ইলিয়াছ স্যারের অচেনা দিক

ইলিয়াস স্যারকে নিয়ে লেখা ভালবাসা দিবস সম্পর্কিত ব্লগটি আমার জীবনে লেখা প্রথম ব্লগ।এছাড়াও ইলিয়াস স্যার এমন একজন চরিত্র যাকে ঘৃণা বা অপছন্দ করা যায় কিন্তু উপেক্ষা করা অসম্ভব।কলেজের কঠোর দিনগুলোতে উনার কিম্ভুতকিমাকার আচার আচরণ সত্যিই ক্যাডেটদের বাড়ি থেকে দূরে থাকার কষ্ট অনেকটাই ভুলিয়ে দিত।আজীজ ভাইয়ের লেখায় ইলিয়াস স্যারের প্রায় জীবন্ত প্রতিচ্ছবি দেখে খুব নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলাম। ইলিয়াস স্যারকে অনেকে যতই অপছন্দ করুক না কেন আর যাই হোক এই কথাটা আমি অস্বীকার করতে পারবনা যে ইলিয়াস স্যারকে নিয়ে সামনা সামনি অনেক দুষ্টামি করার পরেও উনি কিন্তু আমাকে বড় ধরণের বাঁশ মারেননাই কখনো।আমার দুষ্টামিগুলো ছিলঃ

১।স্যারের অনুকরণে কোন ফ্রেন্ডকে দেখিয়ে বলা(তার সামনেই)-স্যার ও তো একটা বিয়াদওওওওওব,ও ডজ দিতে দিতে ফতুর হয়া গ্যাছেএএএএএ।
২।স্যারের হুবহু অনুকরণ করে রাজশাহীর আঞ্চলিক ভাষায় উনাকে সালাম দেওয়া আর কুশলাদি জিজ্ঞাসা করা।
৩।স্যারকে শিবিরের ক্যাডার হিসেবে সরাসরি ইঙ্গিত দিয়ে কিভাবে ওই স্টাইলে জুনিয়র পাঙ্গানো যায় তা জিজ্ঞাসা করা।
৪।আমাদের ফারুককে স্যার জামাই ফারুক ডাকায় স্যারকে ওর শ্বশুর বলে নিয়মিত স্যারের মেয়েদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করা।
৫।পন্টিং সেঞ্চুরি করলেই স্যারের ডিউটি মাস্টার থাকাকালে তাঁর কাছ থেকে পুডিং,কাবাব ইত্যাদি দাবী করা(ক্যাডেটদের কাছে স্যারের ডাকনাম পন্টিং এই কারণে)।
৬।একবার চিত্রনায়ক রিয়াজ তাঁর ভাগ্নে ৩৬ ব্যাচের মেহেদীর সাথে দেখা করতে প্যারেন্টস ডে তে আসলে রিয়াজের সাথে পরবর্তী ছবিতে ভিলেন হিসেবে স্যার ২ লাখ টাকা নিয়েছেন কিনা এর সত্যতা জানতে চাওয়া আর সেই টাকা দিয়ে পুরো কলেজকে চাইনিজ খাওয়ানোর কথা তোলা।
৭।স্যার ডাস্টার দিয়ে বাড়ি দেওয়ার সময় বাড়ির জোর অনুযায়ী বলতেন-“এইটা হইল ৫০ এমজি ট্যাবলেট” যত জোরে বাড়ি এমজি(মিলিগ্রাম) ততই বাড়ত।একবার স্যার প্যারেন্টস ডে তে কলার ছোলায় পা ফসকে সবার সামনে পড়ে গেলেন।অপ্রস্তুত স্যারকে দেখে মিটিমিটি হাসতে হাসতে সেদিন ডিনারের সময় বলেছিলাম-স্যার আজকে আপনের উপর দিয়া এমজি না এক্কেবারে কেজি(কিলোগ্রাম) গেল।
৮।ক্লাশ এইটের ৩য় টার্মে প্রথম শেভ করার পর সবাই এটা নিয়ে পচাচ্ছে দেখে খুব বিরক্ত হয়ে আগে আগে প্রেপে চলে গিয়েছিলাম স্কোয়াড ডজ দিয়ে।ইলিয়াস স্যার ব্লকে আমাকে দেখে বলে উঠেছিলেন-এহ, বিয়াদবটা দেখি কিলিন শেভ কইরা জোশ পাইছ্যাও,লেট করেনাই।আমার উত্তর ছিল-স্যার কিলিন শেভ তো গো ডাউনে আগেও করতাম এখন শো রুমেও করলাম(এই জোকটা লাইব্রেরির কোন কৌতুকের বইয়ে সেই সপ্তাহেই পড়েছিলাম)।

উপরের ঘটনাগুলোর সাথে আমি সরাসরি জড়িত।এধরণের দুষ্টামি করার পরেও স্যার কিন্তু কখনোই কোন এক অজ্ঞাত কারণে কখনোই আমার পিছু লাগেননি।একবার আমি ক্লাশ এইটে নিজ ব্যবস্থাপনায় কলেজে যাবার সময় আব্বু আম্মুর আসতে দেরী হওয়ার কারণে মন খারাপ করে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বসে আছি-ইলিয়াস স্যার আমাকে উনার বাসায় নিয়ে উনার স্ত্রীর সদ্য তৈরি করা পরোটা দিয়ে নাস্তা খাওয়ালেন,আরো বললেন যে আব্বু আম্মু না আসলে উনি নিজে আমাকে বাড়ী পৌঁছে দেবেন আমি যেন কোন চিন্তা না করি।

রাজশাহীর আঞ্চলিক ভাষায় উনার উচ্চারণ নিয়ে অথবা ক্লাশে বলা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে উনার রসালো উদাহরণগুলো নিয়ে তাই যতই হাসাহাসি করি-এই মানুষটার উপর কেন জানি কখনো রাগ করে থাকতে পারিনা।তাই যখনই উনার কথা মনে পড়ে,ক্যাডেটদের জ্বালানো বা ধরা খাইয়ে দেওয়ানোর ঘটনাগুলো ছাপিয়ে আমার মনে ভেসে ওঠে টুপি আর ফ্রেঞ্চকাট দাড়ী নিয়ে সদাহাস্য এক কমিকাল প্রতিকৃতি যে কিনা আমাকে দেখলেই ট্রেডমার্ক উচ্চারণে বলে ওঠে–“মাশ্রুপ(মাসরুফ নয়),বিয়াদপটা কি কইরতিছ্যাআআআআআআআও!”

২,১৬৯ বার দেখা হয়েছে

২২ টি মন্তব্য : “ইলিয়াছ স্যারের অচেনা দিক”

  1. আজীজ হাসান মুন্না (৯১-৯৭)

    রাগ করে কি আর থাকা যায়, মাসরুফ ...শেষ বার যখন স্যার এর সাথে আমার দেখা হয়েছিল আমি খুব আন্তরিক ভাবেই তার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম...।স্যার ও বলেছিলেন যে উনি আমার জন্য প্রান খুলে দোয়া করবেন |
    স্যার আপনি যেখানেই থাকুন আল্লাহ আপনাকে আর আপনার পরিবার-কে ভাল রাখুন

    জবাব দিন
  2. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    স্যার মাশ্রুপরে জামাই হিসেবে পছন্দ করে রাখছিল এই বাপ্যারে সন্দেহের যা ও একটু অবকাশ ছিলো সেইটাও "উনার বাসায় নিয়ে উনার স্ত্রীর সদ্য তৈরি করা পরোটা দিয়ে নাস্তা" খাওয়ানোর মাধ্যমে পুরা ভ্যানিশ হয়া গেলো =)) =))


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  3. কলেজ ছাড়ার এই এতদিন পড়ে, অনেক টুকিটাকি অনেক কিছুই মনে পড়ে, আনমনে হাসি।

    মনে আছে, কলেজ থেকে প্রথম যেদিন বের হই, মনের মাঝে অনেক ক্ষোভ ছিল অনেকের প্রতি, ঘৃনা, অপছন্দ, আরও অনেক কিছু।

    যত বুড়ো হচ্ছি, মনে হচ্ছে ঘৃনা করাটা মনে হয় ভুল ছিল, আমি যা ভেবেছি, তা মনে হয় ঠিক ছিলনা।

    বাকি জীবনটা আমি সবাইকে সম্মান করতে চাই, হয়ত এটা ভুল হবে, কিন্তু আমি এই ভুলটা করতে চাই।

    জীবনে অনেক ভুল করেছি, আর এই একটা ভুল করলে আমার খুব বেশি ক্ষতি হবে না।

    স্যারকে :salute:

    জবাব দিন
  4. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    উনি আমাদের খায়বার হাউসের ক্লাস ইনচার্জ ছিলেন...তাও ২/৩ বছর!!!
    তাই আমি কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছি...!!!
    (আমি এবং আমরা ১৭ জন এখনও বুড়ো হইনি...! )


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  5. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    মাশ্রুফের খাওয়া-দাওয়ার বিষয়টা তাইলে ক্লাস এইট থাইক্কাই শুরু! :grr:

    আমাদের সময় ফৌজদারহাটে ছিলেন গোপাল স্যার। গোপাল বড়ুয়া। ছোট্টখাট্ট গোলগাল ভীষণ সরল-সহজ মানুষ। স্যারকে নিয়ে আমরা ব্যাপক মজা করতাম। আর তিনি ডাস্টার দিয়ে আমাদের আদরের পিটুনি দিতেন।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।