয় :just: ফ্রেন্ড নাই।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  6. এখানে তো আমিও হাসি ললনারাও হাসে । হাসাহাসি চলতেই থাকে

    হাসবোই তো...আপ্নের চেহারায় বাড়তি সৌন্দর্য আছে না????বিদেশে থাইকা থাইকা তো আর ফর্সা হইতাসেন!!!! :grr: :grr:

    জবাব দিন
  7. আশহাব (২০০২-০৮)

    এই জাহাঙ্গীরনগরের মাইয়াগুলি ইচ্ছা কইরা চ্যাংড়া পোলাপানের সামনে দাঁড়ায়া থাকে যাতে পোলাপান সিট দিয়া দেই।
    এই কথা শুনার পর যখন আমি কইলাম যে আমিও দিসি…তখন আমারে লয়া হাসান আর তুহিন সে কি হাসাহাসি!!!

    :khekz: :khekz: =))
    “এরা স্মার্ট মেয়ে, জায়গা দেয়ার আগে ভেবে দেখবেন”…… =(( =(( :bash:
    তাইলে ইডেন কলেজের সামনে দিয়া ভুলেও যাইয়েন না ভাই :no: :no: :khekz:
    তাইফুর ভাই ... :boss: :boss: :boss:
    বস আপনে একটা মা* 😀 :salute: :salute:
    :frontroll: :frontroll: :frontroll:
    মাস্ফ্যু ভাই আমি কিন্তু দিছি... 🙂

    জবাব দিন
  8. আহমদ (৮৮-৯৪)

    🙁 :shy: আমার অভিজ্ঞতাঃ 🙁 :shy:

    ১। একসময় আজিমপুর কলোনির ৭২ নং বিল্ডিং-এ থাকতাম ... ঠিক হোম ইকোনোমিক্স কলেজের সামনে ... আসতে-যেতে সবসময় uneasy লাগত।

    ২। টানা তিন বছ্রর ইডেন কলেজে part-time-faculty হিসাবে ক্লাশ নিতাম ... main gate দিয়ে ঢুকে লম্বা corridor ... যত তাড়াতাড়ি পারা যায় ... লম্বা-লম্বা step নিয়ে হাঁটা দিতাম।


    চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।