একজন অখ্যাত মহানায়কের নীরব প্রস্থান

প্রায় তিন বছর পর আজ সিসিবিতে লিখতে বসলাম। কিছু পারিপার্শ্বিক কারনে এবং কিছুটা ব্যক্তিগত কারনে ইচ্ছাকৃতভাবেই সিসিবি থেকে দূরে ছিলাম। আজ আর সেসব কারন ঘাটতে যাবনা। একটি বিশেষ কারনে আমার এই প্রত্যাবর্তন। যারা সিসিবিতে নতুন তাদের আমি অনুরোধ করব ১০/১৫ মিনিট সময় নিয়ে আমার আগের এই পোষ্টটিতে একটু ঘুরে আসার জন্য। এখানে ক্লিক করুনঃ একজন অখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার গল্প। আশা করি লিংকটি পড়ে এসেছেন। এই বড় লেখাটি পড়ার সময় না থাকলে শেষের দুই প্যারা পড়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ রইলো।

নিজের বাবার প্রশংসা কে না করে? আমিও এর ব্যতিক্রম নই। তবে আমার বাবার প্রশংসা আমি একা করিনা, আরো অনেকেই করে। এর কারন আমার বাবা ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী, সাহসী, পরিশ্রমী এবং প্রতিবাদী একজন মানুষ। আমার দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ এবং সফল মানুষ, একজন মহানায়ক।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ তারিখ সন্ধ্যায় হঠাৎ খবর পেলাম বাবার শরীরটা ভাল না। মাগরিবের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে ফেরার পথে প্রতিবেশীর সাথে ড্রেনের মেরামতের কাজ নিয়ে রাগারাগি করেছেন এবং বাসায় এসে শার্ট খুলে ফ্যান ছেড়ে শুয়ে আছেন। আমার মাকে ফোনে বললাম পাশের ডাক্তার আংকেলকে ডাক দেয়ার জন্য। ডাক্তার আংকেল এসে প্রেসার চেক করে বললেন লো প্রেসার। স্যালাইন খাওয়ানো হলো, এবার প্রেসার অনেক হাই। তাড়াতাড়ি ডায়বেটিক হাসপাতালে নেয়া হলো। নেয়ার পথে বমি করলেন। ডায়বেটিক হাসপাতালের ইসিজি রিপোর্ট খুব খারাপ আসল।আমাকে নার্স ফোনে বললো, অবস্থা খুব খারাপ, সিভিয়ার হার্ট এ্যাটাক। ঢাকা নিতে হবে। বিরাট একটা ধাক্কা খেলাম। তখন বাজে রাত সাড়ে ১০ টা। এদিকে মেঘনা এবং দাউদকান্দি ব্রীজ বন্ধ হবে সকাল ৮ টায়। রাস্তায় অনেক জ্যাম এবং হার্টের রোগী নেয়া খুবই বিপদজনক। বাবাকে ফোনে বললাম, ঢাকা চলে আসার জন্য। বাবা কোনমতে বললেন, “ঢাকা যাবনা, মুন হসপিটালে যাব”। তাড়াতাড়ি খোজ নিয়ে জানলাম, কুমিল্লা সিএমএইচে কার্ডিওলজিষ্ট নাই, শুধু মেডিক্যাল স্পেশালিষ্ট আছে। তাই আত্নীয়-স্বজনদের বললাম, স্থানীয় সেরা হাসপাতাল মুন হসপিটালেই বাবাকে নিয়ে যেতে।

আমি দ্রুত কুমিল্লার উদ্দেশ্যে ঢাকা হতে রওনা হলাম। বাসা হতে ১ কিঃমিঃ দূরে যাবার পর স্ত্রী ফোন দিল, বলল আমার সাথে যাবে। বাসায় ফেরত আসলাম, স্ত্রী ও ৮ মাসের সন্তানকে সাথে নিলাম। স্ত্রীকে বললাম, এত ছোট বাচ্চা নিয়ে এত রাতে কিভাবে যাব? স্ত্রী বলল, আমার শ্বশুড়ের হাতে রাস্তায় তুলে দিবে। প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামনে আমার শ্বশুড় এল। পথিমধ্যে বাচ্চাকে উনার হাতে তুলে দিলাম। রাত ৯ টার পর কুমিল্লার কোন বাস চলেনা। সায়দাবাদে যখন পৌছালাম, তখন রাত ১২ টা ১৫ বাজে। চট্টগ্রামের বাসে উঠলাম, সবচেয়ে পেছনের সিট। অন্য সময় হলে ঐ সিটে বসতাম না।

রাত ৪ টায় কুমিল্লা ক্যান্ট এর এম পি চেক পোষ্টে নামলাম। আগে থেকে সমন্বয় করা গাড়ী তৈরী ছিল। ৪টা ১৫ তে মুন হসপিটালে পৌছালাম। দেখলাম সিসিইউ তে বাবা ঘুমাচ্ছে, মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। ডাক্তারের সাথে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে কথা বললাম। ডাক্তার বলল, অবস্থার উন্নতি না হলে ঢাকা নেয়া যাবেনা। অপেক্ষা করতে হবে। স্ত্রীকে বাবার বাসায় রেখে এসে বাকি সময় হাসপাতালের বেঞ্চে বসে কাটালাম। ১০ দিনের জন্য মেঘনা এবং দাউদকান্দি ব্রীজ বন্ধ হতে যাচ্ছে। কিভাবে বাবাকে ঢাকা নিব? প্রচন্ড টেনশনে আমার সময় কাটতে লাগল। একেকটা মূহুর্ত যেন একেকটা বছর মনে হচ্ছিল।

সকাল সোয়া ৭ টায় নার্স বের হয়ে বলল বাবা নাকি দাঁত মাজছে (পরে বুঝলাম, এটা মিথ্যা কথা ছিল), স্যুপ এবং নরম ভাত আনতে বলল। আমি খুশির চোটে মা এবং বোনকে ফোন করে স্যুপ এবং নরম ভাত আনতে বললাম। ভিতরে গেলাম। অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। বাবা চোখ খুলে তাকালেন আমার দিকে। মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “আব্বা, খুব কষ্ট হচ্ছে?” উত্তরে ‘হ্যাঁ’বলতে গিয়ে গোংগিয়ে উঠলেন। ডাক্তার ইশারা করল কথা না বলার জন্য। আমিও ইশারা করলাম বাবাকে কথা না বলার জন্য। বাবা চোখ বন্ধ করলেন। আমি বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বের হলাম। এর ১৫/২০ মিনিট পরেই ডাক্তার আমাকে ভিতরে ডাকল, বলল অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। ৮ টার দিকে আমার বাবাকে অক্সিজেন মাস্ক খুলে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হলো। তার হৃদপিন্ড রক্ত পাম্প করার শক্তি পাচ্ছিল না। তাই কৃত্রিমভাবে সাপোর্ট দিয়ে দেহে রক্ত পাম্পের ব্যবস্থা করা হলো। আমার তখনো বিশ্বাস ছিল বাবাকে বাঁচানো যাবে। ডাক্তার বলেছিল, এর থেকে খারাপ পেশেন্টও নাকি ফিরে আসে।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একে একে কুমিল্লার সব সেরা ডাক্তাররা বাবাকে চেক করতে এলেন। কেউই আশার বানী শোনালেন না। বললেন শুধু প্রার্থনা করতে, একটু উন্নতি হলে ঢাকা নিয়ে যেতে হবে। ৪৮ থেকে ৭২ ঘন্টা অবজারভ্ করতে হবে। মা, স্ত্রী, বোন, দুলাভাইসহ অনেক আত্নীয় সারাদিন হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষা করল, কখন বাবা একটু সুস্থ্য হবে এই খবরটা শোনার জন্য। এদিন স্ত্রী, বোন এবং দুলাভাই হাসপাতালের বারান্দায় রাত কাটালাম। পরদিন সকালে অবস্থার আরো অবনতি হলো। আবারো ডাক্তারের সাথে বসলাম, লাইফ সাপোর্ট খোলার কোন উপায় নেই, যেখানেই নিয়ে যাই, লাইফ সাপোর্ট দিয়েই নিতে হবে। ঢাকার কার্ডিয়াক এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের কথা বলল ডাক্তার, কিন্তু ব্রীজ দুটিতো বন্ধ। ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম আর কি উপায় আছে? ডাক্তার বলল, এয়ার এ্যাম্বুলেন্স আছে স্কয়ার গ্রুপের কিন্তু অনেক ভাড়া। কোন চিন্তা না করে সিদ্ধান্ত নিলাম এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে করেই বাবাকে ঢাকা নিয়ে যাব।

বোন, দুলাভাই এবং নিকট আত্নীয়দের সিদ্ধান্তের কথা জানালাম। সাথে সাথে সবাই রাজি হয়ে গেল এবং আর্থিক সহায়তার আশ্বাসও পেলাম। এয়ার এম্বুল্যান্স আনার জন্য বেশ বেগ পোহাতে হলো। বিভিন্ন জনের সাথে কয়েকশো মোবাইল ফোনালাপ করতে হলো ৪/৫ ঘন্টার মধ্যে। ঐ মূহুর্তে এয়ার এ্যাম্বুলেন্স সিলেটে রোগী আনতে গিয়েছিল। সেই রোগী ঢাকায় আনার পর হেলিকপ্টার রিফুয়েলিং করার পর তারপর কুমিল্লা আসবে। আবারো অপেক্ষার পালা। ব্রীজের পাশাপাশি প্রকৃতিও যেন বৈরী আচরণ করলো। আকাশ মেঘলা এবং ঝড়ো হাওয়া বইতে লাগল। হেলি পাইলটের সাথে প্রায় ২০ মিনিট তর্ক করলাম ল্যান্ডিং সাইট নিয়ে। আমি চাই হেলিকপ্টার মুন হাসপাতালের কাছাকাছি কুমিল্লা ঈদগাহ ময়দানে নামুক, কিন্তু উনার পছন্দ ৭/৮ কিঃমিঃ দূরে ক্যান্টনমেন্ট অথবা কুমিল্লা এয়ারপোর্টের পরিত্যাক্ত রানওয়ে। উনি এয়ার ফোর্সের একজন রিটায়ার্ড অফিসার। যাহোক অবশেষে অনেক কষ্টে উনাকে রাজি করালাম।

হেলিকপ্টার এল একটু দেরী করে। বাতাসের খুব ঝাপটা ছিল। তাই দেরী হলো। হেলিকপ্টার থেকে লাইফ সাপোর্ট নামিয়ে হাসপাতালে নেয়া হলো। সেগুলো সেট করে বাবাকে ঈদগাহ ময়দানে আনা হলো। সাংবাদিকরা এলো আমার ইন্টারভিউ নিতে। কিভাবে আমি এত অল্প সময়ে এয়ার এ্যাম্বুল্যান্স যোগাড় করলাম তার বর্নণা শুনতে। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “আমার এখন ইন্টারভিউ দেয়ার সময় নেই, শুধু আমার বাবার জন্য দোয়া করুন”। বুঝলাম, আমার উত্তর উনাদের পছন্দ হলো না। পরদিন কুমিল্লার স্থানীয় পত্রিকায় ছাপা হলোঃ “এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে মুন হসপিটালের উন্নত চিকিৎসা সেবা”। শুনলাম এজন্য মুন হসপিটালের মালিক সাংবাদিকদের টাকাও দিয়েছেন। বুঝলাম টাকা দিয়ে আসলে সব সংবাদকেই পালটানো সম্ভব।

এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে রোগীর সাথে মাত্র একজন যেতে পারে। তাই আমিই উঠলাম বাবার পাশে। হেলিকপ্টার আকাশে উড়ল। ঝড়ো বাতাস এবং আকাশে মেঘ। পাইলট আগেই জানিয়ে দিল ঢাকা সিএমএইচের হেলিপ্যাডে নামা যাবেনা, শাহজালাল এয়ারপোর্টে নামতে হবে। আবারো সমন্বয় করলাম, ঢাকা সিএমএইচের এ্যাম্বুলেন্সকে শাহজালাল এয়ারপোর্টে পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম। সেনাসদর এবং আমার অফিসের সবাই আমাকে এসব বিষয়ে অত্যন্ত সহযোগিতা করেছে। স্কয়ারের মেডিক্যাল টিমের সাথে চুক্তি হলো তারা বাবাকে ঢাকা সিএমেইচে পৌছে দিয়ে তারপর ফেরত যাবে স্কয়ার হাসপাতালে। হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার ঠিক ২ মিনিট আগে আমি মনিটরে দেখলাম বাবার ব্লাড প্রেসার আগের মতোই আছে। আমি মোবাইলে sms টাইপ করলামঃ “We are landing. Father is still alive. Pray for father”. নেটওয়ার্ক পাওয়ার সাথে সাথে তা স্ত্রী ও ছোট আপুকে send করলাম। এর কিছুক্ষণ পরেই মাটি থেকে মাত্র ১০ ফুট উপরে থাকতে বাবার ব্লাড প্রেসার রিডিং nil হয়ে গেল। আমি মেডিক্যাল টিমকে জিজ্ঞাসা করলাম বিপি দেখা যাচ্ছেনা কেন? তারা খুব চেষ্টা করলো কিন্ত আর কোন রিডিং মনিটরে দেখা গেলনা। এরমধ্যে হেলিকপ্টার ল্যান্ড করল। স্কয়ার হাসপাতালের মেডিক্যাল টিম বাবার সাথে যেতে অসম্মতি জানাল। ঢাকা সিএমএইচের মেডিক্যাল টিম আসার কারনে তাদের নাকি আর প্রয়োজন নেই। স্কয়ার হাসপাতাল এর মেডিক্যাল টিম মেম্বারদের পরিবর্তিত চেহারা এবং ব্যবহার দেখে আমার মনের ভয় আরো বেড়ে গেল। আর দেরী না করে এ্যাম্বুলেন্সে করে তাড়াতাড়ি বাবাকে ঢাকা সিএমএইচ নিয়ে গেলাম ভিতরের এক ফাঁকা রাস্তা দিয়ে। ১৫ মিনিটের মধ্যে সিএমএইচে পৌছালাম, সরাসরি আইসিইউ-১ এ বাবাকে নেয়া হলো। কার্ডিওলজিষ্ট আগে থেকেই রেডী ছিলেন। বাবাকে নেয়ার সাথে সাথে তার মেডিক্যাল টিম সহ তিনি রোগীকে বাঁচানোর জন্য ঝাপিয়ে পড়লেন। বাবার নাভি থেকে পা পর্যন্ত কোন পালস্ ছিলনা। গলার কাছে খুব সামান্য পালস্ ছিল যা মেশিন রিড করতে পারছিল না। কার্ডিওলজিষ্ট বাবার বুকে মোট তিনবার শক্ দিলেন। শেষের বার সর্বোচ্চ পরিমান শক্ দেয়ার পূর্বে আমার অনুমতি নিলেন (এই শকে শরীরের যেকোন অংগ বিকলাংগ হবার আশংকা থাকে)। আমি ডাক্তারকে বললাম, “আমার বাবাকে শুধু একটু বাঁচান, আর কিছুই আমি চাইনা’। প্রতিটি শকে বাবা খুব ঝাকুনি খাচ্ছিলেন। ডাক্তার আমাকে বললেন, “প্লিজ সরে যান, আপনি সহ্য করতে পারবেন না” আমি বললাম, “আমি দেখব, আমাকে দেখতে হবে, বাবা যদি একবারও চোখ খুলে, আমাকে তো দেখতে পাবে, আমি সামনে থাকব”। ডাক্তার আমাকে আর বাঁধা দিলনা। সর্বোচ্চ শক্‌ দেয়া হলো বাবার বুকে। এবার প্রচন্ড ঝাকি খেলেন বাবা, কিন্তু চোখ আর খুললেন না। শেষ আশার প্রদীপটিও নিভে গেল। ডাক্তারের চোখেও পানি চলে আসল।

বাবার মুখটা ডাক্তার সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিল। আমার জীবনে এর চেয়ে বেশি কষ্টের কোন মূহুর্ত আগে কখনো আসেনি। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম, কি করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ইতোমধ্যে আমার অফিসের কলিগ এবং ডাইরেক্টর (ম্যাডামসহ) আইসিইউতে চলে এল। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। কলিগদের জড়িয়ে ধরে ইচ্ছামতো কাঁদলাম। আমার ডাইরেক্টর এবং কলিগরা আমাকে স্বান্তনা দিল। এরমধ্যে কুমিল্লা রেলষ্টেশন থেকে স্ত্রী ফোন করল, আমার কান্না শুনে সেও বুঝতে পারল আমার জীবনে কি সর্বনাশ ঘটে গিয়েছে। কুমিল্লায় সবার মধ্যে সেই কান্না ছড়িয়ে গেল। মা, বোন, স্ত্রী সহ সবার ট্রেনের টিকেট ফেলে দেয়া হলো।

এবার আমার বাবাকে গোসল করানোর পালা। জীবনে কোনদিন মৃত ব্যক্তিকে গোসল করাইনি। ঢাকা সিএমেইচের লাশঘরে এক ইমামের সাথে বাবাকে নিয়ম মোতাবেক গোসল করালাম। গোসলের সময় দেখলাম, বাবার বুক অনেক উচু হয়ে আছে। দেখে মনেই হয়নি যে, হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। বাবার বুকে অনেক সাহস ছিল, যে সাহসের গুনে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের চোখ ফাকি দিয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করার জন্য দেশে চলে এসেছিলেন। গোসলের সময়ও বাবার শরীর খুব Strong ছিল। বয়সের ভার তার শরীরের কোথাও ছিলনা। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী। আমার বাবার একটা ইচ্ছা আল্লাহ পূর্ণ করেছেন। বাবা সবসময় বলতেন সুস্থ্য থাকতে থাকতে যেন এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে পারেন, কখনো যেন বিছানায় দীর্ঘদিন অসুস্থ্য থাকতে না হয়।

রাতেই বাবার কফিন নিয়ে এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে রওয়ানা হলাম। সাথে শ্বশুড়, একজন আত্নীয় এবং অফিসের একজন কলিগ আসল। ফেরী পার হয়ে কুমিল্লা সিএমএইচ পৌছাতে রাত আড়াইটা বাজল। কুমিল্লা সিএমএইচের মর্গে বাবাকে রাখা হলো। পরদিন বাবাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের জন্য আগেই সেনাসদর হতে চিঠি বের করা হয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামীয় তালিকা অনুযায়ী এ চিঠি বের করা হয়। কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি চৌকস ইউনিটকে এই দাফনের দায়িত্ব দেয়া হয়। আমার বাবা প্রায় ৩ বছর আগেই আমাদের গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থান তৈরী করে বাউন্ডারী দেয়াল দিয়ে ঘিরে রেখেছিলেন। কারো জন্য তিনি কোন কাজ বাকি রেখে যাননি। সেনাবাহিনী ছাড়াও কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সদর উপজেলা এবং পুলিশ এর একটি টিম আমাদের গ্রামের বাড়িতে যায় বাবাকে শেষ সম্মান জানানোর জন্য। সেনাপ্রধান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ইউএনও,পুলিশ এর পক্ষ থেকে আলাদা আলাদা ভাবে বাবার কবরে পুষ্পস্তবক ও ফুলের তোড়া দেওয়া হয়। বাবার জানাজার সময় আমাকে কিছু বলতে বলা হয়। আমি যা বলেছি তার উল্লেখযোগ্য অংশ হলোঃ “আমার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তিনি অত্যন্ত সাহসী এবং পরিশ্রমী একজন মানুষ ছিলেন। অন্যায়ের সাথে তিনি কখনো আপোষ করেননি। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি সে সাহস ধরে রেখেছিলেন। আমার বাবা ছিলেন অত্যন্ত সফল একজন মানুষ। তিনি যদি কোন ভুল-ত্রুটি করে থাকেন, কিংবা কারো মনে কখনো আঘাত দিয়ে থাকেন, তার পক্ষ থেকে আমি সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করছি। সবাই আমার বাবার রুহের মাগফেরাত কামনা করবেন।” এক জীবনে একজন মানুষের আর কত সাফল্য পাওয়া সম্ভব? আমার বাবা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যন্ত সফল একজন মানুষ। শূন্য থেকে তার শুরু হয়েছিল। সকল আত্নীয়-স্বজন ও এলাকার মানুষের অনেক উপকার তিনি করেছেন। এটা ছিল তার একটা নেশার মতো। মানুষের কাজ করে তিনি খুব আনন্দ পেতেন। আমাদের এমন কোন আত্নীয় নেই যার জন্য বাবা কোন কাজ করেননি। এত মানুষের একত্রে কান্না আমাদের এলাকার মানুষ আগে কখনো দেখেনি। আমাদের সব ভাই-বোনদের তিনি যথেষ্ট মর্যাদাপূর্ণ অবস্থায় পৌছে দিয়েছেন, সবার জন্যই তিনি কাজ করে গিয়েছেন।

কুমিল্লা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক প্রদত্ত ক্রেষ্টসহ আমার বাবাঃ

Freedom Fighter Father with Crest

বাবার কবরে দেয়া পুষ্পস্তবক ও ফুলের ঝুড়িঃ

যে সর্বোচ্চ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আমার বাবার দাফন হলো তা আমাদের অঞ্চলের মানুষ আগে কখনো দেখেনি। আমার ছোট দুলাভাইয়ের উক্তিঃ “তোমাদের গ্রাম ভবিষ্যতে হয়তো কয়েকজন সেনাপ্রধানের জন্ম দিতে পারবে, কিন্তু এরকম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্ম দিতে পারবে না, এই ক্ষতি অপূরণীয় ক্ষতি”। যে জাতীয় পতাকা দিয়ে বাবার কফিনটি মোড়ানো ছিল দাফন করার পর তা ভাঁজ করে আমার হাতে তুলে দেয়া হলো। পতাকাটি এখন আমাদের বাবার বাসার ড্রয়িংরুমে শোভা পাচ্ছে। আমার বাবা আমাদের পরিবারকে একটি জাতীয় পতাকা উপহার দিয়ে গেলেন, আমাদের দেশকে একটি মানচিত্র দিয়ে গেলেন। এ পতাকা ও মানচিত্রের সম্মান রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। আজ আমি অত্যন্ত গর্বিত আমার বাবার শেষ বিদায়ে তার অর্জিত সম্মান দেখে, তার রেখে যাওয়া স্মৃতি দেখে, তার জন্য সব মানুষের কান্না ও হাহাকার দেখে। মৃত্যুর পরও নাকি মানুষের তিন ধরনের কাজ আমলনামায় জমা হতে থাকে। এর মধ্যে আছে সদকায়ে যারিয়াহ, সুসন্তান, এবং ভাল কাজ যার সুফল অন্যেরা ভোগ করতে থাকে। আপনারা সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন আমি যেন সেই সুসন্তান হতে পারি। বাবার কবর জিয়ারতের সময় আল্লাহর কাছে এই দুআ করছি সবসময় – আমার বাবা যেন জান্নাতবাসী হয় এবং আমার বাবার ভাল গুনগুলো যেন আমার মধ্যে সঞ্চারিত হয়। বাবার জন্য আমি খুব গর্ববোধ করছি কিন্তু একটি আফসোস আমাকে এখন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। আমি আমার বাবার শেষ চিকিৎসা করার সুযোগটি ঠিকমতো পেলাম না এবং যাবার আগে বাবার মুখের কোন উপদেশ শুনতে পেলাম না। এভাবে নীরবে বাবা কেন চলে গেলেন তার উত্তর আমি কার কাছে পাব???

১,৬৮৭ বার দেখা হয়েছে

১২ টি মন্তব্য : “একজন অখ্যাত মহানায়কের নীরব প্রস্থান”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    রহমান,
    শোক সামলে ওঠার শক্তি অর্জন করো, মনেপ্রাণে এটুকু কামনা করছি। চাচার শেষ মুহূর্তগুলোর বর্ণণা পড়ে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো মনটা। উনার প্রতি অশেষ শ্রদ্ধাসহ ---

    জবাব দিন
  2. ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

    প্রিয় রহমান তোমার বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে আমার স্যালুট। এই সব মহান হৃদয় মানুষগুলোর জন্যই আজ আমরা স্বাধীন দেশে মুক্ত নিশ্বাস নিতে পারছি। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করবো সেই পতাকা ও মানচিত্রের সম্মান রক্ষা করতে।
    উনার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

    জবাব দিন
  3. জিয়া হায়দার সোহেল (৮৯-৯৫)

    রহমান তোমার বাবা এই দেশের সত্যি একজন গর্বিত সন্তান । এই ধরনের চলে পরিবার পরিজনের কাছে দুঃখের হলেও উনার জন্য অনেক সম্মানের । আমি উনার রুহের মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহ্‌ উনাকে যেন বেহেস্ত নছিব করেন এই দোয়া করি। তোমার আশাও যেন পূর্ণ হয় । ভালো থেকো ।

    জবাব দিন
  4. ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

    বাংলার মাটি প্রবল মমতাময়ী। আমি নিশ্চিত সে তাঁর যোগ্য সন্তানকে প্রবল মমতায় আগলে রেখেছে। পরম করুণাময় তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।


    যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

    জবাব দিন
  5. প্রিয় রহমান,

    বাবাকে (F-in-law) নিয়ে তোমার লেখাদুটি পড়লাম। সত্যি বলতে, পড়ার সময় আমি আমার অশ্রু ধরে রাখতে পারিনি। বাবার অনেক ঘটনাই আমি জানতাম, কিন্তু এত বিস্তারিত ও গোছানোভাবে জানতাম না। আমাদের পরিবারের সকল সদস্যই বাবার জন্য গর্বিত ও গৌরবান্বিত বোধ করছি।

    তোমার শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস ও নামকরন দুটি সত্যিই চমকার ও যথোপযুক্ত। আজ আমি শুধু বাবাকে নিয়ে নয় বরং তোমার মতো ভাইকে নিয়েও গর্ববোধ করছি। সবশেষে দোয়া করি, বাবা যে দেশের পতাকা আমাদের দিয়ে গিয়েছেন, আমরা যেন তার মর্যাদা রাখতে পারি। প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন বাবার বিদেহী আত্নার শান্তি দান করেন। আমিন।

    জবাব দিন
  6. প্রিয় রহমান,

    বাবাকে (F-in-law) নিয়ে তোমার লেখাদুটি পড়লাম। সত্যি বলতে, পড়ার সময় আমি আমার অশ্রু ধরে রাখতে পারিনি। বাবার অনেক ঘটনাই আমি জানতাম, কিন্তু এত বিস্তারিত ও গোছানোভাবে জানতাম না। আমাদের পরিবারের সকল সদস্যই বাবার জন্য গর্বিত ও গৌরবান্বিত বোধ করছি।

    তোমার শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস ও নামকরন দুটি সত্যিই চমৎকার ও যথোপযুক্ত। আজ আমি শুধু বাবাকে নিয়ে নয় বরং তোমার মতো ভাইকে নিয়েও গর্ববোধ করছি। সবশেষে দোয়া করি, বাবা যে দেশের পতাকা আমাদের দিয়ে গিয়েছেন, আমরা যেন তার মর্যাদা রাখতে পারি। প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন বাবার বিদেহী আত্নার শান্তি দান করেন। আমিন।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।