৩৬ দিনের দেশ-৩

কুতুব দেখেই আমার কেন যেন ধারণা হয়ে গেছিল সম্রাটেরা বঙ্গ দেশকে খুব একটা পাত্তা দিতে চাইতেন না, তাঁদের নজর ছিল হিমালয়ের কাছাকাছি দিল্লী, রাজস্থান-এসব অঞ্চলে। ভারত ট্যুরের বাকি দিনগুলোতে এ ধারণা আরও পাকাপোক্ত হয়েছিল। সত্য বলতে কি, ভারতের পুরাকীর্তি দেখলে বাংলাদেশের লালবাগের কেল্লা, কি বগুড়ার মহাস্থানগড় সবই কেমন যেন মলিন মলিন লাগে। স্বীকার করতে লজ্জা নেই যে ভারতীয় উপমহাদেশের মূলধারার স্থাপত্য আসলে পুরোটুকুই প্রায় ভারতের ভাগে পরেছে। এটা বাংলাদেশের জন্য ভালো কি খারাপ, তা আমি বলতে পারবো না। তবে ভারতীয়রা তাদের এই পুরাকীর্তিগুলোকে এত যত্নে রেখেছে যে, নিজেদের দিকে তাকাতে কিঞ্চিৎ খারাপই লাগে।
ছবিসূত্রঃ আজরিন

স্থাপত্যের ছাত্রী হওয়ার পরও কেন যেন এই পুরাকীর্তি টির্তি দেখতে আমার একদম ভালো লাগে না। এতদিনকার পুরনো ভাঙ্গা হাঁড়ি কুড়ি দেখে আমার কি লাভ? তবে পুরাকীর্তি যে কেবল ভাঙ্গা হাড়িকুড়িই নয় সেটা আমি প্রথম বুঝেছিলাম এই কুতুবে গিয়েই। পুরাকীর্তি কথা বলে শত শত বছর আগেকার মানুষের বসবাসের ধারা নিয়ে। আমরা এতশত পুরনো জিনিস দেখি যেন পুরনো ভুলগুলো আবার নতুন করে আমাদের সমাধান না করতে হয়। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে সমাধান দিয়ে গেছেন তা নতুন করে করতে গিয়ে যেন সময় নষ্ট না করি।
এই সব ভাবতেই ভাবতেই বাসে করে দিল্লী ফিরছিলাম। মাঝপথে গাইডের সাথে বাঁধলো ফ্যাকড়া। সে আমাদের বিভিন্ন মার্কেটে নিয়ে যেতে চায়, আর আমরা চাই স্থাপনা দেখতে। কিন্তু স্থাপনা দেখিয়ে তার তো কোন লাভ নাই, তাই সে তার অবস্থান থেকে নড়বে না। রাগ হলে আমার আবার শুধু ইংরিজি চলে আসে, আমি গাইডকে ইঙ্গ ভাষায় টানা পাঁচ মিনিট ঝাড়লাম। আমার লেকচার শেষ হলে ব্যাটা বলে, সে নাকি ইংরেজী বোঝে না। ব্যাটা বাঞ্চোত, বাসে উঠে তবে যে বললি ‘হিন্দী অর ইংলিশ’?
আমাদের সাথের কিছু হিন্দীপ্রাণ তাকে বলেছিলো হিন্দীই সই, ব্যাটা সেই সুযোগটাই নিল। পেছনে আমরা রাগে কটকট করে শব্দ করতে থাকলাম, কিন্তু কোন মার্কেটে যেতে রাজী হলাম না। বেশ কিছুক্ষণ ঝগড়া ঝাটির পর আমরা রওনা হলাম দিল্লীর রাষ্ট্রপতি ভবনের দিকে। এই ঝগড়ার শোধটা সে তুলেছিল সেদিন রাত্রে বেলা, আমাদের অকূল পাথারে ফেলে। সে ঘটনায় পরে আসা যাবে।
দিল্লী রাজপথ, ছবিসূত্রঃ আজরিন

দিল্লীর রাজপথ। অসাধারণ একটি জায়গা… কোমল, নির্মল, শুদ্ধ। রাজপথটি তার পশ্চিমে রাষ্ট্রপতি ভবন আর পূর্বে ইন্ডিয়া গেটকে একই অক্ষে যুক্ত করেছে। দিল্লীর এই অংশটুকুর নকশা বিখ্যাত ব্রিটিশ স্থপতি এডউইন লুটেনের (সঠিক উচ্চারণ সম্ভবত লুটইয়েন, lutyen)।
লাল স্যান্ডস্টোনের তৈরী রাষ্ট্রপতি ভবন দুটো ব্লকে বিভক্ত, নর্থ ব্লক আর সাউথ ব্লক। আগে এখানে ব্রিটিশ ভাইসরয় থাকতেন, তিনি বিদেয় হওয়াতে এখন থাকেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। এটি নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘বাসা’। ৩৩০ একরের ওপর তৈরী। ৩৪০টি রুম আছে এখানে। আরও আছে ৩৭০টি স্যালুন, ৭৪টি লবি, এক কিমি করিডোর, ১৮টি সিঁড়ি আর ৩৭টি ঝর্ণা! এতকিছু পরিষ্কার করে কারা? এই ভবনের কাছাকাছিই আছে পার্লামেন্ট ভবন বা রাজ্য সভা। পার্লামেন্টটা একদম গোল, ১৭১ মিটার ব্যাসের আর ১৪৪টি কলামের ওপর দাঁড়ানো। প্রতিটি কলাম ৮.৩ মিটার লম্বা। আমরা পৌছেছিলাম গোধূলীবেলার ঠিক আগ দিয়ে। সবকিছু চুপচাপ, রাজপথের এদিকটায় কেউ আসেনা বোধহয়। রাষ্ট্রপতি ভবনের বেশি কাছে যাওয়া যায় না, আমরা তার সামনের মুঘল ধাঁচে করা বাগানটিতে ঘুরছিলাম, কেমন অপার্থিব লাগছিল সবকিছু। সন্ধ্যার এই আবছা আলোতে ব্যাচমেটগুলোকে অনেক আপন আপন মনে হচ্ছিল।

আমাদের স্যারেরা প্রায়ই ভাবালু কন্ঠে বলে থাকেন স্থাপত্য পরিবেশ পরিবর্তন করে দিতে পারে, মানুষের চরিত্রে পরিবর্তন এনে দিতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁদের ভাষ্যমতে স্পেস ক্যারেকটার (space character), বা থাকার জায়গাটার চরিত্র মানুষের কাজকর্মের ওপর বড় একটা অবদান রাখে। একটা সুন্দর এবং পারফেক্ট স্পেস ডিজাইন করে মানুষকে কর্মক্ষম করে তোলা যায়…(এটুক পর্যন্ত ঠিকাছে), সমাজে পরিবর্তন আনা যায়, (এইটাও ঠিকাছে, উদাহরণ শহীদ মিনার)… সমাজে গণতন্ত্র পাওয়া যায় (একদম চাপা), সমাজের ভোলটাই পালটে দেয়া যায়…(বিশাল চাপা)। আমাদের সংসদ ভবন আর দিল্লীর পার্লামেন্ট ভবন-এই দুইটা স্পেস এত নির্মল আর এত শুদ্ধ যে স্থাপত্যের প্রচলিত কথাবার্তা অনুসারে এখানে যারা কাজ করবে তারাও অনেক নির্মল, বড় মনের আর শুদ্ধ হওয়া উচিৎ। পাঠক, বাকিটুকু বুঝে নিন।
রাজপথের পূর্ব দিকে হলো ইন্ডিয়া গেট, দ্য গ্রেট ইন্ডিয়া গেট। যেদিনকার কাহিনী লিখছি ঠিক সেদিনই ইন্ডিয়া গেটে যাওয়া হয়নি। এর পরের বার যখন দিল্লীতে ফিরে এসেছি, সেদিন আমরা কয়েক বন্ধু মিলে গেলাম। আফসোস করছিলাম- অন্ধকার হয়ে গেছে…ঠিকমত দেখতে পাবো না। আইসক্রীম খেতে খেতে রাজপথে ধরে সামনে হেঁটে যাচ্ছি, অন্ধকার, ইন্ডিয়া গেটটা খুঁজে পাচ্ছি না। আমার এক বন্ধু বললো, ‘কাহিনী কি, ‘আমরা কি উলটা দিকে হাঁটছি নাকি?’ ঠিক সেসময়, আমাদের সামনে ইন্ডিয়া গেটের আলোগুলো একটা একটা করে জ্বলে উঠলো। আমার মনে হলো, অন্ধকারের মাঝে সে যেন একটু একটু করে তার রূপ আমাদের দেখাতে চাচ্ছে, একবারে সবটুকু গিলিয়ে না দিয়ে। আমরা ঘোরের মাঝে সামনের দিকে এগুতে লাগলাম…এই মুহুর্তটা বোধহয় আমি জীবনে কখনই ভুলব না।
ছবিসূত্রঃ আজরিন

ইন্ডিয়া গেটের সৌন্দর্য এই লেখায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমার মনে হচ্ছিল আমার সকল দুঃখ কষ্ট লজ্জা অপমান এই বিশালত্বের কাছে উজাড় করে দিয়ে শুদ্ধ হয়ে ফিরে আসি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত ভারতীয়দের স্মরণে তৈরি এই ইন্ডিয়া গেট, ১৩৫১৬জনের নাম এখানে খোদাই করা আছে। দিল্লীতে গিয়ে এই গেট না দেখে, এবং এর আসেপাশের সবুজ মাঠে অলসভাবে না হেঁটে ফিরে আসলে জীবন বৃথা।
দিল্লী থেকে আমরা বাসে রওনা দিলাম চন্ডিগড়ের উদ্দেশ্যে, রাত্রেবেলা। আমরা চেষ্টা করতাম রাত্রে জার্নি করতে, তাতে করে হোটেল ভাড়ার টাকাটা বেঁচে যেত। বাসেই যতটুকু পারতাম ঘুমিয়ে নিতাম। রাত অনেক গভীর তখন, সম্ভবত একটা দুটা বাজে, এসময় আমরা দেখি হাইওয়ের মাঝে এক জায়গায় বাস থেমে আছে। ড্রাইভার বাস ছাড়বে না, যতক্ষণ না তাকে এক্সট্রা টাকা দেয়া হবে। আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো, আমরা পাওনা সমস্ত দিল্লীতেই পরিশোধ করে এসেছি। তাহলে কেন এই ঝামেলা? জিজ্ঞেস করে জানা গেলো, এজেন্সী তাকে প্রয়োজনীয় টাকা দেয়নি, বলেছে পরে দিবে। যে টাকা দিয়েছে তাতে করে এত দূরের পথ যাওয়া সম্ভব না, তাই আমাদের টাকা দিতে হবে।
এত রাত্রে বেলা একেবারে অন্য ভাষার অন্য একটি দেশে এই ধরণের ব্যবহারের সম্মুখীন হয়ে আমরা কি করব বুঝতে পারছিলাম না। প্রচন্ড অসহায় লাগছিল।
পরে ব্যাচের ছেলেরা নেমে বাসপক্ষের লোকদের সাথে কি যেন সমঝোতা করছিল, এত দিন পরে আর মনে নেই। তবে ওরা সেদিন অনেক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিল। বাসের এই ঝামেলা অবশ্য শেষ হয়নি, পরেও বহু জায়গায় বহু ঝামেলা তারা করেছিল। যাহোক, ঘন্টা দুয়েক পরে বাস আবার চলতে শুরু করলো।

২,০৪১ বার দেখা হয়েছে

১৯ টি মন্তব্য : “৩৬ দিনের দেশ-৩”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    তোমরা কোন সালে গেছিলে?
    আমি বোধহয় তখন দিল্লীতেই। সিসিবির যোগাযোগটা তখন থাকলে তোমাদের হয়তো কিছু হেল্প করতে পারতাম। বিদেশ-বিভুঁইয়ে (বিশেষত উপমহাদেশের দেশগুলোতে) বেড়াতে যাবার অনেকরকম ফ্যাঁকড়া।

    জবাব দিন
  2. ইন্ডিয়া গেটে গেছিলাম, রাজপথেও গেছিলাম কিন্তু এমন কিছু মনে-টনে হয় নাই। বিরক্ত লাগছিল বড় বাড়ীগুলা দেইখা। না গেলে জীবনটাও বৃথা হইতো না মনে হইছে 🙁

    বুঝছি, ট্যুরিজম আমার জন্য না।

    জবাব দিন
  3. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    ব্লগে এসে গত কয়েকদিনে কিছু শক (পজেটিভ অর্থে) পাইছি... সামিয়াকে দিল্লি পৌছায় যাওয়া তার মাঝে অন্যতম বড় শক, আর পর পর দুই পর্ব দেখে তো পুরো মিরা যাবার দশা...

    ভারত ঘুরে দেখার অনেক ইচ্ছা ছিল, তবে সেটা আদৌ পূরন হবে কিনা সন্দেহ। আপাতত তোমার এই লেখাই ভরসা... (ভবিষ্যতে কোন এক দিন যদি চন্ডিগড়ে পৌঁছাতে পার আরকি 😛 )


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  4. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    ট্রেনটা মাঝপথে আটকা পড়েছিল। লাইন ক্লিয়ার হইছে, তাই দিল্লি পৌঁছলো! ভালো লাগছে স্থাপত্য-ভ্রমণ। তাড়াতাড়ি আগাও স্যাম। তর সইতাছে না।

    আমার জন্য যে লাড্ডু আনছিলা সেইটা খাইয়াই তো সুগার লেভেল বাইরা গেল.... ;))


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  5. মুরাদ (৯০-৯৬)
    আমাদের সংসদ ভবন আর দিল্লীর পার্লামেন্ট ভবন-এই দুইটা স্পেস এত নির্মল আর এত শুদ্ধ যে স্থাপত্যের প্রচলিত কথাবার্তা অনুসারে এখানে যারা কাজ করবে তারাও অনেক নির্মল, বড় মনের আর শুদ্ধ হওয়া উচিৎ

    =))


    শামীম মুরাদ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।