সারাটা দিন, মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি…..

সেদিন ছিল কোন একট ছুটির দিন। হলে বসে বন্ধুদের সাথে কার্ড খেলা আর চা সিগারেটের জম্পেশ আড্ডা চলছিল। আমার খুবই বিরক্ত লাগছিলো। কারণ আর কিছুই না; মোবাইলে একটু পর পর এসএমএস এর আগমন। এই মোবাইল কোম্পানি গুলোর যে কী হয়েছে…? খালি এসএমএস পাঠায়। সবাই ভাবছিল মনে হয় কোন মেয়ে আমাকে এসএমএস পাঠাচ্ছে। আবির বলল, “ কীরে দোস্ত, গার্ল ফ্রেন্ড নাকি?” আমি বললাম,  “ হ্যাঁ, দুইজন; আমার দুইজন গার্ল ফ্রেন্ড, এয়ারটেল আর জিপি।”  হঠাৎ করে আমাকে জিজ্ঞেস করলো-“সত্যি করে বলতো তুই কাউকে পছন্দ করিস?”

আমি চমকে উঠলাম কেমন জানি। না ওর প্রশ্ন শুনে নয়,ওর প্রশ্নের ভঙ্গিটা দেখে। চার-পাঁচ বছর আগে ঠিক এই ভঙ্গিতেই আমাকে এই কথাটি জিজ্ঞেস করেছিলেন শিশির ভাই। কেমন জানি ফ্ল্যাশব্যাকে চলে গেলাম।

শিশির ভাই আমার চাচাতো ভাই। খুবই হাসি-খুশি একজন মানুষ। বয়সে তিন চার বছরের বড় হলেও আমার সাথে তার আচরণ ছিল বন্ধুর মতন। প্রায় সারাদিন আমরা একসাথে কাটাতাম। তিনি তার মনের সবকথা আমাকে বলতেন ।আমিও তাই করতাম।

একদিন বাসায় আমার ঘরে পড়ছিলাম। হঠাত শিশির ভাই এসে বসলেন পাশে। প্রত্যেক দিনের মত হাসি-তামাশা করতে লাগলেন। তারপর আচমকা এই প্রশ্নের অবতারণা। আমি প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম,”কেন ভাই? আমি আবার কাকে পছন্দ করবো?”

উনি বললেন,”না এমনি; ওই যে তোর সাথে অনেকগুলো মেয়ে পড়ে না? তাদের কাউকে তোর ভালো লাগে না?”

ক্লাস এইট-নাইনের ছাত্র হলেও আমি তখন প্রেম-ভালোবাসা সর্ম্পকে সবই বুঝতাম। ছোটবেলা থেকে এস,এস,সি পর্যন্ত আমি যেখানে লেখাপড়া করেছি, সেখানে আমরা তিনজন ছেলে আর চারটা মেয়ে ছিলো। সবসময় একই সাথে ঘুরাফেরা,পড়ালেখা,প্রাইভেট পড়তে যাওয়া ইত্যাদি কাজ করেছি। ওরা আমার এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো যে কে ছেলে আর কে মেয়ে তা আমি আলাদা করে দেখিনি কোনদিন। সবাই ছিলো শুধু বন্ধু। তাই সুমি,নীরা,মুন আর মলি এই চারজনের কাউকে আমি কখনো বন্ধু ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে ভাবতে পারিনি।

সত্যি বলতে কী, এই চারজনই ছিল যথেষ্ট সুন্দরী। আর ওদের বন্ধু হওয়ার সুবাদে আমি এটাও জানতাম যে এই বয়সেই ওরা একেকজন কমপক্ষে সাত-আটটা প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছে।

শিশির ভাইকে আমি বললাম, “ভাই আসল ঘটনা কী সেইটা আগে বলেন। আপনি তো জানেন যে আমি কাউকে ওইভাবে পছন্দ করি না। আর ওরা আমার বন্ধু সবাই। এর বেশি বা কম কিছুই না।

“আমি আসলে নীরাকে খুব পছন্দ করি এবং সেও ভালোবাসে আমাকে।”- এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললেন তিনি।

আমি এই কথা শুনে একটু স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। কারণ এত কিছু ঘটে গেছে আর নীরা কিংবা শিশির ভাই কেউ আমাকে কিছুই বলে নি। বেশ রেগে গিয়ে বললাম, “হ্যা, এত কিছু ঘটে গেছে আর আমাকে এখন বলছেন এই কাহিনী? ”

ভাই বললেন,  “দ্যাখ ভাই,আসলে যদি বাবা-মা বা অন্য কেউ টের পেয়ে যায় তবে খবর আছে, তাই এই ঘটনা কাউকে বলি নাই। তোকেই প্রথম বললাম। তুই রাগ করিস না ভাই।”

আমি বললাম, “ঠিক আছে, যেহেতু আমাকেই প্রথম বললেন তাই মাফ করে দিলাম।”

কিন্তু ভাগ্য আমাদের পক্ষে ছিল না। অনেক গোপনীয়তা সত্ত্বেও আমার চাচা-চাচী এবং নীরার বাবা-মা সহ এলাকার প্রায় সবাই এই প্রেমকাহিনী জেনে গেল।

এরপর যা সাধারণত ঘটে তাই হল। দুই পরিবার থেকে বিভিন্ন রকম ভাবে শিশির ভাই ও নীরার উপর চাপ আসতে লাগলো। তাদের সবরকম দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেল। আমিই তখন ওদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিলাম। একজনের চিঠি-পত্র আরেকজনের কাছে পৌছে দেওয়াই ছিল আমার কাজ। তখনো মোবাইল ফোন এখনকার মতো সহজলভ্য হয়নি।

এইভাবে প্রায় মাস চারেক চললো। এই পুরোটা সময় ওদের দেখা সাক্ষাৎ পুরোপুরি বন্ধ ছিলো। এমন সময় হঠাত শিশির ভাইকে উনার বাবা একটি মোবাইল ফোন কিনে দিলেন। আর নীরাও ওদের বাসায় মোবাইলটা লুকিয়ে লুকিয়ে ব্যবহার করা শুরু করলো।

আমার উপর চাপ অনেক কমলো বটে। কিন্তু ওদের প্রেমের ঘনত্ব আরো বাড়তে লাগলো দিন দিন। রাতের বেলায় দেখতাম শিশির ভাই ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলছেন।

মাঝে মাঝে আমাকে টাকা দিয়ে এটা ওটা জিনিসপত্র কিনে নীরাকে দিয়ে আসতে বলতেন। ওদের বাড়িতে ছিল আমার অবাধ যাওয়া-আসা। ছোটবেলার বন্ধু বলে ওর বাবা-মা ওর সাথে মেলামেশায় কখনো আমাকে বাধা দেননি।

নীরা আর শিশির ভাইয়ের প্রেমটা খুব বেশি আবেগপূর্ণ মনে হতো আমার কাছে। প্রায়ই নীরা আমার কাছে কান্না-কাটি করতো। শিশির ভাইকেও দেখতাম কলেজের পড়াশুনা রেখে মনমরা হয়ে বসে আছেন। দু’একদিন আবার বেশ হাসি-খুশী থাকতেন। আমাকে বলতেন, “আজকে ওর সাথে অনেক্ষণ কথা হয়েছে।” মোবাইলটা আমার হাতে দিয়ে বলতেন, “দেখ ও কি সুন্দর একটা মেসেজ পাঠিয়েছে।” আমি হাতে নিয়ে মেসেজটা পড়তাম; দেখতাম- চাঁদ,তারা,আকাশ,নদী নিয়ে বিরাট বিরাট প্রেমের মেসেজ। একটাতে দেখলাম নীরা লিখেছে, “আমি বৃষ্টিবিহীন মেঘলা দিন।” আরেকটাতে দেখলাম একটা সুন্দর লাইন লেখা- “আমার সারাটা দিন ,মেঘলা আকাশ,বৃষ্টি তোমাকে দিলাম। কেবল শ্রাবণ সন্ধ্যাটুকু তোমার থেকে চেয়ে নিলাম।”

আমি তখনো জানতাম না যে,এটা একটা গান। ভেবেছিলাম নীরাই বুঝি নিজ থেকে এসব লিখেছে। ওদের ভালোবাসার প্রতি খুব একটা মায়া পড়ে গেল আমার।

ভালই চলছিল এভাবে। কিন্তু এই সুখ বেশিদিন থাকলো না। এর মাঝে ওরা অনেকবার কথা বলতে গিয়ে ধরা পড়েছে; অনেক ঝমেলায় কেটেছে দিন গুলো। দুই বছরের মতো এইভাবে চললো। এর মাঝে আমাদের এস,এস,সি পরীক্ষা হয়ে গেছে। রেজাল্টে দেখা গেল নীরা বাদে আমরা বন্ধুরা সবাই এ+ পেয়েছি। খুব আনন্দের মাঝেও বেশ খারাপ লাগছিল।

আমি নিজে ভাল রেজাল্ট করলেও বন্ধু খারাপ করেছে এই অনুভূতিটা কেমন জানি খুবই কষ্ট দিতো। যাই হোক নীরার বাবা মা ওর এই খারাপ রেজাল্টের জন্য ওর আর শিশির ভাইয়ের সম্পর্কেই দায়ী করলেন এবং দ্রুত ওর বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। শিশির ভাই তখন সবে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছেন। এই খবর শুনে তিনি পাগলের মতো হয়ে গেলেন। কিন্তু তার বাবা মাকে অনেক কষ্টেও রাজি করাতে পারলেন না।

একদিন তাড়াহুড়ো করেই নীরার বিয়ে হয়ে গেল। আমি বিয়ের দিন গিয়েছিলাম ওদের বাড়িতে। গিয়ে দেখি খুব সাজিয়ে রাখা হয়েছে ওকে। খুব কাঁদছিল নীরা। আমি গিয়ে কাছে বসতেই আমাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। আমি নিজেও চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছু করতে পারিনি। বিয়ে হয়ে গেলো। বর এসে নিয়ে গেল শ্বশুরবাড়ি। আমি বাড়ি ফিরে এলাম। এসে দেখি খুবই খারাপ অবস্থা।

শিশির ভাই নাকি পাগলের মতো আবোল তাবোল বকছেন আর মাঝে মাঝে চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে উঠছেন। তাকে কোন মতেই শান্ত করা যাচ্ছিল না। এমনকি আমিও তাকে চুপ করাতে পারিনি। এইভাবে প্রায় তিন মাস তিনি অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন। ভার্সিটির পড়াশোনা বাদ দিয়ে পাগলের মত ঘুরে বেড়াতেন।

আস্তে আস্তে শোক কমে এলো। কথায় বলে সময়ই সব কিছু ভুলিয়ে দেয়। শিশির ভাইও সুস্থ হয়ে উঠলেন। নতুন করে আবারো পড়াশোনায় মন দিলেন।

মাস ছয়েক পরে শুনি উনি নাকি আবার প্রেম করছেন। আমি প্রথমে বিশ্বাস করি নি। কিন্তু একদিন দেখি উনি আমার কলেজে বেড়াতে এসেছেন,সঙ্গে একটি মেয়ে। বুঝলাম উনার প্রেমিকা। আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় বললেন, “তোর ভাবি।” বেশ ভালই লাগলো আমার। আবার একটু খারাপ ও লাগছিলো এই ভেবে যে,তিনি এত তাড়াতাড়ি নীরাকে ভুলে গেলেন! কোথায় গেলো তার দুই বছরের প্রেম? তবে মুখে কিছু বলিনি; কারণ, পাগল অবস্থায় শিশির ভাইয়ের চেয়ে এই নতুন শিশির ভাইকে আমার অনেক সুখী মনে হচ্ছিল।

মাস তিনেক আগে শিশির ভাই এই মেয়েটিকে বিয়ে করেছেন, পারিবারিক সম্মতিক্রমে। সবাই মেনে নিয়েছে ব্যাপারটাকে বেশ সহজেই। বিয়েতে যেতে পারিনি ব্যস্ততার কারণে। তবে বিয়ের পরে একদিন গিয়েছিলাম ওদের বাড়িতে। দেখলাম ভাই আর ভাবী সুখেই আছে। বেশ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। সারাদিন খুব খুনসুটি করে বেড়ায় দু’জন। নীরার খবরও পেলাম বাড়িতে গিয়ে। কিছুদিন আগে নাকি বাবার বাড়িতে এসেছিলো। শুনলাম একটা মেয়ে হয়েছে ওর। বেশ সুখেই নাকি আছে নীরা।

আমিও আছি আমার মতই। শিশির ভাই আর নীরার অসমাপ্ত প্রেমের অন্যতম সাক্ষী ছিলাম আমি। আমি বলছিনা যে এই কাহিনীটা খুবই একটা মহৎ কিংবা করুণ প্রেমের গল্প। কোন ত্যাগ নেই,আছে শুধু না পাওয়ার বেদনা আর সময়ের স্রোতে বেদনা ভেসে গিয়ে নতুন স্বপ্নের আগমন।

সবার কাছেই হয়তো এটা একটা টিপিক্যাল প্রেমের গল্প মনে হচ্ছে। হয়তো বা এটা আসলেই টিপিক্যাল।

 

তবু কিছু কথা থেকে যায়।একলা বর্ষার কালো রাতে,যখন ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ে,তখন আমি একা জেগে থাকি। মোবাইল কিংবা পিসিতে হয়তো বেজে উঠে “আমার সারাটা দিন,মেঘলা আকাশ ,বৃষ্টি তোমাকে দিলাম…………”

তখন কেমন জানি বুকটা ফাঁকা হয়ে যায়। হু হু করে যেন শীতল বাতাস ঢুকে যায় ফুসফুসে। একটি অসমাপ্ত প্রেমের কাহিনী মনে পড়ে যায়; কেন জানি নিজের অজান্তেই আমার চোখ ভিজে উঠে।

 

১,৯১৭ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “সারাটা দিন, মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি…..”

  1. রায়হান (১৯৯৮-২০০৪)

    ভালো হয়েছে......
    একটা জিনিস বুঝিনা জগতের ছ্যাকা নিয়া সব লেখাই খুব ভালো হয় ক্যান??? 😮


    একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার,সারা বিশ্বের বিস্ময় তুমি আমার অহংকার

    জবাব দিন
  2. অনিন্দ্য (২০০০-২০০৬)
    তবু কিছু কথা থেকে যায় । একলা বর্ষার কালো রাতে,যখন ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ে, তখন আমি একা জেগে থাকি । ............ কেন জানি নিজের অজান্তেই আমার চোখ ভিজে উঠে ।

    অনেক ভালো লিখছ, চালায় যাও...

    জবাব দিন
  3. সামিউল(২০০৪-১০)

    রাজীব ভাই, আমি এইটা লিখসি প্রায় ৯ মাস আগে। তখন কেউ কয় নাই :frontroll: লাগাইতে।

    ভাবসিলাম বাইচা গেছি। ধরা খায়া গেলাম শেষমেশ। লাগাইয়া দিলাম... সাথে ২ টা ফ্রি...।
    :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll:


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।