বিবাহ(বার্ষিকী), স্মৃতিচারণ, ও নসিমন (দু)র্ঘটনা – ২

(গত পর্বের পর)

বাসায় ঢুকতেই বিয়ের আমেজ চোখে পড়লো এখানে সেখানে। তবে বেশ ভোর হওয়ায় এখনো পুরোপুরি সরগরম হয়ে উঠেনি। শুরুতেই ইঞ্জিনিয়ারের হাস্যোজ্জ্বল স্বাগতম। দেখে বুঝলাম উনি যারপরনাই আনন্দিত ঢাকা থেকে আমাকে আমদানী করতে পেরে। একটি ঘরে গিয়ে বসলাম। পরিচিত হলাম সাব্বির (সম্ভবত র,ক,ক ২০০১-০৭) ও সুষমার খালাতো/মামাতো/ফুপাতো/চাচাতো (খেয়াল নেই) ভাই রাজিবের সাথে। ওরা তখনো লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। কিছুক্ষণের মাঝেই খালাম্মা (ইঞ্জিনিয়ারের মা) এবং অন্যান্য খালারা এসে পরিচিত হলেন। খালাম্মা বললেন হাত মুখ ধুয়ে আসতে। বুঝতে পারলাম আমার ভাষায় “খাদ্য নির্যাতন” আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হতে যাচ্ছে। কি মনে করে এর মাঝে ল্যাপটপ আর বাংলালায়নের ক্ষুদে মডেমটা বের করে সংযোগ দিলাম। নেটওয়ার্ক পাবার প্রশ্নই আসে না তাও দেখতে দোষ নেই। বেশ কিছুক্ষণ গরু খোঁজা দিয়ে হঠাৎ দেখলাম ক্ষীন ১ দাগ সহকারে মডেমের নীল বাতি জ্বলে উঠলো। ভূত দেখার মত চমকে উঠলাম। এখানে কিভাবে কি বুঝে পেলাম না। শুরুতেই বাংলালায়নের সাইটে গিয়ে কাভারেজ ম্যাপে দেখলাম একটা ক্ষীন সম্ভাবনা আছে খুলনায় স্থাপিত টাওয়ারের হাওয়া বাতাস মেহেরপুর পর্যন্ত আসার তবে সেটা এই বিষয়ে বোদ্ধারাই ভালো বলতে পারবেন। নেটওয়ার্ক সংযোগ কেন পেয়েছি সেটা দেখার জন্যে বাংলালায়ন ওয়েবসাইটে ঢুকে বসে আছি এটা যখন খেয়াল হলো নিজেকে কষে দুটো গালি দিলাম। ডুবে গেলাম ফেইসবুক, মেইল চেকিং ইত্যাদি কাজে।

এর মাঝে খিচুড়ি আর মুরগীর মাংসে পেট পূজো সেরে ভাবলাম বিছানায় একটু গড়িয়ে নেই। দুপুরে জুম্মার নামাজের পর শুরু হলো বিয়ের অনুষ্ঠান। সঠিক নামটি মনে নেই তবে সেটা পৌর কমিনিটি সেন্টার টাইপের কিছু একটা হবে। নতুন নির্মিত এবং ছিমছাম পরিবেশ দেখে ভালই লাগলো। ভেতরে ঢুকে দেখি জামাই বাবাজি তখনো আসেন নাই। উপরে উঠে ইঞ্জিনিয়ারকে বউয়ের সাজে দেখতে গেলাম। রাজিব আর সাব্বিরের সাথে আড্ডা দিতে দিতে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। পেটে খুধা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই ভাবলাম গিয়ে বলে এসে খেতে বসে যাই। গিয়ে দেখি ইঞ্জিনিয়ারকে সাজাতে সৌন্দর্য্যবর্ধক হিসেবে ব্যবহৃত চোখের পাপড়ির বর্ধিতাংশ একটি খুলে পড়ে গিয়েছে এবং সেটা খুঁজতে আশেপাশে চিরুনী তল্লাশী চলছে। আমরাও মহাসমারোহে মাঠে থুক্কু ফ্লোরে নেমে গেলাম। একসময় সৌন্দর্য্যবর্ধক বর্ধিতাংশের খোঁজ পাওয়া গেলো। নিচে গিয়ে একটি টেবিলে বসে গেলাম। খাওয়া-দাওয়া সেরে উঠার পর রাজিব বললো ভাই চলেন বিড়িতে টান দিতে হবে। চারিদিকে আত্মীয়-স্বজন গিজগিজ করছে তাই একটি মোটরসাইকেলে চড়ে বসলাম। চালাচ্ছে রাজিব, মাঝে আমি আর শেষে সাব্বির। একটানে চলে গেলাম মেহেরপুর জেলা জজ আদালতের সামনে। এখন পর্যন্ত ঢাকার বাইরে যেই কয়টা জেলাতে ঘুরতে গিয়েছি ঘুরে ফিরে আদালতের সামনে দিয়ে আমার যেতে হয়েছেই। তবে ব্যাপারটা কাকতালীয় বা আমি আইনজীবি বলে মনের অজান্তেই চলে যাই তা নয়। বেশীরভাগ জেলা শহরগুলোতে শহরের ঠিক মাঝে দিয়ে একটি মূল সড়ক গিয়েছে এবং সেটার ডানে বামে সেই জেলার মূল স্থাপনাগুলো অবস্থিত (আদালত, জজের বাসভবন, পুলিশের এস,পির বাসভবন, কার্যালয় ইত্যাদি) এবং মেহেরপুরও এর ব্যতিক্রম নয়। ধুমপান শেষে আবার চড়ে বসলাম মোটরসাইকেলে। ফেরত আসছি। গতি ৪০ কিমি/ঘণ্টা ছুঁইছুঁই করছে। সামনে তাকিয়ে আছি। অল্প একটু দূরেই এক লোক আরেকটি মোটরসাইকেলে, পেছনের সীটে বাচ্চা একটি ছেলে বসা। তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ সামনের মোটরসাইকেল কোন সিগন্যাল না দিয়ে ডানে মোড় নিলো। সংঘর্ষ এড়াতে রাজিব ব্রেক ধরার চেষ্টা করলো এবং গড়নে হালকা পাতলা এবং তার পেছনে ঠিক সেরকম দশাশই বপু বিশিষ্ট দুইজন সহযাত্রীর (খাবারের ওজন বাদে) মোট ভরবেগে মোটরসাইকেল বেসামাল হয়ে একপাশে কাত হয়ে পড়ে আমাদের নিয়ে হেঁচড়ে সামনে চলে গেলো অনেকখানি। ঘটনার আকষ্মিকতা কেটে যেতেই আশেপাশে তাকিয়ে দেখি ফিনকি দেয়া রক্তের ক্ষীণ প্রবাহ। এক লোক এসে ধরে উঠে দাঁড়াতে সহায়তা করলো। ধীরে ধীরে হেঁটে রাস্তার এক পাশে এলাম। বাম হাত উলটে দেখি সড়কবিভাগের পিচের প্রলেপের ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে রক্ত বের হয়ে আসছে। হাঁটুর কাছে ছেঁড়া প্যান্টের ভেতরের পিচঢালা রাস্তায়ও ততক্ষণে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। ধাক্কা কাটিয়ে উঠার সাথে সাথে তীব্র যন্ত্রণা এসে জায়গা করে নিতে থাকলো। সবচেয়ে বেশী আহত হয়েছে চালক রাজিব। থুঁতনি ফেটে গিয়ে ঢাকা ওয়াসার ভেঙ্গে যাওয়া পাইপ আর কাঁধে হাটুতেও চোট। সাব্বির শেষের যাত্রী হিসেবে তেমন কোন ব্যথাই পায়নি। তবে মাংশপেশী ছেঁচে গিয়েছিলো কিছুটা। অত্যন্ত ভাগ্যবান আমরা কারণ শুক্রবার তাই রাস্তায় পেছনে বাস-ট্রাক বা অন্যান্য যানবাহন ছিলো না যেটা সাধারণত থাকে।

মোটামুটি শক কাটিয়ে উঠার পর শুরু হলো শলা-পরামর্শ। রাজিবের মতে এই খবর বাসায় জানাজানি হলে ওকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলাসহ বিভিন্ন নাশকতামূলক সম্ভাবনা আছে। আমি ভাবলাম এতবড় দুর্ঘটনা, রক্তক্ষরণ আবার না জানিয়ে থাকবো কিভাবে। এর মাঝে খেয়াল হলো মোটরসাইকেলটি দিয়ে আসতে হবে কারণ সেটা রাজিবের ছিলো না। মেহেরপুর উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর মতই। রাস্তায় যেকোন (পুরুষ) মানুষকে ধরে জিজ্ঞাসা করেন মোটরসাইকেল চালাতে পারে কিনা ৯০% ক্ষেত্রে হ্যাঁ-বোধক উত্তর পাবেন। রাজিব দেখলাম এক ছেলেকে ডেকে নিলো। সাব্বিরকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর মোটরসাইকেল চালকের সাথে পাঠিয়ে দিলো যাতে সরাসরি সন্দেহ করে না বসে আত্মীয়-স্বজনেরা। এরপর আমরা দু’জন আবার গভীর চিন্তায় মগ্ন। কিভাবে না জানিয়ে পার করা যায়। এক লোক এসে বলল ভাই জানাজানি পরে আগে ড্রেসিং করেন। এই ভাইয়ের (রাজিব কে দেখিয়ে) তো সেলাই লাগবে। কোথায় যাওয়া যায় করতে করতে একটি রিকশা ধরে চলে গেলাম ব্যক্তিগত একটি ক্লিনিকে। সেখানে নার্স আয়োডিন ভেজানো তুলো ক্ষতস্থানে ঘষে দিতেই সর্বাঙ্গে আগুন ধরে গেলো। বিনে পয়সায় এর থেকে আর কিছু করতে তারা রাজি হলো না। তাই এইবার একটু দূরের জেলা সদর হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এর মাঝে রাজিব দেখি পাগলের মত হাসছে আবার কাঁদছে আবার হাসছে। বুঝতে পারলাম শক্‌ এখনো কাটিয়ে উঠেনি। মাথায় ক্ষণিকের জন্য একটা চিন্তা মাথায় এলো, এটা যদি মা দেখে তাহলে হবেটা কি?

সংবাদপত্রের অনেকগুলো নিয়মিত খবরের মধ্যে একটি হলো, “চিকিৎসকবিহীন ***** জেলার সদর হাসপাতাল”, “জরুরী বিভাগে রোগীর মৃত্যু – ডাক্তার অনুপস্থিত” ইত্যাদি ও অন্যান্য। এখানে গিয়ে দেখি জরুরী বিভাগের অপেক্ষাকৃত কমবয়সী ডাক্তার আয়েশী ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে আছেন। চেহারার মধ্যে একটা আমুদে ভাব ফুটে আছে বা আমাদের দেখে ফুটে উঠেছে। কাছে যাওয়ার আগেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, “পালসার না ডিস্‌কভার?” বুঝলাম এই লাইনের ঝানু খেলোয়ার উনি। “ডিস্‌কভার”, ক্ষীণ গলায় রাজিবের উত্তর। “ডিস্ক না ড্রাম ব্রেক?” এবার প্রশ্ন শুনে আসলেই মজা পেলাম। “ড্রাম” – রাজীবের উত্তর শুনে উনার আত্মবিশ্বাসী উত্তর, “এই জন্যই পড়ছেন আপনারা!” খস্‌খস্‌ শব্দে প্রেসক্রিপ্‌শান লিখে বললেন ঔষধ গুলো নিয়মিত খেয়ে নিবেন আর ইঞ্জেকশান যেই দু’টো দিয়েছি সেদুটো নিয়ে নিন দেরী না করে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্য বয়স্ক একলোককে ডেকে বললেন এদের ড্রেসিং করিয়ে দেন। ব্রক্ষ্মতালু গরম করা ড্রেসিং সেশানের পর দুই জনেই বের হয়ে এলাম। রাজিব একটু পরপর তার থুতঁনিতে গজিয়ে উঠা আরেকটি থুতঁনি পরখ করে দেখছে আর বিড়বিড় করছে, “এই হালারে ক্যামনে লুকাই?” এর মাঝে ওই দিক থেকে ফোন আসছেই তো আসছেই। সাব্বির ফোন দিয়ে বললো সুষমা আপা আপনাদের খুঁজছে, বিদায় নেবার সময় হয়ছে। কিছু একটা বুঝিয়ে সময় পার করতে বলে আমরা সামনের ফার্মেসিতে গেলাম টিটেনাস ইঞ্জেকশান নিতে। একটু পরপর রাজিবের হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হাসি আর কান্নার মিশ্রণের সাথে যোগ হলো ইঞ্জেকশানের গুঁতো খাবার ভয়। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে কথা বলার ফাঁকে দোকানের কম্পাউন্ডারকে ইশারা করতেই উনি সুঁই বসাতে আর দেরী করলেন না। থুঁতনি ফেটে হা হয়ে যাওয়ার পরেও ইঞ্জেকশানের ভয় পাওয়াটা ছিলো দেখার মত।

টং এর দোকানে সিগারেট আর চা খেতে খেতে শুরু করলাম আলোচনা – ঘটনা কিভাবে সামাল দিতে হবে। রাজিবের প্রশংসাসূচক(!!!) মতামত, “ভাই আপনে তো উকিল মানুষ, কিছু একটা মাথায় আনেন। ঠিক মত না বলতে পারলে আমাকে খুন করে ফেলবে খালাম্মা। তার উপরে আপনারে নিয়া এক্সিডেন্ট করসি।” অন্যদিকে সুষমা আমাদের সাথে না দেখা করেই বিদায় নিলো। সাব্বির ফেরত গেলো সুষমার বাসায়। সেখানে সবাই জিজ্ঞাসা করছে আমরা দুজন কোথায়। সাব্বির মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য একটি গল্প বলে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো। এর মাঝে কোন এক খালা পেছনে থেকে এসে যেই হাতে ব্যথা পেয়েছে সেই হাতেই চাঁটি মেরে বললো, “এই ছেলে সত্যি করে বলতো ওরা দুইজন কোথায়?” সত্য বলার আগেই ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো সাব্বির। খালা পাঞ্জাবির হাতা উঠিয়ে চোট দেখে ২ + ২ = ১০ বানিয়ে “আপা গো!” বলে চিৎকার দিয়ে সোজা চলে গেলেন ঘরের ভেতরে।

(চেয়েছিলাম এই পর্বে শেষ করবো। আন্তরিক ভাবে দুঃখিত টেনে লম্বা করার জন্যে এবং আরো একটি পর্বে ভাগ করার জন্য) [চলবে]

১,৩৩৬ বার দেখা হয়েছে

৯ টি মন্তব্য : “বিবাহ(বার্ষিকী), স্মৃতিচারণ, ও নসিমন (দু)র্ঘটনা – ২”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    এহেন দুর্ঘটনা নিয়েও জমিয়ে লেখা চাট্টিখানি ব্যাপার না।
    তুমি তো কোর্টেও সওয়াল-জবাব বেশ রসের সাথেই করো মনে হচ্ছে।

    অ ট: লেখাপড়া কেমন চলছে।থ্যাংকসগিভিং-এর উইকএণ্ড এ ঘুরতে যাওয়া হচ্ছে কোথাও?

    জবাব দিন
  2. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    নূপুর ভাই কোর্টের সওয়াল জওয়াবের হাতে খড়ি হবার আগেই তো এখানে চালান হয়ে এলাম। তবে কাকুতি-মিনতি ও করুন চেহারা বানিয়ে সময় বের করে আনার জন্যে মোটামুটি বিখ্যাত ছিলাম! 😛

    সেমিস্টার শেষ হতে আর মোটে ১ মাস। চোখে আন্ধার দেখছি মাঝে মাঝে। থ্যাঙ্কসগিভিং এর সপ্তাহে চেয়েছিলাম দক্ষিণে উড়াল দিবো। মনে হচ্ছে কাজ করে আর জানালা দিয়ে তুষারপাত দেখতে দেখতেই ছুটি পার করে দিতে হবে। কপাল ভালো ডিপার্টমেন্টের বুড়ি প্রফেসর ডিনারের দাওয়াত দিয়েছেন (উনার স্বামী গল্পবাজ এবং উনার নিজের বুড়ো-বুড়ির থ্যাঙ্কসগিভিং ডিনার একদম ভালো লাগে না) এবং পরের দিন ডিপার্টমেন্টের নিজস্ব লাঞ্চ আছে ছাত্রদের সমন্বয়ে।

    দুর্ঘটনার বর্ণনা গুলো ইচ্ছাকৃত জমানো চেষ্টা করি। যাতে রগরগে অংশগুলো সহজেই পার করা যায়। 🙂


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।