পিকনিক পিকনিক

১. রবিনের আইটেম

সকাল সাড়ে আটটায় পান্থপথ থেকে বাসে উঠলাম। সঙ্গে সঙ্গে রবিনের ফোন। ও অপেক্ষা করছে মহাখালী ফ্লাই ওভারের নিচে। সেখান থেকেই বাসে উঠবে। ভাবলাম বাস কতদূর এলো জানতে ফোন করেছে। কিন্তু রিসিভ করার পর শুনি অন্য কথা……দোস্ত একটা আইটেম পাইয়া গেলাম মহাখালী, পিকনিকে নিয়া যামু ওইটারে।
সর্বনাশের কথা- আমি মনে মনে ভাবলাম। শালার ভাই কি পিকনিকে দুই নম্বর কিছু নিয়া যাইতে চাইতেছে নাকি! বললাম…
মামা, এইটা তো ফ্যামিলি পিকনিক। এইখানে ওইসব করা যাবে না। বাদ দে, আমরা আলাদা কইরা অন্য এক সময় আইটেম নিয়া যামু নে।
রবিন হেসে দিলো…. আরে ব্যাটা তুই আয় আগে, আইটেম দেখলে তুইও নিয়া যাবি। হেভি মাল।

পান্থপথ থেকে মহাখালী আসতে আসতে ভাবছি, শালায় তো আজকে কেলেঙ্কারী কইরা ফেলবে। সিনিয়র জুনিয়র মিলে বাসে ততোক্ষণে ২০/২৫ জনের মতো হয়ে গেছে। এদের সামনে না আবার সিন ক্রিয়েট হয়ে যায়। ভাবতে ভাবতেই মহাখালী ফ্লাই ওভারের নিচে এসে দাঁড়ালো বাস।
জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে রবিনকে খোঁজার বদলে আমি আগে ওর আইটেমটা খুঁজতে লাগলাম। জানালা দিয়ে আমার মতোই মুখ বের করা রায়হান হঠাৎ চিৎকার দিলো- ওইতো রবিন ভাই…. আরে উনার সঙ্গে ওইটা কে? জুনায়েদ ভাই দেখি !
জুনায়েদকে জোর করে বাসে টেনে তুললো রবিন। আমি হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। তারপর রবিনের পিঠে একটা জোরে ধাক্কা দিয়ে বললাম, শালা এই তোর আইটেম!

ঘটনা কিছুই না। জুনায়েদ পিকনিকে যাচ্ছে না, এটা আগেই জানতাম। আজকে তার খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সকালে পূর্বাচলে যাবে জমি দেখতে, ফিরে এসে এমবিএ ক্লাস। সেই উদ্দেশ্যেই সকাল বেলায় বাসা থেকে বের হয়েছিল সে। কিন্তু মাহাখালী বাস স্ট্যান্ডে আসতেই দেখা হয়ে গেল রবিনের সাথে। ‘কিরে তুই পিকনিকে যাবি না?’ জুনায়েদ না করার সাথে সাথেই রবিন ওর হাত ধরে আটকে ফেলে। ‘কোন কথা নাই, যতো কাজই থাকুক তোর যাইতে হবে।’
তারপরই আমাকে ফোন দিয়েছিল শালা……দোস্ত একটা আইটেম পাইয়া গেলাম মহাখালী, পিকনিকে নিয়া যামু ওইটারে।!

শেষ পর্যন্ত অবশ্য রবিন পিকনিকে নিতে পারেনি হারামিটারে, বনানী এসে সবার হাতে পায়ে ধরে নেমে গেছে জুনা।

২. সুপারস্টার সুপারস্টার

টঙ্গী পেরিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যাবার পর আমাদের বাসের কন্ডাক্টরের মনে হল যাত্রীদের কিছু বিনোদনের ব্যবস্থা করা দরকার। টিভিতে সিনেমা ছাড়া হলো। এবং আমাদের সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে সেটা একটা তামিল সিনেমা। গোঁফঅলা নায়ক নাগার্জুনাকে দেখেই বাসের সবাই একসাথে চিৎকার দিয়ে উঠলো, সুপারস্টার সুপারস্টার। শুধু মুহাম্মদ পেছনের সিট থেকে এগিয়ে এসে একেবারে সামনের সিটে বসলো। এবং খুব মনোযোগ দিয়ে সিনেমাটা উপভোগ করতে লাগলো।
নাগার্জুনার নাচ দেখে আমরা সবাই হাসাহাসি করছি, কিন্তু তাতে মুহাম্মদের মনযোগ কমছে না। কিন্তু হঠাৎ ক্যামেরা বাড়াবাড়ি রকম বেশি নায়িকার নাভিতে ঘুরাঘুরি করা শুরু করলো। এবং বেচারা মুহাম্মদ উঠে আবার পেছনে তার আগের সিটে গিয়ে বসলো।

বেশ কিছুক্ষণ চলার পরও যখন সিনেমার আগামাথা কিছু বুঝা গেল না, তখন বাধ্য হয়ে কন্ডাকটরকে বলে সিডিটা বদলাতে হল।
এবার কনকচাঁপার গান- আমায় এতো রাইতে কেন ডাক দিলি প্রাণ কোকিলারে………….

আমি সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে দিলাম।

৩. সিনিয়রস ২ – ১ জুনিয়রস

খেলাটা হবার কথা ছিল আবাহনী-মোহামেডান। কিন্তু এইভাবে দুই ভাগ না করতে পারায় শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় খেলা হবে সিনিয়র বনাম জুনিয়র। ৯৬ ব্যাচ পর্যন্ত সিনিয়র আর ৯৭ থেকে নিচে বাকি সবাই জুনিয়র। দুই পক্ষে আট জন করে খেলতে নেমে গেলেন। এবং কিছু বুঝার আগেই এক গোল খেয়ে গেল সিনিয়ররা। সম্ভবত এক মিনিটেরও কম সময়ে রায়হানের ক্রস থেকে হাসনাইনের গোল। আন্তর্জাতিক ম্যাচ হলে এটা ফিফার দ্রুততম গোলের রেকর্ডে অবশ্যই থাকতো। কিন্তু সেটা যেহেতু হচ্ছে না আপাতত আমরা সিসিবি কাপ টুর্নামেন্টের দ্রুততম গোল হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছি।
তবে আশার কথা অল্প সময়েই খেলায় ফিরে আসে সিনিয়ররা এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রন নিজেদের কাছে নিয়ে নেয়।
মিডফিল্ডে তানভীর (৯৪) আর সিলেট ক্যাডেট কলেজের সাবেক বর্ষসেরা ফুটবলার রুম্মান (৯৪) জুনিয়রদের ঘাম ঝড়িয়ে দিয়েছেন। ৯৬ ব্যাচের তিন স্ট্রাইকার আহসান আকাশ, আমিন আর হাসানকে সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে জুনিয়র টিমের ডিফেন্ডারদের। একটি করে গোল দিয়েছেন হাসান এবং আমিন। তবে কমপক্ষে ১০টা গোলের সুযোগ নষ্ট করেছেন সিনিয়র টিমের স্ট্রাইকার হাসান। এতো কিছুর পরও আজকের ম্যান অব দ্যা ম্যাচ আসলে রবিন। জুনিয়র টিমের রায়হান আবীর আর জিহাদের দারুণ কিছু শট দুর্দান্ত দক্ষতায় সেভ করেছেন এক সময় ইন্টার ক্যাডেট কলেজ ফুটবল টুর্নামেট কাঁপানো এই গোলকিপার। খেলা শেষে সিনিয়র টিমের ম্যানেজার এহসান জানিয়েছেন, ‘বার্সেলোনার সাথে পরবর্তী ম্যাচেও তারা জয়ের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চান।’

৪. পরিত্যক্ত ক্রিকেট ম্যাচ

ফুটবলের পর ক্রিকেট। ফুটবল ম্যাচের বদলা নিতে ক্রিকেটে আটঘাট বেধে নেমেছিল জুনিয়ররা। টস থেকেই এ জন্যে দুই নম্বরী শুরু করে তারা। কয়েন উপরে ছোড়ার পর হেড-টেল না বলে জুনিয়র ক্রিকেট টিমের অধিনায়ক সামীউর বলেন ‘মানুষ’। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে দুই টাকার কয়েনে একপাশে ‘শাপলা’ এবং একপাশে ‘পরিবার’। কয়েন মাটিতে পড়ার পর দেখা গেল ‘পরিবার’ উঠেছে। অধিনায়ক সামীউর ‘মানুষ ছাড়া পরিবার হয়না’ এই যুক্তিতে নিজে টস জিতেছেন বলে দাবি করেন। একদফা বাক-বিতন্ডার পর তার অন্যায় দাবি মেনে নেন সিনিয়র দলের অধিনায়ক কামরুল। ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন সামীউর।
কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। দ্বিতীয় ওভারেই ‘কুমিল্লা এক্সপ্রেস’ এহসান ভাইয়ের বলে জুনিয়র টিমের এক উইকেটের পতন। এবং তারপরের বলেই তার বাউন্সারে হুক করতে গিয়ে ব্যাট ভেঙ্গে ফেলেন জুনিয়র টিমের জিহাদ তরফদার। দুপুরের খাবারের সময় হয়ে যাওয়ায় খেলা সেখানেই বন্ধ করে দেয়া হয়। সর্বোচ্চ উইকেট নিয়ে ‘ম্যান অব দ্যা ম্যাচ’ হন এহসান হক।

………………………………………………………………
বিঃদ্রঃ
বাকি অংশ বিজ্ঞাপন বিরতির পর। এই ফাঁকে আপনারা চা-টা খাইয়া আসেন। হাজার খানেক ছবি তোলা হইছে, শীঘ্রই পোস্ট করা হবে, সেগুলি দেখে সময় কাটান।
আমিও চা-বিড়ি খাইয়া আসি। আর যদি বাকি অংশ লিখতে না পারি নিজগুণে মাফ কইরা দিয়েন। 🙁

২,৯৬৯ বার দেখা হয়েছে

৩৩ টি মন্তব্য : “পিকনিক পিকনিক”

  1. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    রবিন ভাই আমারে এই অনেক ভাল জানেন, সেজন্যই মনে হয় এইরকম বলেছেন...আমিও ওনারে এবং কামরুল ভাইরে অনেক পছন্দ করি...আফসোস জুনিয়র হবার কারনে তা প্রকাশ করতে পারি না... x-( x-( :chup: :chup: :duel: :duel:


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  2. শাওন (৯৫-০১)

    মিস কইরা ফেললাম মনে হইতেছে...ইস... কেন যে অফিসের কাজ আমারে যাইতে তে দিলোনা...। :(( :bash:


    ধন্যবাদান্তে,
    মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শাওন
    প্রাক্তন ক্যাডেট , সিলেট ক্যাডেট কলেজ, ১৯৯৫-২০০১

    ["যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায় ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি"]

    জবাব দিন
  3. মিশেল (৯৪-০০)

    ধুরু বুঝাই যাইতেছে পিকনিক পুরা ভুয়া হইছে। যাইতে পারি নাই ভালই হইছে। B-)

    (জুনিয়র পোলাপাইন কেও আঙ্গুর ফল টক বলার আগেই নিজ দায়িত্বে ফ্রন্টরোল শুরু করবি)

    জবাব দিন
  4. সাব্বির (৯৫-০১)

    পিকনিক ভুয়া হইছে এইটা যাতে কেযউ বুঝতে না পারে, তাই সবাই ইচ্ছা করে মোবাইল অফ কইরা রাকছিল :grr:
    যাদের পাওয়া গেছে তারা ইচ্ছাকৃত ভাবে লাইন কাইট্টা দিছে 😡
    না গিয়া ভাল করসি, না হইলে বানাইয়া বানাইয়া কইতে হইত পিকনিক ভাল হইছে, খানা মজা হইছে। আমি আবার চাপা মারতে পারি না :-B

    জবাব দিন
  5. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    পিকনিকে যাওয়া পার্টি মনে হয় এখনো কালকের সারাদিনের মাস্তির ধকল কাটায়া উঠতে পারে নাই, কেউ এখনো কমেন্ট করতেও আসে নাই, এই সুযোগে মাঠ ফাঁকা পেয়ে না যাওয়া পার্টি আঙ্গুর ফল টক জাতীয় কমেন্ট করে ফাটায়া ফেলতেছে।

    *** কুমিল্লা এক্সপ্রেসের বলে সেই ব্যাট ভাঙ্গা শটে যে ক্যাচ উঠেছিল সেটা কিন্তু আমিই ধরেছিলাম B-)


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  6. মান্নান (১৯৯৩-১৯৯৯)
    আমায় এতো রাইতে কেন ডাক দিলি প্রাণ কোকিলারে…………

    যতদূর মনে পড়ে আহমেদ ভাইয়া [ সিসিআর কালচারাল প্রিফেক্ট] কোন এক কালচারাল শোতে এই গান গেয়ে ব্যাপক হিট ছিলেন। আহমেদ ভাই কি পিকনিকেও এই গান গেয়েছিলেন নাকি ?

    জবাব দিন
  7. হাসনাইন (৯৯-০৫)
    সম্ভবত এক মিনিটেরও কম সময়ে রায়হানের গোল।

    গোলটা আমি দিছিলাম ভাই রায়হানের ক্রসে। 😛

    জন্টি রোডস ক্যাচ মিস করলে যেই আফসোস করতেন সবাই সেই একই আফসোস হইতাছে পিকনিকে না যাইতে পেরে সবার জানি। কি লাভ লুকায়ে ভাই। আমরা আমরাই-ত।ব্যাপার না। বেটার লাক নেক্সট টাইম। :grr: :grr: :grr: :grr: :grr:

    জবাব দিন
  8. তানভীর (৯৪-০০)

    পিকনিকটা বেশি মজার হয়ে গেছে, এখন তো পরবর্তী পিকনিকগুলোর জন্য প্রত্যাশাই বেড়ে গেল। 😀

    ফুটবলে আমাদের টিমে একজনের নাম সেভাবে উল্লেখ করা হয়নাই- আহসান আকাশ। রাইট উইং দিয়ে ও খুব খেটে খেলছে। আর আমাদের শোয়েব আর তৌফিক বেশ ভালো সামলেছিল ডিফেন্সটা- রুম্মান মামা তো ছিলই দুর্দান্ত ফর্মে। আমিন আর হাসান বেশ ফাঁকিবাজি করেছে, খুব একটা নড়াচড়া করেনাই।

    দুপুরের খাওয়াটা বেশি মজার হয়ে গেছিল- অনেকদিন যাবৎ এত বেশি খাইনাই। তারপর মোসাদ্দেক ভাই যখন সত্যি সত্যি মিষ্টি খাইয়ে দিলেন তখন মিষ্টিগুলা খেতে যেন আরও বেশি মজার ছিল।

    হায়দার ভাইয়ের দুই পিচ্চি তো দারুণ সুইট। পুরাটা সময় ওদের উচ্ছাস দেখতে খুব ভালো লেগেছে। দোয়া করি ওরা বড় হয়ে যেন হায়দার ভাইয়ের মতই অলরাউন্ডার হোক।

    নাহ! পিকনিকে এত মজা করা ভালো না! যারা পিকনিকে যায়নাই তারা ভালোই করেছে। ;;;

    জবাব দিন
  9. আন্দালিব (৯৬-০২)

    কী একটা পিকনিক কর্লাম!! আহা!

    রবিন ভাইয়ের আইটেমের কাহিনী এখন 'কিলিয়ার' হৈলো। আমি জুনায়েদ কবীর ভাইজানের লিগা আরেকটু হৈলেই বাস মিস করতেছিলাম। র‌্যাডিসনের সামনে বাস অনেকক্ষণ দাঁড়ায়ে ছিলো, আর আমারে নেওনের টাইমে পুরা দৌড়ের উপ্রে। 🙁

    তবে বাসে ওঠার পর থেকে বাস থেকে নামাতক অসাধারণ একটা সময় কাটিয়েছি। এই জন্যে পুরা সিসিবি, আর পিকনিকের সাথে জড়িত সকলকে অনেক ধন্যবাদ। বহুদিন এমন উচ্ছ্বসিত পিকনিক করি নাই!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।