ছবি ব্লগ ৩ – গত এক বছরের মার্কিনি ফিরিস্তিঃ আন্তর্জাতিক বান্ধবীরা।

আমেরিকার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তজার্তিক ছাত্র নেই তা আমার জানা নেই। উপযুক্ত বেতনের বিনিময়ে আন্তর্জাতিক ছাত্রদের শিক্ষা প্রদানের জন্য মার্কিনিরা বিখ্যাত। তবে বৃত্তিধারী ছাত্রের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। সেটা স্নাতোকোত্তর পর্যায়ে বেশী। অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী ও শীতল এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় বলে মিশিগান টেকনোলোজিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক ছাত্র অপেক্ষাকৃত কম। তারপরেও সংখ্যাটা একেবারে কম নয়। তবে আমার কাছে মার্কিনিরাও আন্তর্জাতিক। তাই আন্তর্জাতিক ছাত্রদের মাঝে যারা আমার পরিচিত তাদের নিয়েই আমার আজকের ফটোব্লগ।

এঞ্জেলা ইউ - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

এঞ্জেলা ইউ – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

ছবিটা চুরি করতে হলো ওর প্রোফাইল থেকে। আমার আগের কোহর্ট/ব্যাচের একই সাবজেক্টের মাস্টার্সের ছাত্র এঞ্জেলা ইউ (Angela Yu)। গত সেমিস্টারে থিসিস ডিফেন্স করে রিসার্চের কাজ শুরু করলো। এদিকে টিচিং এসিস্ট্যান্ট হবার সুবাদে আমার কলিগ। চাইনিজ বংশোদ্ভূত এঞ্জেলা জন্মসূত্রে মার্কিনি। তাই চেহারার সাথে ইস্ট-কোস্টের চোস্ত বাচনভঙ্গি দেখে অনেকেই মাথা চুলকায়। খাতা দেখা ও পড়াশোনার কাজে অফিসে প্রচুর সময় একই সাথে কাটানোর সুবাদে এই মেয়েটির সাথে বন্ধুত্বটি চমৎকার ভাবে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে কার ক্লাসের ছাত্রদের লেখা বেশী উদ্ভট এই নিয়ে আমাদের সবসময়ের প্রতিযোগিতা ছিল। একটি অলস কুকুর এবং দুইটি দ্বিগুন অলস বিড়ালের গর্বিত মালিক সে। গল্পের মাঝে তার অলস পরিবারবর্গের কথা উঠে আসবেই কোন এক সময়। দৌড়ঝাঁপ করে বেড়ানো স্বাস্থসচেতন এই মেয়ের কাছে নতুন খাবারের রেসিপি, সস্তায় জামা জুতা কেনার ওয়েবসাইটের লিঙ্ক থেকে শুরু অত্যন্ত সহজ ইংরেজী শব্দের বানান জিজ্ঞাসা করা কোন কিছুই বাদ যেতো না। তীক্ষ্ণ রসবোধ সম্পন্ন এই মেয়ের কথার মারপ্যাঁচে রসিকতা অনেক সময় ধরতে পারি না। মার্কিনি কথ্য ইংরেজীর অনেক শব্দ ও বাক্যাংশ বলে বলে আমাকে শিখিয়েছে এই মেয়ে।

আসমা বৈদ্য - নেপাল

আসমা বৈদ্য – নেপাল

নেপালের মেয়ে আসমা বৈদ্য (Ashma Vaidya), আমার সাথে একই বিষয়ে পড়ছে। কিন্তু সে পিএইচ,ডিতে। বরফে ঢাকা পর্বতের দেশ নেপালের মেয়ে বরফের মত শীতল। হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ফ্রেমবন্দী করা সৌভাগ্যের ব্যাপার। স্বভাবজাত নেপালী অর্থাৎ কর্মঠ, একনিষ্ঠ, এবং সৎ।

হাইপিং লিউ - চায়না

হাইপিং লিউ – চায়না

চায়নার মেয়ে হাইপিং লিউ (Haiping Liu), কিসে পড়ছে ঠিক মনে নেই। তবে জটিল কোন বিষয় এ আমি নিশ্চিত। পথে চলাফেরার সময় দুনিয়ার খবর থাকে না। একদিন ক্লাস থেকে ফেরত আসার সময় অনেক দূর থেকে হাত নাড়ছি তাকে দেখে। হাত নাড়তে নাড়তে একজন আরেকজকে ছাড়িয়ে দু-দিকে চলে গেলাম। উলটো ঘুরে দেখি সে তার হাঁটার এক মূহুর্তের জন্য কমায়নি। পরে জানতে পেরেছি, বেমালুম ভুলে যায়নি বরং চলাফেরার মাঝে বিভিন্ন ধরনের চিন্তা করে সে করে থাকে। এখানে আসার আগে চাইনিজরা মিতব্যয়ী বা খরচের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারী নয় এরকম একটা ধারণা ছিল। পোর্শে ৯১১ টার্বো, বিএমডব্লু এম-৫, হামার এইচ-৩, লিঙ্কন নেভিগেটরের মত কান দিয়ে ধোঁয়া বের করা গাড়ির চালকের আসনে ওদের দেখার পর থেকে পূর্বের ধারণা নিয়ে কিছুটা দ্বিধান্বিত।

হোয়া - ভিয়েতনাম

হোয়া – ভিয়েতনাম

বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং পিএইচ,ডি করতে এসেছে গত সেমিস্টারে ভিয়েতনামের মেয়ে হোয়া মিন লে (Hoa Minh Le)। দেখে কেন জানি মনে হয় মাথার মধ্যে একটি কোর আই-৭ প্রসেসর সবসময় ঘুরছে। খুবই মিতভাষী এবং চালাক এই মেয়ের সাথে কথা বলার সুযোগ খুব একটা হয় নি কারন সে মিতভাষী। বন্ধুবান্ধবের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক বলয় মেনে চলে বলে আমার বিশ্বাস। আমি বৃহস্পতির আশেপাশে হয়তো। তবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দাওয়াতটা পাই ঠিকই।

ইয়েজেরসা হাদো - আলবেনিয়া

ইয়েজেরসা হাদো – আলবেনিয়া

আলবেনিয়ান এই সুন্দরীর নাম ইয়েজেরসা হাদো (Jezerca Hodaj)। ওরা যেই গ্রামে সেখানের একটি পাহাড়ের নাম হলো ইয়েজেরসা। সেই থেকে ওর এই নাম। গণিতে পিএইচ,ডি করছে। ওর নাম উচ্চারণ করতে সবার অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। এমনকি ওর দেশের মানুষজনও ওর নাম উচ্চারণ করতে ভিমড়ি খায়। আমারো প্রায় এক সপ্তাহ লেগেছে মুখস্থ করতে। শেষে জেস (Jez) ডাকা শুরু করলাম আর সবার মত। পুরো নাম ধরে ডাকার কষ্ট অন্তত এই নামে আর করতে ইচ্ছা হলো না। যুভেন্তাসের কড়া সমর্থক এই মেয়ে ফুটবল নিয়ে কথা উঠলে ঝগড়া বাধিয়ে দেয় বন্ধুদের সাথে। আলবেনিয়া সম্পর্কে গত সেমিস্টারে ওয়ার্ল্ড কালচার নামক কোর্সে ছাত্রদের একটি চলচিত্র দেখিয়েছিলাম। নাম Before The Rain. চলচিত্রের উপর লেখা ছোট পরীক্ষার খাতা দেখা জন্য দেশটি নিয়ে ঘাটাতে গিয়ে জানতে পারলাম সর্বকনিষ্ঠ ন্যাটো সদস্য হলো আলবেনিয়া। বলকান সংঘর্ষে একসময় অনেক রক্ত দিয়েছে এই দেশটি। মূলত চলচিত্রে এই বিষয়টিই উঠে এসেছে। এই মেয়েটির মুখে একটুকরো হাসি ও বিসন্নতা শরতের রোদ আর মেঘের মত খেলা করে। ওর যত ভালো ছবি তুলি না কেন, “মোটামুটি” হলো সর্বোচ্চ প্রশংসা।

লিওনর মেদিরস - পর্তুগাল

লিওনর মেদিরস – পর্তুগাল

কথা বলছি বামপাশেরজনকে নিয়ে। পর্তুগালের মেয়ে লিওনর মেদিরস (Leonor Medeiros) পড়াশোনা করছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্কিওলোজিতে। আমাদের অফিসের পেছনে প্রায় জানালাবিহীন বেরসিক ধরনের একটা ভবনে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্কিওলোজির ছাত্রদের বসবাস। এনভায়রনমেন্টাল পলিসির ছাত্রদের সাথে ওদের একধরনের উদ্ভট শীতল সম্পর্ক রয়েছে। যাই হোক, লিওনর আবার আমার প্রতিবেশী। ডাউনটাউনে আমার সিনেমাহলস্থ বাসভবনের পাশেই তার বাসা। সেটা জানতে পেরেছিলাম উপরের ছবিটি যেদিন তোলা সেদিন। অর্থাৎ স্কিং করে ফেরত আসার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি থেকে যখন আমার সাথে নামলো তখন। খুব হাসিখুশী একটি মেয়ে। ওর সাথে আমার বেশীরভাগ সময় দেখা হয় পথে। আমি অফিস যাচ্ছি সে ফেরত আসছে অথবা উল্টোটা। একই পথে যেতে পারলে মন্দ হতো না। পর্তুগীজ এই সুন্দরীর ইংরেজী শুনলে অবশ্য বোঝার উপায় নেই সে পর্তুগীজ। চমৎকার ও সাবলীল উচ্চারণ তার মার্কিন ইংরেজীতে।

মায়রা স্যানচেজ গঞ্জালেস - মেক্সিকো

মায়রা স্যানচেজ গঞ্জালেস – মেক্সিকো

মেক্সিকোর মেয়ে মায়রা আমাদের সাথে একই বিষয়ে পড়াশোনা করছে। তবে আসমার মত সেও পিএইচ,ডিতে। হোউটনের শীত নিয়ে তার চিরন্তন ঘ্যানঘ্যানানি রেকর্ড বুকে টুকে রাখবার মত। মেক্সিকানরা সম্ভবত বাঙ্গালীদের মত আবেগপ্রবণ। বিভিন্ন ঘটনা পরিক্রমায় আরেকটা ব্যাপারও মাথায় এসেছে। ওরা হিন্দি সিরিয়ালের গুটিবাজ মেজো বউয়ের চেয়েও ভয়ঙ্কর। তবে একজন মেয়েকে দিয়ে পুরো মেক্সিকো বিচার করে ফেলা আমার মোটেও উচিৎ নয়। শারিরীক স্থূলতা দেখে অনেকেই ভাবতে পারে অকম্যার ঢেঁকি। কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার উলটো। ভালো সালসা নাচে মেয়েটি, সেই সাথে পরিশ্রমী।

রিয়ানা উইলিয়ামস - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

রিয়ানা উইলিয়ামস – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

আমাদের আগের কোহর্ট বা ব্যাচের এই মেয়েটি। নাম রিয়ানা উইলিয়ামস (Rhianna Williams)। এনভায়রনমেন্টাল পলিসিতে দুটো ক্লাস এক সাথে করেছি। চেহারার মাঝে বেশ ভারিক্কি একটা ভাব আছে এবং বয়সে অনেক বড়। আমি শুধু বাঙ্গালী ছেলে বলেই নয়, মেয়েটাও কেমন যেনো একটা রাগী বড়বোন সুলভ আচরণ করে। তবে গল্প জুড়ে দেবার ক্ষেত্রে এই মেয়ের জুড়ি নেই। আড্ডায় এই মেয়ের সাথে সময় কোন দিক দিয়ে চলে যায় বোঝা যায় না।

সারা নেভালা'নেন - ফিনল্যান্ড

সারা নেভালা’নেন – ফিনল্যান্ড

গত দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রে হয়ে গেল ২০১৩ ফিন-ফেস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফিনল্যান্ডের মধুর সম্পর্কের দীর্ঘসূত্রিতার উদযাপনই নাকি এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য। ফিন-ফেস্টের দিন সকালে এখানকার এক রসিক প্রফেসর যিনি আমার বর্তমান রিসার্চ এডভাইজার, বলছিলেন, “হেই মোকা ক্যান ইউ ফিল দ্য ফিনিস এক্সাইটমেন্ট?” প্রশ্নের ধরণে সন্দেহ হওয়ায় জিজ্ঞাসা করলাম,”ইজ দ্যাট আ জোক অর সামথিং?” উনি জানালেন, “ফিনিসরা জাতি হিসেবে খুবই গম্ভীর। তাদের মাঝে রসবোধ নেই। তাদের আনন্দ ফূর্তির সংজ্ঞা ভিন্ন। তারা হাসতে জানে না। তাই ফিন-ফেস্ট এলেই এক ধরনের চাপা রসিকতা চলে এখানের মানুষের মাঝে। চিন্তা কর স্ট্যান্ড আপ কমেডির কথা। ফিনিস স্ট্যান্ড আপ কমেডি বলে কিছু নেই পৃথিবীতে।” এত কথা বলার কারণ সারা নেভালা’নেন (Sara Nevalainen)। এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে পড়তে আসা সারা চলে গিয়েছে প্রায় পাঁচ মাস হলো। কিন্তু দুই সপ্তাহ আগের প্রফেসরের ঠাট্টার সময় প্রথম আমার এই মেয়েটির কথা মনে পড়েছিল। চারমাস সময়ে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে বহুগুণের অধিকারী এই মেয়ের সাথে। একটিবারের জন্য হাসতে দেখিনি। হিন্দি, আরবীসহ, ইংরেজী এই তিনটি ভাষায় কথা বলতে পারে অনর্গল। কোন এক দাওয়াতে বাসায় গিয়েছিলাম। রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে দেখি দেশী রুমমেট নাইমাকে বলছে, “তুই একটা কুত্তা” তার উত্তরে নাইমার বিজয়ী শয়তানি হাসি। চমৎকার স্যাক্সোফোন বাজায় এবং জ্যাজ সঙ্গীতভক্ত এই মেয়ে নাকি ভূতের মত পুরো এপার্টমেন্টে ঘুরে বেড়াতো। নাইমার কাছে শুনেছি, এমন নাকি হয়েছে নাইমা রুমে বসে কাজ করছে, সারা এসে রুমে বসে থাকতো। কোন কথা বলতো না। তারপরে মিনিট বিশেক পরে আবার উঠে চলে যেত। ফিনিস এক্সাইটমেন্টের অনেকখানি ব্যাখ্যা এখানে পাওয়া যায়।

এরা বাদে এক দুইবার দেখা হওয়া বান্ধবীদের মাঝে জার্মান, তুর্কী, স্পেইন, ইথিওপিয়া ইত্যাদি দেশের ছাত্ররা আছে। কিন্তু লিখবার মত যথেষ্ট পরিচিত ওরা এখনো হয়নি তাই এই ব্লগে স্থান পায়নি। ভবিষ্যতে তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা গেলে হয়তো আবার নতুন করে কিছু লেখা যেতে পারে।

পুনশ্চঃ এ পর্যন্ত পড়ে আসার পর যদি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমার “ছাত্র” শব্দটির ব্যবহার নিয়ে মনে দ্বিধা থেকে থাকে তবে যেনে রাখুন, কাজটি ইচ্ছাকৃত ছিল।

২,০০৬ বার দেখা হয়েছে

১৫ টি মন্তব্য : “ছবি ব্লগ ৩ – গত এক বছরের মার্কিনি ফিরিস্তিঃ আন্তর্জাতিক বান্ধবীরা।”

  1. মঞ্জুর (২০০২-২০০৮)

    ভাইয়া এইখানেও কোহর্ট কথাটা ব্যবহার করলেন?:-P
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার লাইন মনে পড়ছে,"নরেশ এসে দাড়াক সেই কোণে,আর তার সেই অসামান্য মেয়ের দল"

    জবাব দিন
  2. সামিউল(২০০৪-১০)

    ইয়েজেরসা হাদো(jez) আফারে খুব মনে ধরছে। সাথে সারা নেভালা’নেন আফারেও। 😛 :awesome:
    বেয়াদবি হইলে আগেই :frontroll: :frontroll: :frontroll: কয়ডা লাগায়া দিলাম...


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন
  3. তাওসীফ হামীম (০২-০৬)

    ফর্শা মোকা ভাই ছবি নেই ক্যান? দেশের ইজ্জত একটু কমে গেল নাকি? লিউ নামের চাইনীজ মেয়ে আমার ইউনিতেও আছে। ফিনিশ মেয়েটারে খুব ভালো লাগলো


    চাঁদ ও আকাশের মতো আমরাও মিশে গিয়েছিলাম সবুজ গহীন অরণ্যে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।