চলুন ঘুরে আসি চীন থেকে

কেমন আছেন সবাই? আবারো অনেক কদিন পর ব্লগে এলাম । শেষ ব্লগটি লিখেছিলাম সেই ২০১১ সালে । মাঝে পুরো এক বছর কেটে গেছে । কাজের চাপে , সময়ের অভাবে, নিজের আলসেমীতে ব্লগ লেখা না হলেও প্রায়ই ব্লগ পড়া হত । এখনও নিওমিতই পড়া হয় তবে কিছু লিখা যেন হয়েই উঠছিল না । তবে বর্তমান পরিস্থিতি হল একটা কোর্সে কারনে প্রায় ২ মাস ধরে আমি চীনে অবস্থান করছি । আসার পর থেকেই নতুন কিছু দেখা, উপভোগ করা, আর বিরিক্ত হওয়ার পাশাপাশি অনেক দিন থেকেই ভাবছিলাম এখানে এসে কী দেখলাম তা আমার মত দেশের অন্য অনেক সাধারন মানুষের কাছেই খুলে বলা যেতে পারে । ভ্রমণকাহিনী লেখা নয়, অনেকটা নিজের অভিজ্ঞতা শায়ার করাও তো সম্ভব। কে জানে হয়তো কোন দিন কারো কোন কাজেও লেগে যেতে পারে । আর তার চেয়েও বড় কথা- আজ থেকে অনেক দিন পর যদি বেঁচে থাকি তখন নিজের ঝাপসা হয়ে আসা স্মৃতির উপর নির্ভর না করে এখানে নিজেই দেখে নিতে পারব ২০১৩ সালে চীনে গিয়ে আমি কী দেখেছিলাম আর কী করেছিলাম। সেই উপলব্ধি থেকেই লিখতে চাওয়ার শুরু । তার পরও হয়ে উঠছিল না। অবশেষে আজ শুরু করলাম । চেষ্টা করব অন্তত পক্ষে কয়েকটা পর্বে কিছু লিখার জন্য । তাহলে চলুন ঘুরে আসি চীন থেকে…………………………………

ওয়েলকাম টু ঝ্যাংঝৌ ( হয় নাই মামা, দুই চাপা লাগিয়ে খুব ফাস্ট বলেন “চ্যাংচউ”)

মার্চ মাসের ০২ তারিখ যখন কুনমিং এয়ারপোর্ট হয়ে Zhengzhou airport এ অবতরণ করলাম তখন জানতাম যে আমি, আমার সাথে ক্যাপ্টেন ফুয়াদ { jcc (1999-2005) }এবং মেজর তৌহিদ (সস্ত্রীক) {rcc (1995-2001)} চীন দেশের হেনান প্রদেশের রাজধানী ঝ্যাংঝৌ শহরে অবতরন করলাম । পৌঁছুতে রাত প্রায় ১০ টা । আশা করছিলাম যে আমাদের একাডেমীতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা একাডেমী থেকেই করা হবে । আদতে হয়েছিলও তাই । তবে এয়ারপর্টে নেমে খানিকটা ভড়কেই গেলাম । আমাদের ঢাকার এয়ারপোর্ট আন্তর্জাতিক এবং আমরা ধারনা করি যে, ভৌগলিক কারনে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ খানিকটা গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিচিত । আর এখানে এই এয়ারপোর্টটি বেইজিং থেকে খানিকটা দূরে শুধুই একটি প্রদেশের রাজধানীতে এবং এই প্রদেশে আন্তর্জাতিক আসা-যাওয়াও খুব একটা নেই । তবে মাশাআল্লাহ এয়ারপোর্ট খানা সাইজে আমাদের ঢাকার তিন গুনের থেকে বেশি ছাড়া কম হবে না। সেই সাথে তার নান্দনিক সৌন্দর্য না হয় বাদ ই থাকল । এই প্রসঙ্গে ফুয়াদের কাছে শোনা একটা গল্প মনে পড়ে গেল । ১৯১২ সালে যখন হার্ডিঞ্জ ব্রিজের উদ্বোধন হয়, তখন এক পিচ্চি মেয়ে তার বাবার হাত ধরে গেছে সেই ব্রিজ দেখার জন্য । অনেক খন পর ব্রিজ দেখেই প্রথমেই তার মন্তব্য হল “আল্লাহ এত্ত বড় ব্রিজ !! বানাইতে তো ৫০০ ট্যাহার খালি নোহাই ( লোহা) লাগছে।” আসলে এই মেয়ের যেমন ধারনা ছিল না যে ৫০০ টাকার থেকেও বেশি টাকা থাকতে পারে, তেমনি মুভিতে অনেকবার JFK এয়ারপোর্ট দেখলেও এক প্রদেশের এয়ারপোর্ট, যেখানে খুব বেশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও ওঠানামা করে না , তার সাইজ দেখে আমারও অনেকটা সেই দশা । আমি হলাম কুয়োর ব্যাঙ, তাই প্রথম দর্শনেই এই সাগরের রুপে মুগ্ধ । প্লেনে আসার সময়ই বুঝতে পেরেছি এখানে ইংরেজীর খুব একটা চলন নেই । এমনকী কুনমিং থেকে আসার সময় প্লেনে দেখলাম বিদেশীও খুব বেশি নেই ( বাঙালি শুধু আমরাই )। আ. আমাদের রিসিভ করতে কেউ আসবে কীনা,আর আসলে আমরা তাকে খুঁজে পাবো কিভাবে আল্লাহই জানে । এছাড়া আমাদের কাছে কারো ফোন নাম্বারও নেই। কি হবে… এই আলোচনা করছি আর লাগেজের জন্য লাইন দিয়ে অপেক্ষা করছি……এমন সময় দেখি পুরো এয়ারপোর্টে শুধু আমরাই বিদেশী । যাদের গায়ের রঙ দেখে যে কেউ ১ মাইল দূর থেকেও আমাদের চিনতে পারবে । হলও তাই। আমাদের ৪ কালো মানুষকে খুজে নিতে লেঃ এরিক( এটা তার ইংরেজী নাম, আসলে নাম অন্য কিছু) এর কোন অসুবিধাই হয়নি। আমরা লাগেজ নিয়ে গাড়িতে উঠলাম । প্রায় ৪৫ মিনিটের রাস্তা পেরিয়ে যখন আমরা একাডেমিতে পৌঁছলাম…রাত প্রায় ১২ টা । এই ৪৫ মিনিটের বর্ণনা দিতে গেলে বলা যায়… একেবারেই সুনসান রাস্তা, পুরো রাস্তায় যতদুর চোখ যায় একটাও ইংরেজী অক্ষর নেই , রাস্তায় এবং তার আশেপাশে বাতির কোন অভাব নেই ( মাঝে মাঝে ইলেক্ট্রিসিটির এমন প্রাচুর্যপূর্ণ ব্যবহার দেখে আমরা প্রচন্ড অবাক হলাম ), ফ্লাইওভার যে কয়তলা তা গুনতে হিমশিম খেলাম, রাস্তা এত্ত বেশি ফাঁকা দেখে অবাক হলাম, ফাঁকা রাস্তায় ড্রাইভারের নিয়ম মানা দেখে মুগ্ধ হলাম, টোল প্লাজায় একাধারে ১৭ টি লেন দেখে টাস্কি খেলাম, রাস্তার পাশে নিচু কোন বিল্ডিং খুঁজে হয়রান হলাম, আর পৌঁছে লাইফ ইন্টারপ্রেটার হিসেবে একজন মাইয়াকে পাইয়া আনন্দিত হইলাম। সে যখন আমাদেরকে তার পরিচয় দিয়ে বলল “welcome to chongchou” তখন খানিকটা দোটানায় পড়লাম। যতদুর মনে পরে ঠিক প্লেনেই উঠেছিলাম, তাহলে Zhengzhou না এসে chongchou আসলাম কেমনে ? খানিকপর যা জানলাম তা হল চীন দেশে zh কে চ এর মত উচ্চারণ করা হয়। উচ্চারণ করার সময় দুই চাপার দাঁত একে অন্যের সাথে লাগাইয়া প্রচন্ড বেগে বাতাস ছেড়ে দিতে হবে । মনে মনে কইলাম এইটা বোধহয় চাইনিজ ইংরেজী । পরে মাসখানেক থেকে এখন পর্যন্ত যা শিখলাম তা হল ইংরেজী বর্ণমালাগুলো চীনা ভাষারই আর এক রূপ। ইংরেজদের এই ভাষাটারেও তারা চাইনিজ বানায়া ছাড়ছে । এর বিস্তারিত বিবরন পরবর্তী কোন অংশে বিশদভাবে দেবার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ । আজ আমার জীবনের প্রথম প্লেন জার্নির একটা গল্প বলি ।

কুন্মিং এয়ারপোর্ট

কুন্মিং এয়ারপোর্ট

zhengzhou airport

zhengzhou airport

Who is the mother of this egg ??????

জীবনে প্রথমবারের মত প্লেনে উঠলাম । মজাই লাগল। আগে শুধুমাত্র সিনেমায় অথবা টিভিতেই দেখছি, এবার নিজে উঠলাম । সারা জীবন এয়ার হোস্টেসদের গল্প শুনছি, এবার নিজে যাচাই করে দেখার পালা……সেইসাথে শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রায় ১ ঘন্টা দেরির পর যখন আমরা প্রায় ২০ জন একই প্লেনে উঠলাম আর পাশে দেশি অফিসারকে সহযাত্রী হিসেবে পেলাম, তখন বেশ ভালই লাগল । সব ই সাধারন…যেমনটা আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা জানি, কল্পনা করি, ঠিক তেমনই । শুরু হল যাত্রা । চায়না ইষ্টার্নের প্লেনে করে কুনমিং এয়ারপোর্টে নামার পর আমরা সবাই একে একে নিজ নিজ গন্তব্যের দিকে রওনা করলাম । ২০ জনের এক দল থেকে হয়ে গেলাম মাত্র ৪ জনের এক দল। তাও খারাপ না। জুনিয়র , সিনিয়র এবং সিনিয়র তৌহিদ ভাবি সবাই অনেক আগে থেকেই পরিচিত । সুতরাং অজানা , অচেনা কোন এক জায়গায় আমি সম্পুর্ণ একা হয়ে যাচ্ছি না, এটা যে কত বড় একটা পাওয়া এখন অনেক বিদেশী বন্ধুদের দেখে বুঝতে পারছি। এক দিন জাম্বিয়ার ক্যাপ্টেন পল ত বলেই ফেলল “ man I feel so jealous seeing u people talking each other in ur mother language, u know i am dying to speak in my mother tongue, but ….”। কুনমিং এ অনেকেই যখন একা একা আলাদা হয়ে যাচ্ছিল নিজেকে তখন খানিকটা ভাগ্যবান বলেই বিশ্বাস করলাম । যাই হোক কুনমিং এ এসেই দেখি আমাদের ২ কানেকটিং ফ্লাইট এর মাঝে যে ৪ ঘন্টার একটা বিরতি ছিল, তা আসলে কাগজে কলমে । কারন বাংলাদেশ এবং চীন এর সময়ের ব্যাবধান ২ ঘন্টা । সাথে ঢাকায় প্লেনের দেরি ১ ঘন্টা । মাত্র ১ ঘন্টা বাকী ঝ্যাংঝউ এর জন্য পরের প্লেনে উঠে বসার। অথচ এত বড় এয়ারপোর্ট, ডান না বাম এ যাব, সোজা না বাঁকা যাব…তাই বুঝে উঠতে পারছি না । সেই সাথে আছে প্লেন মিস করার টেনশন । তারাতারি লাগেজ নিয়ে বাকীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রায় দৌড়ে যখন আমাদের টার্মিনালে পৌঁছলাম, তখন দেখি আমাদের ৪ জনের জন্য একটা আস্ত বাস দাঁড়ান । আমরা তারাতারি করে প্লেনে উঠতে না উঠতেই প্লেনের ইঞ্জিন স্টার্ট হয়ে গেল । একটু পর যখন চারপাশে তাকাতে শুরু করলাম দেখি আমরা ৪ জন ছাড়া বাকি সবাই চীনের অধিবাসী অথবা বাইরের কেউ থাকলেও তাদের দেখেও চিনাই মনে হচ্ছিল । অনেক্ষন চুপচাপ । কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনার চেষ্টা করছিলাম, এমন সময় খাবারের ট্রলি এল । কি যে জিজ্ঞাসা করল ঠিকমত বুঝলাম না। সীট শেষের দিকে হওয়ায় হয়ত যে কয়েকটা প্যাকেট বাকি ছিল তা থেকেই একটা দিয়ে এয়ারহোস্টেস চলে গেল । প্যাকেট খুললাম । অনেক কিছুই আছে তাতে কিন্তু একটা খটকা । ডিমের মতই সাইজ, শেপ, তবে রঙটা অদ্ভুত। সারা জীবন ত ডিম দেখলাম সাদা । কিন্তু এই জিনিসটা বাদামী রঙের । আবার ডিমের খোলসের মত শক্ত কোন আবরণও নেই । কী এটা ? ফুয়াদ কে জিজ্ঞাসা করলাম , সেও আমার মতই একদৃষ্টিতে জিনিসটার দিকে তাকিয়ে আছে। পেছনের সীটে মোটামুটি সুন্দর একটা মেয়ে বসে। তাকে জিজ্ঞাসা করে বুঝলাম এই খালা ইংরেজী এর ই ও জানে না। সামনের লোকটাও কি জানি বলে এবার আমি বুঝি না । ফুয়াদ এর পাশের লোকটাও বোধহয় জানে না । পিছনের সীটে বসে তার সুন্দরী মেয়েটাও যে কি বলছে তা আমাদের কান দিয়ে ঢুকলেও মাথায় এমন কোথাও গিয়ে আঘাত করছে যেখান থেকে কোন সাবটাইটেল আসছে না । এই যখন অবস্থা তখন ফুয়াদ এর মনে পড়ল যে এটা চীন । এখানে পাওয়া যায়না এমন কিছু নাই । আবার কয়দিন আগে পেপারে পড়লাম যে কৃত্রিম ডিমও নাকি চীনে পাওয়া যায়। সেটাও না হয় গেল । কিন্তু এই বস্তু হালাল নাকি হারাম -সেটা তো আরো বড় প্রশ্ন ।কী করা যায় । এমন সময় দেখি সবচেয়ে সুন্দরী এয়ারহোস্টেসটা আমার পিছন থেকে সামনের দিকে যাচ্ছে। খানিকটা শঙ্কা এবং এক্সাইটমেন্ট নিয়ে তাকে ডাকলাম “ এক্সকিউজ মি……” তিনি এলেন মুখে চমৎকার একটা হাসি ঝুলিয়ে “ ইয়েস……” তাকে ডিমটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম “হোয়াট ইজ দিস???”……তার চেহারা দেখে মনে হল আকাশ থেকে পড়ল । বিষ্ময়ভরা কন্ঠে বলে উঠল “ স্যার এগ……” খানিকটা যেন কনফিউজড । আমি আবারো জিজ্ঞাসা করলাম “ হুজ এগ ইজ দিস ???” এবার তাকে দেখে মনে হল বুঝি সে পড়ে যাবে । আমি হাল না ছেড়ে আবার জিজ্ঞাসা করলাম “ হু ইজ দা মাদার অব দিস এগ ? এবার তার মুখের যে অবস্থা হল তা দেখে আমারই খানিকটা করুনা হল । অনেক কষ্টে উত্তর দিল “চিকেন…………” উত্তর দিয়েই দৌঁড় । পাশে তাকিয়ে দেখি ফুয়াদ হাসতে হাসতে প্রায় পড়ে যাচ্ছে ………। .যা আছে কপালে মনে করে প্যাকেট খুলে খাওয়া শুরু করলাম । এটা আসলেই মুরগির ডিম । পরে এখানে বসবাসকারী মামুন ভাই এর সাথে কথা বলে জানলাম যে হয়তো সেই ডিম ভিনেগার অথনা সয়া সস অথবা অন্য কোন কিছুর সাথে প্রসেস করার কারনে তার রংটা চেঞ্জ হয়ে যায়, তবে এটা মুরগীরই ডিম আর এখানে যে কোন সুপারশপেই পাওয়া যায় । তবে যাই হোক আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে সেই এয়ারহোস্টেসের অবাক চাহুনীটা দেখতে পাই “ চিকেন……”

এয়ারহোস্টেস

এয়ারহোস্টেস

প্যাকেটের গায়ে অনেক লিখা । কিন্তু সবই চায়নিজ......

প্যাকেটের গায়ে অনেক লিখা । কিন্তু সবই চায়নিজ……

ডিম

ডিম

কাটার পর

কাটার পর

চলবে………

৯৮০ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “চলুন ঘুরে আসি চীন থেকে”

  1. মুহিব (৯৬-০২)

    দুষ্টু শিবলী তুই আর ভালো হইলি না। সুন্দরী এয়ার হোস্টেস এর ছবিটাও তুলে ফেললি। যাক মিশনে যাবার সময় এই কাম করিস না। কারণ তুই তখন তোর সৈনিকদেরকে এটার জন্য না করবি। :chup:

    আর তুই ডিমের যে ছবি দিছিস এইটা কিসের মত দেখা যাচ্ছে সেটা আমি সাক্ষাতেই বলব। 😛

    আর ভাই তোরা ভাই বিদেশে যাস, কোর্স করিস...... তোদের ভাই ব্যাপার স্যাপারই আলাদা। :bash: :bash:

    তবে তোর লিখাটা কিন্তু খুব ভাল হইছে। চালাইয়া যা। :clap:

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।