ভাল ধারাভাষ্যকার হবার কিছু দিকনির্দেশনা!

কয়েক বছর আগেও ধারাভাষ্যকারদের গুরুত্বের ব্যাপারে অনেককেই হয়ত অনেক কিছু বুঝিয়ে বলতে হত। তবে, বর্তমানে ধারাভাষ্যকারদের তারকা খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তা এটাই প্রমাণ করে যে এখনকার দর্শকেরা এঁদের অবদানের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। সত্যি কথা বলতে কি- যে কোন খেলাকে আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য করতে খেলোয়াড়, খেলার মান, মাঠের দর্শক, সম্প্রচারের পাশাপাশি দক্ষ ধারাভাষ্যকারের গুরুত্ব কোন অংশেই কম নয়, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশিই! বাংলাদেশে এখনো তেমন সাড়া ফেলতে না পারলেও পৃথিবীর অনেক দেশেই ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার বেশ লোভনীয় পেশা!

richie-benaud-cricket-commentator-6429201

১। গত মাসে ‘মিস্টার ক্রিকেটার’ খ্যাত রিচি বেনো মারা যাবার পর তার একটি ইমেইল বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সামাজিক মিডিয়াতে আলোড়ন তুলেছিল। ২০১২ সালে ক্রিস্টিন স্যামস নামের একজন নারী সাংবাদিক রিচির কাছে চ্যানেল ৯ এর হয়ে কাজ করার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, স্মরণীয় মুহূর্ত, ধারাভাষ্যের ব্যাপারে তাঁর চিন্তা-ভাবনা, দর্শন সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। ইমেইলে রিচি বেনো ভদ্রমহিলার উত্তর দেবার সময়ে ৮টি ‘গোল্ডেন রুল’ জানিয়েছিলেন। আসুন দেখা যাক একজন সফল ধারাভাষ্যকার হবার জন্য সেই ৮টি ‘আন অফিসিয়াল’ রুলস কি কি-

1. Never ask for a statement.
2. Remember the value of a pause.
3. There are no teams in the world called ‘we’ or ‘they’.
4. Avoid cliches and banalities, such as ‘he’s hit that to the boundary’, ‘he won’t want to get out now’, ‘of course’, ‘as you can see on the screen’.
5. The Titanic was a tragedy, the Ethiopian drought a disaster, and neither bears any relation to a dropped catch.
6. Put your brain into gear before opening your mouth.
7. Concentrate fiercely at all times.
8. Above all, don’t take yourself too seriously, and have fun.

পয়েন্টগুলো বেশ সহজবোধ্য এবং বঙ্গানুবাদ/ভাবানুবাদ করলে মূল বক্তব্য থেকে কিছুটা হলেও সরে যাবার সুযোগ রয়েছে বলে হুবহু তুলে দিলাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, শুরুর দিকে রিচি বেনোর মধ্যে উপরের বেশ কয়েকটি বিষয়ের/গুণের ঘাটতি ছিল। নিজস্ব চেষ্টায় তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে শাণিত করেছিলেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমি আরেকটি বিষয় যোগ করতে চাই তা হল- ভাষার উপর দক্ষতা। এটা ছাড়া কেউ কখনোই ভাল ধারাভাষ্যকার হতে পারবে না।

২। রিচি বেনোর গোল্ডেন রুল তো জানলাম, এবার আরও কিছু টিপস জেনে নিই-

ক। চোখের সামনে যা দেখবেন- তাই বর্ণনা করবেন। অর্থাৎ কোন ব্যাটসম্যান যদি ফ্রন্ট ফুটে এসে বোলার্‌স ব্যাক ড্রাইভ করে তাহলে ধারাবর্ণনায় সেটাই বলুন, অন্য কিছু বলতে যাবেন না। রেডিও ধারাভাষ্যকারদের অনেক বেশি ডিটেইল আলোচনা করতে হয়, টিভির ক্ষেত্রে অতটা না হলেও চলে।

খ। কখনো একই কথার পুনরাবৃত্তি করবেন না। এতে করে ধারাভাষ্যের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে যায়। শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করুন, তাহলে শব্দ বা শব্দ-গুচ্ছের পুনরাবৃত্তি অনেকাংশেই কমে যাবে। বিশেষণ ও উপমার ব্যবহারে সতর্ক থাকবেন।

গ। কখনো বলার মতন কিছু না পেলে সঙ্গীর সাহায্য নিন। এ কারণেই যে কোন খেলায় সাধারণত দুই বা দুই এর অধিক ধারাভাষ্যকার উপস্থিত থাকেন।

ঘ। আপনাকে অবশ্যই স্মার্ট হতে হবে। ক্যামেরা কোন ফুল, পাখি বা দর্শকের সারিতে থাকা অন্য কোন তারকা বা রাজনীতিবিদের উপর পড়লে প্রসঙ্গ বদলে ফেলে তাদের সম্পর্কে বলতে দ্বিধা করবেন না। এতে করে দর্শকের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাবে।

ঙ। ক্লোজ কল (‘নো বল’ ছিল কি না, ‘এল বি ডব্লিউ’ ছিল কি না, রান আউট ছিল কি না… ইত্যাদি) এর ক্ষেত্রে চট করে সিদ্ধান্ত জানাবেন না। অবশ্যই ‘সম্ভবত’ বা ‘আমার মনে হয়’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করবেন। তা না হলে আপনাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে।

চ। বিভিন্ন খেলার ভিডিও শব্দ ছাড়া দেখুন এবং নিজে নিজে ধারাভাষ্য দেবার মাধ্যমে অনুশীলন করুন। সেসব রেকর্ড করে পরে নিজেই নিজের সমালোচনা করুন। অনুশীলন এবং চর্চার কোন বিকল্প নেই!

ছ। ভুল তথ্য বা নিয়ম-কানুন সম্পর্কে ভুল বলবেন না। আর ভুল করে ফেললেও তা স্বীকার করুন, মনে রাখবেন আপনি একজন রক্ত-মাংসের মানুষ- ফলে ভুল হতেই পারে!

জ। প্রচুর পড়াশোনা করুন। টিভি বা রেডিও তে বিখ্যাতদের ধারা বিবরণী শুনুন। প্রতিবারই নতুন কিছু না কিছু শিখতে পারবেন।

৩। পরিশেষে বলতে চাই ধারাভাষ্য একটি শিল্প। বাংলাদেশের যারা ধারাভাষ্যের সাথে যুক্ত আছেন, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। তবে, তাদের মান নিয়ে আমার অনেক ক্ষোভ এবং হতাশা আছে!

যাই হোক, আমাদের দেশে এই শিল্পের এখনো তেমন কদর বা বাজার গড়ে ওঠে নি, তবে আমি নিশ্চিত খুব শীঘ্রই এটি তৈরি হবে। প্রয়োজন শুধু সঠিক নির্দেশনা এবং ট্রেনিং দেবার মতন দক্ষ কিছু মানুষ এবং প্রতিষ্ঠান তৈরি হওয়া।
___________________________________
___________________________________

পুনশ্চঃ
১। লেখাটির বেশিরভাগই ইন্টারনেট এর বিভিন্ন আর্টিকেল ঘেঁটে তৈরি করা।
২। রিচি বেনো আমার খুব পছন্দের একজন ধারাভাষ্যকার (এবং মানুষ) হলেও আমার সবচেয়ে পছন্দ টনি গ্রেগ! জীবিতদের মধ্যে পছন্দ ডেভিড গাওয়ার, নাসের হুসেইন, মাইকেল হোল্ডিং, টনি কোজিয়ার, ড্যানি মরিসন, পমি মোবাঙ্গা প্রমুখ। এছাড়া ভাল লাগে অ্যালান উইলকিন্স (উপস্থাপক, ধারাভাষ্যকার), বিজয় অমৃতরাজ (লন টেনিস, উপস্থাপক, ধারাভাষ্যকার), জন ডাইক্‌স (ফুটবল, উপস্থাপক, ধারাভাষ্যকার), মার্টিন টাইলর (ফুটবল, উপস্থাপক, ধারাভাষ্যকার)… ওহ! এই লিস্ট তো শেষই হয় না…

১৭ টি মন্তব্য : “ভাল ধারাভাষ্যকার হবার কিছু দিকনির্দেশনা!”

    • জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

      ভাই, কষ্ট করে পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। 😀

      গাভাস্কার বিশ্লেষণধর্মী ধারাভাষ্য শুনতে একসময় ভাল লাগত। কিন্তু বাকি ভারতীয়দের মতন সেও প্রচণ্ড 'ইজম' সমস্যায় আক্রান্ত। এজন্য এখন আর পছন্দ হয় না। আর রোহানের কন্ঠস্বর জড়তাপূর্ণ মনে হয়, অনেকটা পাকিস্তানীদের মতন- এজন্য ভাল লাগে না।

      কার/কাদের ধারাভাষ্য আপনার পছন্দ?


      ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

      জবাব দিন
  1. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    ভিন্নধর্মী ও খুব সুন্দর একটা লেখা ।
    চ পয়েন্টটাতে সবচেয়ে কার্যকর পরামর্শ বলা হলো । আর সব পয়েন্টগুলোও সমধিক গুরত্বপূর্ণ পালনীয় ।
    এমন আরো চমকপ্রদ লেখা পড়বার প্রত্যাশায় থাকলাম ।

    জবাব দিন
  2. কাজী সাদিক (৮৪-৯০)

    পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, আর মন্তব্যে এসে দেখলাম বড় ভাইরা ইতিমধ্যে বলে ফেলেছেন--- অন্যরকম বিষয়ে লেখা। আর, অল্প কথায় অনেক জরুরী তথ্য গুছিয়ে লিখেছ। খেলা নিয়ে আমার তেমন কোন আগ্রহ নাই, কিন্তু ঠিকই শেষ অবধি পড়ে ফেললাম!

    বিভিন্ন পেশা নিয়ে এরকম ছোট ছোট লেখা পেলে মন্দ হয় না।

    জবাব দিন
    • জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)
      বিভিন্ন পেশা নিয়ে এরকম ছোট ছোট লেখা পেলে মন্দ হয় না।

      খুব ভাল কথা বলেছেন সাদিক ভাই। প্রত্যেকে একটি করে লিখলেও কিন্তু অনেকগুলো পেশা কাভার করা হয়ে যাবে...
      আশা করি, অন্যরাও এগিয়ে আসবেন। 😀


      ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

      জবাব দিন
  3. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    ভাল্লাগলো জুনা।
    একসঙ্গে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখার সময়টা মিস করি।
    ধারাভাষ্য একটা বেশ কঠিন শিল্প বলে মনে হয় আমার --- অনেক কম্পিটিটিভও ক্ষেত্রটা।
    তা জিহাদের প্রশ্নের প্রতিধ্বনি করছি -- শুরু করছ নাকি?

    জবাব দিন
    • জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

      নূপুরদা,
      বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়টা আসলেই অনেক মিস করি... 🙁
      কি দারুন সময়টাই না ছিল! :dreamy:

      বাংলাদেশের এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকাটা কোনভাবেই মানতে পারি না। এতদিনে বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক মানের ধারাভাষ্যকার তৈরি হওয়া উচিত ছিল। তবে, আমি আশাবাদী!

      ও হ্যাঁ, আমি শুরু করি নি... তবে সুযোগ পেলে... 😀


      ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

      জবাব দিন
  4. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    "মনে রাখবেন আপনি একজন রক্ত-মাংসের মানুষ- ফলে ভুল হতেই পারে"
    আমি যেটা যোগ করতে চাই তা হলো, খেলার সাথে বা পিছনে জড়িতদের নিয়ে এমন কিছু বলা থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকা যা শ্রোতার মনে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বিরূপ ধারনা দেবে।
    এখানে আম্পায়ারদের নির্দেশ করে মাঝে মাঝেই এমন কটুক্তি বা বক্রক্তি করা হয় যেটা দুঃখজনক।

    ও, আরেকটা কথা।
    ধারাভাষ্যকার কিন্তু কোন শিক্ষক নন। শ্রোতা কে শেখানোর কোন দায় তার নাই। কথার মধ্যে এই শেখানোর বা পান্ডিত্য জহির করার ব্যাপারটা যত কম পারা যায় থাকা উচিৎ...


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।