নামঃ ক্রিকেট, বয়সঃ ক্রিকেট, ধর্মঃ ক্রিকেট, পেশাঃ আমজনতা, জাতীয়তাঃ বাঙলাদেশি

আমার ফেইসবুকের প্রোফাইলে রিলিজিয়ন এর ঘরে লেখা ক্রিকেট। এটা খেয়াল করে কোন এক বড় ভাই একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলেন। উত্তরটা তৎক্ষণাৎ দিতে পারি নাই। কারণ এক লাইনে বলার মত ছিলো না। কারণ যেটা সেটা হলো, আমি কোন ক্রিকেট বোদ্ধা নই। ব্যাট-বল জীবনে ক’বার ছুঁয়ে দেখেছি বলে দেয়া যাবে। খেলোয়াড়ি জীবন বলতে ১৯৯৫ সালে ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের একটুকরো জমিতে টেলএন্ডার/দুধভাত হিসেবে বিপদে পড়ে ব্যাটিং করতে নামা। চোখে চশমা, কাঁপতে থাকা হাত-পা নিয়ে দাঁড়াবার দুই তিন বল পড়েই উইকেট উপড়ে যাওয়ার শব্দ কানে আসতো।

ক্যাডেট কলেজেও ছয় বছরে ২২ গজের আশেপাশে আর যাওয়া হয়নি। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেনীতে আন্তঃহাউজ প্রতিযোগীতায় সীমানার বাইরে চার-ছয় এর বিতর্ক নির্ধারন করার জন্য বাকি দুই হাউজের খেলার সময় বাধ্যতামূলক বসে থাকতে হতো পুরো সময়। মনে পড়ে অষ্টম শ্রেনীতে ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। গ্রীষ্মের শেষ বিকেলের সূর্য আর তেতে উঠা মাঠ আমাকে থামাতে পারেনি। বড় ভাই মোত্তাকী (মকক ৯৪-২০০০) শুনেছি ও দেখেছি সোহরাওয়ার্দী হাউজের কৃতি পেইস বোলার ছিলেন। দশম শ্রেনীতে থাকতে কোন এক খেলায় উনার বলে উইকেট নাকি দুই টুকরো হয়ে গিয়েছিল। সত্য মিথ্যা জানি না তবে এই নিয়ে আমার গর্বের শেষ ছিলোনা। এরপরে চোখের সামনে পাকা খেলোয়ার হয়ে উঠলো আমাদের রেজওয়ানুর, নুরুল্লাহ, ইমরান, রাকিব, জুয়েল, ফাহিম, হাসনাইন, সাকিফেরা। আইসিসিসিএম এর প্রস্তুতি নিল। আমাদের নেতৃত্বের ক্রিকেট প্রতিযোগীতাটা বেশ চাঞ্চল্যকর ছিল মনে পড়ে। দলের ফলাফল আশানুরূপ হয়নি বেশ কিছু অযাচিত কারণে। বাকিদের কথা মনে নেই তবে আমার মন খারাপ ছিল অনেকদিন। এমনকি ঘৃণা পর্যন্ত জন্মেছিল বেশ কিছু মানুষের উপর, কলেজের উপর ও সামগ্রিকভাবে ব্যবস্থাপনার উপর। সেটি কাটিয়ে উঠে সেইসব মানুষের সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতেও কলেজ থেকে বের হবার পর আমার অনেকদিন লেগেছে। দলটি যখন ফেরত আসলো তখন তাদের মুখের দিকে তাকানোর অবস্থা ছিলো না। অসহায় লেগেছে। মনে হয়েছে কিছু করতে পারলাম না এদের জন্য।

এরপরে বাংলাদেশের খেলায় কেদেঁছি। টেলিভিশন বন্ধ করে অন্ধকার ঘরে বসে থেকেছি। মাঝে দুরুদুরু বুকে টেলিভিশন মিউট করে ছেড়ে অবস্থার উন্নতি দেখে আশায় বুক বেঁধেছি। রাগের মাথায় বাসা থেকে থেকে বের হয়ে গিয়ে ২ শলাকা সিগারেটের জায়গায় ৪-৫টি উড়িয়েছি। বিদ্যুৎ চলে গেলে মুঠোফোনের রেডিও কিংবা ইউপিএস দিয়ে কম্পিউটার চালিয়ে ক্রিকইনফোর স্কোরবোর্ডে তাকিয়ে থেকেছি। আর কোনরকম উপায়ন্ত না দেখলে অন্ধকারে বসে থেকেছি কখন আরো একটি চিৎকার ভেসে আসবে পাড়ার কোন এক কোনা থেকে – সাথে সাথে উৎকন্ঠিত স্বরে নিচতলার খালাতো ভাই জিজ্ঞাসা করেছি, “কিরে রাজন আরেকটা ফালাইসে মনে হয়?” বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১ এর সময় ঢাকা শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছি অপার বিষ্ময়ে। এত সুন্দর করে সাজানো আসলেই সম্ভব। আর‌ো একটি ছিনিয়ে আনা বিজয়ের বিজয় মিছিলে গলা মিলিয়েছি দূরে থেকে কাছে থেকে।

এরকম আরো শত সহস্র অনুভূতি বলেই যাওয়া যাবে। কিন্তু আমি জানি এই অনুভূতি গুলো আমার একার নয়। এদেশের আরো কোটি মানুষের কাছে আরো লক্ষ-কোটি আবেগ ও অনুভূতি লুকিয়ে আছে এই একটি খেলাকে কেন্দ্র করে। যেই দেশের পুলিশ দূরের কোন বহুতল ভবনের ছাদে প্রহরার পাশাপাশি খেলছে ছেলেটা ছক্কা মারলো কিনা তা দেখতে চোখ বুলায় লিলিপুট সদৃশ খেলার মাঠে; যেই দেশের মানুষ টয়লেটের ঘুলঘুলি দিয়ে উঁকি দিয়ে খেলা দেখে; যেই দেশের মানুষ গাছ, বিপদজনক টাওয়ারের মাথায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উঠে স্টেডিয়ামের টিকেট পায়নি বলে কিন্তু প্রিয়দল আজ জিতবে এই আশায় বুক বাঁধে, সেই দেশের মানুষের ধর্ম ইসলাম নয়, হিন্দু নয়, খ্রিষ্টান নয়, বৌদ্ধ নয়। সেই দেশের মানুষের ধর্ম ক্রিকেট।

২,০৬৬ বার দেখা হয়েছে

২৬ টি মন্তব্য : “নামঃ ক্রিকেট, বয়সঃ ক্রিকেট, ধর্মঃ ক্রিকেট, পেশাঃ আমজনতা, জাতীয়তাঃ বাঙলাদেশি”

  1. নাফিস (২০০৪-১০)

    কলেজের সবচেয়ে ঠেকাইনা ব্যাটসম্যান ছিলাম। দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় আন্ত হাউজ ক্রিকেট কম্পিটিশনে দলের প্রাথমিক ব্যাটিং বিপর্যয় ঠেকাতে এক অবিস্মরণীয় টেস্ট খেলা দিয়েছিলাম। ৬৪ বলে ২২ রান করেছিলাম 😀 এক প্রান্ত আগলে রেখে এই খেলার শিক্ষা পেয়েছিলাম স্পোর্টস গুরু ও হাউজ মাস্টার ইজরাইল হক স্যার এর কাছ থেকে ! 😛
    এককালে প্রচুর ক্রিকেট দেখতাম। স্পেশালী ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার আগে.. ফেভারিট টিম ছিল সাউথ আফ্রিকা। ল্যান্স ক্লুজনার, জ্যাক ক্যালিস, হার্শেল গিবস দের ভক্ত ছিলাম। টেন্ডুলকার- ম্যাকগ্রা র দ্বৈরথ দেখতাম আগ্রহ নিয়ে। মুরালিধরন - শেন ওয়ার্ন এর স্পিন বোলিং নিয়ে গবেষণা করতাম। শন পোলক এর ইন সুইং , আউট সুইং এর রহস্য বোঝার চেষ্টা করতাম।
    এখন এসবের কিছুই আর করিনা। ধ্যান জ্ঞান সব এখন ফুটবল নিয়ে। তবুও ইদানিং আবার ক্রিকেট দেখছি। কেউ তাগাদা দেয়নি। নিজে থেকে দেখছি। সাউথ আফ্রিকা কে সাপোর্ট করার আর প্রয়োজন দেখিনা। নিজের দেশই যদি এরকম খেলে তখন সেই খেলা না দেখে উপায় আছে?

    জবাব দিন
    • মোকাব্বির (৯৮-০৪)

      পড়ার জন্য ধন্যবাদ ভাই। আরো কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল কথা হলো এরপরে থেকে আলোচনা যেদিকে যাবে সেদিকে যথেষ্ট জ্ঞান নেই। কিন্তু বড় দাগে আপনার কথাটার পুনরাবৃত্তি করছি, বিভেদের উর্ধ্বে কোন জীবনাচার আজ জরুরী। স্বল্প পরিসরে, সাময়িক হলেও এই একটি খেলা সেই চাহিদা মেটাচ্ছে।


      \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
      অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

      জবাব দিন
  2. তাওসীফ হামীম (০২-০৬)

    প্রস্তুতি ম্যাচে ২২ রান এবং ৩৪ রানের দুটো ঝোড়ো ইনিংস খেলে মূল দলে চান্স পেয়েছিলাম, সাথে মরা উইকেটে অফ স্পিন।

    বিশাল বিশাল হাতের কারনে আমার কাছ থেকে ক্যাচ ছুটতো না, কিন্তু ক্যাপ্টেন আমাকে যেখানেই দাড়া করায় সেখানে কেউ বল মারে না।

    মূল ম্যাচে ২ ও ৩ রানের দুটো হতাশাজনক ইনিংস উপহার দেই হাউজকে। তবে সব মিলিয়ে ক্রিকেট অভিজ্ঞতা আমার ভালোই আছে।

    লেখাটা পড়ে খুবই ভালো লাগলো।


    চাঁদ ও আকাশের মতো আমরাও মিশে গিয়েছিলাম সবুজ গহীন অরণ্যে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।