ক্যাডেট নম্বর ৯৯৯ : বদলে যাওয়া নিক

গত জুন মাসে বা-পায়ে একটা ‘ইনফেকশন’ নিয়ে কিছুদিন বাসায় বিশ্রাম আর কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। সে সময় সামুতে প্রকাশিত আমার একটা পোস্টে জিহাদ এসে মন্তব্য করলো :

১৬ জুন : ভাইয়া আপনি অদ্ভুত সুন্দর লিখেন। আমাদের ক্যাডেট কলেজ ব্লগে আপনাকে না পেলে কিন্তু খবর আছে!!!!

লিংকটা দিয়ে দিলাম : http://cadetcollegeblog.com”

এরকম দাবি নিয়ে বলা! সত্যি বলছি ভীষণ ভালো লেগেছিল। লিংক ব্রাউজ পেলাম সিসিবি। কিন্তু ব্লগাতে গিয়ে স্বস্তি পাই না। কারণ ওখানে বিজয় নাই। একইদিন আরেকটা পোস্টে ও লিখলো :

১৬ জুন : জিহাদ বলেছেন: আপনার ক্যাডেট নং টাকে রীতিমত হিংসা হচ্ছে!!

আরো দুইজন কে হিংসা করতাম। ক্যাডেট নং ২০০০। আমার ব্যাচ মেট, হাসনাইন। ও এখন আর্মিতে আছে।

আরেকটা ১৯৭১। আমাদের ব্যাচের সবার প্রিয় মুখ, রেজা। এসএসসি’র ছুটিতে পানিতে ডুবে মারা গেল। সব দৌড়ে সবার আগে ওর বলিষ্ঠ দেহের ছায়া দৌড়াতো। জীবনের দৌড়েও সবার আগে চলে গেল…

যাই হোক। অনেক কিছু জানলাম যেটা জানা ছিলনা। অনেক অনেক ভাল্লাগলো… আরো লিখুন। মাঝে মাঝে এসে পড়ে যাবো। আর আমাদের ব্লগে আপনাকে অবশ্যই চাই। এখানকার লেখাগুলোই আমাদের ব্লগে দিয়ে দিবেন প্লীজ।

ভাল থাকবেন।”

আসলেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। ছোটভাই লিখলো বলে কি হয়েছে। তো সিসিবিতে আসি যাই, কিন্তু একে ‘ইউজার ফ্রেন্ডলি’ মনে হয় না। ভাবি থাকি সামুতেই। হাসপাতালের বেডে শুয়ে লিখলাম আরেকটা পোস্ট। জিহাদ সেখানে এসে আবার মন্তব্য করলো :

২৪ জুন : ভাইয়া আপনার এই লেখাটা আমাদের ব্লগে ড্রাফট হিসেবে সেভ করা ছিল। এই জন্য ভেবেছিলাম হয়তো বা লেখাটা সম্পূর্ণ নয়। আজকে এখানে দেখে ড্রাফট টাই পাবলিশ করে দিয়েছি।

আর আপনি যদি অনুমতি দেন তো আগের দুটো লেখাও পোস্ট করে দেই?”

স্বাভাবিকভাবেই অনুমতি দিলাম। জিহাদই আমার প্রথম তিন-চারটা পোস্ট সিসিবিতে প্রকাশ করলো। হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে সামু আর সিসিবিতে ঘুরাঘুরি করি। কখনো সামুতে লিখে দুই জায়গাতেই প্রকাশ করি। এরই মধ্যে অফিসের কাজের চাপে নতুন পোস্ট বা মন্তব্য কোনটাই করা হয় না। ব্লগে আসাটাও কমে আসে। সিসিবিতে আমাকে নিয়মিত হওয়ার তাগাদা দিয়ে সম্ভবত গত অক্টোবরে কামরুল আমাকে প্রথমে মেইল করেছিল। পরে ব্লগেও দুয়েকবার খুঁচিয়েছে। তার প্রতিক্রিয়া হলো, কখনো কখনো অফিসে গভীর রাতে বসেও সিসিবিতে সক্রিয় থাকা।

এই সুযোগে সিসিবিতে আমাকে ‘ভর্তি’ করানোর জন্য জিহাদকে আর নিয়মিত ‘ক্লাস’ করার জন্য কামরুলকে :salute: ।

দিনের একটা বড় সময় সিসিবিতে থাকি। কখনো লিখি। কখনো মন্তব্য করি। আবার কখনো শুধুই একের পর এক পোস্ট পড়তে থাকি। সিসিবি সদস্যদের মধ্যে একজন শুনলাম আমার চেয়ে সিনিয়র। তবে তিনি অনিয়মিত। আমিই এখন সক্রিয় বুড়াতম সদস্য। প্রথম প্রথম জড়তা ছিল। এত্তোসব জুনিয়রের সঙ্গে চলতে পারবো তো? নিজের বয়সটাকে তাই কমিয়ে আনলাম।

চোখের সামনে এখনো ভাসে ঢাকার আইডিয়াল স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া একটি বালককে নিয়ে একজন বাবা ট্রেনে করে চট্টগ্রাম গেলেন। তারপর ১৯৭৪ সালের ১৭ আগস্ট ১২ বছর বয়সের ওই বালককে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ নামে একটা অসাধারণ সুন্দর বিশাল ক্যাম্পাসে রেখে গেলেন। বাবাকে বিদায় দেয়ার সময় বালকটার চোখ কি ভিজে গিয়েছিল? বাবাও কি চোখের পানি আড়াল করেছিলেন? ওই বালকটার চোখে তখন ছিল শুধুই বিষ্ময়! রবীন্দ্র হাউসের দোতলার ২০ নম্বর কক্ষে নিজস্ব একটা বেড, এটা কাবার্ড, চেয়ার-টেবিল নিয়ে শুরু হয়েছিল বালকটির নিজের জীবন। ওই কাবার্ডটার মাথায় ছোট্ট একটা নম্বর প্লেটে লেখা ছিল, “৯৯৯ সানাউল্লাহ”।

৩৪ বছর পর সিসিবিতে এসে আমি আবার ফিরে গেছি ১৯৭৪ থেকে ১৯৮০ সালের ছয় বছরের জীবনে। তাই সহজেই নিজের অর্ধেক বয়সী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ঠাট্টা-মজা করতে পারি, তাদের সঙ্গে নিজের চিন্তা-ভাবনা অকপটে প্রকাশ করতে পারি। সামুতে যে নিকটা আমার ছিল সেটাই সিসিবিতে রেখেছিলাম, “ক্যাডেট নম্বর ৯৯৯”। কিন্তু সিসিবির এডু একসময় আমাকে স্বনামে প্রকাশ হতে অনুরোধ জানালো। শত হলেও এডু তো; তাকে তো অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না! তাই বদলে ফেললাম নিকটাও। আর চোখের সামনে দেখলাম মাত্র তিন-চার মাসে পুরো সিসিবিটাই বদলে গেছে। যে ইতিহাস লিখে ফেলেছে এডু নিজেই।

সিসিবির সবাইকে :salute: ।

আর :hatsoff: জিহাদ, মুহাম্মদ, সামিয়া, রায়হান, কামরুল, শফি, মরতুজা, তারেক, আরিফ, রায়হান রশীদ, কামরুলতপুকে। যাদের স্বপ্ন-অর্থ আর শ্রমে সিসিবি একটা সম্পূর্ণ ব্লগের রূপ নিয়েছে।

বাকি থাকলো লেখক-ব্লগার আর পাঠকরা। আমি নিজেও এই দলের। কতো কষ্ট করে লিখি! তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাকি আমাদের জন্য :just: :awesome: (নাচানাচি) ??

৬,১৬১ বার দেখা হয়েছে

৭৮ টি মন্তব্য : “ক্যাডেট নম্বর ৯৯৯ : বদলে যাওয়া নিক”

  1. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    সিসিবিতে আপ্নাকে ‘ভর্তি’ করানোর জন্য জিহাদকে আর নিয়মিত ‘ক্লাস’ করার জন্য কামরুল ভাইকে :just: :salute:


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  2. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    কামরুলরে প্রকাশ্যে আরেকটা :salute: দিয়া লই। এবিসি রেডিও'র সিনেমার অনুষ্ঠানটার নাম দিয়েছে ও। কামরুল তোমার "সিনেমাতাল" চালু হইয়া গেছে। প্রমো বাজতাছে। আজ মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে তিনটায় ওই অনুষ্ঠানটা মনে চাইলে সবাই শুইন্যো।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  3. রহমান (৯২-৯৮)

    লাবলু ভাই,
    আপনার লেখা পড়তে আমার সবসময়ই খুব ভাল লাগে। এই লেখাটাও অত্যন্ত মন ছোয়া লেখা। আপনাকে একটা অনুরোধ করবঃ সিসিবিকে ছেড়ে কখনো যাবেননা প্লিজ। আপনাদের মতো বড়ভাইরা থাকলে সিসিবি অনেকদূর এগিয়ে যাবে। জিহাদ এনং কামরুল কে :hatsoff: আপনাকে এখানে নিয়ে আসার জন্য। আর আপনাকে :salute: আমাদের সাথে থাকার জন্য 🙂

    জবাব দিন
  4. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    সানা ভাই আপনি কিন্তু ক্যাডেট কলেজ নিয়ে লেখালেখি করার অনুপ্রেনণা প্রতম দিয়েছিলেন।
    সামুতে আপনার নিকটি দেখেই ঢুকে পড়ি এবং পড়ে যাই আপনার সব লেখা।
    নির্জিন পাহাড়ের চূড়া বা কি জানি এমন একটি শিরোনামে( মাফ চাইছি নাম ভুলে যাওয়ার জন্য)
    আমি ক্যাডেট কলেজ নিয়ে লিখা শুরু করি।
    ক্যাডেট কলেজ নিয়ে অনেক লেখা আমি লিখব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম।
    কিন্তু আমি সিসিবি থেকে নির্বাসনে যাওয়ায় তা হয় নি।
    আপনার মত একজন এরশাদকে কালো পতাকা দেখানো তরুণ(!)কে সহব্লগার হিসেবে ব্যক্তিগত ভাবে আমি গর্বিত।

    জবাব দিন
  5. জিহাদ (৯৯-০৫)

    কি যে বলেন সানা ভাই, আমি তো কেবল আমার পবিত্র দায়িত্বটুকু পালন করেছি (কপিরাইট: বাংলা সিনেমার সকল হ্যান্ডসাম নায়ক। ) B-)

    আপনি আমাদের ব্লগের অনেক বড় অনুপ্রেরণা। আপনাকেও :hatsoff:


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
  6. তাইফুর (৯২-৯৮)
    আমিই এখন সক্রিয় বুড়াতম সদস্য। প্রথম প্রথম জড়তা ছিল। এত্তোসব জুনিয়রের সঙ্গে চলতে পারবো তো? নিজের বয়সটাকে তাই কমিয়ে আনলাম।

    আপনি বইলাই পারছেন ...


    পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
    মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।