এ জার্নি বাই বাস-১

নীচের এই কাহিনী পুরাটাই ব্লগারের নিকট অতীত জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার সন্নিবেশ । ফলে এই ব্লগের সাথে সংশ্লিষ্ট না এমন কারও জীবনের কোন ঘটনার সাথে মিলে যেতেই পারে । তবুও এজন্য ব্লগার দায়ী নয় । এজন্য বড়জোর তার সৌ/দুর্ভাগ্যকে দায়ী করা যেতে পারে

সন্ধ্যা ৬টা

দুরুদুরু বুকে বাস কাউন্টারে আমার পদার্পণ । আল্লাহই জানে কি আছে কপালে……
-ভাই বগুড়ার কোনো সিট হবে ?
-কখন ? কয়টা ?
-আজ / কাল যত তাড়াতাড়ি হয় । একটাই দরকার ।
– না ভাই । কোন সিট নাই।
-একটু দেখেন না । এসি/ননএসি কোনটাতেই কোন সমস্যা নাই । যত রাতই হোক । খালি যাইতে পারলেই হইলো ।
-আজ রাত সাড়ে বারটায় একটা আছে । কিন্তু পাশে তো মহিলা ।
-আমার কোন প্রব্লেম নাই । ওই মহিলার সমস্যা না হইলেই হয় । কালকে কোন সিট হয় না ? বিকালের দিকে ।
-এসি চলবে ? মার্সিডিজ ?
-সিট কোনটা ?
-এই টিকিটটা এখনই রিটার্ণ আসছে । এই একটা সিটই আছে ।এছাড়া ঈদের আগে আর কোন সিট খালি নাই । আপনি ইচ্ছা করলে চেক কইরা দ্যাখেন ।
-ওকে সিট নাম্বারটা ?
-বি২ ।
-ওকে । এইখানে আবার পুরুষ,মহিলার ঝামেলা নাই তো । ভাই থাকলেও বাসেই ঠিক কইরেন । তারাতারি টিকেট দ্যান । আমি যাইগা ।

হটাত এক লোককে কাউন্টারে ঢুকতে দেখে তারাতারি টাকাটা দিয়ে দিলাম ।
আহ !! শান্তি । ভাই যাই বলেন…ঈদের আগে টিকেটের জন্য যে ব্যক্তি হা হুতাশ কইরা কাউন্টারে কাউন্টারে মাথায় হাত দিয়া ঘুইরা বেড়ায় নাই–তার পক্ষে আমার মনের তাতখনিক এই আনন্দ বোঝা সম্ভব না । তেমনি ঈদের আগের রাত ৩।৩০ এর পরে যে কখনো বাসায় পৌছায় নাই, ঈদের জ্যাম যে আসলে কি জিনিস তা তার পক্ষে বোঝা একটু কষ্টকর !!!!!তাই বাস যাই হোক, সিট যেমনই হোক, আর যত টাকাই লাগুক সময়মত আমার বাড়ি যাওয়া যে অনেকটাই নিশ্চিত করতে পারলাম আমি তাতেই খুশিতে আটখানা ।
যাই হোক । হাতে টিকেট পাইয়া আমার মনে হইল আমি পাইলাম। আমি ইহাকে পাইলাম । মনের আনন্দে পরের দিন আমার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচী পালন শেষে যখন বাস ষ্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছি কি মনে করে যেন একটু ভাল কাপড়টাই পরলাম । ইতোমধ্যেই ছোট ভাই-বোনের জন্য কিছু কিনে নিয়ে যাবার জন্য বড়সড় একখানা নোট আমার পকেটে এসেছে । ফলে মনটা একটু উড়ুউড়ু । আর তাছাড়া আসলেই অনেকদিন পরে ছুটিতে যাচ্ছি । মাঝে গত ঈদটাও সরকারকে উতসর্গ করতে হয়েছিল ।ফলে চুয়িংগাম চাবাইতে চাবাইতে যখন দেখলাম যে আমি ছাড়া আমার এই সিটের জন্য আর কোন দাবিদার নাই ……মনটা আসলেই আকাশে উড়তে লাগল । খালি একটাই আশা একটু পাতলা গোছের মাঝবয়সী কেউ পাশে বসুক । কেননা পিচ্চি পোলাপাইন বা বয়স্ক হইলে ক্যাওম্যাও বা ঘ্যানঘ্যান করতে পারে । ল্যাপটপ আর হ্যান্ড ব্যাগটা নীচে সেট কইরা বইসা যামু কিনা ভাবতেছি এমন সময় এক দাড়িওয়ালা ভাইয়ের আগমন । আমাকে দেখে বেচারা যেন আকাশ থেকে পরলেন । আমি চিন্তা কইরা কূল পাইতেছিলাম না যে আমার চেহারা এমন কি খারাপ যে উনি অনেকটা আতকাইয়া উঠলেন ঃ
– ভাই আপনের সিট নাম্বার কত ?
-বি২ । আমি আমার টিকে্টটা উনাকে দেখালাম ।
-ও । ঠিকই আছে । ওইটা তোমার সিট ।
উনি উনার পিছনে থাকা এক তরুনীকে আমার পাশের সিটটা দেখিয়ে বললেন । আমি এতক্ষনে বুঝলাম ক্যান উনি আমারে দেইখা এমুন ভাব ধরছিলেন । আর আমার মনে তখন ………পাঠক, প্লিজ নিজ দায়িত্বে বুইঝা লন ।
-আচ্ছা, আপনারা বসেন আমি বাইরে যাচ্ছি । আমি কিছুক্ষনের জন্য নিচে নেমে গেলাম যাতে উনারা একে অপরকে সী-অফ একান্তে করতে পারেন ।
বিকাল ৪।৩০ এ বাসের ড্রাইভার বাসে উঠে বসলো । আমিও উঠলাম পিছুপিছু । দেখি ভাইজান নাই । আগেই নাইমা গেছেন । সহযাত্রীর দিকে একবার তাকাইয়া তার এক্সাক্ট বয়স বুঝতে ব্যার্থ হইয়া আমিও নিজ আসন গ্রহন করলাম ঃ
– এক্সকিউজ মি । আপনার প্রবলেম থাকলে আপনি সিট পাল্টাইতে পারেন । আমি কিছু মনে করবো না। ইন ফ্যাক্ট আগেও এরকম সিচুয়েশনে আমি পড়ছিলাম একবার । সো পাশের সিটে একটা পিচ্চি আছে আপনি চাইলে আমি বাস গাইডকে ডাকতে পারি ।
– না। সমস্যা নাই । আপনি চিন্তা করবেন না প্লিজ । its ok .
– আসলে এই রকম সিচুয়েশনে নরম্যালি মেয়েরা সিট চেঞ্জ করে নেয় । আগে একবার আমার সাথে এমন হইছিল । আমার মায়ের বয়সী মহিলার জন্য আমার সিট চেঞ্জ করায় দেওয়া হইছিল ।
– না ঠিক আছে ।
– ওকে । আপনার কোন প্রব্লেম না থাকলে ভাল । বাই দ্যা ওয়ে আমি শিবলী ।
– আমি আর্শি ।
– আনকমন নেম । ক্লোজআপ ওয়ানে মনে হয় ওর্শি নামের একটা পিচ্চি ছিল না?
– আমি আর্শি । ও ছিল ওর্শি ।
– হুম্মম্ম । আপনার বাড়িও কি বগুড়া ? একাই যাচ্ছেন ? ভাইয়া যাবেন না ?
– না। আমি একাই যাচ্ছি ।
এই রকম সময়ে বেরসিকের মত আমার চিন্তিত মায়ের ফোন । আমি তাড়াতাড়ি আমার মাকে জানাইলাম যে বাস টাইমমত ছাড়ছে আর পরে কথা হবে । কিন্তু লাভ হইল না। ওই পক্ষকেও ফোনে ব্যাস্ত দেখে আমি হাল ছেড়ে দিয়ে সকালের নির্ধারিত কর্মসূচী থেকে প্রাপ্ত বিশাল সাইজের একখানা পত্র পড়া শুরু করলাম । পত্রটা কি বিষয়ক, তা না হয় আর একদিন বলব । চিঠি পড়তে পড়তে খালিদের ফোন । তার সাথে বরাবরের মতই কিছুক্ষন আজাইরা প্যাচাল পাড়ার পর কানে ইয়ারফোনটা লাগাইয়া প্রিয় গানগুলা আর একবার শুনতে গিয়ে খেয়াল করলাম যে বাসের টিভিটা কে জানি সযত্নে সরায়ে রাখছে ।সন্ধ্যার সময় বলেই হয়তো কোন মিউজিকও ছাড়া হচ্ছে না ।ফলে টাইম পাসের জন্য উত্তম ভেবে আমি আমার ল্যাপটপটা বাইর কইরা ফেসবুক, সিসিবি আর ম্যসেঞ্জারে ইন হইয়া গেলাম । প্রিয় একজনকে অনলাইনে পাইয়া পাশের জনের কথা হয়তো পুরাই ভুইলা গেছিলাম ।এমন সময় আরো ২/১ টা ফোন আসায় আমার চাকরির কথাটাও উচ্চারন করতে হইল।এমনকি এক ফ্রেন্ডের সাথে ক্যাডেট-অক্যাডেট একটা ঝগড়াও হইয়া গেল । প্রায় ঘন্টাখানেক পর টের পাইলাম যে সুর্য মামা অনেক্ষন আগেই গেছেন । আর আমার ল্যাপটপের আলো ছাড়া ২/১ টা মোবাইলের আলো দেখা যাচ্ছে । আমার বাম পাশের মেয়েটা তার বাম হাতের সাহায্যে চোখ ঢেকে বাম দিকে মুখ ঘুরিয়ে চুপচাপ বসে ।
– স্যরি । আলোতে আপনার প্রব্লেম হচ্ছে না তো ?
– না ঠিক আছে ।
– আমি ডিফেন্সে আছি ।
– আমি ষ্টুডেন্ট । বিবিএ ।
-ও । আপনার এইচ এস সি কবে ?
-২০০৫ ।
– তাইলে ভাই আমিই সিনিয়র । মমমম আপনি ম্যারেড ?
– না । কেনো?
-স্যরি । আমি ভাবছিলাম যে আপনি……আর আপনাকে সী-অফ করতে আসছিলেন উনাকে ভাইয়া ভাবছিলাম । এই জন্যই জিজ্ঞাসা করছিলাম যে ভাইয়া যাবেন কিনা………
-না । ( একটু হাসি) ও আমার কাজিন । আমাকে বাসে তুলে দিতে আসছিল ।
-ও সরি সরি । আমিতো মনে মনে বিশাল কাহিনী বানাইয়া নিছিলাম । আসলে আমাকে দেখে উনি মনে হয় ………কোন মহিলাকে আশা করছিলেন মনে হয় ।
-হু…। সবসময় বাবা টিকেট করে দেয় । এবার ভাইয়া তাড়াহুড়া করে টিকেট করছে । লিখে দ্যায় নাই । আমি প্রথমবার একা যাচ্ছি । নরমালি বাবা সাথে থাকে আমার পাশে ।
-আমিও কোন মেয়ের পাশে ফার্ষ্ট টাইম । আগে একবার এক মহিলার পাশে সিট পরছিল বাট চেঞ্জ করা হইছিল ।
এমন সময় যে ফ্রেন্ডের সাথে একটু আগে চ্যাট করতেছিলাম তার ফোন ঃ
-কি সুন্দরি কি বলে ?
-কি আর ??? তুমি তো……
-মাঝখানে ফোন দিছি ?????? ( হাসি )
– ওই রকমই আর কি ?
-খুব সুন্দরি নাকি???
– মমমমম বলতে পার মটামুটি । চলে । তা তুমি এত টেনশন নিতেছ ক্যানরে ভাই । আমি বললাম তো দেখবনি । তুমি চিন্তা কইর নাতো !!!
-ডিস্টার্ব করলাম ?
-কিছুটা ।
-ওকে রাখলাম ।
– ওকে । পরে আমি ফোন দিব । বাই।
-বাই।
ফোন রাখলেও টের পাইলাম আবার নতুন কইরা শুরু করতে হবে । হামতুম মুভির সাইফের কথা মনে হইল । নিজেরে কইলাম ” টেক ইওর টাইম “।

৫৩০ বার দেখা হয়েছে

১৭ টি মন্তব্য : “এ জার্নি বাই বাস-১”

  1. সাবিহা জিতু (১৯৯৩-১৯৯৯)

    এ জার্নী বাই বাস- ২ এর অধীর অপেক্ষায় থাকলাম :dreamy:
    কথা আগাইতে টাইম টেইক কর, নো প্রবলেম। বাট ভাই আমাগোরে বেশী টাইম ওয়েট করাইও না।


    You cannot hangout with negative people and expect a positive life.

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।