উপরওয়ালা এ যাত্রায় ছেড়ে দিল মনে হয়…

ফুলার রোডে এক বন্ধুর বাসায় যাচ্ছিলাম গত পরশুদিন দুপুরে। বনানী থেকে সিএনজি অটো নিলাম। মিটারে যে ভাড়া উঠবে তার থেকে দশ টাকা বেশি দিতে হবে তাকে। অবাক হলাম। সিএনজি অটোর জগতে এরকম হাজী মহসিন টাইপের ড্রাইভার আজকাল পাওয়া যায় না। শবে বরাতের দিন। রাস্তাঘাট খালি। পরীবাগ পার হয়ে বারডেমকে বামে রেখে আমি সোজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে চলে যাব। বারডেমের ওভারব্রিজ পার হয়ে একটু সামনে আমার সিএনজি। হঠাৎ বামের লিঙ্ক রোডে চোখ পড়তেই দেখি নীল রঙের শতাব্দী পরিবহন দ্রুত গতিতে চৌরাস্তার দিকে এগিয়ে আসছে। সন্দেহ হলো খারাপ কিছু একটা হলেও হতে যাচ্ছে। আমি প্রথমবার সতর্ক করলাম শুনলো না। দ্বিতীয়বার – শুনলো না, তৃতীয়বারও শুনলো না। চতুর্থবার আর সতর্ক করলাম না কারন বামে তাকিয়ে দেখি বাসের বাম্পার এবং নম্বর প্লেট হাতখানেক দূরে দেখা যাচ্ছে।

সময়টা মনে হলো ঠিক ওই কিছুক্ষণের জন্য থমকে গিয়েছিল। প্রথমে ভাবলাম, শালার আজকেই মরতে হবে??!! তারপর আবার মনে হলো অনেকের সাথে তো দেখা হলো না!! আবার মনে হলো ওরে খোদা আজকেই কেন………ধাম…!!! প্রচন্ড জোরে ধাতব বস্তুর সংঘর্ষ। সিএনজি ব্যালান্স হারিয়ে ফেলল মুহূর্তের মধ্যেই। প্রথমে একটা ফ্রন্টরোল, নাহ এখনো আছি। তারপর আরেকটা এবং সবশেষে আরেকটা। বাম পা টা ভুলক্রমে চলে গেল সিএনজি অটোর তলায়। সৌভাগ্যক্রমে আমার বাম পা আর সিএনজি এর মহা সংঘর্ষে বাধা হয়ে দাড়ালো সিএনজির সীটটি। লোকজন ছুটে আসলো। উদ্ধার করলো আমাকে। প্রথমেই প্রশ্ন – “ভাইজান বেঁচে আছেন কিভাবে??!! চোখে তাদের অপার বিস্ময়। কারন সিএনজির চেহারা এবং দুর্ঘটনার ধরন দেখে ভেতরে কেউ বেঁচে থাকার কথা না-তাদের মতে। উৎসুক দৃষ্টিতে অনেকে আমার হাত্, মাথা, পিঠ ধরে দেখছে আসলেই বেঁচে আছি কিনা। হঠৎ মনে পড়ল – আমার ছাতা…??!!! আবার গিয়ে ছাতাটা উদ্ধার করলাম। নাহ ঠিক আছে। ভেঙ্গে যায়নি। বাম পা টা বেশ ব্যাথা করছিল। একটা রিকশা নিয়ে চলে গেলাম ফুলার রোড। যেখানে যাবার কথা আমার। লোকজন হা করে তাকিয়ে থাকল।

মনে মনে গর্ব আমার খুব শক্ত আমি। ঘুড়ে বেড়ালাম, আড্ডা দিলাম। রাতে বাসায় ফিরে খুব আমোদের সাথে মা কে বললাম। তারপর গোসল করতে গিয়ে হঠৎ পানি খুব ঠান্ডা লাগলো। কাপুনি দিয়ে উঠলো। হেচঁকি দেয়ার মত করে কান্না শুরু হয়ে গেল। তারপর হাউমাউ করে কান্না। বাথরুম থেকে বের হয়ে গেলাম। জননী চিন্তিত। এতক্ষণ ভালো ছিল হঠাৎ কি হলো আবার। ব্যাপারটা আর কিছুই না। বাবার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। আরেকটু হলেই গত ১৯ বছর যাকে খুঁজেছি তার কাছে চলে যাওয়ার একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে গিয়েছিল। যাই হোক বেঁচে আছি। হয়তো বেঁচে থাকব। উপরওয়ালা এ যাত্রা ছেড়ে দিল। কারনটা ঠিক ঠাওর করতে পারলাম না। সকল প্রশংসা তার জন্য যিনি মনে করেছেন আরো কিছুদিন বাঁচুক গাধাঁটা। :boss:

১,৯২৩ বার দেখা হয়েছে

৩৯ টি মন্তব্য : “উপরওয়ালা এ যাত্রায় ছেড়ে দিল মনে হয়…”

  1. শাহেদ_৯৭-০৩
    সকল প্রশংসা তার জন্য যিনি মনে করেছেন আরো কিছুদিন বাঁচুক গাধাঁটা

    পছন্দ হইছে...একজন ডাক্তারের কাছে একটু দেখায় নিও পা-টা...এইসব জিনিস আগেভাগে খেয়াল না নিলে বহুদিন জ্বালায়...যদিও আশা করতেছি কিছুই হয় নাই...

    জবাব দিন
  2. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    নূপুর ভাই ড্রাইভার সাহেব খাঁচার মধ্যে থেকে ভালই আঘাত পেয়েছেন। মাথায় এবং হাতে পায়ে বেশ কয়েক জায়গায় দেখলাম রক্ত ঝরছে।

    শাহেদ ভাই গতকাল ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। অর্থপেডিক্স। এক্স-রে করিয়েছি। কিছু হয়নি। তবে ৭ দিনের বাধ্যতামূলক Ex PPG দিয়েছেন। 😀


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন
  3. তাইফুর (৯২-৯৮)

    দোয়া করি ... বেঁচে থাক ... লিখতে থাক ...
    শুধু বেঁচে থাকাটাই নেহায়েত মন্দ না ...

    (ক্রাইসিস মাথায় রেখে লাভ নাই ... একটু রসিকতা করি। ছোটবেলায় প্রাইভেট টিউটরের কাছ থেকে ফিরছিলাম, এক জায়গায় দেখি প্রচুর লোক জড়ো হয়ে আছে, রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলে বলল "ট্রাকের সাথে মটরসাইকেল এ্যাক্সিডেন্ট ... তেমন সিরিয়াস না ... মারা গেছে কিন্তু চেহারা বুঝা যায় ...")


    পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
    মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

    জবাব দিন
    • মোকাব্বির (৯৮-০৪)

      ফয়েজ ভাই বললাম না কোন একটা কারনে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে খুব ফাইজলামি করছিলাম। রাতে বাসায় গিয়ে মানসিক কষ্ট পেয়েছি। সত্যি কথা বলতে সেই বাসের বাম্পার এর দৃশ্যটুকু এখনো বিরক্ত করছে। 🙁


      \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
      অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

      জবাব দিন
    • আব্দুল্লাহ্‌ আল ইমরান (৯৩-৯৯)
      সকল প্রশংসা তার জন্য যিনি মনে করেছেন আরো কিছুদিন বাঁচুক গাধাঁটা। :boss:

      বেঁচে গেছিস ভাল কথা।ড্রাইভারকে প্যাঁদানি দিলিনা কেন? :duel:
      সেটা দেয়ার মত যথেষ্ট ফিটনেস তোর ছিল বুঝা যাচ্ছে।তিনবার সতর্ক করার পরও কথা শুনেনাই ! এই ত্যাঁদড় রা এরকমই। :bash:
      আফটার অল :just: ভাল আছিস শুকরিয়া। :boss: :hatsoff:
      নফল নামাজ আদায় করে নিস ভাই।

      জবাব দিন
  4. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    জীবন নিয়ে দারুণ রসিকতা করলা মোকাব্বির!

    ভালো থেকো ভাইয়া। অনেক ভালো থেকো। আমাদের সবার অফুরান ভালোবাসায় ভালো থেকো। :hatsoff:


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  5. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    বেঁচে থাকো।
    সাবধানে থাকো যতোটা পারা যায়।
    ভয় পাইয়ো না, মরতে তো হবেই, দুইদিন আগে আর পরে। 😛


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।