স্বপ্ন সন্ত্রাস – ১

খুব মৃদু ভাবে ঘন্টা বেজে যাচ্ছে যেটা একদম ভালো লাগে না। আজকে একদম উঠতে ইচ্ছা করছে না। বন্ধ চোখ এক চিলতে খুলে দেখলাম বাইরে আলো ফুটেনি কিংবা কুয়াশা। যেটাই হোক এখন উঠবার প্রশ্নই আসে না। চোখ আবার বুজে ঘুমের রাজ্যে একটু ডুব দেবার আগেই স্টাফের তীক্ষ্ণ হুইসেল বেজে উঠলো। নাহ আজকে ঘুমাতেই দিবে না। কোনমতে উঠে বসলাম বিছানায়। ফয়সাল, মঞ্জুর, হাবীব, শাকেরীন, মোটামুটি সবাই উঠে পড়ছে। আড়ষ্ট গলায় জিজ্ঞাসা করলাম পিটি না প্যারেড। হাবীব উত্তর দিলো প্যারেড। এর মাঝেই দেখি দরজার সামনে স্টাফ দাঁড়ানো। কাগজ থেকে কয়েকটা নাম পড়ে জিজ্ঞাসা করলো এরা এই রুমে কিনা। হাবিব এবং শাকেরীনের সাথে আমার নামটাও এলো। জুতা পালিশ করতে থাকা হাবিব তাচ্ছিল্যের ভঙিতে জিজ্ঞাসা করলো, “স্টাফ কি হইসে?” স্টাফের গগণবিদারী উত্তর, “সেটা মাঠে গেলেই বুঝবেন। এই কয়জন গেম্‌স ড্রেসে মাঠে এডজুট্যান্টের সামনে ফল-ইন” এরা কেনো যে চিৎকার করে সবকিছু বলার চেষ্টা করে সেটা আজ অব্দি বুঝে উঠতে পারিনি। সেই ক্লাস সেভেন থেকে চলে আসছে একই সার্কাস।

দ্রুত গতিতে গেমস ড্রেসে মাঠে দৌঁড়ে গেলাম। প্যারেডের জন্যে ফল-ইন হওয়া সবার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি। যাই হোক। কুয়াশার মধ্যে এডজুট্যান্টের অবয়ব ভেসে উঠতে উঠতেই চিৎকার, “স্টার্ট ফ্রন্ট-রোল ব্লাডি ডাফারস”, বুঝলাম কাহিনী বেশী সুবিধার না। ফ্রন্ট-রোল দিয়ে উনার কাছে যেতেই কান্ডজ্ঞান শূন্য উন্মাদের মত সবাইকে উনার হাতের স্টিক দিয়ে পেটানো শুরু করলেন। শিশির ভেজা ঘাসে ভিজে যাওয়া পুলওভারের উপর আঘাত গুলো মনে হলো লেলিহান শিখা। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা মাত্রই লাথি দিয়ে মাটিতে ফেলে দিলেন তিনি। ব্যথার তীব্রতায় বিষ্ময় হার মেনে গেলো। হচ্ছেটা কি? একটা আঘাত গালের পাশে লাগতেই নোনতা হয়ে উঠলো মুখ। ভেতরে ফেটে গিয়েছে। তারপর হঠাৎ পেটানো বন্ধ করে প্যারেড গ্রাউন্ডে চলে গেলেন তিনি। বেশ আহত অবস্থায় মাঠে পড়ে থাকলাম আমরা কয়েকজন। কিছুক্ষণ পরে স্টাফ এসে টেনে তুলে হাউজে পাঠিয়ে দিলো। মাত্র প্যারেড শেষ হয়েছে। সবার বিস্ফোরিত দৃষ্টির সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে হাউজের দিকে যাচ্ছি। ক্লাসমেটরা এসে জিজ্ঞাসা করছে কি হলো। রাগে ক্রোধে ফেঁটে পড়লো তাদের অনেকেই।

হাউজে গিয়ে ভীড় জমে উঠার আগেই ড্রয়ার থেকে স্যাভলন তুলা নিয়ে রওনা দিলাম বাথরুমে। ক্ষতগুলো পরিষ্কার করে, প্রচন্ড ব্যথায় বরফ ঠান্ডা পানিতে ইচ্ছা করে গোসল করলাম বেশী সময় নিয়ে। প্যারেড দেখে এত ঠান্ডায় অনেকেই আজকে গোসল করতে আসেনি। বের হতে হতে ব্রেকফাস্টের বেল দিয়ে দিলো। লকারে গিয়ে খাকি ড্রেস বের করতে গিয়ে দেখি কোনটার বোতাম ছেঁড়া তো কোনটার হাতা ছেঁড়া বা কোনটার রঙ জ্বলে গিয়েছে। ব্যথা, রাগে দুঃখে ক্ষোভে চিৎকার দিয়ে লকারে ধাক্কা দিলাম। বিপদজনক ভাবে দুলে উঠে লকারটি আবার দাঁড়িয়ে পড়লো। ছিটকে বাইরে চলে এলো জিনিসপত্র। হঠাত খেয়াল করলাম একটি খাকি সেট খুব সুন্দর করে পরিপাটি করে রাখা। একদম নতুনের মত। তুলে নিয়ে দেখি এটা সেই ক্লাস সেভেনের খাকি সেট যেটা বাসা থেকে নিয়ে এসেছিলাম। ব্যবহার না করে রেখে দিয়েছিলাম স্মৃতি স্মারক হিসেবে। ভুলেই গিয়েছিলাম এটা যে তুলে রেখেছিলাম। প্রায় ৬ বছর আগের কথা। প্রকৃতির রসবোধ চরম। পরার মত খাকি খুঁজে পাচ্ছি না আর এর মাঝে ক্লাস সেভেনের তুলে রাখা খাকির আগমন…আবার রাগ উঠলো…এইবার চিৎকার দিয়ে লকারটাই ফেলে দিলাম……

এতো তাড়াতাড়ি তো এলার্ম বাজার কথা না। আজকে একদম উঠতে ইচ্ছা করছে না। বন্ধ চোখ এক চিলতে খুলে জানার দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাইরে আলো ফুটেনি। ফুটার প্রশ্নই আসে না। মুঠোফোনের ঘড়িতে বাজে ৬টা ৫০ মিনিট। এখানে সূর্য উঠে সকাল ৭টা ৩০মিনিটে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে চোখ ডলতে ডলতে রান্নাঘরে গেলাম। ফ্রিজ থেকে দুটো ডিম, টার্কি হ্যামের একটি স্লাইস, অরেঞ্জ জুসের প্যাক, পিনাট বাটার, রুটি টেবিলে রেখে হাত মুখ ধুতে বাথরুমে গেলাম। “একি উদ্ভট স্বপ্ন ছিলো? এডজুট্যান্ট মেরে তক্তা বানিয়ে দিয়েছে।” আয়নার দিকে তাকিয়ে একটা বোকা হাসি দিয়ে মুখ মুছে ফেরত আসলাম। নাস্তা বানিয়ে খেতে খেতে বার বার ঘুরে ফিরে মাথায় আসছিলো স্বপ্নের ব্যাপারটা। আসলেই যদি সত্যি হতো ব্যাপারটা তাহলে কত ভয়াবহই না হতো। কফির টাম্বলারে চুমুক দিতে দিতে বের হয়ে এলাম বাসা থেকে।

স্মিত হেসে গুড মর্নিং বললো সকালে দৌঁড়াতে বের হওয়া সোনালী চুলের একটি মেয়ে। উত্তর দেবার আগেই পার হয়ে চলে গেলো। আজকে হুটন শহরের তাপমাত্রা ৫৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট, আকাশ আংশিক মেঘাচ্ছন্ন। কানে হেডফোন বসিয়ে রওনা দিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে।

৫৬২ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “স্বপ্ন সন্ত্রাস – ১”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    দুর্দান্ত।সিম্পলি দুর্দান্ত!
    আমি বরং আনন্দের সাথে অমন পাংগা খাওয়া প্রেফার করবো আমার ইদানিংকালের নিষ্করুণ রুটিন দিনের পর দিন বয়ে চলার চেয়ে।
    হা, সে হবার নয়। 🙁

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : মাহমুদ (১৯৯৮-২০০৪)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।