১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষন, শাসন ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে যে আন্দোলন দানা বেধে উঠছিল তা তদানিন্তন আইয়ুব ক্যাডেট কলেজকেও প্রভাবিত করেছিল। কলেজের অধ্যক্ষ এম বকীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রশীদ, শিক্ষকবৃন্দ,কর্মচারীবৃন্দ এবং সকল ক্যাডেট অহিংস এবং অসহযোগ আন্দোলন সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেন। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ক্রমেই জটিল এবং অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার প্রেক্ষিতে উর্দ্ধতন কতৃপক্ষের নির্দেশে ১৯৭১ সালের ৯ মার্চ আইয়ুব ক্যাডেট কলেজ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং ক্যাডেটদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু ৭জন সাহসী ক্যাডেট বাড়িতে না গিয়ে রাজশাহী অবস্থান করে। সেই ৭ জন হল-
১) কলেজ প্রিফেক্ট ক্যাডেট মোশাররফ হোসেন, দ্বাদশ শ্রেনী, ক্যাডেট নং ৩৭,ব্যাচ নং ২,খালিদ হাউস
২) ক্যাডেট তালেবুল মওলা চৌধুরী, দ্বাদশ শ্রেনী, ক্যাডেট নং ৫৮, ব্যাচ নং ২, কাসিম হাউস
৩) ক্যাডেট মনিশ দেওয়ান, দ্বাদশ শ্রেনী, ক্যাডেট নং ৭৪, ব্যাচ নং ২, খালিদ হাউস
৪) ক্যাডেট খায়রুল আলম বেলাল, একাদশ শ্রেণী, ক্যাডেট নং ৭৮, ব্যাচ নং ৩, খালিদ হাউস
৫) ক্যাডেট আফজাল নূর, একাদশ শ্রেণী, ক্যাডেট নং ৯৩, ব্যাচ নং ৩, তারিক হাউস
৬) ক্যাডেট আমিনুল ইসলাম, একাদশ শ্রেণী, ক্যাডেট নং ১০৯, ব্যাচ নং ৩, খালিদ হাউস এবং
৭) ক্যাডেট মনোয়ার হোসেন, একাদশ শ্রেণী, ক্যাডেট নং ১২৫, ব্যাচ নং ৩, খালিদ হাউস ।
তারা সেখানে বড় বড় ছাত্র নেতা এবং রাজনৈতিক নেতাদের সংস্শর্শে এসে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে অনুপ্রানিত হয়।
২৩ মার্চ আইয়ুব ক্যাডেট কলেজের নাম সর্বসম্মতিক্রমে ‘মুক্তারপুর ক্যাডেট কলেজ’ রাখা হয় এবং পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ঐদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এক বিশাল মিছিল নিয়ে ক্যাডেট কলেজ এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা প্রদক্ষিণ করে। কলেজের অধ্যক্ষ এম বকীয়তুল্লাহ ক্যাডেট কলেজ পরিবারকে সাথে নিয়ে এ মিছিলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। এভাবে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ স্থানীয় জনতার সাথে একাত্ব হয়ে পাকিস্তান বিরোধী একটি আন্দোলন সংগঠিত করে। ২৭ মার্চ অধ্যক্ষের অনুমতি ও সমর্থনে কলেজের প্রথম বাঙ্গালী অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রশীদ শিক্ষক এবং কর্মচারীদের সাথে নিয়ে রাজশাহীর দক্ষিণ অংশে মুক্তিসংগ্রাম চালানোর দায়িত্ব নেন । তাঁকে সহযোগিতা করেন বাংলার শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিকী, মিলিটারী সাইন্সের শিক্ষক শামসুল আলম, ওয়ার্কশপ ইনস্ট্রাক্টর মোয়াজ্জেম হোসেন, হাবিলদার ইউসুফ প্রমুখ । ২৯ মার্চ ১৯৭১।পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী বগুড়া প্রবেশের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেন ক্যাডেট শহীদ আব্দুল মোমেন হিটলু [ ২য় ইনটেক আয়ুব ক্যাডেট কলেজ ( রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ) ক্যাডেট নম্বর ৩৫, দ্বাদশ শ্রেণী, কাসিম হাউস ]।অন্যরা পালিয়ে গেলেও তিনি ইউনাইটেড ব্যাংক অফ পাকিস্তান (জনতা ব্যাংক ) এর ছাদে অবস্থান করে লড়ে যাচ্ছিলেন। তিনি একটি ডিবিবিএল গানসহ ধরা পড়েন। পাক বাহিনী তাঁকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।মাত্র ১৭ বছর বয়সে শহীদ হন তিনি। পরে বগুড়া কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বগুড়া জেলা স্কুল পর্যন্ত রাস্তাটি শহীদ হিটলু রোড নাম করণ করা হয়।মুক্তিসংগ্রামে তিনি প্রথম ক্যাডেট শহীদ। ৩০ মার্চ অধ্যক্ষ মোঃ বকীয়তুল্লাহ পদ্মা নদী পার হয়ে ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি কোলকাতার বাংলাদেশ মিশনে ‘ইয়ুথ ক্যাম্প’ এর পরিচালক হন।
১২ এপ্রিল সন্ধ্যায় বিড়ালদহতে পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত বিশাল পাক বাহিনীর সাথে আপ্রাণ চেস্টা করেও পেরে ওঠেননি। ঐ যুদ্ধে আবু বকর সিদ্দীক বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হন। এজন্য তাকে বীর বিক্রম খেতাব দেয়া হয়। ১৩ এপ্রিল পাক বাহিনী সারদা পুলিশ একাডেমীতে প্রবেশ করে। ঐ দিন ক্যাডেট মন্নাফ সারদা বাজারের কাছে পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে তার ভাইসহ শহীদ হন। পুলিশ একাডেমীর দখল নেয়ার পর শুরু হয় গণহত্যা। পদ্মা নদীর তীরে প্রতিদিন অসংখ্য বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয়। এ সময় জীবন বাচাতে অনেক লোক পদ্মা নদী পার হয়ে ভারতের পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় চলে যান। ক্যাপ্টেন রশীদ তখন কাজীপাড়া ক্যাম্পের কমান্ডার ছিলেন। তিনি শেখপাড়া এবং কাজীপাড়া ক্যাম্পে গেরিলা প্রশিক্ষণ দিতেন। ক্যাপ্টেন রশীদ পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে মেজর হন এবং ৭ নং সেক্টরাধীন ৪ নং সাব সেক্টর এর কমান্ডার এর দায়িত্ব পান। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় তিনি ‘বীর প্রতীক’ খেতাব পান। মিলিটারী সাইন্সের শিক্ষক শামসুল আলম বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কমিশনে যোগ দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় তিনি ‘বীর প্রতীক’খেতাব পেয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ১৮ জন শহীদ হয়েছেন । তারা হলেন-
১। এ বি সিদ্দিকী বীর বিক্রম, শিক্ষক,
২। আব্দুর রাজ্জাক, কেয়াটেকার,
৩। মোঃ খায়রুল আলম, অফিস সহকারী,
৪। মোঃ আজিজুল হক, পিওন,
৫। মোঃ সালাহ উদ্দিন, মেস ওয়েটার,
৬। মোঃ নূরুল হক, হাউস বেয়ারার,
৭। মোঃ ফয়জুদ্দিন শেখ, হাউস বেয়ারার,
৮। শ্রী জংগুরাম জমাদার, হেড সুইপার,
৯। শ্রী জগদীশ জমাদার, সুইপার,
১০। শ্রী বধুরাম জমাদার, সুইপার,
১১। ক্যাডেট আব্দুল মন্নাফ, ক্যাডেট নং ২৫৯,
১২। ক্যাডেট এস এ মোমিন, ক্যাডেট নং ৩৫,
১৩। ক্যাডেট মাজিদ রেনা, ক্যাডেট নং ১৬০,
১৪। ক্যাডেট মোঃ জাকারিয়া, ক্যাডেট নং ২২৩ ,
১৫। ক্যাডেট মোঃ আবতাব আলম, ক্যাডেট নং ২৩৫,
১৬। ক্যাডেট মোহাম্মদ ইনাম, ক্যাডেট নং ২৪৮,
১৭। ক্যাডেট আবদুল্লাহ্ আল-আমিন, ক্যাডেট নং ২৫৭ এবং
১৮। ক্যাডেট হান্নান আশরাফ, ক্যাডেট নং ৩৫৩।
[ বিশেষ দ্রষ্টব্য: ২০১৩ সালে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ স্যার (শাহী ভাই) আমাকে ইংরেজীতে ২২ পাতা তথ্য দিয়েছিলেন। সেটা বাংলা করে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ নামে একটি ব্লগ লিখেছিলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধের অংশটুকু আলাদা ব্লগ হবার দাবি রাখে। এজন্য আলাদা ব্লগ পোস্ট।